Tuesday, 24 December 2024

বড়ো দিন

বড়োদিন। দিনের কি আর বড়ো ছোটো আছে রে পাগল? এ দিন দীন বা বড়োলোক কোনোটাই না। কিন্তু, এই দিন-ই-ইলাহীতে এলাহী ব্যবস্থা হয়। স্বয়ং যীশুখ্রিস্টের হ্যাপিবাড্ডে বলে কথা! তার জন্মের সময়ে তিন বৃদ্ধ জ্ঞানী মানুষ উড়ে এসে ধূপচন্দন দিয়ে গেছিলো, যাদের ছোটোবেলায় মাগী বলতাম - যদিও পুরুষমানুষ কীভাবে মাগী হবে, এই ব্যাপারটা সাল্টে উঠতে পারতাম না (তখনও জেন্ডার নিয়ে ধারণা গড়ে ওঠেনি, woke বলতে ঘুম থেকেই জাগা বুঝতাম)। পরে যখন এক ইঞ্জিরিশিক্ষিত বন্ধু বুঝিয়ে দেয় যে ওটা ম্যাজাই, তখন মানবইতিহাসের এক অবোধ্য রহস্যের দ্বার চোখের সামনে উদঘাটিত হয়ে যায়। 

আমরা যারা কনভেন্টলালিত ও কলোনিপালিত নই, তাদের কাছেও বড়োদিন আর পাঁচটা দিনের থেকে অনেকটাই আলাদা ছিলো। যাদের কপাল এবং বাবা-মা ভালো ছিলো, তারা সান্তাক্লজের গিফট পেতো, এবং যাদের বাবা-মা এবং কপাল ভালো ছিলো না, তারা পেতো আমাদের সমবেদনা। এই সান্তাক্লজ আমার কাছে বিশ্বের ত্রয়োদশ আশ্চর্যের মধ্যে ছিলো। কাবুলিওয়ালা আফগান রহমতের এই কমিউনিস্ট ভাইয়ের ঝোলায় হাঁথির পাশাপাশি এতো কিছু কীভাবে যে ধরতো, যেটা নিয়ে সে বিশ্বময় শিশুর চাহিদা পূরণ করতে বেরোয় 'নিয়ে ঝোলা চললো ভোলা' গাইতে গাইতে, সেটা কোনোদিন বুঝিনি। তবে আমার দৃঢ় ধারণা ছিলো, সান্তাক্লজ বাংলা বোঝেনা। একবার চেয়েছিলাম রিমোট কন্ট্রোল ট্রেন, পেয়েছিলাম পথের পাঁচালী। আরেকবার চেয়েছিলাম টিনটিনের বই, পেয়েছিলাম শঙ্কু সমগ্র। দুবারই দেখেছিলাম, বইয়ের মধ্যে খড়দহ বইমেলার বিল। ভেবেছিলাম, সান্তা নিশ্চয়ই বইমেলায় স্টলগুলো বন্ধ হওয়ার আগে হাতের সামনে যা পায়, খাবলা মেরে তুলে নেয়। খারাপই লাগতো। একা একা একটা লোক, সন্ধে থেকে বিশ্বজুড়ে বাজারহাট করতে বেরোয়, এবং এদিকসেদিক হয়ে যায়। হয়তো কোনো জন্মান্ধ শিশুকে রঙিন গগলস গিফট করেছে, বা বধির কোনো শিশুকে নতুন ইয়ারফোন দিয়েছে, এমন ঘটনাও নিশ্চয়ই ঘটে। লাল কাবুলিওয়ালার প্রতি আমার মন মিনি-সম ম্যাক্সি সহানুভূতিতে পরিপূর্ণ হয়ে যেতো। আহারে, একটা লোক খান সাতেক বল্গা হরিণকে চাবকাতে চাবকাতে ঘণ্টা বাজাতে বাজাতে ভুঁড়ি নিয়ে চিমনি বেয়ে নেমে এসে (বাঙালি ঘরে কীভাবে আসে, খোদায় মালুম) গন্ধমোজার পাশে গিফট রেখে যায় অন্ধকারে। কী খাটনি ভাই। তাকে গালাগাল দিয়ে লাভ আছে?

কিন্তু, এমনও একদিন এলো, যেদিন খোঁখা সোসুরবাড়ির মানে বুঝে গেলো, ফলে সান্টা তখন কাবুলিওয়ালা থেকে ডিমোটেড হয়ে গেলো। কিন্তু তবুও, বড়োদিনের আনন্দ কোনোদিনই তেমন মাটি হয়নি। বড়োদিন মানেই রিচুয়াল ছিলো, ভল্টু (আমার মা'র বাবা) কেক আর কমলালেবু নিয়ে সকাল সকাল এসে বেল বাজাবে। খুবই আনন্দে কাটতো সারাদিন - পড়াশুনো তো নেইই, বরং তাধিন তাধিন করে দিনটা কাটানো যাবে। বিকেল বিকেল বেরিয়ে পড়তাম ভল্টুর সঙ্গে, স্কুলের বন্ধুদের জন্য গ্রিটিংস কার্ড কিনতে। আট আনা থেকে একটাকার যে অত্যন্ত প্যাতপ্যাতে, দেড় বাই দুই ইঞ্চির যে কার্ডগুলো, সেগুলো থাকতো সাধারণ বন্ধুদের জন্য। ৫-১০ টাকারগুলো থাকতো বেঞ্চের সদস্যদের জন্য। আর কুড়ি কি তিরিশ টাকার যে কার্ডগুলো, বেশ বড়োসড়ো, খুললে পরে কেক গাড়ি টেডি বেড়াল কুকুর হাতি কেল্লা ইত্যাদির ত্রিমাত্রিক জেল্লা দেওয়া কার্ডগুলো ছিলো বেস্ট ফ্রেন্ড যে, তার জন্য। আবার যদি হিসেবের বাইরের কেউ কার্ড দিতো, তার জন্য আবার গিয়ে কার্ড কিনতে হতো, সে যে দামের দিয়েছে, সেই দামের অনুপাতে। সম্পর্কের উপর ভিত্তি করে কার্ডের দামের অর্থনীতি সেই বালক, বা না-বালক বেলাতেই দিব্য বুঝে গিয়েছিলাম।

আমাদের মফস্বলের বড়োদিন আসলে এরকমই ছিলো কমবেশি। খৃষ্টে আর কৃষ্টে তফাত আছে কি নেই, এই নিয়ে চুলোচুলিও হয়নি কোনোদিন। আবার, বিশ্বায়নের জোয়ারে ভেসে গেলেও হুজুগে মাতিনি কেউ কোনোদিন। পার্ক স্ট্রিটে না এতো ভিড় হতো (যদিও লোকজনের জীবনে তখনো পুলক ছিলো, এখনকার মতো না হলেও), না 'যীশুখ্রিস্টের জন্মদিন কি পার্কস্ট্রিটে?' বলে অত্যন্ত উচ্চস্তরের হিউমার দেখানোর চল ছিলো। পার্কস্ট্রিটের ঝলমলে আলো, সাহেবিয়ানা, ক্রিসমাসের সাজ, অ্যালেন পার্কের সামনের ক্রিসমাস ট্রি - এগুলো সবই কেমন একটা অধরা স্বপ্নের মতো অপাপবিদ্ধ ছিলো, প্রত্যাশার আলোয় ভাস্বর। বড়োদিন মানে আমাদের কাছে ছিলো কাউন্টডাউন - নতুন বছর, স্কুলে ফেরত যাওয়া, আবার গল্প-খেলাধুলো, আবার পড়াশুনো শুরু - মার্চেই অ্যানুয়াল (তখন অদ্ভুত একটা সাইকেল ছিলো)। বড়োদিনের কেক ছিলো, কমলালেবু ছিলো, সান্তা ছিলো, নির্মল আনন্দ ছিলো - আর আমার কাছে আমার ভল্টু ছিলো। 

ভল্টু চলে গেছে অনেকদিন হলো। টেবিলে এখনো কেক আর কমলালেবু রাখা কালকের জলখাবারের জন্য। কিন্তু জানি না কেন, কেক আর কমলালেবু আর আগের মতো মিষ্টি লাগে না। কার্ড কিনতে হয় না - দেবো কাকে? রাতে বিছানায় শুয়ে ঘাপটি মেরে 'এই সান্তা এলো, দেখবো কেমন দেখতে' - ও করতে হয় না। সারপ্রাইজের আনন্দ অনেকদিন আগেই মুছে গেছে। মানুষের তো আর মৃত্যু হয় না, হয় ইনোসেন্সের; বাকি জীবনটা পরিপক্কতার সঙ্গে দ্বন্দ্ব লড়ে যাওয়া কেবল। আসলে, জীবনটাও এই বড়োদিনের মতোই। যতো বয়েস বাড়ে, ততো তার জৌলুস কমতে থাকে। তবুও কোথাও গিয়ে হলেও আমরা অপেক্ষা করে থাকি, যদি ঝুমঝুমি বাজিয়ে এক সাদাদাড়ি বুড়ো এসে এক মুঠো আনন্দ রেখে যায় মোজার ভিতরে। আমেন।




Monday, 2 December 2024

'যাক, যা গেছে তা যাক...'

 এখনকার ছেলেমেয়েদের (ব্যতিক্রম বাদে) গানের টেস্ট দেখলে কষ্ট হয়। ভাবলে হতাশ লাগে, এরা অখিলবন্ধু শোনে না, জটিলেশ্বর শোনে না, মানবেন্দ্র শোনে না, শ্যামল মিত্র শোনে না। মান্না দে, সুবীর সেন, হেমন্ত কিচ্ছু না। বড্ড হিসেবি এই জেনারেশন। এরা প্রেমে পড়ে না, প্রেম করে। 


এরা বলে না, 'সে আমার মনের মানুষ বলে, মরেছি অনেক জ্বালায় জ্বলে...'। এরা 'শুরু হল কবে, এতো চাওয়া-পাওয়া/একই অনুভবে, একই গান গাওয়া'-র আশ্লেষে ভাসে না আর। এরা প্রেমে পড়ে চিঠি লেখে না, 'এমন মাধবী রাতে আমায় যে মালা তুমি পরালে, যে মাধুরী দিয়ে মোর শূন্য জীবন তুমি ভরালে...'। এরা অঙ্ক কষে ভালোবাসে। তুমি দাও, আমিও দেব। তুমি করো, আমিও করব। প্রথম দেখার উদ্বেলতায় ওরা গেয়ে ওঠে না, 'ও কেন তখন উড়িয়ে আঁচল বিনা কাজে সামনে এল? দেখে তো আমি মুগ্ধ হবোই, আমি তো মানুষ!' মিলনাকাঙ্ক্ষায় এদের মাথায় খেলা করে যায় না 'ঝরনা কেমনে হয় নদী, সাগর না ডাকে কাছে যদি?'


ভালোলাগার মানুষটার উল্টোদিকে বসে কারোর আর 'না-বলা কথায় থরথর অধর কাঁপা..'-র অনুভূতি হয় না। কাছের মানুষটাকেই পেয়ে কেউ আর 'এই জীবনে যে-কটি দিন পাব, তোমায়-আমায় হেসেখেলে কাটিয়ে যাব দোঁহে, স্বপ্নমধুর মোহে'-র আকাঙ্ক্ষা করে না। এরা 'ক্রাশ' খায়, অথচ কেউ 'কী নামে ডেকে বলব তোমাকে, মন্দ করেছে আমাকে ওই দুটি চোখে' বলে না। এদের 'হার্টব্রেক' এবং 'ক্লোজার' হয়, কিন্তু 'ওই পথ দিয়ে বধূবেশে সেজে যেদিন গেল সে হারিয়ে, সেদিন আমার সজল হৃদয় দুপায়ে গিয়েছে মাড়িয়ে - যাক, যা গেছে তা যাক...' হয় না।


এদের অভিমানও হয়না। এদের অধিকাংশই যন্ত্রবৎ, যুক্তির ইঁট দিয়ে তৈরি। কেউ এরা বলে না, 'যখনই আসবে সে, তখনই যেতে হবে - আমি কি এমনতরো ফ্যালনা?'। বা, অভিমানে গেয়ে ওঠে না, 'ও রূপের মিথ্যে গরব অমন যদি বিরূপ থাকে, ও গুণের কী দাম বলো লাজেই যদি আগুন ঢাকে..'।  বলে না, 'এত সুর আর এত গান, যদি কোনোদিন থেমে যায়, সেইদিন তুমিও তো ওগো, জানি ভুলে যাবে যে আমায়...'। এরা বড্ড কাঠকাঠ।


এই সব গান আস্তে আস্তে হারিয়ে যাবে। যাচ্ছেও। কালকেই যেমন জানলাম, একটি বিশেষ খ্যাতনামা কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের পড়ুয়াদের কেউ 'তখন তোমার ২১ বছর বোধহয়' গানটা শোনেনি। এভাবেই আস্তে আস্তে হারাচ্ছে বাংলা গানের স্বর্ণযুগ, যেভাবে হারিয়ে যাচ্ছে প্রেম। হারিয়ে গিয়েছে প্রেম। হারিয়ে গিয়েছে ভালোবাসা, আবেগ, প্রেমে 'পড়া', একজনের প্রতিই অনুরক্ত থাকা। 'ভালোবাসায় শরীর আসা' বদলে গিয়েছে 'শরীরী ভালোবাসায়'। 


এভাবেই হারিয়ে যায় সময়। মরে যায় সময়। মৃত্যু হয় ইনোসেন্সের। আবেগের। মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে কঠোরকঠিন যুক্তি। 


'যাক, যা গেছে তা যাক...' :)

Sunday, 24 November 2024

বিদায়, পত্রাবলী...

ভার্চুয়াল চিঠি নিয়ে কদিন বেশ মেতে থাকা গেল যা-হোক। কিছু ভালো অভিজ্ঞতার পাশাপাশি, খারাপ লাগার রেশটুকুও রইলো।


আমাকে যাঁরা একটু হলেও চেনেন, তাঁরা জানেন চিঠি জিনিসটা আমার কতটা প্রাণের। আমি মনে করি, চিঠির থেকে সৎ, আপন এবং হৃদয়াবেত্তাসম্পন্ন লেখা আর কিচ্ছুটি হতে পারে না। যে আবেগানুভূতিকে 'ম্যাচিওর' মানুষজন ব্রাত্য করে রাখেন - মানে, ফেসবুক পোস্টে প্রবল আবেগ দেখান এবং ব্যক্তিগত স্তরে সেই আবেগকে নিয়ে ঠাট্টা-ইয়ার্কি মারেন - সেই আবেগানুভূতিকে সবথেকে স্পষ্ট, সহজ, সরল, রাখঢাকহীনভাবে কেউ যদি তুলে ধরতে পারে, তবে তা হল চিঠি। তার মধ্যে ভান নেই, কোনো লুকোচুরি নেই, নিজেকে মেলে ধরতে কোনো বাধা নেই। চিঠি একটা মানুষের মনকে যেভাবে তুলে ধরে, তা অত্যন্তই বেনজির - যেজন্য, আমরা কোনো মানুষকে জানতে গেলে, বিশেষ করে বিখ্যাত মানুষদের - চিঠি বা ডায়রির শরণাপন্ন হই।


এইজন্যই, বরাবর আমি চিঠি লিখতে ভালোবাসি। প্রথম চিঠি লিখেছিলাম একটি মেয়েকে, যাকে আমার পছন্দ ছিল। তখন পড়ি লোয়ার কেজিতে। মেয়েটি আমাদের ফ্ল্যাটেই থাকতো আর আমার সঙ্গে স্কুলে পড়ত। সম্ভবত এক ক্লাস উঁচুতে পড়ত সে। হারিয়ে-যাওয়া মামাবাড়ির বারান্দায় এক শীতের দুপুরে বসে বসে তাকে ৫ পাতার একটা চিঠি লিখেছিলাম, যাতে 'তোমাকে না দেখলে আমার খুব মন খারাপ করে, তুমি স্কুলে রোজ আসো না কেন, তোমার ওই লাল রিবন দিয়ে বাঁধা বেণী আমার খুব ভালো লাগে, তুমি চাঁদের মতো স্নিগ্ধ' ইত্যাদি লিখেছিলাম। কচি বয়েস থেকেই সুমন-মান্না শুনে গাছপাকা আমি চিঠিতে গানের লাইনটাইনও দিয়েছিলাম বিস্তর। সবই ভালো, কিন্তু সেই চিঠি তাকে আর সাহস করে দিয়ে উঠতে পারিনি। ব্যাপারটা মনে পড়লে এখন বেশ হাসিই পায়, তার মধ্যে আবার সামনের মাসে তার বিয়ে।


ভালোবাসলে চিঠি লেখা ব্যাপারটা সেই তবে থেকে আমার সঙ্গে অদ্ভুতভাবে জুড়ে গিয়েছে। কিন্তু, অদ্ভুতভাবেই - সেই অনুভূতিগুলো কোনোদিন ফিরে আসেনি আমার কাছে। কোনোদিন বললে হয়তো মিথ্যে হবে যদিও। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সেই অনুভূতিগুলোকে দেখেছি খোলা বাজারে বিকিয়ে যেতে। ভালোবেসে চিঠি লিখে উত্তর না পাওয়ায় যত না কষ্ট হত, তার থেকে বেশি খারাপ লাগতো সেই চিঠিগুলো নিয়ে উদ্দিষ্ট ব্যক্তির পরিচিতরা ঠাট্টা-তামাশা করছে। আবেগ, যা কিনা একান্তই আপন, সেই ধবধবে শ্বেতশুভ্র আবেগকে কুৎসিত তামাশার কালিঝুলি মেখে রাস্তায় পড়ে থাকতে দেখতাম।


তাও, হাল ছাড়িনি। লিখে ফেলতাম চিঠি। ভালোবাসলে চিঠির থেকে দামি আর কিছু হতে পারে, এমনটা মনে হয়নি কোনোদিন।


আমার প্রাক্তন প্রেমিকা আমাকে প্রথম প্রথম দুয়েকটা চিঠি লিখেছিল। তারপরে আস্তে আস্তে দূরত্ব বাড়ে। একটা চিঠির থেকে আরেকটা চিঠির দূরত্ব বাড়তে থাকে, বাড়তে বাড়তে চিঠিগুলো হারিয়ে যায়। আমি তবুও লিখতাম। থামাইনি। কখনো পড়ত সে, কখনো না। বেশিরভাগ সময়েই একটা 'তুই কী সুন্দর লিখিস!' মার্কা স্টক উত্তর তার ঠোঁটের গোড়ায় লেগেই থাকত। অথচ, আমি আমার লেখার প্রশংসা শুনতে চাইতাম না। চাইতাম, সে যেন পড়ে। আমাকে স্তোক দিতে নয়, ভালোবেসে। সেটার উত্তর লেখে। চিঠির উত্তর দেওয়া কি খুবই কঠিন? হয়তো নয়। কিন্তু, মনকেও সায় দিতে হয়। চিঠির উত্তর অঙ্ক নয়, যে জোর করলেই মিলবে।


তাকে শেষ চিঠিটা লিখেছিলাম গত বছর ডুয়ার্সে বেড়াতে গিয়ে। চিলাপাতার জঙ্গলে বসে ঝিঁঝিঁর ডাক শুনতে শুনতে, এক মনকেমন করা সন্ধেতে, অখিলবন্ধু শুনতে শুনতে তাকে চিঠি লিখেছিলাম।


সে পড়েনি। 'অত বড়ো চিঠি পড়তে ভাল্লাগছে না। পরে দেখা যাবে।'


পড়েনি আর সে। জানতাম, পড়বে না। আমিও অনুরোধ-উপরোধের পথ বহুদিন হলো হাঁটা বন্ধ করে দিয়েছিলাম, শান্তির জন্য।


শান্তি। কত ছোটো শব্দ, কিন্তু কী প্রবল প্রভাব তার। সারাটা জীবন, আমরা শুধু পাগলের মতো শান্তি খুঁজে চলি। পাই না কেউই। যে কোনো কিছুর বিনিময়ে আমরা শুধু শান্তি কিনতে চাই দুমুঠো, কিন্তু পাই না। সেই দাম চুকিয়ে দেওয়ার মতো ঋদ্ধ হতে পারিনা আমরা।


সে ছেড়ে যাওয়ার পরে নিজের মতো করেই একের পর এক না-পাঠানো চিঠি লিখে যেতাম। আমি নিজের চিঠিগুলোর অধিকাংশই কাউকে উদ্দেশ্য না করে লিখে যেতাম আগেও - 'ঠিকানাবিহীন চিঠি' নামে। সেরকমই লিখে যাচ্ছিলাম।


তখনই, ভালো লাগল একজনকে। যা হয়। একটা শূন্যতা ভরাট করতে গিয়ে ভালো লেগে যাওয়া। তাকেও পরের পর চিঠি লিখে গেছি। নিরর্থক। সে তার মতোই, দিব্যি চলে গিয়েছে। 'সময়েই যে যাওয়ার যায়, মেনে নিতে শিখেছি বিদায়...' সুমন লিখেছিলেন।


তারপরেও, তারপরেও ভালোবেসেছি। চিঠি লিখেছি। অপমানিতও হয়েছি। শুধু ভালোবেসে যে এতটা অপমানিত হওয়া যায়, তা জানা ছিল না। বন্ধুদেরকেও চিঠি লিখেছি। তারাও, দুয়েকজন বাদে, কেজো-কেঠো উত্তর দিয়েছে। কিন্তু, যাদের থেকে পাওয়ার ছিল, তারা কেউ ফিরিয়ে দেয়নি। সত্যিই, চিঠি লেখা বড্ড কঠিন। অনেক সময় লাগে। অনেক কষ্টস্বীকার। আবেগ-টাবেগের মতো ছেঁদো জিনিস মানায় না। আমার বয়সোপযোগীও নয়, পেশাপযোগী তো আরোই নয়।


একটা সময়ে হাল ছাড়তেই হয়। হার মেনে নিতে হয়। এগিয়ে যেতে হয়। নিয়েছি। চিঠি লেখা বন্ধ করে দিয়েছি। আমার ভালোবাসার চিঠিলেখাকে যত্ন করে চুল্লিতে ঢুকিয়ে দিয়েছি। নেড়েঘেঁটে তার নাভি নিয়ে ভাসিয়ে দিয়েছি গঙ্গায়।


ভালো থাক চিঠিরা। যে চিঠিগুলো কোনোদিন ঠিকানা পেল না, ভালোবাসা পেল না, উত্তর পেল না, প্রত্যুত্তর পেল না - তারা সবাই ভালো থাকুক। আমি না লিখলে যদি তারা ভালো থাকে, তবে তাই সই। 



জীবনে তো কত কিছুই ছাড়তে হয়। না হয়, নিজের সবথেকে আপন চিঠি লেখাটাই ছাড়লাম! অপমানের থেকে, অবহেলার থেকে, উপেক্ষার থেকে, তাচ্ছিল্যের থেকে তা অনেক ভালো।



তাই এই কদিন একটু এই চিঠি-নামের খেলনা চিরকুটে, বেনামী খেলায় মেতে ছিলাম। তার পালা মিটল। ধন্যবাদ, যাঁরা আমাকে লিখেছেন। যাঁরা লেখেননি, তাদেরও ধন্যবাদ। যাদের চিঠির আর উত্তর দেওয়া হবে না, তাদের কাছে দুঃখিত। তবে, কথা হবে, গল্প হবে। 


বিদায়, পত্রাবলী। :)  


Sunday, 17 November 2024

ভেন্ডারকথন

 রমাপদ চৌধুরী তাঁর স্মৃতিকথা 'হারানো খাতা'-য় লিখেছিলেন, ভারতে রেলব্যবস্থার পত্তন কীভাবে পরোক্ষভাবে জাতীয়তাবাদী সত্তাকে জাগিয়ে তুলেছিল - ফার্স্ট ক্লাসের কামরা ইউরোপীয় সাহেবদের, সেকেন্ড ক্লাসের কামরা মোটামুটি বড়োলোকদের, আর সাধারণদের জন্য ভরসা থার্ড ক্লাস। থার্ড ক্লাসে জাতপাত-বর্ণধর্ম-ছোঁয়াছুঁয়ি সব ঘুচে যেত। অত্যন্ত ধর্মপ্রাণ, গোঁড়া ব্রাহ্মণের সঙ্গে উঠতেন নিম্নবর্ণের মানুষও। থার্ড ক্লাস সব্বাইকে আপন করে নিতো, মনে করিয়ে দিতো যে তাদের একমাত্র পরিচয় ভারতীয়-ই। এই একই রকম অনুভূতি আমার হয়েছিল ভেন্ডার কামরায় উঠে। 


ট্রেনের ভেন্ডার কামরা -- এক অদ্ভুত, সমাজবিচ্যুত, দ্বীপের ন্যায়, চতুর্মাত্রিক কোনো এনটিটি, যার তুল্য অস্তিত্ব ওই কামরার বাইরে কোথাও নেই। ভেন্ডার কামরা যে ধরনের সাম্যবাদ প্রোমোট করে, স্বয়ং গ্রামসি তাঁর কালচারাল হেজিমনির তত্ত্ব ভুলে যেতেন দেখলে। 


ডেলিপ্যাসেঞ্জারের জীবনে পা দেওয়ার আগে যখনই ট্রেনে চড়তাম, বরাবর জেনারেল কামরাতেই উঠেছি। ভেন্ডার কামরা যখনই পাশ দিয়ে যেতো, নাকে গোঁত্তা মারত এক বিটকেল ছানাপচা টক-টক গন্ধ। ওই গন্ধে প্রাণ ওষ্ঠাগত হয়ে যেতো। ফলে, কোনোদিন কল্পনাতেও আসেনি ভেন্ডারে ওঠবার কথা। 


কিন্তু অদৃষ্ট - প্রথম কলেজে মাস দেড়েক 'লাইফ ইন আ মেট্রো' হওয়ার পরে, ট্রেনের দীর্ঘযাত্রার সুযোগ জুটে গেল, অন্তত বছর তিনেকের জন্য। দীর্ঘ মানে, খড়দা থেকে শেয়ালদা। খাতায়-কলমে ১৮ কিমি রাস্তা, ৩৮ মিনিটের শিডিউল্ড টাইম - যেটা ঢুকতে প্রায় ৫০-৫৫ মিনিট লেগেই যেত আমাদের সময়ে। শিয়ালদা নর্থের ট্রেন লেট করা এবং ঝোলানোর উপর আমার যা বিশ্বাস ছিল, অত বিশ্বাস নিজের প্রাক্তন প্রেমিকাকে অবধি কোনোদিন করে উঠতে পারিনি। 


প্রথম কিছুদিন আপ ট্রেন ধরে ব্যারাকপুর গিয়ে ফের ডাউন ব্যারাকপুর লোকাল ধরে বসে বসে যেতাম। কিন্তু তার জন্য যত সকালে উঠতে হত, তা আমার পক্ষে রীতিমতো টর্চারের শামিল। পড়াশুনোও করব, কলেজেও পড়ব, আবার সকালেও উঠব - এ কেমন অবিচার?


নিকুচি করেছে বসা - এই বলে সোজা বেরিয়ে পড়লাম গটগট করে। খড়দায় এসে দাঁড়ানো ডাউন ট্রেনের ভিড় দেখেই প্রবল জেদ ফুস হয়ে গেল। এবার? এইজন্যই বলে, মা-বাবার কথা শোনা উচিত। 


ইতিউতি তাকিয়ে দেখি, প্রথম ভেন্ডার কামরাটি 'গড়ের মাঠ' না হলেও, 'পেছনে একদম ফাঁকা, খালি গাড়ি কালীঘাট' মার্কাও নয়। অন্তত উঠে দাঁড়ানো যাবে। কিন্তু গন্ধ... 


'ধুত্তোর অলফ্যাক্টরি' বলে উঠে পড়লুম ভেন্ডারে। উঠতেই নাকে ঝাপটা মারল ভেপসে যাওয়া ছানা, পচা শাক, কাঁচা মাছ - সব মিলিয়ে একেবারে রাজা এজিয়ানের আস্তাবলের মতো ব্যাপার। আমি তো আর হারকিউলিস নই - কী করি এবার?


মেনে নিতে হল। কোনোমতে নাকমুখ সিঁটকে যাতায়াত শুরু করলাম। দিনদুয়েকের মধ্যে, আশ্চর্যভাবেই, গন্ধটা নাকে অনেকটা সয়ে এলো। আর, গন্ধ সয়ে আসতেই পুরোনো প্রি-কনসিভড নেতিবাচক ধারণা কেটে গেল, এবং ভেন্ডারের বেশ কিছু ভালো দিক চোখে পড়ল। 


ভেন্ডার একমাত্র জায়গা, যেখানে আরামসে ধূমপান করা যায়। কলেজে পড়া আমি চেইনস্মোকার ছিলুম। খড়দা থেকে কলেজ পৌঁছোতে পৌঁছোতে আমার এক প্যাকেট সিগারেট শেষ হয়ে যেতো। সেই আমার জন্য ভেন্ডারের থেকে উৎকৃষ্ট জায়গা আর কী হতে পারে? 


শুধু তাই নয়, ভেন্ডারে হইহই করে ব্রিজ খেলা চলত। আমার তখন মারাত্মক ব্রিজের নেশা। রাজ্য ব্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের মেম্বার হয়েছি, ব্রিজ খেলতে বড়ো বড়ো ক্লাবে যাচ্ছি, অ্যাসোসিয়েশনের অফিশিয়াল ক্লাবের সদস্যও। রোজ কলেজ সেরে পূর্ণদাস রোডে তাস পেটাতে যেতাম। ফলে, দুই নেশা মিলে ভেন্ডার আমার জন্য এক নতুন স্বর্গরাজ্য হয়ে উঠল। 


ভেন্ডারে কেউ কাউকে রেয়াৎ করে না। আমার যে স্নবারিটুকু ছিল, ভেন্ডারে উঠে দুই খিস্তিতে কেটে গিয়েছিল। আমার কলেজ আমাকে অতটা ডিক্লাসড করতে পারেনি (প্রেসি-যাদবপুরের মতো দুই আঁতেল এবং এলিট, সমাজ-বিচ্যুত প্রতিষ্ঠান এমনিও পারেনা), যতটা ভেন্ডার করেছিল। 


আমার তাস খেলার সঙ্গী ছিলেন বাকি যে তিনজন - তার মধ্যে একজন রাজ্য সরকারি আমলা, একজন সবজির পাইকারি বিক্রেতা, এবং একজন স্কুলশিক্ষক। এদের মধ্যে স্কুলশিক্ষক দমদমে নেমে যেতেন - আর সেই জায়গা নিতেন এক ফুলঝাড়ু বিক্রেতা। 


বাইরে হয়তো অনিমেষদা (নাম পরিবর্তিত) আমলা, ওয়াসিমদা (নাম পরিবর্তিত) সবজি বিক্কিরি করে, তুষারদা (নাম পরিবর্তিত) হাইস্কুলে পড়ায়, রতনদা (নাম পরিবর্তিত) ফুলঝাড়ু বেচে। আমি প্রেসিডেন্সির ভেকধারী আঁতেল। কিন্তু ওখানে আমরা সবাই সমান। একই সিগারেটের কাউন্টার সবার হাতে হাতে ঘুরছে। বাংলা থ্রি নো-ট্রাম্প খেলা অনিমেষদা ডাউন করায় ওয়াসিমদা মা-মাসি তুলে খিস্তি করছে, আর অনিমেষদা 'ভাই রাগ করিস না, গুনতে ভুল হয়েছিল' করে বোঝাচ্ছে। বাইরে আমরা যে যাই হই, ভেন্ডরে আমরা সবাই এক। একটাই আমাদের শ্রেণিপরিচিতি - আমরা ভেন্ডারযাত্রী। কী অদ্ভুত এক সাম্যের পাঠ পেয়েছিলাম! 


কোনোদিন না গেলে, পরে/আগে গেলে খোঁজ নিতো এরা সবাই। ওয়াসিমদার মেয়ের বিয়ের খরচের সিংহভাগ অনিমেষদাই দিয়েছিল, অনেক পরে জেনেছিলাম। রতনদার ছেলে ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করায় তুষারদা ভেন্ডারের প্রত্যেককে মিষ্টি বিলিয়েছিল, চেনা-অচেনা সব্বাইকে। সে আরেক ঝামেলা - ট্রেনে উঠছে লোকে, আর তুষারদা বাক্স খুলে 'এই নিন, খান' বলে বাড়িয়ে দিচ্ছে। লোকে সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখছে, কিন্তু তুষারদার ভ্রুক্ষেপ নেই। 


কলেজ ছাড়ার পরে আর ভেন্ডারে উঠিনি। জানি না, তাদের আজ কী খবর। তবে শূন্যস্থান কখনোই শূন্য থাকে না। আমার জায়গায় অ্যাদ্দিনে নতুন পার্টনার এসে গিয়েছে। অনিমেষদা-রতনদারও রিটায়ার করে যাওয়ার কথা। অন্য কেউ এসে গিয়েছে নির্ঘাত সেখানে। 'ফোর হার্টস' - 'ফাইভ ডায়মন্ডসের' ডাকে কামরা মাতায় অন্যরা এখন।


সব পাল্টে যায় - মানুষ, জীবন, যাত্রা, স্টেশন। শুধু ভেন্ডার এক থেকে যায়। এক রয়ে যায়।..

Thursday, 14 November 2024

বড়ো হয়ে বড়ো হব

আজ নাকি আমাদের, মানে ছোটোদের দিন। সবার কতো ভালো কথা! অন্যদিনগুলোয় ছোটোদের কী অপমান, কী অপমান! একটা কথা যদি শোনে কেউ আমাদের!

 


আরে, ছোটো হওয়া কি ইয়ার্কি নাকি? তোমরা, মানে বড়োরা যে আমাদের এভাবে হতচ্ছেদ্দা করতে থাকো, বোঝো ছোটো হওয়া কত কঠিন? হয়ে দেখেছো কখনো ছোটো? 


তোমাদের যখন বলি, বারান্দায় ঘ্যাঁঘাসুর বসে আছে ঘাপটি মেরে, বেরোতে গেলেই ধরবে, তোমরা বিশ্বাস করেছো? হেসে উড়িয়েই দিয়েছো। কী? না, এসব নাকি হয় না। বললেই হলো? আগেরদিন দীপু মা শীতলার দিব্যি কেটে বলল, ওর বাড়ির বারান্দায় সন্ধে থেকে ঘ্যাঁঘাসুর এসে বসে থাকে। ও মিথ্যে কথা বলেছে, বলো? মা শীতলার দিব্যি কেটে ও মিথ্যে বলবে? বেশ, না হয় বলল। কিন্তু বোসদের পোড়ো আমবাগানটায় যে ঘোলু আর ভোলু বলে দুটো কন্ধকাটা থাকে, সেটা তো সত্যি মানবে? ও মা! তাও দেখি মানো না। বাবাকে বলতে গেলাম, বাবা খুব গম্ভীর মুখে শুনে 'হ্যাঁ, এখন কাজ করছি, বিরক্ত করো না' বলে তাড়িয়ে দিল। কী মুশকিল, ওই আমবাগানের পাশ দিয়েই তো বাবা ফেরে। মানুষের ভালো কি আর করতে আছে? বুঝবে ঠ্যালা, একদিন ঘোলু-ভোলু লম্বা হাত বাড়িয়ে রাস্তা থেকে টেনে নিয়ে গিয়ে গেন্ডুয়া খেলুক। তখন না মেনে থাকে কী ভাবে, দেখব। সব কাজ বেরিয়ে যাবে!


সেদিন দূরের যে লম্বা রাপুঞ্জেলের প্রাসাদটা, যেটাকে দাদা সমানে বলতে থাকে ফোনের টাওয়ার - কী বোকা দেখেছো? - সেটার উপর একটা বিরাট পাখি বসেছিল। দাদাকে যত বলছি, ওটা সিন্দবাদের রক, দাদা হেসেই উড়িয়ে দিচ্ছে। বলছে ওটা নাকি চিল। মানে আছে কোনো, বলো? কলেজে পড়ে আর গোঁফ গজিয়েছে বলে কি সব জেনে গিয়েছে? বেশি হাসুক, আমিও বাড়িতে বলে দেবো ও লুকিয়ে লুকিয়ে সিগারেট টানে। আমি স্পষ্ট দেখেছি, মাক্কালী! ওর ব্যাগে দেশলাই বাক্সও দেখেছি আমি। বড়ো হয়ে গেলে মানুষ বোধহয় এসবই করে! 


এই যেমন, সেদিনকার কথা। ক্লাসে আন্টি জিজ্ঞেস করছিলেন, কে কী হতে চাও বড়ো হয়ে। প্রতীক, আমাদের ফার্স্ট বয় কী একটা বলল আইএস না কী। আন্টি শুনে খুব খুশি! কে জানে ভাই, কী ওটা! আমাকে তো বাপু জিজ্ঞেস করাতে আমি সোজা উঠে দাঁড়িয়ে বললাম, রঘু ডাকাত। বলেই ক্ষান্ত হইনি, মুখে হাত চাপা দিয়ে হা-রে-রে-রে বলে হাঁক পেড়েও দেখালাম। ক্লাসের সবাই হাততালি দিয়ে উঠল! তোমাদের চুপিচুপি বলি, কাউকে বলো না যেন - দুপুরবেলায় ঠাম্মি ঘুমিয়ে পড়ার পর আমি একা একা বাগানে গিয়ে অনেকদিন ধরে এটা অভ্যেস করে করে শিখেছি। ঘোঁতনকে আগেরদিন শোনালাম - ওর চোখগুলো গুল্লি-গুল্লি মার্বেলের মতো হয়ে গিয়েছে শুনে। অথচ, কী অদ্ভুত, আন্টির মুখটা কীরকম রাগী-রাগী হয়ে গেল - দাদুর টেবিলে একটা বাঘের ছবি দেওয়া ক্যালেন্ডার আছে, অনেকটা ওরকম। আন্টি বললেন, বাড়ি থেকে যেন মা-বাবাকে নিয়ে দেখা করি। খবরটা মা-বাবাকে বলতেই ওদের মুখটাও কেমন ওই রাগী বাঘটার মতো হয়ে গেল। কারণ জানতে চাওয়ায় পুরোটা বললাম। শুনে বাবা-মা নিজেদের মধ্যে গজগজ করতে থাকল, আমি নাকি কীসব 'ফ্যান্টাসি' বই পড়ে এমনটা হয়ে যাচ্ছি। কী বলে, বুঝি না বাপু। 


তা বাবা-মা গেলো। প্রিন্সিপাল ম্যাম, আন্টি, বাবা, মা - সবাই রাগী বাঘের মতো মুখ করে বসে। মায়ের মুখটা যদিও মাঝে মাঝে আমাদের পাড়ার হুলোটার মতো হয়ে যাচ্ছিল, যাকে দেখলেই মনে হয় এক্ষুণি কেঁদে ফেলবে। তাই দেখে আমি ফিচফিচ করে হেসে ফেলছিলাম বলে বাবা এক ধমক লাগাল। ওরা কীসব বলল, আমি অত শুনিনি। আমি তখন জানলার বাইরে আকাশ দেখছিলাম। ওদিন পাঁচটা আইস্ক্রিম মেঘ, দুটো গাড়ি, ছটা ব্যাং আর তিনটে কচ্ছপ মেঘ যেতে দেখলাম - আমি পরিষ্কার গুণেছি। আমি কর ধরে ওয়ান, টু করে করে গুণতে পারি। এর মধ্যেই কানে আসছিল, ওরা 'আনমাইন্ডফুল' 'ডেড্রিমিং' 'ইম্ম্যাচিওর' 'নন-সিরিয়াস' কীসব যেন বলছে। তারপর আমাকে ডেকে বলা হল, আমাকে নাকি প্রতীকের পাশে বসতে হবে, কারণ ও আইএস হতে চায়। 


কী জ্বালা! এই আইএসটাইএস কেন হবো আমি? তাকে নাকি সবাই ভয় পায়, শ্রদ্ধা করে। আরে, রঘু ডাকাতকেও তো সবাই ভয় পায়! ভাবো, কত সাহস হলে চিঠি পাঠিয়ে জমিদারবাড়ি ডাকাতি করতে যায়। সবাই ভয়ে কাঁটা হয়ে থাকে। আর শ্রদ্ধা পেতে হলে ক্যাপ্টেন স্কট হবো! এমনিতেও আমি ভেবেইছি, আমি আর ঘোঁতন মিলে আটলান্টিস আর এলডোরাডো খুঁজে বের করব। এই যাহ, তোমাদের বলে দিলাম! আসলে এটা সিক্রেট তো খুব! আমাদের এখানে নন্দীদের যে পুকুরটা আছে, ওই পুকুরের তলা দিয়ে সোজা আটলান্টিসে যাওয়া যায়। ঘোঁতন একদিন সাঁতার কাটতে গিয়ে তলায় একটা টানেল দেখেছে, যার ওদিক দিয়ে আলো আসছিল। আমি আর ঘোঁতন ডুবুরির পোশাক বানাচ্ছি রেনকোট কেটে। হয়ে গেলেই আমরা বেরোব। আর সেসব ছেড়ে, আমি হব নাকি আইএস? প্রতীকটা এক নম্বরের বাজে ছেলে। কিচ্ছু জানে না ও। হেডউইগের ছবি দেখে নাক সিঁটকে বলেছে, এ নাকি এমনিই লক্ষ্মীপ্যাঁচা, এদিকে খুবই পাওয়া যায়। ও আসলে এসব কিচ্ছু পড়েনি। ওর মা আসলে খুব রাগী। সারাক্ষণ পড়তে বসায় ওকে। তার পাশে বসতে হবে আমাকে?


তাহলেই দেখো, আমাদের কতো কষ্ট। আমাদের কে বোঝে? কেউ কিচ্ছু মানতে চায় না। পাড়ার শেষ বাড়িটা যেটা, যেখানে কেউ থাকেনা আর সারাবছর থাকে, ওখানে যে রাতে ভূতে নাচ করে 'হিং হ্যায়, তেল হ্যায়, ইমলি হ্যায়, লসুন হ্যায়' বলে, আর মানিক কুঁজ নিয়ে গেলে তার কুঁজ ফেলে দেয় - এটাও কেউ মানতে চায় না। সবাই বকা দেয়। আমাদের বাড়িতে ভাত খায় যে মেনিটা, ওটাই যে আসলে মজন্তালী সরকার - এটা সব্বাইকে কতবার বলেছি। শুনলে হাসে সবাই। আমি তো বাবা ওকে দেখলেই 'পেন্নাম হই মহারানী' বলি। কী দরকার, রাজার কাছে নালিশ করে যদি?


আর বড়ো হলে কত সুবিধে! শুধু সবার উপর চেঁচিয়ে যাও, বকে দাও। যার যার উপর রাগ হচ্ছে, তার উপর চেঁচাতে না পারলে ছোটো কাউকে ধরে বকে দাও। ওদের ভাবতে হয়, কাল স্কুলের পাশের দোকানটায় ড্র‍্যাগনবলজির স্টিকারগুলো শেষ হয়ে গেলে কী হবে? বা রমেন কাকুর দোকানে যে কুড়িটা রিফিল দেওয়া পেন বিক্রি হয়, যেটা রমেন কাকু এনে দেবে বলেছে, ওটা না এনে দিলে স্কুলে মুখ দেখাতে পারব কিনা? ওদের শুধু চেঁচামেচি করলেই হল, বকলেই হল। 


 ধুর ধুর। ঠিক করে নিলাম, আমি বড়ো হয়ে বড়োই হব। ছোটো হওয়া খুব কঠিন।

Wednesday, 13 November 2024

'আমারে বাঁধিছে রাদিচে..'

উইলিয়াম রাদিচে আর আমাদের মধ্যে নেই। জানতে পারলাম, দু'দিন আগে তিনি চলে গিয়েছেন। বাঙালির কাছে 'শুধুই বাঞ্ছারাম' মনোজ মিত্রের মৃত্যুসংবাদকে ছাপিয়ে তাঁর প্রয়াণের খবর ফেসবুক অ্যালগরিদমে জায়গা করে নিতে পারেনি। স্বাভাবিক। গেঁয়ো যোগীই যেখানে ভিখ পায়না, নাম-না-জানা বিলিতি যোগীর চলে যাওয়ার খবরে সেখানে আহাউহু না হওয়াটাই কাম্য। 


তবুও, রাদিচেকে হয়তো অনেকেই চেনেন। যাঁরা চেনেন, জানি না তাঁদের কাছে রাদিচের গুরুত্ব কতটা। হিসেব মতো, আমার কাছেও থাকা উচিত নয়। জেভিয়ার্সখেদানো-প্রেসিতাড়ানো আমার মতো সামান্য পাঠকছাত্রের উপর রাদিচের প্রভাব ঠিক ততখানিই হওয়ার কথা, যতটা প্রভাব বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় ভার্সেই চুক্তির ছিলো।


কিন্তু আমার সৌভাগ্য, সম্ভবত রাদিচের দুর্ভাগ্যও, রাদিচের সঙ্গে আমার পরিচিতি হয়ে যায়। আমার মতো মূঢ় মানুষ কোনোদিনই তাঁকে খুঁজে পেতো না, যদি না আমার জীবনে ড. ঋতম্‌ মুখোপাধ্যায়ের মতো একজন প্রফেসর থাকতেন।


থার্ড ইয়ারে পড়ি তখন। পঞ্চম সেমিস্টার। মধ্যযুগের অকূল পাথারে ভরাডুবি হয়ে আধুনিক সাহিত্যে এসে একটু হাঁপ ছাড়ছি সবে। সিলেবাসে রবীন্দ্রনাথের উপর একটি পেপার ছিল, যার মধ্যে একটি মডিউল ছিল রবীন্দ্র কবিতা। মডিউলটি ঋতম্‌বাবু পড়িয়েছিলেন।


'সোনার তরী' পড়ানোর কথা একদিন। ক্লাসে এসে স্যার সবার আগে ধরেছিলেন রাদিচে। আমি বুঝভুম্বুল। কী জ্বালা, এখন অনুবাদ থেকে রবীন্দ্রনাথ পড়ব কেন? কী দরকার এসবের? আচ্ছা ঝামেলা তো! 


ভাগ্যিস পড়িয়েছিলেন স্যার। ভাগ্যিস স্যার রাদিচের সঙ্গে আলাপ করিয়েছিলেন। নয়তো সারা জীবন ট্রান্সলেশন স্টাডিজের সঙ্গে পরিচিতি হত না। জানতে পারতাম না, কীভাবে একটা প্রাইমারি টেক্সটকে ভেঙেচুরে তার যথার্থ অনুবাদ করতে হয়। অনুবাদের ভাষা ও প্রাইমারি টেক্সটের ভাষার মধ্যে যোগসূত্র কীভাবে তৈরি হয়, কীভাবে লেখক বা অনুবাদকের ছাপ পড়ে ভাষাকে ছাপিয়ে যাওয়া ভাবের মধ্যে, সেসব কিচ্ছু শিখতাম না। রাদিচে-অনূদিত 'গোল্ডেন বোট' এবং রবীন্দ্রনাথের স্ব-অনূদিত 'গোল্ডেন বোট'-এর মধ্যে ফারাকটাও জানতে পারতাম না। জানতে পারতাম না, কেন রাদিচে পাটনীকে স্ত্রীলিঙ্গবাচক করে তুলেছেন। একটা নতুন দিক খুলে দিয়েছিলেন স্যার, এবং অবশ্যই, রাদিচে। 


তারপরে বিস্তর ঘেঁটেছি রাদিচে নিয়ে। স্যারের সঙ্গে কথা হয়েছে ট্রান্সলেশন স্টাডিজ নিয়ে। ডিসার্টেশন করার কথাও ভেবেছিলাম স্যারের কাছে, জাপানি সাহিত্য এবং বাংলা অনুবাদের উপর। স্যার প্রবল উৎসাহ দেওয়া সত্ত্বেও, গাইড হিসেবে স্যারকে না পাওয়ায় তা আর হয়ে ওঠেনি। 


ঋতম্‌বাবু, এবং সর্বোপরি রাদিচে না থাকলে অনুবাদ ব্যাপারটাকে কোনোদিনই অন্য চোখে দেখতে পারতাম না, বা ডিসিপ্লিন হিসেবে ট্রান্সলেশন স্টাডিজের মাহাত্ম্য বুঝতাম না৷ আমার মতো তুচ্ছ মরমানুষের জীবনে এই পাওয়াগুলোই বা কম কী?


ভালো থাকবেন, রাদিচে। আপনার ভূমিকা আমার সাহিত্যচিন্তন গড়ে ওঠার পিছনে যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ, সেটা বোঝাতে আমি ক্লাসে একটা মজার কথা বলতাম - 'আমারে বাঁধিছে রাদিচে।' 



Rest in peace. :)

Thursday, 24 October 2024

নীলাচলের নীল আঁচলে - পর্ব ১

সবক্ষেত্র একবার, শ্রীক্ষেত্র বার বার - এমনটা কেউ একজন বলেছিলেন। কে বলেছিলেন ঠিক মনে নেই - শ্রীচৈতন্য বা শ্রীদেবী, কেউ একটা হবে। 


সেই শ্রীবাক্য আপ্ত এবং apt-ও মেনে আমার জন্মদাতা ও জন্মদাত্রী ঠিক করলেন, এবারের পুজোর ছুটিতে পুরী যাওয়া হবে। সেই ব্যাপারে ওদের পুরোপুরি সমর্থন থাকলেও, আমার একেবারেই ছিলো না - কারণ, আমার পুরী ভাল্লাগে আহারে, আর বেড়াতে ভাল্লাগে পাহাড়ে। সমুদ্র আমার বরাবরের না-পসন্দ। সমুদ্রকে নিয়ে ভালো কথা লিখেছেই বা কজন? যেমন মেঘনাদের লেখা ‘মাইকেলবধ’ বলে উপন্যাসটায় রাবণভাই ‘কী হেব্বি চোকারমার্কা মালা পরেচিস বে পোচেতো, পুরা চলতা ফিরতা কোকেইন হ্যায়, কোকেইন’ ইত্যাদি ডায়লগ ঝেড়ে ব্যজস্তুতি-সার্কাজম ভরে ভরে দিয়েছিল; বা কোলরিজের ‘রাইম অফ দ্য এনশিয়েন্ট মেরিনার’ - এ কমরেড মাঝিভাইরা তেষ্টার চোটে সমুদ্দুরের জল খেয়ে ‘হ্যাক থুঃ, কী নুন রে ভাই ছ্যাঃ, মানুষে খায় এসব’ বলে মুখ সিঁটকে নিজেদের বিতৃষ্ণা, বি-তৃষ্ণা প্রকাশ করছিল - এইসবই মাথায় আসে শুধু। এইসব ভেবে গাঁইগুঁই করে বাড়িতে বোঝানোর চেষ্টা করছিলাম - যে সমুদ্রের কী দরকার, বাড়ির সামনেই তো পাড়ার পুকুর রয়েছে, ওখানে বসেই তো লোকজন গরম গরম কাটাপোনা ভাজা আর বাংলা খায়.. তবে শ্রেণিসংগ্রামের লড়াইতে কবেই বা আমার মতো সর্বহারারা জিততে পেরেছে। যাইহোক। ফলে টিকিট কাটা, হোটেল বুক করা - ইত্যাদি সমস্ত একে একে হয়ে গেল। আমি মুখ চুন (বা সমুদ্রে যাব বলে নুন) করে বসে রইলাম। 


এরপর ব্যাগ গোছানোর পালা। ব্যাগ গোছানোর ব্যাপারে আমার মায়ের প্রবল FOMO আছে। ফলে, আমাদের বেড়াতে যাওয়ার লাগেজ আমার ইমোশনাল ব্যাগেজের থেকেও ভারি হয়। সেইসব সময়ে আমি সামনে থাকি না - আমার ভারি আতঙ্ক হয়। 


প্যাকিং ইত্যাদি সারার পরে ঘরে ঢুকেই দেখি কেলেঙ্কারি! মেঝেতে পড়ে আছে ছটা ট্রলি, তিনটে সাইডব্যাগ, চারটে পিঠের ব্যাগ, খান পাঁচেক এদিকসেদিক আরো ব্যাগ.. সে এক বিরাট বাগাড়ম্বর, বা ব্যাগাড়ম্বরও বলা চলে। সমস্যা কী? সমস্যা হল, আমার উপরে ভুবনের ভার না থাকলেও, এই ব্যাগেজের ভার রয়েছে - এই ব্যাগেজ আমাকে আর বাবাকেই বইতে হয়। মা একটা স্টাইলিশ লেদারের সাইডব্যাগ আর একটা জলের বোতল নিয়ে অ্যাটলাসের পৃথিবী কাঁধে নেওয়ার মতো দাঁতমুখ খিঁচিয়ে চলতে থাকে। আর বাবাকে কুলি নিতে বললে বাবা কুলির সঙ্গে মারাত্মক দরাদরি করে, আর কুলি রেগে একেবারে হটি হয়ে যায়। স্বাভাবিক - একটা লোক ৩০০ টাকা চাইলে তাকে যদি কেউ ৩০ টাকা নেওয়ার জন্য ঝুলোঝুলি করতে থাকে, তবে তার মাথায় খুন চাপবে না? 


ব্যাগ দেখে আমার মাথায় হাত। মা গর্বিতা হয়ে বসে বসে যুগপৎ নিজের সুকীর্তি (লাগেজ) এবং কুকীর্তি (আমি) দেখছে। 


— এসব কী নিয়েছ মা?

— কেন, লাগেজ! ওখানে গিয়ে লাগবে না? 

— হ্যাঁ, লাগে বলেই তো এদের নাম লাগেজ। কিন্তু এত কিছু কোন কাজে লাগবে? তুমি কি দেশত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নিচ্ছো নাকি?

— আহা, কী সব অলুক্ষুণে কথা! দরকারের জিনিসই নিয়েছি শুধু! এইটুকু ছাড়া যাওয়া যায়?


ততক্ষণে আমি ব্যাগ হাঁটকে একের পর এক বোমা বের করছি। শুরুতেই একটা ৫ লিটার প্রেশার কুকার বেরোলো। 


— এটা কোন কাজে লাগবে?


মা গদগদ হেসে বলল, 


—আহা, কোনোদিন যদি পাঁঠার মাংস খেতে ইচ্ছে হয় আমাদের?

— মা, আমরা হোটেলে উঠছি, হলিডে হোমে না! সেখানে এসব হোম-যজ্ঞ চলে, হোটেল এসবের যোগ্য না! 


ব্যাগ থেকে আরো বেরোলো একটা ছোটো স্টোভ, একটা পুঁচকে গ্যাস সিলিন্ডার, একটা বড়ো কড়াই, একটা মাঝারি নন-স্টিক প্যান।


— এসব কেন? পিকনিক করবে নাকি? 

— না না। ধর ওখানে গিয়ে ভালো খাবার পেলাম না। তখন তো আমাকেই ধরবি তোরা। সবার জন্য ভাবি বলেই আজ আমার এই দশা। কেন যে মরতে এই সংসারে এসে পড়েছিলাম.. (ক্রন্দন)


এইসব শুনতে শুনতে অন্যান্য ব্যাগগুলোও দেখছি। একটা ব্যাগ থেকে বেরোলো একটা ভাঁজ করা ক্যাম্প খাট, একটা গার্ডেন ছাতা। অন্য আরেকটা ব্যাগ থেকে আমাদের ওয়াইফাই-এর রাউটার। 


— রাউটার নিচ্ছো কেন? এ কী! 

— (ফোঁপাতে ফোঁপাতে) যদি ওখানে নেট না পাই, তখন? কে তোদের জন্য রান্নার ভিডিও দেখে রান্না করবে, কে জোরে জোরে ভূতের গল্প লাইভ শুনে তোদের উত্ত্যক্ত করবে? (আরো জোরে ক্রন্দন)


মহা ঝামেলা তো! তারমধ্যে অন্য ব্যাগগুলো খুলতেও আর সাহস পাচ্ছি না। কে জানে, কোনো ব্যাগ খুললে হয়তো অক্সিজেন সিলিন্ডার বেরোবে - যদি আমরা সমুদ্রের তলায় গুপ্তধন খুঁজতে যাই! 


অবশেষে বেরোনোর দিন এলো। 


কোথাও বেরোনোর হলে আমাদের সবার সঙ্গে সবার চূড়ান্ত ঝামেলা বেধে যায়। মা আমাকে দোষ দেয়, আমি বাবাকে, বাবা নিজের কপালকে…. এইসব করে মোটমাট বেরোনো হল৷ 


বাবা রাস্তায় বেরিয়েই ‘ওরে বাবারে, ওলা কতো টাকা! ওরে বাবারে, উবের কতো টাকা! ওরে বাবারে, লোকাল ট্রেনের টিকিট কতো টাকা…’ মর্মে শুরু করেছে। 


প্রসঙ্গত -  বাবা একেবারেই কিপটে না - বরং বরাবরই উল্টোটা। কিন্তু, এটা বাবার স্বভাব। বাজারে আগুন, সবাই জানে - তাও বাজার এনেই রোজ ‘জানো, কী দাম সবকিছুর! কিছুই খাওয়া যাবে না আর’ মর্মে শুরু করে, অথচ আনে সব ভালো ভালো জিনিসই। 


যাইহোক। এসমস্ত সেরে, গাড়িটাড়ি ডেকে আমাদের ওলাওঠা, থুড়ি উবেরওঠা হল৷ লাগেজ তোলা নিয়ে সে আরেক ঝকমারি। শেষমেশ লাগেজগুলো সিটে বসল, আমরা কোনোমতে লাগেজের উপর গুটিসুটি মেরে। সামনে বসা ট্রলির গায়ে আদর করে সিটবেল্টও বেঁধে দিলাম। 


বাবা গাড়িতে উঠেই ড্রাইভারের সঙ্গে গল্প জুড়ে দেয়। বাবার ধারণা, বাড়ির বাইরে পা দিলেই সবাই হিন্দি আর ইংরিজিতে কথা বলে।


— রাম রাম ড্রাইভার ভৈয়া, গাড়ি তো বহুত হি আচ্ছা হ্যায় আপকা!


সম্পূর্ণ বাজে কথা। গাড়ির ভিতর থেকে ডিজেলের গন্ধ ছাড়ছে, গাড়ির কন্ডিশন অনেকটা আমার মানসিক স্থিতির মতো - ব্রেকডাউন হতে বিশেষ বাকি নেই। গাড়ি চললেই ‘ঘ্যাঁ ঘ্যাঁ ঘঁচাৎ’ করে আওয়াজ হচ্ছে। সেই গাড়ির মধ্যে বাবা যে কী ‘আচ্ছা’ দেখল, তা বুঝে ওঠা দুষ্কর। 


— হ্যাঁ, দেখতে হবে না! গাড়ি রোজ নিজের হাতে মেইনটেইন করি আমি। নিজের হাতে ধুয়ে মুছে সাফ করি রোজ! 


এদিকে পষ্ট দেখছি, উইন্ডস্ক্রিনের সামনে, বনেটের উপর ভূতুড়ে বাড়ির মতো ধুলোর পুরু আস্তরণ। যেমন ড্রাইভার, তেমন বাবা। পুরো সেয়ানে সেয়ানে কোলাকুলি হচ্ছে। 


— হাঁ ড্রাইভার ভৈয়া, হামলোগ হাওড়া স্টেশন যায়েঙ্গে। হাওড়া জানতা হায় না? উ যো ব্রিজ হ্যায় গঙ্গা মাইজী কে উপর? 


— আরে দাদা, জানব না কেন! লোকাল ছেলে, হাওড়া স্টেশন চিনব না?


— হাঁ, তো ওহিপর জায়েঙ্গে। রেলওয়ে স্টেশন সে ট্রেন পাকড়েঙ্গে।


— হ্যাঁ, আমরাও ট্রেন ধরতে হাওড়া স্টেশনেই যাই (উৎফুল্ল কণ্ঠে)।


আমি চুপ করে শুনছি শুধু। ভাষা হারিয়ে ফেলেছি। গান শুনব ভাবছিলাম একটু, সেই শক্তিও নেই আর। অত্যন্ত উচ্চস্তরের আলোচনা হচ্ছে। 


এইসব সিরিয়াস আলোচনার শেষে আমরা শেষমেশ হাওড়া পৌঁছালাম। কুলি ছাড়া কীভাবে যে ওই প্রচুর পরিমাণ লাগেজ নিয়ে ওয়েটিং রুম এবং সেখান থেকে ট্রেনে তুললাম, সে আরেক গল্প। সে থাক এখন। 


পুরী সুপারফাস্ট এক্সপ্রেসের ফার্স্ট ক্লাস কামরা। লাগেজ-টাগেজ দিয়ে ক্যুপটাকে মোটামুটি ভরিয়ে ফেলে হাঁপ ছাড়ছি যখন, তখন ক্যুপের চার নং ব্যক্তি এলেন। ভদ্রলোক সম্পর্কে একটা কিছু বলতে গেলেই মোটামুটি লোকজন বডিশেমিং-এর তকমা এঁটে দেবে আমার গায়ে। অতএব, বেশি কিছু বলা যাবে না। তবে, ভদ্রলোকের হাইট মোটামুটি ৫ ফুট, ওজন আন্দাজ ৮০ কেজি। বিধাতাপুরুষ একটি ডিভাইন কম্পাস বসিয়ে ৩৬০ ডিগ্রির মাপে ভদ্রলোককে এঁকেছেন। 


ভদ্রলোক এসে বসলেন। আমি মন দিয়ে বোধহয় কোনো সুন্দরী মেয়ের ফেসবুক প্রোফাইল দেখছি। হঠাৎই শুনি, চড়ুইয়ের ডাক। মন ভালো হয়ে গেল। চারপাশের দূষণের চক্করে চড়াইরা যে কোথায় চলে গেল.. দেখতেও পাইনা। চড়াইয়ের ডাক শুনে নস্ট্যালজিক লাগছিল খুব। চোখটোখ ভিজে এসেছিল আবেগে। 


হঠাৎ খেয়াল হল, রাত্তিরবেলা চড়ুই, তাও বন্ধ ট্রেনের ক্যুপে? অ্যাঁ? 


তাকিয়ে দেখি, চড়াই না - উৎরাই। মানে ভদ্রলোকের নিঃশ্বাস বেরোচ্ছে। কিন্তু এ জ্বালা উতরোই কীভাবে? প্রমাদ গুনতে শুরু করলাম। বাড়িতে ইতিমধ্যেই এক স্লিপ অ্যাপনিয়ার রুগি রয়েছে, মানে আমার বাবা।


 নেকের জ্ঞাতার্থে জানানো, স্লিপ অ্যাপনিয়া হল সেই রোগ, যাতে নাসাগহ্বর চর্বি দিয়ে ঠাসা থাকে। সেই চর্বিত চর্বণের ফলে নাক সারারাত ডাকাডাকি করতে থাকে। এই রোগেই বাপ্পী লাহিড়ি মরণকে জাদুর ঝাপ্পি দিয়ে আমাদের ফাঁকি দিয়ে অকালে কেটে পড়েছিলেন। 


বাবা আর এই দাদা - দুজনে মিলে কী কীর্তি যে বাধাবে রাতে, ভেবেই আতঙ্ক হচ্ছিল৷ ভয়ের চোটে দুটো ক্লোনাজেপাম(অ্যান্টি-অ্যাংজাইটি ওষুধ) মুখে দিয়ে চুষতে শুরু করলাম। 


অবশেষে সেই কালরাত এলো। 


আলোটালো নেভানো হল। লোয়ার বার্থদুটো আমি আর মা কব্জা করেছি। উপরে বাবা আর ওই অচেনা দাদা। 


দাদার আলাপ শুরু হলো প্রথমে।


ভাই রে ভাই, সে কী ভয়াবহ নাক ডাকা! নাক, মুখ, গলা দিয়ে রীতিমতো কথা বলছেন উনি! সমানে ‘ঘঁক ঘঁক ঘোঁড়ৎ’, ‘খোঁস ভোঁস ভঁচাৎ’ করে বিজাতীয় ভাষায় কথা বলেই চলেছেন। 


আমি কানে বালিশ চাপা দিয়ে পড়ে রয়েছি। ইয়ারফোন কানে গুঁজে রবীন্দ্রসঙ্গীত চালালাম - কিন্তু রবীন্দ্রসঙ্গীতের কী সাধ্য, ওই অতীন্দ্রিয়সঙ্গীতকে আটকায়! ফলে বাধ্য হয়ে আইটেম গান চালাতে হল। আইটেম গান ভেদ করেও যখন দেখছি দাদার নাসিকাধ্বনি আসছে, তখন বাধ্য হয়ে কঠিন বাস্তব - মানে দাদার বাঙ্ককে ফেস করলাম ইয়ারফোন খুলে। দেখা যাক, কে বেশি শক্তিশালী। 


দেখা গেল, দাদার নাকই বেশি শক্তিশালী। সবসময়ে তাই চ্যালেঞ্জ নিতে নেই।


অন্যদিকে বাবা তবলা সঙ্গত ধরে ফেলেছে।


সে কী অপূর্ব হারমোনি, থুড়ি ক্যাকোফনি! অনুপম থাকলে নির্ঘাত লিখতেন, ‘নাসিকের এই ক্যাকোফনি আমাদের স্বপ্ন চুষে খায়!’ 


তারপরে দুজনের নাকে নাকে সারারাত গল্প হল। 


— ঘোঁ ঘঁড়াৎ?

— ফঁড়াৎ।

— ঘঁড়াৎ ফঁড়াৎ?

— ঘুঁ ঘুঁড়ুৎ। 

— সুঁড়ুৎ!

— ভোঁ ভোঁ ভুঁড়ুৎ! (অর্থাৎ কিনা, আমাদের বাদে বাকিদের ঘুম আজকের মতো ভোঁ ভোঁ!)


এর বেশি বাকিটা কিছু বুঝলাম না। অনুলিখন দেওয়া রইলো; কোনো ভাষাবিদ এর পাঠোদ্ধার করতে পারলে জানাবেন দয়া করে। 


সারারাত এইমতো চলার পরে, নামের মর্যাদা রক্ষা করে সুপারফাস্ট এক্সপ্রেস আমাদের ভোরবেলা শিডিউল্ড টাইমের আধঘণ্টা আগে পুরী স্টেশনে নামিয়ে দিল। 


 (চলবে)

Saturday, 12 October 2024

নোবেল শান্তি পুরস্কার ২০২৪ নিয়ে দু-চার কথা


গতকাল নোবেল শান্তি পুরস্কার ঘোষণা করা হল। জাপানের পারমাণবিক অস্ত্রবিরোধী সংস্থা নিহন হিদানকিওকে এবার বেছে নেওয়া হয়েছে। নোবেল কমিটির সুপারিশ জানাচ্ছে, এই নোবেল দেওয়ার কারণ - ‘পারমাণবিক অস্ত্রবিহীন এক বিশ্ব গড়ে তোলার প্রচেষ্টা এবং সাক্ষ্যপ্রমাণের মাধ্যমে দেখিয়ে দেওয়া যে, পারমাণবিক অস্ত্র আর কখনোই যাতে ব্যবহার না করা হয়।’


নোবেল শান্তি পুরস্কার নিয়ে আমরা খুব একটা মাথা কোনোদিনই ঘামাই না। তার একটা কারণ, সাহিত্যের নোবেল, বা ভারতীয়/বাঙালিরা জিতলে অর্থনীতির নোবেল নিয়ে জ্ঞানের ব্যাপ্তি দেখাতে পারলে বুদ্ধিজীবী সমাজে কদর বাড়ে। আর সবথেকে বড়ো কারণ? নোবেল শান্তি পুরস্কার একটা অত্যন্ত রাজনৈতিক পুরস্কার। আমরা যেহেতু ‘অরাজনৈতিক’ বলে এক ‘নহি ছাতা, নহি জুতা, নহি আমি কিচ্ছু’ মার্কা ‘রাজনৈতিক’ নিহিলিস্টিক কিম্ভূতকিমাকার প্রাণী, যাদের ব্যক্তিগত আলোচনার পরিসরে বলাই থাকে ‘এই এই পলিটিকাল আলোচনার জায়গা এটা না কিন্তু’, তারা স্বভাবতই এগুলো এড়িয়ে যাবে। 


কিন্তু, কিছুক্ষেত্রে করা দরকার। এবারের পুরস্কারটা নিয়ে বিশেষ করে করা দরকার। কেন?


বিগত বেশ কিছু বছরে, বিশেষ করে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে, আন্তর্জাতিক এজেন্সিগুলো কীভাবে বৃহৎ স্কেলে পুত্তলিকাবৎ হয়ে গিয়েছে। 


JCPOA-থেকে ২০১৮তে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বেরিয়ে যাওয়া এবং ইরান ও তার অ্যালাইদের উপর স্যাংশন চাপানো, আফগানিস্তান থেকে আচমকাই সৈন্য অপসারণ কোনো ডেফিনিটিভ সলিউশনের ব্যবস্থা না করে (ফলস্বরূপ দ্বিতীয় তালিবানি রেজিম) আটকাতে রাষ্ট্রপুঞ্জের অক্ষমতা; মার্কিন-চিন 'ট্রেড ওয়ার' এবং পারস্পরিক শুল্কের হার বাড়ানো (বাইডেনের প্রেসিডেন্সিতে চিন থেকে আমদানিকৃত ইলেক্ট্রিক ভেহিকলের উপর ১০০ শতাংশ শুল্ক চাপানো হয়!) রোধ করতে ডাব্লুটিও-র দৃষ্টান্তমূলক ব্যর্থতা; ২০২০ সালে কোভিড মহামারীকে আটকানো, একটা কম্প্রিহেন্সিভ প্ল্যান অফ অ্যাকশন - এই ব্যাপারে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কী ভূমিকা ছিল, সেটাও দেখা গিয়েছে। সেই ফাঁকে আবার ট্রাম্প হু-এর সদস্যপদ ত্যাগ করেন; ২০১৫-তে ইউনএফসিসিসি-র সিওপি ২১-এ হওয়া প্যারিস চুক্তির বর্তমান অবস্থা, বা ২০২০তে ট্রাম্পের প্যারিস চুক্তি ত্যাগ করা (যদিও বাইডেন তাঁর নির্বাচনী ইস্তেহারে বলেছিলেন যে প্যারিস চুক্তিতে যোগ দেবেন, সেই কথা রাখেনও তিনি) - গ্লোবাল ওয়ার্মিং বা ক্লাইমেট চেঞ্জ আটকাতে এজেন্সির অবস্থা বিশেষভাবে চোখে পড়ে। মজার ব্যাপার, বড়ো বড়ো ‘এমিটার’ দেশগুলোর সেই আর্থিক ক্ষমতা রয়েছে, যা দিয়ে তারা বিপুল পরিমাণ কার্বন ক্রেডিট কিনে নিচ্ছে তুলনামূলকভাবে অনেক কম কার্বন ফুটপ্রিন্ট রাখা দেশের কাছ থেকে, বা তাদের দেশে নানা ‘গ্রিন’ প্রজেক্টে কোটি কোটি ডলার ঢেলে দিচ্ছে। নিজেদের এনডিসি (ন্যাশনালি ডিটারমাইন্ড কনট্রিবিউশন) নিয়ে কেউই ভাবিত নয়। 


এভাবে বলতে গেলে লিস্ট ফুরোবে না। টেরর ফাইনান্সিং আটকাতে এফএটিএফ, আর্থিক কোটার পুনর্বিন্যাস করতে আইএমএফ, তেলের কার্টেলাইজেশন নিয়ন্ত্রণ করতে ওপেক, দক্ষিণ এশিয়া ও ভারতীয় উপমহাদেশে সম্প্রীতির পরিস্থিতি তৈরি করতে সার্ক - সবাই কমবেশি ব্যর্থ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর গ্লোবাল অর্ডারে এজেন্সির যে ভূমিকা ছিল, বা যে ভূমিকা এনভিসাজ করা হয়েছিল, তা বহুক্ষেত্রেই ধূলিসাৎ হয়েছে।


সবথেকে বেশি যে দুটো ঘটনা প্রভাব ফেলেছে, তা হল পৃথক পৃথক ফ্রন্টে চলতে থাকা যুদ্ধ। ডনেতস্ক অঞ্চলে রাশিয়া-ইউক্রেনের যুদ্ধ, গাজা স্ট্রিপ বা লেবাননে চলতে থাকা ইজরায়েলি হানা - এই ন্যক্কারজনক ঘটনাগুলো সবাই মোটামুটি জানেন, তাই বলা নিষ্প্রয়োজন। এই দুটো ঘটনাতে আন্তর্জাতিক এজেন্সিগুলোর ব্যর্থতা রীতিমতো চোখে পড়ার মতো। এই যুদ্ধগুলো, নির্বিচারে চলা গণহত্যা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে, ১৯৪৫-পরবর্তী অবস্থা কিচ্ছুটি পাল্টায়নি। বরং, আগ্রাসী শক্তিগুলো নিজেদের নখদাঁতকে লুকোনোর নিতুই নব কৌশল শিখে নিয়েছে, শিখেছে মিডিয়া ম্যানিপুলেশনের নিত্যনতুন পদ্ধতি। আক্রমণের নয়া নয়া অপরিকল্পিত পদ্ধতি দেখছি আমরা। আমরা দেখছি, কীভাবে নিরীহ পেজার যন্ত্রে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে গোটা লেবানন জুড়ে(দাবি, শুধুই নাকি ‘হেজবোল্লা’-দের লক্ষ্য করা হয়েছিল) প্যানিক সৃষ্টি করা যাচ্ছে - কোল্যাটারাল হিসেবে বেশ কিছু প্রাণও যাচ্ছে যদিও বা। আন্তর্জাতিক সাপ্লাই-চেন ম্যানেজমেন্টে কী স্তরের অন্তর্ঘাত ঘটাতে পারলে এমনটা করা সম্ভব, বোঝা যাচ্ছে কী? 


যুদ্ধ-বিধ্বস্ত একটা বিশ্বের অ্যাবসার্ডিটি, যার পরতে পরতে মিশে আছে মহামারী-উত্তর কালেক্টিভ ট্রমা, আর্থিক সংকট, বেকারত্ব, অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের দৃপ্ত হুঙ্কার - সেই ঘোরতর সার্বিক অবসাদ আমাদের পাথর করে দিচ্ছে, সূক্ষ্মতর অনুভূতিগুলো বোঁদা হয়ে যাচ্ছে। বাস্তবের পাথর-ঠেলা দুনিয়াকে ছাপিয়ে আমরা খোঁজ করছি এক ডিলিউশনাল দুনিয়ার। ‘ডেলুলুতেই সলুলু’ গোছের জেন-জি ইয়ার্কির গভীরে নিহিত আছে মূলত এই এসকেপিজমই। কনফ্রন্ট করতে করতে আমরা ক্লান্ত, নিজেদের ঘাড়ে বোঝা টানতে টানতে আমরা হতাশ। তাইজন্যই আমরা ঢুকতে চাইছি মেটাভার্সের ভার্চুয়াল রিয়ালিটির জগতে। অল্টারনেটিভ রিয়ালিটি চাই আমাদের। আমাদের চাই রিল-এর ৩০ সেকেন্ডের ডোপামিন বুস্টার। 


এই ক্লান্তি, হতাশার মাঝখানে নিহন হিদানকিও-র নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়া হৃত বিশ্বাসকে অন্তত আংশিক না হোক, ভগ্নাংশটুকু হলেও ফিরিয়ে দেওয়ার জায়গায় নিয়ে যেতে পারে। সাধারণত, যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়া হয় না। প্রথম বিশ্বযুদ্ধেও দেওয়া হয়নি, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধেও না। শুধু ১৯১৭-তে রেড ক্রস পেয়েছিল, যুদ্ধে আহত বা যুদ্ধবন্দীদের সেবার জন্য। ১৯৪৪-এও ফের ওরাই পায়, যুদ্ধচলাকালীন মানবিকতা প্রদর্শনের কারণে। সেই রীতি মেনেই এবারেও অনেকেই ভেবেছিলেন, হয়তো নোবেল শান্তি পুরস্কার এবারে স্থগিত রাখা হবে। অথচ, সবাইকে অবাক করেই এই পুরস্কার দেওয়া হয় এমন এক সংস্থাকে, যারা এক কথায় বলতে গেলে ফিনিক্স পাখি।


১৯৫৬ সালে এই সংস্থা তৈরি হয়। তৈরি করেন কারা? মার্কিন পরমাণু বোমার ফলআউট থেকে যাঁরা সারভাইভ করেছেন। হিরোশিমা-নাগাসাকি তো আছেই, তার সঙ্গে রয়েছে ১৯৫৪ সালের ১লা মার্চ বিকিনি অ্যাটলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ১৫ মেগাটনের পরীক্ষামূলক হাইড্রোজেন-লিথিয়াম পারমাণবিক বিস্ফোরণ - যাকে ‘আদর’ করে নাম দেওয়া হয় ‘কাসল ব্রাভো’। এই সারভাইভরদের জাপানি ভাষায় বলা হয় ‘হিবাকুশা’। সেই ১৯৫৬ সাল থেকে শুরু করে তাঁরা পারমাণবিক অস্ত্রের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছেন। জাপান সরকার, রাষ্ট্রপুঞ্জ, অন্যান্য নানা দেশের সরকারের কাছে আবেদন চালিয়ে গিয়েছেন তাঁরা, যাতে বিশ্বের কোথাও আর ‘হিবাকুশা’ তৈরি না হয়। 


এমন এক যুদ্ধ পরিস্থিতি, যেখানে প্রতিটি বেলিগারেন্ট দেশই পারমাণবিক অস্ত্রে বলীয়ান, একটা বোতাম টিপতে যাদের মুহূর্তমাত্র দেরি হবে না - সেখানে দাঁড়িয়ে এহেন এক আন্তর্জাতিক পুরস্কার কি কিছুটা হলেও আস্থা ফিরিয়ে আনে না, যেখানে গোলার বদলে গোলাপ ফুটবে একদিন? 


আরো একটা পরোক্ষ কারণের কথা এখানে বলা যায়। 


আগেই বলা, নোবেল শান্তি পুরস্কার অত্যন্ত রাজনৈতিক একটি পুরস্কার। এমন এমন রাষ্ট্রনায়কদের এই পুরস্কার দেওয়া হয়েছে, যাঁদের পুরস্কার পাওয়া আদৌ উচিত কিনা, সেটা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। তারমধ্যে যে দুজনের নাম খুবই আসে, তাঁরা দুজনেই মার্কিন - একজন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার, অপরজন মার্কিন রাষ্ট্রপতি বারাক ওবামা। 


ব্রিটিশ-মার্কিন লেখক-সাংবাদিক ক্রিস্টোফার হিচেনস তাঁর ‘দ্য ট্রায়াল অফ হেনরি কিসিঙ্গার’ বইতে লিখছেন, কিসিঙ্গারের বিরুদ্ধে তাঁর অভিযোগ কী কী - 


“1. The deliberate mass killing of civilian populations in Indochina.

2. Deliberate collusion in mass murder, and later in assassination, in Bangladesh.

3. The personal suborning and planning of murder, of a senior constitutional officer in a democratic nation Chile - with which the United States was not at war.

4. Personal involvement in a plan to murder the head of state in the democratic nation of Cyprus.

5. The incitement and enabling of genocide in East Timor.

6. Personal involvement in a plan to kidnap and murder a journalist living in Washington, DC.

The above allegations are not exhaustive. And some of them can only be constructed prima facie, since Mr. Kissinger - in what may also amount to a deliberate and premeditated obstruction of justice - has caused large tranches of evidence to be withheld or destroyed.”


গত বছর কিসিঙ্গার মারা যাওয়ার পরে মার্কিন সাংবাদিক স্পেন্সার অ্যাকারম্যান ‘রোলিং স্টোনস’-এ একটি আর্টিকলে লেখেন, 


‘Kissinger maintained his standing in part by savaging the Eastern Establishment from which he emerged. It was not entirely cynical. Kissinger shared with Nixon a contempt for the “defeatism” and “pessimism” of those who flinched at the unsavory Vietnam War they once supported. He rationalized his purges of the National Security Council bureaucracy and his marginalization of the State Department — measures that made him indispensable to foreign policy, and to Nixon — as protecting American power from those who lacked the confidence to wield it. It is revealing that among those who make U.S. foreign policy, Kissinger’s perspective is not considered ideological.’


মন্তব্য নিষ্প্রয়োজন। 


এই কিসিঙ্গারকে ১৯৭৩ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়া হয়, যেটা নিয়ে বিস্তর জলঘোলা হয়। বিশেষ করে এমন এক সময়ে, যখন ভিয়েতনাম যুদ্ধ একেবারে ফুল সুইং-এ চলছে। এই পুরস্কারকে কি আমরা ‘রাজনৈতিক’ বলতে পারিনা?


আবার, কিসিঙ্গারের এক ‘তথাকথিত সমর্থক’, প্রথম মার্কিন কৃষ্ণাঙ্গ প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাও নোবেল পান। নিপাট ভদ্রলোক এক ইমেজ। তবে, কেন এই কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি? 


ঠাণ্ডা যুদ্ধ পরবর্তীতে তথাকথিত ‘বোমারু’ রাষ্ট্রপতি হিসেবে আমরা বুশকেই ধরে থাকি। ৯/১১ এর পরে বুশের ঘোষিত ‘গ্লোবাল ওয়ার অন টেরোরিজম’, ইরাক যুদ্ধ, সাদ্দাম হুসেনের বাথিস্ট সরকারের পতন, ‘অপারেশন রেড ডন’ চালিয়ে সাদ্দাম হুসেনকে বাঙ্কার থেকে বের করে আনা ও এক্সিকিউট করা - এসবই আমাদের জানা। কিন্তু, আমরা কিছু স্ট্যাটিসটিক্স ভুলে যাই। কীরকম?


ওবামা তাঁর দুটো প্রেসিডেন্সি মিলিয়ে মোট ৫৬৩টা ড্রোন স্ট্রাইক ঘটান মিডল-ইস্ট, পাকিস্তান মিলিয়ে। বুশ মাত্র ৫৭টা। ওবামার প্রেসিডেন্সির প্রথম বছরে তিনি শুধু পাকিস্তানেই ৫৪টি ড্রোন স্ট্রাইক করান। বহু, বহু সিভিলিয়ান হতাহত হয়। শুধু দুটো বছরে পাকিস্তানেই ১৩০-এর উপর সিভিলিয়ান মারা যায় তাঁর বোমাবাজিতে। ২০১০-১১ সালে ইয়েমেনেও যথেচ্ছ বোমাবর্ষণ করেন তিনি। আফগানিস্তানেও। ডবল-ট্যাপ ড্রোন স্ট্রাইক - যেখানে প্রথম স্ট্রাইকের বেশ কিছুক্ষণ পরে আবার দ্বিতীয় স্ট্রাইক করা হয়, যাতে সিভিলিয়ান, স্বাস্থ্যকর্মী, উদ্ধারকর্মীরাও আহত হন - তাতে ওবামা বিশেষ পারদর্শী ছিলেন। 

ওবামা ২০০৯ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার পান। কিসিঙ্গারের মতো আউটরেজ না হলেও, ওবামার ক্ষেত্রেও নোবেল শান্তি পুরস্কারের ব্যাপারটা খুবই প্রশ্নসাপেক্ষ হয়ে দাঁড়ায়। আবারও, অত্যন্ত রাজনৈতিক একটি সিদ্ধান্ত, বোঝাই যাচ্ছে। 

সমরাপরাধের রক্ত যাঁদের হাতে রয়েছে, তাঁদের নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়ার মধ্যে যে ভাগ্যের ও সমকালের পরিহাস লুকিয়ে রয়েছে, তারই বিপ্রতীপে দাঁড়িয়ে রয়েছে নিহন হিদানকিও-র নোবেল পাওয়া। একদিকে প্রথম পরমাণু বোমার আঘাত হেনে লক্ষ লক্ষ লোককে হত্যা করা একটা দেশের এমন দুই রাষ্ট্রনায়ক, যাঁদের কীর্তিকলাপ লিখতে বসলে ফুরোবে না - আরেকদিকে এমন এক দেশ, যারা সেই প্রথম পরমাণু বোমার আঘাতে জরাজীর্ণ হয়ে আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়িয়েছে। চেষ্টা করেছে, যাতে আর বিশ্বজুড়ে হিবাকুশা কোথাও না থাকে। 

এই বিপ্রতীপ সিদ্ধান্তের মধ্যে নিহিত রয়েছে যে ন্যাচারাল জাস্টিসের সম্ভাবনা, সেটা কি খুবই কষ্টকল্পিত? বিশেষ করে সবাই যখন ‘জাস্টিস’-এর দাবিতে রাস্তায় নামছি?

প্রসঙ্গত, নিহন হিদানকিও, যারা ফিনিক্স পাখির মতো পারমাণবিক ফলআউটের ছাইয়ের থেকে ফের ডানা ঝাপটে ওড়বার শক্তি সঞ্চয় করেছে, তাদের লোগো হচ্ছে একটা ওরিগামির পাখি। :)

Thursday, 10 October 2024

হান কাং, নোবেল ও বাংলা সাহিত্য নিয়ে দু-চার কথা


সাহিত্যে নোবেল পেলেন দক্ষিণ কোরিয়ার সাহিত্যিক হান কাং। আমি যেহেতু ফেসবুকের নেমড্রপিং আঁতেল বা তুলনামূলক সাহিত্যের পড়ুয়া (নিন্দুকেরা বলে দুইই সমান, কান দেবেন না ওসবে) নই, ফলে তাঁর লেখা পড়িনি। সত্যি বলতে, তাঁর নামটা পর্যন্ত এর আগে শোনা ছিল না। দুদিন আগে দ্য গার্ডিয়ানের একটা প্রেডিকশন পোল পড়ছিলাম, যেটা অনুযায়ী জেতার দৌড়ে সবথেকে এগিয়ে ছিলেন চিনের ক্যান শুয়ে, আর্জেন্তিনার সিজার আইরা, অস্ট্রেলিয়ার গেরাল্ড মার্নেন, মার্কিন টমাস পিঞ্চন, আর অতিপরিচিত দুজন - মার্গারেট অটউড এবং প্রিটেনশাসদের গডফাদার হারুকি মুরাকামি। হান কাং তালিকাতেই ছিলেন না। কিন্তু, বিগত সমস্ত প্রেডিকশনেই আমরা এক্সিট পোলকে ফেল মেরে যেতে দেখেছি, এক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। 


হানের জেতার খবর পেয়ে একটা কেজো আর্টিকল লিখতে বসে ঘাঁটাঘাঁটি ইত্যাদি করছিলাম। দুর্ভাগ্যই বলা চলে, ভদ্রমহিলা যে ২০১৫ সালে ম্যান বুকার পেয়েছিলেন, সেই খবরটাও জানা ছিলো না। তবে নির্ঘাত জানি, যে উপন্যাসের জন্য তিনি ম্যান বুকার পেয়েছিলেন, 'চেসিকজুইজা' বা 'দ্য ভেজিটেরিয়ান' - সেটা এখন ফেসবুকজুড়ে অনেকেরই প্রিয়তম উপন্যাসের তালিকায় থাকবে। ঠিক দুদিন আগেই তারা পড়ছিল উপন্যাসটা, বা কেউ কলেজে থাকতেই পড়েছিল, পড়ে মুগ্ধ হয়েছিল এবং ভেবেছিল যে এরকম লেখা কেন নোবেল পায় না - পুরস্কার নামক পুঁজিবাদী প্রতিষ্ঠানকে ধিক-ধিক-ধিক্কার ইত্যাদি।


ভদ্রমহিলা সঙ্গীত ও শিল্পের রীতিমতো কনোইজার যাকে বলে। অনুরাগিনী। তাঁর লেখাতে বিশেষভাবে প্রচুর রেফারেন্স উঠে আসে, এবং একটা অদ্ভুত শিল্পচেতনা দেখা যায়, এমনটা অনেকেরই মত। বিশেষত, তাঁর 'গেউদাইউই চাগাওন সোন' বা 'ইয়োর কোল্ড হ্যান্ডস'-এ এটা বিশেষ করে দেখা যায়। এক স্থপতির নেশা, ধ্যানজ্ঞান, মোহাবিষ্টতা - সবই হচ্ছে নারীদেহের প্লাস্টারকাস্ট বানানো। মানবদেহের অ্যানাটমি এবং আর্ট - এই দুইয়ের আলোচনাকে যে জায়গায় নিয়ে গিয়েছেন, সেটা প্রচণ্ডই রেনেসাঁ যুগের কথা মনে করিয়ে দেয় কিছুক্ষেত্রে। এক স্থপতির মনের দ্বন্দ্ব - মানবদেহের দৃশ্য ও অদৃশ্য নিয়ে - শরীর কী দেখায়, শরীর কী লুকোয় - এই নিয়ে এক অদ্ভুত আলো-আঁধারির সংঘাত। প্রসঙ্গত, রেমব্রান্টের অ্যানাটমি লেসন অফ নিকোলাস টুল্প ছবিটার কথা মনে পড়তে পারে অনেকের। যাইহোক, না পড়া উপন্যাস নিয়ে অকারণ জ্ঞান দেওয়া উচিত হবে না। তবে, রয়্যাল সুইডিশ অ্যাকাডেমি এই উপন্যাসের ইংরিজি অনুবাদের যে লাইনটা তুলে দিয়েছে তাদের বিবৃতিতে, সেটা উদ্ধৃত করার লোভ সামলাতে পারলাম না -  “Life is a sheet arching over an abyss, and we live above it like masked acrobats.”।


হানের লেখা সম্পর্কে যা পড়লাম, যেটুকু উলটেপালটে দেখার সুযোগ হল, তাতে এটাই বোঝার, যে হানের সাহিত্য মূলত অন্তর্জগতের। মনোজগতের। শরীর-মনের যে ক্লাসিক দেকার্তীয় দ্বৈততা, তা তুলে ধরা এবং তার পাশাপাশি দুয়ের মধ্যে এক অনবদ্য সাঁকো তৈরি করা, তার সঙ্গে এক অদ্ভুত কাব্যিক গদ্যশৈলী - এতে হান অদ্ভুতরকমের পারদর্শী। বিশেষত আমরা যখন মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে এতোটা সচেতনতা ছড়ানোর চেষ্টা করছি চারপাশে, সেখানে মানসিক স্বাস্থ্য সংক্রান্ত লেখার অভাব তুলনামূলকভাবে চোখে পড়ার মতো। ম্যাক্রো ঘটনার মাইক্রো প্রভাব নিয়ে অনেকেই মাথা ঘামান, লেখেন। কিন্তু তুচ্ছাতিতুচ্ছ ঘটনা কীভাবে মনোজগতের ধূসর জায়গাগুলোকে প্রভাবিত করে, সেগুলো নিয়ে আমরা লেখালিখিতে অতটা ভাবিত নই। দুঃস্বপ্ন দেখে মাংস খাওয়া বিষয়ক ট্রমা, মাংস ছেড়ে নিরামিষাশী হয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া, তার ফলে নানাবিধ কনসিকোয়েন্সেস - এই সামান্য ব্যাপার নিয়ে ভাবি আমরা কেউ? কীভাবে আপাত ছোটো ছোটো ঘটনা মানসিক বিকলন ঘটাতে পারে, পর্যুদস্ত করে দিতে পারে সবকিছু, ওলটপালট করে দিতে পারে আমাদের জীবনজগৎ সবকিছু - সাহিত্যে তার প্রতিফলন এখন কই? বিশেষ করে, বাংলা সাহিত্যে? 


এক্ষুণি হয়তো কোনো লিটল ম্যাগাজিনের সম্পাদক দাড়ি নেড়ে এবং কাফকা-কামু ঝেড়ে কিছু বাতেলা দেবে এসে, কেন নোবেল পুরস্কারের মাধ্যমেই উৎকর্ষতা হয় না, কেন তাদের ক্ষুদ্রতম, সংকীর্ণতম গণ্ডির ম্যাগাজিনেই একমাত্র বাংলা সাহিত্যের আসল অস্তিত্বসংকটের আসল ধারাটা লুকিয়ে রয়েছে, বা সমাজ পালটে দেওয়ার চাবিকাঠি। অনেকেই বলবেন, বাংলা সাহিত্য এখন কর্পোরেটাইজড। কিছু হাঙ্গররূপী বৃহদাকার প্রকাশনা সংস্থা পুরো বাজারটা চালাচ্ছে, বাকিরা পাত্তা পাচ্ছে না, আর চলছে চূড়ান্ত ফেভারিটিজম, লবির খেলা ইত্যাদি। ঠিকই, কিছু ক্ষেত্রে তা নিশ্চয়ই ঠিক। কিন্তু, তা সত্ত্বেও আমরা, বাঙালির মতো একটা চূড়ান্ত অধঃপতিত জাত, ভুলেও নিজেদের দিকে একবারও তাকাব না। ভাবব না, ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা প্রকাশনা সংস্থা এবং রক্তবীজকে কমপ্লেক্স দেওয়া নব্যলেখকগোষ্ঠী বইমেলা এলেই কিছু না কিছু ছাপতে থাকে। দুটো লাইন লিখতে পারে কি পারে না (বেশিরভাগই পারে না, সেটা আলাদা), গাঁটের কড়ি খরচা করে সেলফ-পাবলিশড বই বের করতে বেরিয়ে পড়ে সবাই। 


আর, বাংলা বাজার এখন রাজ করছে চেনা কিছু রিপিটিটিভ জনরা - হয় তন্ত্র, নয় অদ্ভুত সব প্রেমের গল্প, নয় জঘন্য কবিতা, নয় থ্রিলার, নয় ঐতিহাসিক, নয় পৌরাণিক - অথবা এদের মধ্যেকার পারমুটেশন নিয়ে লড়ে চলা। মানে, পৌরাণিক-তন্ত্র, প্রেম-ঐতিহাসিক, থ্রিলার-প্রেম, ঐতিহাসিক-তন্ত্র... আর কী লেখার ছিরি, কী তার বাহার! ঐতিহাসিক মাত্রেই তৎসম শব্দে এক অদ্ভুতুড়ে ন্যারেটিভ, সবাই সবাইকে 'আর্যে! ভদ্রে! রাজন! রাজ্ঞী' এসব বলে ডাকছে - তন্ত্রমাত্রেই একটা এমন চরিত্র থাকছে, যে হুটপাট বিভিন্ন তন্ত্রসার হ্যানত্যান বইয়ের থেকে র‍্যান্ডম পটল(অধ্যায়, তোলার বা ভাজার না) মুখস্থ বলে যাচ্ছে, এবং লাস্টে 'ভালোবাসাই তন্ত্র, বাকি সব যন্ত্র, আর পেটে থাকে অন্ত্র' মার্কা ক্যাচফ্রেজ দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে ইত্যাদি। সেখানেতে আঁভা-গার্দ ভাবব, ঠিকঠাক সাহিত্যের কথা ভাবব.. এসব কোথায়? তাও লোকে লেখার চেষ্টা করছে। দুয়েকজন এখনো ভালো লিখছেন, কিন্তু সেই লেখার সমকালীনতাকে ছাপিয়ে যাওয়ার প্রয়াস কই? সমকালীনতার বেড়াজালকে কাটাতে না পারলে কোনো শিল্পই উৎকর্ষের শিখরে পৌঁছোতে পারে না, সে নোবেল পাক আর কৎবেল।


আর, পুরস্কারের প্রতি বাঙালির চিরঘৃণা তো রয়েছেই। বাঙালি মাত্রেই এক অদ্ভুত শহিদ জাত, যাদের সবাই চেপে রেখেছে, আটকে রেখেছে, জিততে দেয়নি, ফেলে দিয়েছে, ঠেলে দিয়েছে, উঠতে দিচ্ছেনা। ক্রিকেটের ময়দান থেকে চাকরির পরীক্ষা, সবেতেই বাঙালি এগিয়ে, কিন্তু লবি বাঙালিকে উঠতে দেয়নি। বাঙালি পুরস্কারে বিশ্বাস করে না, তাকে ঘৃণাভ'রে প্রত্যাখ্যান করে। (অথচ পেলে পরে মাথায় নিয়ে পরের একশো বছরের হিসেব সেটল করে নেয়, সেটা আলাদা)।


একটাই কথা। পাশ্চাত্য একমুখীনতার যুগে বহুদিন হল প্রাচ্য মাথা উঁচু করে এগিয়ে চলেছে। সিনেমা, সাহিত্য, শিল্প, বিজ্ঞান, অর্থনীতি সবেতেই প্রাচ্যের জয়জয়কার হচ্ছে। এশীয় হিসেবে আমাদের গর্ব হওয়া উচিত, হান এক এশীয় দেশ থেকে সাহিত্যে প্রথম নোবেল জিতলেন, যেখানকার পপ গান নিয়ে বা ড্রামা নিয়ে আমরা পাগল হয়ে যাই। অথচ, আমাদের মনে হয় না, প্রচুর ভেবেচিন্তে ব্রেইনস্টর্মিং করে, অনুভব করে কিছু লেখার কথা। এমন লেখা, যা শুধু বাজারেই কাটবে না, বরং ভাবাবেও। দরকারে দুটো লোক কম পড়বে, কিন্তু যারা পড়বে, ভালোবেসে পড়বে। সাহিত্যের প্রতি, শিল্পের প্রতি একটা দায়বদ্ধতা থাকা উচিত। 'লোকে পড়বে' অজুহাতে গা ভাসিয়ে দিলেই সাহিত্যিক হওয়া যায় না। আপনারা তাই সেটা হতে পারবেনও না, সেই দূরদর্শিতাও আপনাদের নেই।


প্রসঙ্গত, এর আগে এশিয়া থেকে সাহিত্যে ৮ জন নোবেল জিতেছেন। হান ৯ নং। প্রথমজনের পরে আর কেউই বাংলা সাহিত্য নিয়ে এগোনোর প্রয়োজন বোধ করেননি। আসলে, লিটল ম্যাগাজিনেই আমাদের ভিত্তি, বইমেলাই আমাদের ভবিষ্যৎ কিনা!


Tuesday, 8 October 2024

A Raconteur's Ramblings

It’s well past the midnight. The smaller hand of the vintage grandfather clock, almost as vintage as your heart, is about to complete its 4th and a half revolution of the day. My city, sullen and in slumber, wishes not to be perturbed anymore. So does my weary mind, but it refuses to shut off. I dream while being half-asleep, and sink, sink, sink.. 

You are more vivid in my subconscious than in reality. Almost lively, as clear as a hallucination. The paintbrushes picked up by my layers are as bold as Monet's strokes, as colourful as Rothko, as pointed as Seurat, as detailed as Botticelli. You are painted, and alive. Maybe alive. Or painted. Difficult to distinguish at times. 

I touch your scars. The hidden scars, that you're afraid to showcase. You're afraid, timid as a homeless bird. You're stripped off of your garb of pretence that protects your tender, broken heart. I touch your scars, caress them. Your scars touch me too. You're not you anymore. You are a body full of scars, a mind full of trauma, a life full of pasts affecting the presence. Your cindery existence, a testament to the existence of fire, recounts the story of Icarus. Your wings have melted. You fall, and fall, and fall. You are drowning. You are looking for someone. That someone isn't me. It never was. Or maybe it was, I can't really tell. It's been epochs and eons since then. Almost an eternity. 

Your scars lighten up. My tears touch your scars. Your wounds, that are long unattended. Perhaps it never was attended in the first place. I kiss your wounds, as dearly as Adam kissed Eve when he saw her for the first time, ever. Kiss speaks of empathy, compassion. A language that binds our soul. We kiss, and kiss, and kiss - as if that's the end of the World. An apocalyptic kiss. A kiss, that Klimt painted in yellow. A kiss, that Scorsese crafted with fiery cinders. Cinders, that speak of your existence. A testament to the fire within. 

You heal. Your healing heals me. My healing heals you. Our sorrows and pains and woes touch each other. Our cosmic presence transcends into the realm of ethereal nothingness. The metamorphosis of macabre melancholia into nihilistic numbness. We are floating, and floating, and floating. You wish to stretch your hands out. My hands are closer as well, so close that you can touch mine if you want. But they never meet. We never meet. We go back to our own abysses again. Abyss, that we've turned into home. With a whimper, not with a bang - we explode. The sound of the explosion barely reaches anyone. Not even our own ears.

And our city, your city, my city, wishes not to be perturbed of its deep, dark, deadly slumber. And the vintage grandfather clock, almost as vintage as your heart, keeps ticking.

Wednesday, 2 October 2024

উৎসবে-ব্যসনে চৈব (ed.)


*উৎসবে-ব্যসনে চৈব*
আগেরদিন অনলাইনে একটা আর্টিকল পড়ছিলাম, যার মুখ্য বিষয় হলো কীভাবে উৎসবের হরষের গভীরে লুকিয়ে থাকে গোষ্ঠীক অবসাদ। অবসাদের মাত্রা যত গভীর হয়, ততই পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকে আড়ম্বর, ভিড়, ঠেলাঠেলি, ধাক্কাধাক্কি। বিশেষত, কোভিডের প্রকোপের ফলে যে প্রজন্মগত ট্রমা সামাজিকভাবে আমাদের পঙ্গু করে দিয়েছে, তারই বশে কোভিড-পরবর্তী পুজোগুলোর ধুমধাড়াক্কা আরো বেশি।
বিশ্বায়ন-পরবর্তী যুগে, মূলত এই নয়া পুঁজিবাদের যুগে মানুষ নিজের অজান্তেই হয়ে পড়েছে কেবলই একটি রাশিবিজ্ঞানের আইডেন্টিটি, একটি সংখ্যা। কেবলই একজন ভোক্তাবিশেষ - এর বাইরে তার পরিচয় নেই। সুকৌশলে সেটাকে মুখোশ পরিয়েই যে পরিচিতিটা তুলে ধরে এই নয়া-পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থা, তা হল ইন্ডিভিজুয়াল, ব্যক্তিবিশেষ হিসেবে একজনের পরিচয়। এইসবের টানাপোড়েনের ফলে আমরা ক্রমশ যে 'বিশেষ' হয়েছি, তাই শুধু নয় - আমরা হয়ে পড়েছি চূড়ান্ত, চূড়ান্তভাবে একা। বহির্বিশ্বের সঙ্গে একদিকে আমাদের সংযোগ বেড়েছে, অপরদিকে আমাদের নিজেদের মধ্যে মানসিক ব্যবধান যোজনবিস্তীর্ণ হয়ে গিয়েছে আস্তে আস্তে। আমরা এর আগে এক বদ্ধতার মধ্যে থাকলেও, বেঁধে বেঁধে থাকতাম। একটা কৌমপরিচিতি ছিল আমাদের। বিশ্বায়ন এসে সেই পরিচিতি-রাজনীতির মূলে আঘাত হেনেছে, ঘটিয়েছে এক অদ্ভুত প্যারাডাইম শিফট।
কোভিডের মতো বিশ্বব্যাপী সঙ্কট আসার ফলে আমরা বহির্বিশ্ব থেকে মুখ ফেরাতে বাধ্য হয়েছিলাম। আমাদের ফিরে আসতে হয়েছিল ঘরে, নিজের বাড়ির লোকেদের সঙ্গে চার দেয়ালের মধ্যে - যাদের মধ্যে দূরত্ব মাপতে বোধহয় হাবল স্পেস টেলিস্কোপ বা জেমস ওয়েব টেলিস্কোপও পারবে না। বাধ্য হয়েছিলাম সভ্যতার ফিরতি পথের ট্রানজিট রুট নিতে, যার অবশ্যম্ভাবী ফলস্বরূপ আমরা এক নয়া পরিচিতিসঙ্কটের শিকার হই - যাদের থেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছিলাম, তাদের সঙ্গে দিনগুজরান - ব্যক্তিক ও গোষ্ঠীক পরিচয়ের অদ্ভুত সংঘাত। ফলে, খুঁটিনাটি কারণেই ঝগড়া, বিরক্তি। বরফ গলা তো দূর, বরফ জমতে থাকে - বাড়তে থাকে একাকীত্ব। বাইরের জগতের কোভিড-সংক্রান্ত উদ্বেগ, অস্তিত্বের একরকম সঙ্কট, আর ভিতরের জগতের পরিচিতি সঙ্কট - এই দ্বিমুখী আক্রমণে টাল সামলাতে না পেরে এক অনন্ত কুয়োর মধ্যে তলিয়ে যাওয়া শুরু হয় আমাদের, আমাদের গিলে খেতে থাকে এক অদ্ভুত ট্রমা।
এই ট্রমা-পরবর্তী সময়েই আমরা দেখছি, যেকোনো উৎসবে, যেকোনো সামাজিক স্ফিয়ারে আমাদের যোগদানের উৎসাহটা তুলনামূলকভাবে বেশি - সেটা পুজোর প্যান্ডেলে হোক, ক্রিসমাসের পার্ক স্ট্রিটে হোক, বা তিলোত্তমার বিচারের দাবিতে পথে নামাতেই হোক। প্রসঙ্গত, ফেসবুকে একজন লিখেছেন, বোধন শব্দের মধ্যেই বোধ লুকিয়ে থাকে - এবং দেবীর বোধনের আগেই কলকাতায় লক্ষাধিক জনসমাগম সেই বোধের অভাবেরই পরিচায়ক। আমি নিজেও সেই মতাদর্শেই মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি, যে বাঙালি এবং ভারতীয় মাত্রেই হুজুগে বিশ্বাসী। কিন্তু, তবুও, কোথাও গিয়ে যেন একটু হলেও মনে হয় যে, এই উৎসবের হুজুগগুলো, বিশেষ করে এই পরিস্থিতিতে খুব একটা নিরর্থক নয়।
মানুষ আসলে একা থাকতে ভালোবাসে না। এই একাকিত্বটা শুধুমাত্র যে দশটা মানুষের সঙ্গে গলাজড়াজড়ি করে বসে থাকা, তা নয় - এই একাকিত্বটা belongingness-এরও। এই কারণেই দেখা যায়, কোনো পপুলার টিভি সিরিজ, কোনো সিনেমা, কোনো বই (যদিও বই নিয়ে মাতামাতিটা ডাইনোসরের সঙ্গেই উল্কার বাড়ি খেয়ে মহাশূন্যে বিলীন হয়ে গেছে) বা যেকোনো নতুন অভিজ্ঞতার একটা সামাজিক চাপ কাজ করে, যেটাকে peer pressure-ও বলা হয়। ফলে দেখা যায়, মার্ভেল দিয়ে গুলি করে না মার্ভেলাস মারামারি করে, এইটুকুও না জানা মানুষটা মার্ভেলের নতুন সিনেমা দেখতে চলে যায়, ফ্যান্টাসি বলতে পাশের বাড়ির বৌদির বেশি ভাবতে না পারা লোক গেম অফ থ্রোনস দেখে নিচ্ছে, ডিজনিল্যান্ডকে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের দেশ ভাবা লোকজন শ্রীভূমিতে ভূমিহীনের ন্যায় জড়ো হয়েছে। এমন না, যে এগুলো না দেখলে-না করলে লোকে জাতে উঠতে পারবে না। বরং, এগুলো না করলে সে বাকিদের থেকে আলাদা হয়ে পড়বে। এই আলাদা হয়ে পড়া, এই একাকিত্ব, এই একলা হয়ে যাওয়ার উদ্বেগ মানুষকে বোধশূন্য করে তোলে, তাকে হুজুগে মাতিয়ে তোলে।
অনেকেই মনে করেন, যাদের ব্যক্তিত্বের অভাব, যাদের নিজস্বতার অভাব, তারাই এই পিয়ার প্রেশারের চাপে মাথা ঝুঁকিয়ে ফেলে, হয়ে যায় ট্রেন্ডসর্বস্ব, ভেড়ার ন্যায় herd mentality-ময়। কিছুটা হয়তো তা সত্যিই। কিন্তু, 'আমি ট্রেন্ডের সামনে মাথা নিচু করবো না' এই মর্মে অনেকেই হয়ে গেছে চূড়ান্ত একা। বাকিদের থেকে আমি আলাদা, স্রোতের বিপরীতে আমাকে যেতেই হবে - এই জেদ করে স্রোত থেকেই চ্যুত হয়ে গেছে কতশত মানুষ। অথচ, একটু যদি 'আমিত্ব'কে দূরে সরিয়ে রেখে তার কালেক্টিভ সত্তাকে প্রশ্রয় দিতো, তাহলে হয়তো এতোটাও খারাপ সময় আসতো না। ক্ষুদ্র আমিগুলোকে কখনো কখনো বৃহৎ আমিগুলোর সঙ্গে, সামাজিক আমিগুলোর সঙ্গে, গোষ্ঠীক আমিগুলোর সঙ্গে মিলিয়ে দিতে হয় - নিজের স্বাতন্ত্র্যের স্বার্থেই - কেন না, মনে রাখতে হবে, মানুষ আসলে একা থাকতে পারে না, এবং চায়ও না, তা কাম্যও নয়। ব্যক্তিপরিচয়ের সঙ্গে মানুষের কৌমপরিচয়টাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এখন আবার উৎসবের মরশুম। অদ্ভুত কিছু মনখারাপ গ্রাস করে থাকে আমাদের যাপন। কেউ কেউ সেটা ভুলতে বেরিয়ে পড়ে ভিড়ের মধ্যে, যদি ধাক্কাধাক্কির চোটে সেসবকে দূর করে দেওয়া যায় - আর অল্প কিছু মানুষ থাকে, যারা নির্বান্ধব, নিঃসঙ্গ, একাকী - এই সমস্ত শহরের সবকটা ভিড় একসঙ্গে মিলেও তাদের মনখারাপের মলম হয়ে উঠতে পারে না৷ অদ্ভুত এক বোধ খেলা করে চলে তাদের মধ্যে। এই পুজো, উৎসব তাদের জন্য নয়। তারা শুধু এই আলোকোজ্জ্বল শহরের ছায়া-উপচ্ছায়ার কোণে বসে নিজেদের মনখারাপের বিনিসুতো গেঁথে চলে, আবার দিনদশেক পরের ধূসর বিষণ্ণতার শরিক হওয়ার জন্য। আসলে, উৎসব বড়ো নিষ্ঠুর। উৎসব মানুষকে যেমন কাছে আনে, তেমনই তাদের মধ্যেকার ফাঁকগুলোও বড্ড নির্মমভাবে হাইলাইট করে দেয় - বুকের মধ্যে শূন্যতা খাঁ খাঁ করে, যে অতলস্পর্শী হওয়ার মতো ডুবুরি হওয়া আর কারোর হয়ে ওঠে না।
(বছরকয়েক আগে পুজোয় লেখা। একটু এডিট করে পোস্টানো)

Monday, 30 September 2024

বিদায়, সেপ্টেম্বর...


সেপ্টেম্বর, 

বিদায়ের বেলা আসন্ন। তোমার মেয়াদ ফুরিয়ে এল। আর তো মাত্র কয়েকটা মুহূর্ত, তার অব্যবহিত পরেই তোমার খণ্ড-অস্তিত্ব মিশে যাবে ডায়রির পাতায়, মিলতে না পারা অঙ্কের খাতায়। চলে যেতে হচ্ছে বলে তোমার মন কি ভারাক্রান্ত? যে শেষ বিদায়গুলো জানিয়ে যাওয়া হল না, স্টেশনে-বন্দরে একা পড়ে রইলো একপাক্ষিক আলিঙ্গনের রিক্ততাটুকু - তার শূন্যতাটুকু কি তোমার পাঁজরের মাঝে ছড়িয়ে দিচ্ছে করুণ বিধুরতা? কুড়োনো হল না যে ফুলগুলো, তারই কি নিরস্তিত্ব মালা গেঁথে চলেছো নিরন্তর?

 

সেপ্টেম্বর, যেতে তোমাকে হতোই। জগতের এটাই নিয়ম। আগমনীর মধ্যেই মিশে থাকে বিদায়ের নীরব প্রতিশ্রুতি, আসন্নের মধ্যেই থাকে আগামী। প্রকৃতির অদ্ভুত লটারির খেলায় তোমার হাতে পড়ল একটা কম দিন - নইলে, তুমিও বেঁচে দেখিয়ে দিতে, কীভাবে বাঁচা যায়। অথচ, এমনটা হয় না। যার ভাগ্যে যেটুকু পড়ে, সেটুকুর মধ্যেই যত্ন করে গুছিয়ে নিতে হয় নিজের ঝরাপাতার জীবনকে। অসংখ্য না-পাওয়াগুলোকে যদি গুনতে বসি, ভিড়ের শেষে অধীর অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকা মলিন মুখের বাচ্চাটার মতোই, ‘পাওয়া’গুলোর জন্য তো আর কিচ্ছুটি পড়ে থাকবে না! যা আছে, তাই ভালো। যেটুকু অপ্রাপ্তি, তাদের যেতে দাও। আঁকড়ে থেকো না। মায়া একেই অতি বিষম বস্তু, তার মধ্যে অপ্রাপ্তির মায়া আরো বেশি। হাসিমুখে বিদায় জানাও। চলে যখন যেতেই হবে, তখন তুচ্ছতা বাদ দাও। ওতে সংকীর্ণতা বাড়ে বই কমে না। মনকে কখনো ক্ষুদ্র হতে দেবে না, ডোবার মতো হতে দেবে না, আটকা পড়তে দেবে না কোথাও।


অথচ কী জানো, এসব বলার পরেও কোথাও গিয়ে একটা অবশ অভিমান কাজ করে। শরীর চলতে চায় না, পা এগোতে চায় না - ক্লান্তিতে নুয়ে পড়ে দেহ। মনের ভিতরে নেমে আসে অবসন্ন সন্ধে। অ্যালপ্রাজোলাম হাতড়ে নিতে হয় ড্রয়ার খুঁজে, যাতে পরের দিনটুকু রঙিনভাবে বাঁচা যায়। যে সেপিয়াগন্ধী দুঃখগুলো ঠেলে উঠতে চায়, তাদের ছিপিবন্দী করে রাখতে হয়। তুমি তো জানোই সেপ্টেম্বর, প্যান্ডোরার বাক্স থেকে প্রথমে কী বেরিয়েছিল। চেপে রাখতে রাখতে যখন অসহ্য লাগে, ফিরে যেতে হয় জলের কাছে। গর্তের কাছে। সমস্তটা উজাড় করে দিতে হয় সেখানে, দিয়ে মাটি চাপা দিয়ে দিতে হয়। 


এতো চাপাচুপি দিয়ে রাখার পরেও, দুঃখগুলো কীভাবে যেন ছাড়া পেয়ে যায়। ড্যান্ডেলিয়নের পাপড়ির মতো, চেরিফুলের পাতাঝরার মতো তারা ভেসে ভেসে ইতিউতি ঘুরে বেড়ায়। দেখো, জানালার বাইরে তাকাও, তাকালেই দেখতে পাবে তাদের। হাত বাড়ালেই ধরতে পাবে। কারোর না কারোর দুঃখ এই শহরের বুকে সবসময়ে ভেসে বেড়ায়। সবাই আসলে বড্ড দুঃখী, বুঝলে কিনা!


সেপ্টেম্বর, তুমি মনখারাপের মাস। একাকীত্বের মাস। তোমাকে কেউ চায় না। তোমার চলে যাওয়ার দিন গোনে সবাই। তুমি চলে গেলে পুজো আসবে। তুমি চলে গেলে এক রোদ-ঝলমলে শারদ ভোরবেলায় গা-ঝাড়া দিয়ে উঠে বসবে সবাই। গান বেজে চলে, ‘ওয়েক মি আপ, হোয়েন সেপ্টেম্বর এন্ডস…’। তুমি শুধু একলাটিই দাঁড়িয়ে থাকো, বর্ষাশেষ-শরৎশুরুর এক একলা সাঁকো হয়ে - চুপচাপ, টুপটাপ। অবহেলিত, বিস্মৃত - যে শিশুটিকে কেউ খেলায় নিতে চায় না বলে একা একা চুপটি করে মাঠের পাশটায় বসে থাকে। সে দুর্বল, সে দুধভাত। গলার কাছে দলা পাকিয়ে উঠতে থাকে আবেগাভিধানের বাইরের কোনো অনুভূতি। মিথ্যে সান্ত্বনাটুকুও তিতকুটে ট্যাবলেটের মতো লাগে। তুমি একলাই থেকে যাও, একা হয়ে। কী অদ্ভুত, না? শহরজুড়ে একা মানুষ এতো, তাও একলা তুমিটাকে কেউ টেনে নেয় না কাছে। নিজের করে নেয় না, আপন ভাবে না। অন্যমনস্ক-ইতিউতি-গয়ংগচ্ছ কাটিয়ে দেয়, যতক্ষণ না আজকের এই দিনটা এসে দোরগোড়ায় দাঁড়ায়।


শেষপাতে থাকে কিছু খুচরো বিদায়সম্ভাষণ, কিছু কেজো লৌকিকতা। ‘সাবধানে যাস-আবার আসবি’-র একঘেয়েমি। সমস্তটা মিটিয়ে উদাস পায়ে পথে নামা। ফের সামনের বছর। ততদিন, বিস্মৃতির ভিতর আরেক বৃহৎ বিস্মৃতিকে নিয়ে কাটিয়ে দেওয়ার নিঃশব্দ অশ্রুযাপন।

কোহেন সেপ্টেম্বর হতে চেয়েছিলেন। পারেননি। বা হয়তো পেরেছিলেন। সবাই সেপ্টেম্বর হতে পারে না। সেপ্টেম্বর হওয়া সহজ নয়। 


বিদায়। যাত্রা শুভ হোক।

Sunday, 29 September 2024

আমেজী ভালোবাসা, ফুল ফোটার কাল, ফুলেলা কিছু বছর - ওয়ং কার-ওয়াইয়ের নান্দনিকতার ভাষ্য


[ডিসক্লেইমার - ১) আমি ফিল্ম স্টাডিজের লোক নই, কোনো বোদ্ধাও নই। নিজের যেটুকু বোধ, তার উপরে ভিত্তি করে লেখা। ফলে, কোনো বক্তব্য থাকলে সরাসরি বলবেন।

২) ফিল্ম রিভিউ জিনিসটা আমার ফোর্টে নয় (সে কিছুই ফোর্টে নয়, এফোর্টে হতে পারে বড়োজোর)। ফলে, একটু বড়ো হয়ে গিয়েছে, এবং সম্ভবত ইনকোহেরেন্টও। ক্ষমাঘেন্না করে পড়ে বক্তব্য জানালে খুশি হব।]

ভালোবাসার কি সত্যিই বিশেষ ‘আমেজ’ থাকে? সমস্তটা জুড়েই কি ভালোবাসা নয়? নাকি, মুহূর্তের পর মুহূর্ত বুনে তৈরি হয় ভালোবাসার পশমি অস্তিত্ব? ভালোবাসা কি সামগ্রিকতা নাকি খণ্ডযাপন? সময়ের নিক্তিতে কি তীব্রতা মেপে নেওয়া যায় ভালোবাসার? ভালোবাসা ঠিক কতটা রঙিন, কতটা মোনোক্রোম, কতটা গ্রেস্কেল? আদৌ উচ্ছ্বাস, নাকি স্থবিরতা? 

এরকম হাজারো প্রশ্ন ভিড় করে আসছিল ওয়ং কার-ওয়াইয়ের তর্কাতীতভাবে শ্রেষ্ঠ এবং জনপ্রিয়তম সিনেমা ‘ইন দ্য মুড ফর লাভ’ দেখতে বসে। সিনেমাটা প্রথম দেখেছিলাম পাক্কা দশ বছর আগে। স্কুলে পড়তাম তখন, সদ্য মাধ্যমিক দিয়েছি। মাথায় ভূত চেপেছে সিনেমার। সারাদিন গোগ্রাসে সিনেমা গিলে যাচ্ছি। কিছু সিনেমা বুঝে, অধিকাংশই না বুঝে বা নিজের মতো করে বুঝে… তখনই, হাজারো ক্লাসিক সিনেমার ভিড়ে এই সিনেমাটাও দেখেছিলাম। প্রথম দেখায়, অবশ্যই, ভালো লাগেনি। ষোলো বছরের অপরিপক্ক্ব মাথা নিতে পারেনি ওয়ং কার-ওয়াই। তবে, সিনেমার বর্ণময়তা ভালো লেগেছিল, এইটুকু পরিষ্কার মনে আছে।

আবার যখন সিনেমাটা কিছুদিন আগে, এক বৃষ্টিমুখর বিষণ্ণ দিনে দেখতে বসলাম, তখন মাঝখান দিয়ে কেটে গিয়েছে দশটা বছর। গ্রামার ভাঙা শিল্পের সৌন্দর্য নিয়ে অল্পসল্প ধারণা জন্মেছে। পিকাসো-দালি-ম্যাগরিটের কাজ দেখেছি, দেখেছি বুনুয়েল-দুশঁর কাজ, পড়েছি সার্ত্র-হাক্সলি-মার্কেজ। প্লটের গঠন নিয়ে ধারণা জন্মেছে, ধারণা জন্মেছে উত্তর-অবয়ববাদ, উত্তরাধুনিকতা নিয়ে। খুবই উপরউপর ধারণা, তবুও। যদিও, সিনেমা দেখতে গেলে এগুলোর প্রয়োজনীয়তা কী - এই নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে। অনেক বিজ্ঞ ব্যক্তিই হয়তো বলবেন, সিনেমা আসলে কবিতার মতো। যা বুঝবে তুমি, যা দেখবে, তাই-ই সিনেমা। আমার সেই ব্যাপারটায় একটু আপত্তি আছে। বেশি ডিটেইলে না গিয়ে এটুকুই শুধু বলার, ব্যাকরণ না বুঝলে ব্যাকরণ ভাঙা কেন হচ্ছে - এটা বোঝা যায় না। এসব কচকচি এখানেই থাক বরং।

সিনেমাটা দেখতে গিয়ে যেটা টের পেলাম, একটা জিনিস দশ বছর আগের সঙ্গে একইরকম ভাবে মিলে যাচ্ছে - বর্ণময়তার প্রতি মুগ্ধতা। ইন দ্য মুড ফর লাভ-এ বিষণ্ণ ভালোবাসার যে রঙিন উদযাপন হয়েছে, সেটার মতো অদ্ভুত কনট্রাস্ট খুব কম আছে। এই কনট্রাস্ট থেকেই উঠে আসে ড্রামাটিক কনফ্লিক্ট, বা নাট্যদ্বন্দ্ব। সেসবে পরে আসছি। 

সিনেমাটির গল্প (বা গল্পহীনতা) খুবই সাধারণ। ষাটের দশকের শুরুর কথা, ঘটনাস্থল হংকং। প্রধান কুশীলবেরা হচ্ছেন এক সওদাগরি আপিসের মালিকের সেক্রেটারি সু লি-ৎসেন/মিসেস চ্যান (ম্যাগি চেয়ুং) আর এক সাংবাদিক চাও মো-ওয়ান (টোনি লেয়ুং)। মিসেস চ্যান এবং মিস্টার চাও দুজনেই একটি সস্তাগোছের অ্যাপার্টমেন্টে ভাড়া নিয়ে উঠবেন,পাশাপাশি ঘরে। দুজনেই বিবাহিত, দুজনের সঙ্গীই চাকরিসূত্রে জাপানে রয়েছে। হঠাৎই দুজনে আবিষ্কার করবেন, তাঁদের সঙ্গীরা একে অপরের সঙ্গে পরকীয়ার সম্পর্কে আবদ্ধ। সত্যিকে মেনে নিতে পারা আর না-পারার দোলাচল এবং এক শীতল শূন্যতাকে একটু উষ্ণ আঁচে ভরে নেওয়ার জন্য তাঁরা একে অপরকে সঙ্গ দেন। তাঁদের সম্পর্ক কী কী মোড় নেবে, সেটাকে ঘিরেই সিনেমাটা মূলত এগিয়েছে (বা এগোয়নি?)

ওয়ং কার-ওয়াই-এর সিনেমার একটা প্রধান বিশেষত্ব হল ছকের মধ্যে থেকে ছক ভাঙা। অ-সরলবৃত্তীয় আখ্যান (নন-লিনিয়ার ন্যারেটিভ) নিয়ে সিনেমায় যাঁরাই কাজ করেছেন, তাঁরাই তাঁদের শৈল্পিক স্বাধীনতা নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা চালাতে গিয়ে বহুক্ষেত্রে চলে গিয়েছেন অবস্কিওরিটির দিকে, কখনো বা জোর করে চাপিয়ে দিতে চেয়েছেন নিজের ন্যারেটিভ। তার ফলে ব্যাহত হয়েছে সিনেমার স্বাভাবিক গতি। মনের চেতনাপ্রবাহের সঙ্গে তাল মেলাতে সবসময়ে পারেনি রিলের চেতনা-আখ্যান। এখানে দাঁড়িয়েই ওয়ং কার-ওয়াই শিখিয়ে দিচ্ছেন, পরিমিতিবোধ কতটা দরকার। 

ইন দ্য মুড ফর লাভ মূলত কোলাজধর্মী সিনেমা। নন-লিনিয়ার ন্যারেটিভে যা মূলত হয়, অর্থাৎ কোনো বিশেষ দৃশ্যক্রম থাকে না। আগের ঘটনা, পরের ঘটনা, মাঝের ঘটনা… এসব কিচ্ছু নেই। সবটাই রয়েছে, আবার কিছুই নেই। নিজের মতো করে বসিয়ে নাও। গদারের সিনেমা, বিশেষ করে ‘প্রেইজ অফ লাভ’ দেখলে এটা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। গদার নিজেও বলে গিয়েছেন সেই বিখ্যাত কথাটি - ‘আ স্টোরি শ্যুড হ্যাভ আ বিগিনিং, আ মিডল অ্যান্ড অ্যান এন্ড, বাট নট নেসেসারিলি ইন দ্যাট অর্ডার।’ ‘ইন দ্য মুড…’-এও মোটামুটি একই জিনিস প্রায় দেখা যায়। একের পর এক সিন তৈরি হচ্ছে - জীবনানন্দ ধার করে বলা যায়, ‘তবু কেবলি দৃশ্যের জন্ম হয়’। অজস্র কোলাজ জুড়ে একের পর এক মঁতাজ শট (ব্রজদার ভাষায়, মন তাজা করে দেয় যা), দ্রুত দৃশ্যপটের পরিবর্তন - এককথায় যাকে ‘সিনেমাটিক ব্রিলিয়ান্স’ বলা যায়।

১৯৬৩-এর সময়ের ঘটনা দেখালেও মনে রাখতে হবে, সিনেমাটি ১৯৯০-এর দশকে তৈরি। বিশ্বায়নের খোলা বাজারের যুগ। পৃথিবী যত কাছাকাছি আসছে, মানুষের মধ্যে দূরত্ব তত বাড়ছে। ৯০-এর দশকের এই একাকীত্বকে ওয়ং বসাচ্ছেন ১৯৬০-এর দশকে। ভালোবাসা নামক ইনস্টিটিউশনের যে প্যারাডাইম শিফট, তাকে দুটো টাইমস্কেপে একইসঙ্গে প্লেস করতে গেলে সময়-কালের কাটাকুটি গ্রিডের ব্যাপারে প্রবল ধারণা থাকতে হয়। ওয়ংয়ের সেটা যথেষ্টই ছিল।

সিনেমাটির অনেকগুলো বিশেষ দিক রয়েছে। প্রথমত, রঙের ব্যবহার। ওয়ং কার-ওয়াইয়ের সিনেমার প্রতিটা ফ্রেমে রঙের ব্যবহার যে ঠিক কতখানি ভিভিড, উজ্জ্বল, বর্ণময় - সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। এক সমালোচককে এককালে দেখেছিলাম, মার্ক রথকোর ছবির সঙ্গে ওয়ংয়ের সিনেমার তুলনা করতে। এর থেকে ভালো তুলনা বোধহয় সম্ভবত আর হয় না। প্রতিটা দৃশ্যের সঙ্গে মানানসই কালার ফিল্ড, এবং বহুক্ষেত্রেই অত্যন্ত আনইউজুয়াল কালারস্কেপ - এর তুলনা খুবই কম। ‘ইন দ্য মুড ফর লাভ’-এ এই কালারস্কেপ অত্যন্ত অদ্ভুত একটা কনফ্লিক্ট তৈরি করেছে, যেটার কথা বলছিলাম। দুটো অত্যন্ত একলা মানুষ, যারা একাকীত্ব থেকে পাথর হয়ে গিয়েছে প্রায় - যারা নিজেদের জন্য রান্নাটুকুও করতে চায় না, যাদের নুডলস কেনার মধ্যেও অদ্ভুত একাকীত্ব মিশে আছে - তাদের ওয়ং কার-ওয়াই সাজিয়ে দিচ্ছেন লাল দৃশ্যপটে। লাল, অর্থাৎ ভালোবাসার রং। উষ্ণতার রং। চাউ আর সু-এর মধ্যে যে উষ্ণতাটা আসবে আসবে করছে, কিন্তু এসে পৌঁছোয় না - তাদের সাদাকালো জঞ্জালে ভরা জীবনে যে লাল রঙের প্রবল অভাব, ব্যাকগ্রাউন্ডে অন্তত ওয়ং তার কোনো অভাব রাখেননি। প্রেম আছে এবং প্রেম নেই - এই দুয়ের এক অদ্ভুত বর্ণময় কনফ্লিক্টে ভর করেই সিনেমাটা গড়গড়িয়ে এগিয়ে চলে। 

প্রসঙ্গত, এই বর্ণময় প্রেম দেখে আরেকটা সিনেমার কথা হয়তো মনে পড়তে পারে - দামিয়েন শ্যাজেলের বিখ্যাত মিউজিকাল রোমান্টিক কমেডি লা লা ল্যান্ড। এমা স্টোন-রায়ান গসলিং এর সম্পর্কের রসায়নেও এই রঙের ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ একটা ভূমিকা আছে। লা লা ল্যান্ড যেমন নৃত্যছন্দে এগিয়েছে, তেমনই এগিয়েছে ইন দ্য…-ও। ওয়ং নিজেই তাঁর এই সিনেমা সম্পর্কে বলতে গিয়ে বলেছেন, ‘টু পিপল ডান্সিং টুগেদার স্লোলি’। ঠিক এই কথাটাকেই আমরা কি ‘লা লা ল্যান্ড’-এর দুটো গান, ‘সিটি অফ স্টারস’ আর ‘আ লাভলি নাইট’-এ ফেলতে পারিনা? তবে, দুটো সিনেমার মধ্যে ফারাকও বিস্তর। ইন দ্য মুড ফর লাভ-এর বিষণ্ণতা কখনোই প্রাণোচ্ছ্বলতায় পর্যবসিত হয় না; লা লা ল্যান্ড-এ প্রাণোচ্ছ্বলতা থেকে বিষণ্ণতার একটা রুটবদল বরং দেখা যায়। লা লা ল্যান্ড-এর থিম্যাটিক রং নীল - আসন্ন বিষণ্ণতার ইঙ্গিতবাহী; ইন দ্য-এর থিম্যাটিক রঙ লাল, একটা অপ্রাপ্তিজাত উষ্ণতার প্রতীকস্বরূপ, আর কিছুক্ষেত্রে সেপিয়া - বিবর্ণ স্মৃতির প্রতিফলন। 

সিনেম্যাটোগ্রাফির দিক থেকে এই সিনেমা মোটামুটি টেক্সটবুকের কাজ করতে পারে। দুই বিখ্যাত সিনেমাটোগ্রাফার এই সিনেমায় কাজ করেছেন - একজন ওয়ং-এর দীর্ঘদিনের সঙ্গী সিনেমাটোগ্রাফার ক্রিস্টোফার ডয়েল, আরেকজন মার্ক লি পিং বিন - তাইওয়ানিজ সিনেমায়, বিশেষ করে তাইওয়ানিজ নিউ ওয়েভ সিনেমার এক অন্যতম পথপ্রদর্শক হৌ সিয়াও-সিয়েনের সঙ্গে ‘ফ্লাওয়ার্স অফ সাংহাই’, ‘মিলেনিয়াম মাম্বো’, ‘থ্রি টাইমস’-এর মতো কাজ করেছেন। ডয়েলের দ্রুতগতির ছোটো ছোটো শট, ক্লোজ শট, আনইউজুয়াল নানা অ্যাঙ্গলের শট আর লি পিং বিন-এর লং শট, তাক লাগানো একেকটা প্যানিং শট - এই দুই চালডাল মিলিয়ে কী স্বাদু খিচুড়ি যে ওয়ং বানিয়েছেন, তার তুলনা সত্যিই বিরল। সু আর চাউয়ের বিভিন্ন দৃশ্য তোলা হয়েছে এমন একেকটা অ্যাঙ্গল থেকে, যাতে মনে হয় চুরি করে তাদের জীবনে উঁকি মারা হচ্ছে। সত্যিই কি তাই নয়? শুরু থেকেই তাদের লক্ষ্য ছিল, ‘গসিপ’-এর বিষয় না হওয়ার। নাকগলানো বাড়িওয়ালি মিসেস সুয়েন, চাউয়ের মদ্যপ ও লম্পট বন্ধু পিং - তাদের জীবনে মাথা গলানোর লোকের অভাব হয়নি। জনবহুল হংকং শহর, ব্যস্ত হংকং শহর - তাও, দুটো একা মানুষের নিজস্ব, ব্যক্তিগত স্পেসের অভাব। এক ছাতার তলায় হাঁটলে, এক ঘরে কাটালে, এক ট্যাক্সিতে করে ফিরলে, নিভৃতে জড়িয়ে ধরে কাঁদলেও অলক্ষ্যে থাকা সদাসতর্ক চোখ নজর রেখে যাবে, ঠিক যেটা ক্যামেরা তুলে ধরতে চেয়েছে। ঝাপসা, আউট অফ ফোকাস, পিপ-ইন করা - অথচ, অন্যের জীবনে মাথা গলানো। সু প্রথম থেকেই বলে গিয়েছিল, ‘আমরা ওদের (তাদের স্বামী ও স্ত্রী) মতো হব না।’ হায় রে ভাগ্যের পরিহাস! হায় রে একাকীত্ব!

আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ আসপেক্ট বাদ দিলে এই সিনেমার কথা কিচ্ছুটি বলা হবে না - তা হল ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর। যে সিনেমা ‘মুড’-এর কথা বলে, সেই সিনেমায় মুডনির্ভর ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর হবে না, তা হতেই পারে না। ট্রাডিশনাল চিনে অপেরার ব্যবহার বাদ দিলে মূলত চারটে স্কোরের জন্য এই সিনেমা অমর হয়ে থাকবে - জাপানি কম্পোজার শিগেরু উমাবায়াশির ‘ইউমেজিস থিম’, আর মার্কিন জ্যাজ গায়ক, ব্যারিটোন কণ্ঠের ন্যাট কিং কোলের গলায় ‘আকুএওস ওহোস ভেরদেস’ (ওই সবুজ চোখদুটি), ‘তে কিয়েরো দিহিস্তে’ (তুমি বললে, ‘ভালোবাসি তোমায়’) আর ‘কিজাস, কিজাস, কিজাস’ (বোধহয়, বোধহয়, বোধহয়)। ইউমেজি’স থিম-এ বেহালার করুণ, বিষণ্ণ, একাকীত্বের আর্তির সঙ্গে চেলোর গম্ভীর, ‘শূন্যতা’র দৃপ্ত অথচ মন্দ্রোচ্চারণ মিলে যে এক অদ্ভুত মনখারাপের হারমোনি তৈরি করেছে, তার যথাযথ ব্যবহার করেছেন ওয়ং। সু-এর একাকী নুডলস কিনতে যাওয়া, চাউয়ের একা একা দাঁড়িয়ে একের পর এক সিগারেট টেনে যাওয়া, বৃষ্টিভেজা রাস্তায় সু আর চাউয়ের একসঙ্গে ভেজা, আলিঙ্গনবদ্ধ হওয়া, হাতদুটো একমুহূর্তের জন্য আশ্লেষে চেপে ধরে ছেড়ে দেওয়া -  সমস্তটা জুড়ে বাজতে থাকে ইউমেজিস থিম। সু ভেজে, চাউ ভেজে, দ্রব হয় দুই হৃদয়, কাছে আসতে না পেরে রক্তাক্ত হয় - আর ভিজতে থাকি আমরা, দর্শকেরা। স্নাত হই দুজনের অবরুদ্ধ কান্নায়। কখনো কখনো আমাদের কান্না বেরিয়ে আসে সু-এর মতোই, শুধু আলিঙ্গনের জন্য কাঁধ পেতে দেয় না কোনো চাউ। ফাঁকা পড়ে থাকে হোটেলের ঘর, সময়ে এসে পৌঁছোনো হয় না। অস্থির অস্থির লাগতে থাকে, হাতছাড়া হয়ে যায় সমস্ত সুযোগ, আর ব্যাকগ্রাউন্ডে ন্যাট কোল কিং ব্যঙ্গ করে যান ‘কিজাস, কিজাস, কিজাস!’... পারহ্যাপস, পারহ্যাপস, পারহ্যাপস বলে। মিলতে পারেনা দুটো হৃদয়, আর সম্ভাবনার তীর ছুঁড়ে ছুঁড়ে তাদের আঘাতে আঘাতে দীর্ণ করে দেওয়া হয়, সমাজের নৈতিকতার সদাজাগ্রত-সদাভিজিল্যান্ট চোখের দৃষ্টিশরে শেষ করে দেওয়া হয় সমস্ত সম্ভাবনা - দিয়ে গাওয়া হয় সম্ভাবনার গান। 

সব মিলিয়ে, ইন দ্য মুড ফর লাভ ওয়ং কার-ওয়াইয়ের নান্দনিকতার এক ন্যারেটিভ। না এতে গল্প বিশেষ আছে, না প্লট, না বলিষ্ঠ অভিনয়ের সুযোগ - শুধু রয়েছে জ্যাকসন পোলকের প্যালেটের মতো রঙের খেলা, এডওয়ার্ড হপারের ছবির ব্যাকগ্রাউন্ডে পিয়েট মন্ড্রিয়ানের সিটিস্কেপ, আর নেরুদার কবিতা। সমস্ত গ্রামার ছেড়ে, তত্ত্ব ছেড়ে, চুপ করে মাথা নত করে বসতে হয় এই সিনেমাকবিতার কাছে, যেখানে দুটো হৃদয় চেয়েছিল এক হতে, একে অপরের কাছে আসতে, ভালোবাসতে, বৃষ্টিভেজা এবং ঠকে যাওয়া স্যাঁতস্যাঁতে হৃদয়কে প্রেমের দেশলাই ঠুকে উষ্ণ করে নিতে - কিন্তু, ফুরিয়ে যায় সব। সমস্ত আমেজ, সমস্ত মুড, সমস্ত সময়… ফেলে আসতে হয় ভালোবাসাকে, এগিয়ে যেতে হয়। আর, গোপন কথাকে পাহাড়ের মাথায় গাছের গায়ের কোটরের মধ্যে বলে মাটি চাপা দিয়ে দিতে হয়। বোতলবন্দী করতে হয় আবেগকে, দিয়ে এগিয়ে যেতে হয়। 

অনেকেরই দেখা নির্ঘাত। যদি একান্তই দেখা না থাকে, তবে দেখেই ফেলুন। 

(বিচ্ছিরি পোস্টারটি নিজের অতিকাঁচা হাতে বানানো। ক্ষমা প্রার্থনীয়।

ইন দ্য মুড ফর লাভ x মনে x নেরুদা)


 

Monday, 16 September 2024

ঠিকানাহীন চিঠি : ১১


 প্রিয়তমা,


আমার অধিকাংশ চিঠির মতোই, এই চিঠিরও কোনো ঠিকানা নেই। কাকে লেখা, তাও কি জানি? জানি হয়তো। তবে ভেবেছিলাম, তোমাকে এই চিঠিটা লিখবো না। কী লাভ বলো? এই চিঠিটা, বা পরের চিঠিগুলো তো কোনোদিনই তোমাকে পাঠাতে পারবো না! পুরো ব্যাপারটাই অকারণ, অহেতুক - ভস্মে ঘি ঢালা। তারমধ্যে কী জানো, তোমাকে কোনোদিন যদি পাঠাতেও পারতাম, তাহলেও উত্তর পেতাম না৷ কিন্তু, সবকিছু কি সত্যিই কার্যকারণ সম্পর্কের দ্বিঘাত সমীকরণ মেনে চলে? সত্যিই কি সবক্ষেত্রে প্রত্যাশা নামক গোমড়ামুখো যুক্তিকে বসানোর কোনো মানে হয়? এতো ভেবেচিন্তে কাজ করতে গেলে তো কবেই রোবটটোবট হয়ে যেতাম। হলে মন্দ হত না যদিও।


এক অদ্ভুত ধূসর সময়ে তুমি এলে। জীবনে বরাবরই দেখেছি, এরকমটাই হয় ঠিক। ক্যানভাস থেকে এক এক করে রং যখন সব মুছে যায়, উপরে বাসা বাঁধতে থাকে ঝুল-মাকড়সার জাল, ঠিক তখনই শিশুর মতো কৌতূহলী, বিস্ময়ভরা মায়াময় চোখ নিয়ে কেউ এসে দাঁড়ায়। কচি-কচি হাত দিয়ে সরিয়ে দেয় ঝুলজালের আস্তরণ৷ অনভ্যস্ত হাতে প্যালেটের উপর মেশানো রংগুলো হাতে মেখে ক্যানভাসের উপর হাতের ছাপ দিয়ে দিয়ে আবার রঙিন করে তোলে।


প্রিয়তমা, এরকমই এক বিবর্ণ জীবনে আচমকাই তুমি এলে। চৌকাঠ পেরিয়ে আসতে অনেকটা সময় লাগল তোমার। তুমি আসলে, আমার ভাঙাচোরা ঘর রোদজোছনায় ভেসে গেল। বুঝলাম, আমার ধ্বংসের খেলা শুরু হল আজ থেকেই। বাঁচার জন্য প্রতিদিন, প্রতি পলে যে মরতে থাকা, সেই মরণের জয়গান গেয়ে তুমি এলে। তুমি এলে, আমার অগোছালো বিছানায় বসলে। অপ্রস্তুত আমিটাকে আরো অপ্রস্তুত করে দিলে। আমি শুধু তাকিয়েই থাকলাম। খুব ভুল করছিলাম কি? হৃদয়ের ভিতরের বিবর্ণ শীতে শরীর-মন কালি হয়ে গেলে পর একমুঠো উষ্ণতার দেখা যদি পায় কেউ, সে কি নিজেকে সেঁকে নেবে না? আমি দেখে নিচ্ছিলাম, প্রাণপণে দেখে নিচ্ছিলাম। চোখ দিয়ে টেনে এনে মনে বসাচ্ছিলাম। শুধু দেখে যে এতো সুখ, সুখের মধ্যে যে এতো অপ্রাপ্তি, পাশে বসে থেকেও যে এতোটা দূর, চাওয়ার মধ্যেও যে এতটা না-পাওয়া - এগুলো লিখে বোঝানোর মতো ভাষাজ্ঞান আমার নেই। আমি শুধু দেখেই যাই। 


তোমার গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়তে থাকে অদৃশ্য কান্না। তুমি হাসছো, আর তোমার চোখে ইলশেগুঁড়ি। টুপটাপ মুক্তো জমা হচ্ছে তোমার কোলে। সবাই দেখতে পাবে না। আমি ভাগ্যবান। অনেক জন্মের পুণ্য করলে পাহাড়ের কোণে লুকিয়ে থাকা সেই ঝর্ণা দেখতে পাওয়া যায়। খুব ইচ্ছে করে, হাত বাড়িয়ে মুছিয়ে দিতে। লেপ্টে যাওয়া কাজলটাকে গুছিয়ে দিতে। কাছে টেনে নিতে। পারি না। একটু সাহস করলে এগিয়ে গেলেই পারতাম হয়তো। পারি না। ছুঁয়ে ফেললে যদি বুদ্বুদের মতো মিলিয়ে যাও? যেটুকু আছে, সেটুকুও যদি হারিয়ে যায়? হারাতে হারাতে আমি ক্লান্ত। খুঁজতেও পারি না আর। ইচ্ছেও করে না। যেটুকু আছে, যেভাবে আছে, থাকুক না হয়। তুমি মিলিয়ে গেলে তো ইজেল থেকে ক্যানভাসটাই খসে পড়ে যাবে। ঘর ভরে যাবে নিঃঝুম অন্ধকারে। 


তোমার ঘুমপাড়ানি কণ্ঠস্বর আমার কানে এসে লাগে। কী মায়া, কী মায়া, কী মায়া মিশে যে ওই গলার তন্ত্রী থেকে কথা বেরোয়, তার তুমি কী বুঝবে? সারেঙ্গি কি নিজের কান্না বোঝে? ভাঙনজ্বর থেকে সারিয়ে তোলে তোমার গলা। আচ্ছা, তুমি বোঝো না, তুমি বাকিদের সঙ্গে কথা বললে আমার কী পরিমাণ রাগ হয়? সর্বরোগহর এই মিরাকিউরলের স্বত্ব কেন থাকবে সবার কাছে? ডিবিয়ার্সের হিরে কি সবার হাতে মানায়?


খুব হিংসে হয় আমার তাদের উপর, যারা তোমাকে দেখতে পায়, শুনতে পায়, ছুঁতে পায়। মনে হয়, তোমাকে ছিনিয়ে এনে লুকিয়ে রেখে দিই। কেউ, কেউ যেন খোঁজ না পায়। কেউ জানতে না পারে। 


পরমুহূর্তেই নিজের অধিকারবোধ সম্পর্কে সচেতন হয়ে পড়ি। ভাঙা ঘরে জোছনার আলোটুকুই মানায়। চাঁদকে এনে ভাঙা ঘরে রাখা সম্ভব না। চাঁদ সবারই, অথচ কারোর নয়। সবার জন্যই চাঁদ হাসে। ওই জোছনা, ওই স্নিগ্ধতায় আমার ততটুকুই অধিকার, ঠিক যতটা আর পাঁচজন রাম-শ্যাম-যদুর। আমরা শুধু দূর থেকে চাঁদের আলোয় মুগ্ধ হতে পারি, কবিতা লিখতে পারি, ভাসিয়ে দিতে পারি চিঠির স্নিগ্ধশ্রীর অঞ্জলি। দূরত্বটা সেই থেকেই যায়। থেকেই যাবে। একসময়ে তাকিয়ে দেখব, বিছানাটা খালি। শুধু তোমার বসার জায়গাটা সামান্য উষ্ণ হয়ে আছে।


বহুদিন কারোর জন্য প্রার্থনা করিনি, জানো। কাউকে নিজের করে পাওয়ার আকুতিতে সঁপে দিইনি কোনোদিন। জানি মিথ্যে, জানি অলীক, কিন্তু ছায়াও কি সত্যি নয়? 


আসতে পারো যদি, চৌকাঠ ডিঙিয়ে এসো কোনোদিন। জ্যোৎস্নাময়ী, তোমার চাঁদের আলোয় অবসান ঘটুক আমার পার্থিব সকল সুখ-দুঃখের।



যে ভালোবাসা তলহীন, যে আবেগ ভাষাহীন, যে আকুতি কামনাহীন, যে স্পর্শ কায়াহীন, সেই ভালোবাসাটুকু নিও। 


‘আমার অশেষ আর্তি তার সুখকে যেন কখনো বিঘ্নিত না করে।’’


ইতি, 

তোমারই…

Monday, 9 September 2024

এলোমেলো...

 সারাদিনের হইহুল্লোড় থেমে গেলে পর মনের মধ্যে একটা ক্লান্ত সন্ধ্যা নামে। এক সীমন্তিনী চুল এলিয়ে তুলসীতলায় মঙ্গলকামনার্থে বাতি দেয়, ধূপ দেখায়। অনেকটা দীর্ঘ উঠোন পেরিয়ে আসে সে। আলো-আঁধারির উঠোন। কে যেন এক এক করে ঘরের সমস্ত আলো নিভিয়ে দেয়। চারপাশটা নিশ্চুপ, নিস্তব্ধ হয়ে যায়। অন্ধকার। নিঃঝুম, বুকঝিম এক অন্ধকার।


অন্ধকারে চৌকাঠে হোঁচট লাগে। আলোর সুইচগুলো কোথায়, খুঁজে পাওয়া যায় না। হাতড়ে দেখলে হয়তো পাওয়া যাবে, কিন্তু হয়ে ওঠে না আর। সবসময়ে হাতড়ে দেখতে ইচ্ছেও করে না। হাতের নাগালেও কিছু থাকা উচিত, আলতো আদরে হাত বাড়ালেই যা পাওয়া সম্ভব। কোনোমতে হোঁচট খেতে খেতে ঘরে এসে বসা হয়। খাট, না সোফা? খাটই হয়তো। যায়-আসে না আর। কিছু একটা হবে। না হলেও হবে। পা তুলে কোনোমতে পিঠটা ঠেকাতে পারলেই হল। তারপর অপেক্ষা, অপেক্ষা। 


কিছু কিছু অন্ধকারে দেখতে পাওয়া যায় না। সেইসব অন্ধকার এতটাই নিকষ, যে চোখ সয়ে ওঠে না। চোখের ভিতরের রড সেলগুলো নিজেদের অস্তিত্বের ক্রাইসিসে গুমরে মরতে থাকে, ল্যাক্রিমাল গ্রন্থিগুলোকে চেপেচুপে ভাসাতে থাকে - যেগুলোকে হঠাৎই কান্না বলে ভ্রম হয়। সেইসব অন্ধকারে, সেইসব কালোডাকা অবসন্ন সন্ধ্যায় ঘুম আসতে চায় না। সমস্ত আলো নিভে যাওয়ার পরে চুপ করে জেগে থাকে কারা যেন। সেইসব জোনাকিমোছা অন্ধকারে জেগে থাকতে ইচ্ছে করে না। কিন্তু কবেই বা ইচ্ছে অনুযায়ী কাজ হয়? 


আস্তে আস্তে মনের ভিতরে সন্ধে গড়াতে থাকে, রাত বাড়ে। ক্লান্তি বাড়ে। চরাচরের শেষ ঝিঁঝিঁর ডাকটুকুও মুছে যাওয়া এক অবসন্ন নিস্তব্ধতা বাড়ে। যে অনস্তিত্বের শূন্যতার উপহার নিয়ে জলের ফোঁটার ন্যায় সান্দ্রযাপন চলতে থাকে গড়িয়ে গড়িয়ে, সেই ভ্যাকুয়াম ভরাট করবার জন্য জোর করে কিছু না কিছু গোঁজবার চেষ্টা চলতে থাকে। প্রকৃতি নাকি শূন্যস্থান রাখে না কোনো, এমনটা বলা হয়ে থাকে। কিন্তু, ব্যতিক্রমী কিছু শূন্যস্থান থেকেই যায়, যা হয়তো অতিপ্রাকৃত। এরকম অজস্র শূন্যতা দিয়ে তৈরি শতছিন্ন এক মনকেমনের চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়তে ইচ্ছে করে। কিন্তু সেই ফুটোফাটলের মধ্যে দিয়ে হাওয়া ঢুকতে থাকে। শীত করে, বড্ড শীত করে...


মনের মধ্যে রাত গভীর হয়। শেষ শিয়ালটা ডেকে চুপ করে গেছে অনেকক্ষণ। ঘড়ির কাঁটা টিকটিক করছে হয়তো। বা করছে না। ঘড়িটা কোনদিকে, বোঝা যায় না। দেখাও যায় না এই অন্ধকারে কিচ্ছুটি। কারা যেন নিয়ম করে এসে আলোগুলোও ঠিক নিভিয়ে দিয়ে যায়। দেখাশোনার ওপারের যে ছুঁতে না পারার বুদ্বুদসত্য, সেখানে কোন মন্ত্রবলে যেন এক মুহূর্তেই টেলিপোর্টেশন হয়ে যায়। অলীক, অবাস্তব, তবুও তা রয়েছে। না থাকাও আসলে একটা থাকা। সমস্তটাই দৃষ্টিভঙ্গি আসলে, পয়েন্ট অফ রেফারেন্স। এসব ভাবতে ভাবতে মনের ভিতরে রাত নামতে থাকে, আরো নামতে থাকে, আরো নামতে থাকে। ভোর হয় না তার আর। ভোর এসে পৌঁছোয় না। ক্লান্তিতে চোখ বুজে আসে, তবু ঘুম আসে না। আসতে চায় না।


শুধু খাটের উপর, বা সোফা - শুয়ে থাকা হয়। ঘড়িটা আছে, নাকি নেই - সেটাও বোঝা হয় না। আর শতচ্ছিন্ন চাদরটার ফাঁকফোকর দিয়ে একপশলা ঠাণ্ডা হাওয়া ছুঁয়ে যায়। শীত করতে থাকে, ভীষণ কনকনে শীত....


Wednesday, 4 September 2024

পুলিশ না মানুষ?

বিগত বেশ কিছুদিন ধরে এই আরজিকর কাণ্ডকে কেন্দ্র করে একটা অদ্ভুত বাইনারি ন্যারেটিভ সমাজমাধ্যমে, তথা সমাজমানসে চলছে। বাইনারিটা একটা খুব অদ্ভুত পেশানির্ভর ক্লাসভিত্তিক আর ডিক্লাসডের বাইনারি - পুলিশ বনাম মানুষ। এই শব্দবন্ধটায় অনেকের আপত্তি থাকতেই পারে, আছেও - হয়তো কিছুটা সঙ্গত কারণেই। তবে, এইধরনের শব্দচয়নকে এড়িয়ে থাকার ব্যাপারটা হতে পারে না।


হিস্টোরিকালি, সবরকম বামপন্থা(কমিউনিজমের বাইরেও বামপন্থা এক্সিস্ট করে, মাইরি বলছি) বিশ্বাস করে এসেছে, রাষ্ট্রযন্ত্র মূলত নিপীড়ক। ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের রাজনীতি তাই বরাবর কোনো বিশেষ ব্যক্তি, মুষ্টিমেয় ব্যক্তিবর্গ বা নির্দিষ্ট শ্রেণির হাতে ক্ষমতা যাওয়ার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে এসেছে। তত্ত্বের কথা ছেড়ে মোদ্দায় বললে, রাষ্ট্রের স্বার্থ আলাদা, সাধারণ মানুষের আলাদা। রাষ্ট্র ম্যাক্রোস্কেলে দেখে, সাধারণ মানুষ মাইক্রোস্কেলে। ফলে, রাষ্ট্রের সঙ্গে সাধারণ মানুষের বিরোধ থাকবেই।


এই বিরোধ-বিভাজন স্পষ্টতর হয় যখন কোনো কোনো সঙ্কটের মুহূর্ত উপস্থিত হয়। অন্যান্য সময়ে যে বিরোধের ধারা অন্তঃসলিলা ফল্গুর মতো অদৃশ্যভাবে বয়ে চলে, সঙ্কটকালে সেই বিরোধের ধারাই নগ্নভাবে প্রকাশিত হয়। দেখা যায়, সঙ্কটকে ঘিরে কীভাবে রাষ্ট্র এবং সাধারণ মানুষের দাবিদাওয়াগুলো আলাদা হয়ে যাচ্ছে, স্বার্থসংঘাত ঘটছে৷ এই ডায়ালেক্টিকাল কনফ্লিক্টে সাধারণ মানুষের অস্ত্র কালেক্টিভ কনশাসনেস বা গোষ্ঠিক চেতনা, ক্লাস ইন্টারেস্ট বা শ্রেণিস্বার্থ এবং সঙ্ঘবদ্ধতা। আর রাষ্ট্রের হাতে? আইন, প্রশাসন, পুলিশ। স্টেট মেশিনারি বনাম সাধারণ মানুষের যুদ্ধটা ফলে বরাবরই অসম। 


এই অসম যুদ্ধের কিছু ঐতিহাসিক মোড় ঘোরানো ন্যারেটিভ রচনা হয়েছিল ১৭৮৯-এর ফরাসি বিপ্লবে, ১৯১৭-এর নভেম্বর বিপ্লবে। কিন্তু, বর্তমান পরিস্থিতি তার থেকে সম্পূর্ণই আলাদা। কেন? আক্ষরিক অর্থে যেটাকে লিবারাল ডেমোক্রেসি বলা হয়, সেই উদারনৈতিক গণতন্ত্রের বিকাশ ঘটতে তখনো অনেক দেরি। বাকস্বাধীনতার বিরুদ্ধে যাঁরা এখন বলেন, তাঁরা আশা করি এটা অন্তত স্বীকার করবেন, সেইসব সময়ে বাকস্বাধীনতার অবস্থা কী ছিলো। সেই নিরিখে বর্তমানে অনেকটাই আছে। সম্পূর্ণ বাকস্বাধীনতা হতে পারে কি না, তাই নিয়ে অবশ্যই প্রয়োজনীয় প্রতর্কের পরিসর রয়েছে। সেসব দূরে ঠেলে রেখে বলা যায়, যোগাযোগ মাধ্যমের সঙ্গে বাকস্বাধীনতার এক সমানুপাতিক সম্পর্ক বর্তমান। মানুষের প্রকাশের অ্যাভিনিউ যত খুলে যাবে, যত বিবিধ প্রকাশমাধ্যমের মধ্যে দিয়ে মানুষ নিজেকে মেলে ধরতে পারবে, ততই বাকস্বাধীনতা, মতপ্রকাশের বিভিন্নতা বাড়বে।


এই বিভিন্নতার কারণেই বর্তমানে মানুষ প্রশাসনের বিরুদ্ধে অনেক বেশি সরব হতে পারে, সচেতনভাবেই। ১৭৮৯-তে শতকরা যত সংখ্যক মানুষ 'ষোড়শ লুইয়ের গলা, যাবে গিলোটিনের তলা' মর্মে স্লোগান দিতো, তার থেকে শতকরা বেশিসংখ্যক মানুষ দিদি-মোদিকে সমালোচনার খাঁড়ার তলায় ফেলেন। 


এই সরবতার বাইপ্রোডাক্ট হিসেবেই বেরিয়ে আসে 'পুলিশ বনাম মানুষ' - এর বাইনারি বিভাজনের আখ্যান। পুলিশ মানে খারাপ, কারণ তারা অত্যাচার করে। সাধারণ মানুষকে মারে, লাঠি চালায়, জলকামান ছোঁড়ে, কাঁদানে গ্যাস ছোঁড়ে। সরকারের নির্দেশে গুলিও চালায়, হতাহত হয় সাধারণ মানুষ। 


অথচ, এরই বিপ্রতীপে দাঁড়িয়ে থাকে দেশের সেনাবাহিনীর অবদান নিয়ে এক দক্ষিণপন্থী দেশাত্মবোধক রাজনৈতিক চেতনার আখ্যান। নিঃসন্দেহে, যেকোনো মৃত্যুই দুঃখজনক, বিশেষ করে ইন-সার্ভিস মৃত্যু। অথচ, সেনাবাহিনীর কোনো সদস্য মৃত্যুবরণ করলে যে রোমান্টিসিজম হয়, পুলিশবাহিনীর কেউ করলে ততটা হয় না - এক যদি না তার পিছনে কোনোভাবে সন্ত্রাসবাদ আটকানো,কাউন্টার-ইনফিল্ট্রেশন জড়িয়ে থাকে। যে কারণে, ২৬/১১-তে মৃত পুলিশকর্মীরা এখনো বীরের সম্মান পান, অথচ কোনো স্থানীয় এনকাউন্টারে মৃত পুলিশকর্মীর স্মৃতি মুছে যায় মানুষের কালেক্টিভ স্মৃতি থেকে।


যাইহোক। এসব বিতর্কিত বিষয়। 


বস্তুত, আমরা যেটা ভুলে যাই, সেটা হল সমস্ত আক্রমণ মূলত আসে একটা সিস্টেমের স্ট্রাকচারকে লক্ষ্য করে। আর, যেকোনো কাঠামোই নিজেদের কাঠামোত্ব বজায় রাখতে ব্যক্তিসত্তাকে মেরে ফেলে, তুলে ধরে গোষ্ঠিক পরিচয়কে। একই ছাঁচে না ফেলতে পারলে সিস্টেমচক্র মসৃণভাবে গড়গড়িয়ে চলতে পারবে না।


আর, আক্রমণের লক্ষ্যবিন্দু হয় এই সিস্টেমই। যখন আমরা বলি, ‘পুলিশ অত্যাচারী’, বা ‘পুলিশ নিরস্ত্রদের মারছে’, বা ‘পুলিশ গুলি চালিয়েছে’, সেটা কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট কনস্টেবল, এএসআই, এসআই, ডিএসপি, ডিসিপি, জয়েন্ট সিপি ইত্যাদিদের লক্ষ্য করে নয়। হ্যাঁ, কিছু ক্ষেত্রে অবশ্যই হয় - নকশাল আন্দোলন দমনে রুনু গুহনিয়োগীর ভূমিকা যেমন। ওই সময়ে রুনু নিজেই হয়ে উঠেছিলেন স্বয়ংসম্পূর্ণ এক সিস্টেম, অত্যাচারী এক তন্ত্রের প্রতিভূস্বরূপ। সেরকম ব্যতিক্রম ছেড়ে দিই যদি, তাহলে কি কেউ বলতে পারবেন - পুলিশকর্মী বা অন্য কেউ - কোনো বিশেষ কর্মসূচিতে পুলিশি নিপীড়নের বিরুদ্ধে সমালোচনা যখন হয়, সেটা কি কারোর নাম করে হয়? এমনটা কি বলা হয়, ‘এসআই কখগ সরকারের দালাল, নিরস্ত্র জনতার উপরে অত্যাচার চালিয়েছে’? না। বা, পুলিশকে কি নির্দেশ দেওয়া হয়, ‘আন্দোলনকারী চছজ (নীল গেঞ্জি)র উপরে গুলি/লাঠি/জলকামান চালাও’? সেটাও না, আশা করি!


লড়াইটা পুলিশ বনাম মানুষের নয়। লড়াইটা মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনী শক্তির সঙ্গে একটা প্রশাসনিক প্রত্যঙ্গের। সেখানে ইন্ডিভিজুয়াল মানুষ বা পুলিশ, কেউই দায়ী নন। তাঁদের ব্যক্তিগত ভূমিকাও এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ নয়। যে যাঁর ডিউটি পালন করছেন কেবল। অনেকেই বলতে পারেন, সাধারণ নিরস্ত্র মানুষের উপর লাঠি চালানো কি ডিউটির মধ্যে পড়ে? এখানে প্রশ্নটা ‘ডিউটি’ ঠিক কী, তার উপরেও নির্ভর করছে। বা, ডিউটি কার? পুলিশব্যবস্থা যে আসলে রাষ্ট্রযন্ত্রেরই একটা অংশ, সেটা বিস্মৃত হয়ে যাওয়াটা মূঢ়তা। আর, এই রাষ্ট্র-জনতার সংঘাতের এই চিরকালীন ডায়ালেক্টিক্সে বরাবর মুখ্য হয়ে এসেছে ব্রুট ফোর্স। প্রথম চার্লসকে হত্যা করেই ক্ষমতায় এসেছিলেন অলিভার ক্রমওয়েল। আবার, ক্রমওয়েল স্বৈরাচারী হয়ে যাওয়ায় তাঁকেই ফের হত্যা করা হয়। ষোড়শ লুইকে ফেলা হয়েছিল গিলোটিনের তলায়। আবার, ভাগ্যেরই ফেরে, গিলোটিনের তলাতেই যেতে হয়েছিল দাঁতন-রোবসপিয়েরকেও। ব্রুট ফোর্স কখন কার কতটা বেশি, কতটা ইমপ্যাক্টফুল - তার উপরেই নির্ভর করে, কে টিকে থাকবে। সৃষ্টির গোড়ার থেকেই, যেকোনো কিছুর এগিয়ে যাওয়ার জন্য যে শক্তির দরকার - বের্গসঁ যাকে ‘এলঁ ভিতাল’, বা ভাইটাল ফোর্স অফ লাইফ আখ্যা দিয়েছেন, এক প্রয়োজনীয় জৈবী শক্তি - সেই জৈবী শক্তিরই এক রূপান্তরিত রূপ হল এই ব্রুট ফোর্স। যেকোনো ডায়ালেক্টিক কনফ্লিক্টের একটা চালিকাশক্তির ফলেই সমস্তকিছু এগিয়ে চলে, সমাজব্যবস্থার বিবর্তন হয় - সেই চালিকাশক্তি হলো ব্রুট ফোর্স - আদিমতম শক্তি। 


ফলে, এখানে ব্যাপারটা কোনোদিনই মানুষ বনাম পুলিশ নয়। ‘উর্দির নিচেও তো আছে মানুষ’ নয়। একটা পুলিশ, দুটো পুলিশ, আন্দোলনরত একটা কি দুটো মানুষ - এরা সিনে থাকে না। ম্যাক্রো আর মাইক্রোকে গুলিয়ে দেখবেন না, অনুরোধ। দুটো আলাদা পক্ষকে কীভাবে আলাদা আলাদা চশমা, সেটাও নিজের ইচ্ছেমতো - কীভাবে দেখা যায়? 


আবারও, এখানে পুলিশ একটা সিস্টেম। বা, বলা ভালো, একটা লার্জার সিস্টেমের একটা প্রয়োজনীয় সাবসেট। ‘এই পুলিশই রাত জাগে বলে আপনি বেরোতে পারেন’, এটাও যেমন ভুল, ‘পুলিশ মাত্রেই ঘুষখোর’-টাও ভুল। সিস্টেমাবয়ব কোনোদিনই ইন্ডিভিজুয়াল-নির্ভর নয়। ঠিক যেমন হাতের পাঁচটা আঙুল (হ্রত্বিকোচিত হলে ছয়) পাকিয়ে ঘুষি মারলে বোঝা যায় না, তার মধ্যে অপমানজনক মধ্যমা, দুর্বল কনিষ্ঠা, আলাদা থাকা বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ রয়েছে, ঠিক তেমনই সিস্টেমের পদক্ষেপের বিরুদ্ধে সমালোচনাটাও সিস্টেমেরই। এতে কেউ ব্যক্তিআক্রমণ করলে, বা সিস্টেমের সমালোচনাকে নিজের গায়ে টেনে ‘আমি পুলিশ, আমাকে সবাই আনফ্রেন্ড করুন’ মর্মে শাহাদাৎ দাবি করতে চাইলে সেটা সচেতনতার অভাব ব্যতীত আর কিছুই নয়। দু’পক্ষেরই বোঝার সময় এসেছে, আসল বেলিগারেন্টস মূলত কারা। 


প্রসঙ্গত, ‘পুরুষরা ধর্ষক’ স্টেটমেন্টটাও পুরুষতান্ত্রিক সিস্টেম এবং তার নিয়ন্তাদের বিরুদ্ধে। যেসব স্বল্পবুদ্ধিসম্পন্নরা ‘নট অল মেন’ মর্মে প্রতিবাদের ভাষ্য রচতে যায়, তাঁদেরও বোঝা উচিত, সিস্টেম এবং ইন্ডিভিজুয়াল এক না। সিস্টেমের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ উঠলে যদি কেউ ‘না, আমি তো কলা ধরেও দেখিনি’ মর্মে ছলাকলা দেখাতে আসেন, সেটাও তাঁদের সচেতনতার অভাব, বোধের রিক্ততা। এইটুকুই।


আবারও, সিস্টেমের ম্যাক্রোতে সংকীর্ণ মাইক্রো ঢুকিয়ে দেবেন না, বা জুমড-ইন মাইক্রোযাপনকে মাপতে যাবেন না ম্যাক্রোর গরুড়াবলোকন দিয়ে। অনুরোধ!

Sunday, 1 September 2024

খোলা চিঠি, ঋতুপর্ণ-কে


ঋতুদা,

প্রথমেই জানাই, শুভ জন্মদিনের অ-গুনতি শুভেচ্ছা। আচ্ছা, দাদা বলে সম্বোধন করায় কিছু মনে করছ না তো? তোমাকে হয়তো 'দাদা' বলাটা উচিত না। আমার থেকে তুমি বয়সে অন্তত অনেকই বড়ো। যদিও তুমি চিরতরুণ, একটা স্থায়ী বিন্দুতে এসে তোমার বয়েস থমকে থেমে গেছে - জরা নামক সর্বগ্রাসী দৈত্য তোমাকে আর ছুঁতেও পারবে না কোনোদিন। তবুও, তুমি আজ যদি থাকতে, তাহলে বয়স নামক বিচ্ছিরি এক সামাজিক নির্মাণের মাপকাঠি, যা সহজেই মুড়িমিছরিকে একই দামে বেচে দেয়, তার নিরিখেই আরকী, তুমি আমার থেকে অনেকটাই বড়ো হতে। তবুও, ঋতুদা, আন্তরিকতার দিক থেকে দাদা ব্যতীত আর কী বলেই বা ডাকতাম, বলো?


ঋতুদা, আর পাঁচটা অসংবেদনশীল বাঙালির মতো, ছোটো থেকেই জেনেছি, ঋতুপর্ণ ঘোষ সিনেমা বানান, সংবাদপত্রটত্রের সঙ্গে যুক্ত, আর — মেয়েলি। ব্যাস, শেষ। মানুষটা কী, কেমন সব কাজটাজ করেন, কিচ্ছু না। মেয়েলি৷ চেনা ছকের বাইরে, চেনা কাঠামোর জিগস পাজলে আটকাচ্ছে না - অতএব, হ্যাটা৷ আর ততোধিক কৌতূহল। ও কি সমকামী? হিজড়ে? বাবা, কী বিচ্ছিরি না? চিকিৎসা হয় না? নাকি নাকি গলায় তোমার মিমিক্রি বানিয়ে ফেললাম আমরা৷ হাহাহাহাহা, কী হাসি। টিআরপি উপচে পড়ছে, উপচে পড়ছে আমাদের ভসভসিয়ে সোডার গ্লাসের মতো উচ্ছ্বাস, উপচে পড়ছে চরম দৈন্যদশা। এবাবা, ব্যাটাছেলেটা গড়িয়াহাটে গিয়ে দুল কেনে? কানে দুল পরে, পরে হাতে চুড়ি, চোখে কাজল-লাইনার, হাতে নেলপালিশ? ছ্যা ছ্যা। ভাগ্যিস আমাদের ঘরে এরকম হয়নি!


ভাগ্যিস হয়নি ঋতুদা। ভাগ্যিস। কেউ চলে গেলে আমরা তখন এমন বিচ্ছিরিভাবে হেদিয়ে পড়ি, দেখে হাসিও পায়। তুমি অন্যধারার সিনেমা বানাও, কিছু সিনেমা খুব ঘরোয়া, মেয়েদের কথা মেয়েদের মাথায় রেখে তুলে ধরেছো.. ব্যাস। শেষ। তোমার লেখা, তোমার কথা, তোমার চিন্তা, তোমার প্রজ্ঞা - তার কতটুকু তল পাওয়ার চেষ্টা আমরা করেছি? 


অথচ মজা দেখো ঋতুদা, তোমাকে নিয়ে এখন কী বিচ্ছিরি বাড়াবাড়িটাই না হয়! লিঙ্গসচেতনতার হদ্দমুদ্দ ঘটিয়ে সবাই এখন তোমাকে মাথায় তুলে নাচে। তোমার কাজের ভিতরের সূক্ষ্মতা তুলে ধরে, ন্যারেটিভ খোঁজে, কাটাছেঁড়া চলে তোমার কাজের। আগে চলতো তোমার চরিত্রের, তোমার অস্তিত্বের - এখন তোমার সিনেমার। ফার্স্ট পার্সন নিয়ে বাঙালির কী আবেগ, আহাবাহা! মজাই লাগে বেশ, জানো তো? আমাদের মতো হিপোক্রিট, মাইরি, একটাও হয় না। তোমাকে সারা জীবন কর্নার করে গেলাম, আদারাইজ করে গেলাম, হেটেরোনর্মেটিভ বাইনারির চেনা ছকের বাইরে পড়ো বলে তোমাকে ধর্তব্যের মধ্যেই ধরলাম না - আর সেই তুমি-টাকেই আমরা এখন পূজ্যপাদ করে তুলেছি। লজ্জাও নেই আমাদের! 


স্বীকার করতে দোষ নেই ঋতুদা, আমি নিজেও এককালে এরকমই ছিলাম। তুমি যখন চলে গেলে এক্কেবারে, তখন আমি সবে ক্লাস টেন। অত বোধ, চেতনা তৈরি হয়নি তখনো। এখনো কি সত্যিই চেতনা এসেছে? কে জানে। তবুও, সেনসিটাইজেশনের মাইক্রোফাইবার কাপড় দিয়ে যেদিন ঘোলাটে চশমাটা মুছতে শিখলাম, তবে থেকেই তোমার সঙ্গে একটা একপাক্ষিক বন্ধুত্ব গড়ে উঠলো। খুব আপশোষ হতে থাকলো - কেন তোমার সঙ্গে আলাপের সু্যোগ হল না? তুমি কাউচে বসে আছো, আমি মেঝেতে বসে কাউচের গায়ে মাথা হেলিয়ে বসে তোমার বকবক শুনছি। তোমার কথা শোনার, তোমার উন্নত ভাবনাচিন্তার, তোমার উদার মনের শরিক হওয়ার সুযোগ এই যে হলো না, ঋতুদা - এই দুঃখ আমার কোনোদিন ঘুচবে না।


লিঙ্গসচেতনতার পাশাপাশি, তোমার প্রতিটা লেখা, প্রতিটা সিনেমা, কথা, হাসি, সব - সবকিছুর থেকে একটা জিনিস বের করে আনা যায়। যদিও, সবাই পারবে না সেটা। তোমার সামগ্রিক অস্তিত্ব আসলে একাকীত্বের উদযাপন। এই একাকীত্ব কখনো স্বেচ্ছাবসরের, কখনো উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, কখনো বা পরিস্থিতিজনিত। কিন্তু, সেই একাকীত্বকে তুমি এমনভাবে তুলে ধরেছো, যা কেউ করে না। তোমার সিনেমার প্রতিটা চরিত্রই কীভাবে নিজের মতো করে একা, ঋতুদা? কীভাবে সুখী দম্পতির মধ্যেও অভিমানের একাকীত্বের একটা দেওয়াল থাকে, প্রবল প্রেমেও মিশে থাকে নিঃসঙ্গতার নোনাজলের টুপটাপ, বন্ধুত্বেও থাকে দূরত্বের বোবা অভিযোগ, ভালোবাসা পাওয়ার হাহাকার? 


কীভাবে তুমি বুঝে ফেললে বলো তো ঋতুদা, এক মেট্রো লোকের মধ্যে যেতে যেতেও অদ্ভুত একাকীত্বের ধূসরতা ঘিরে ধরে? অফিসে বসে কেজো লেখা লিখতে লিখতে একটা মনখারাপের আদুরে বেড়াল কোলে এসে শুয়ে পড়ে? বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডার মাঝে বসে চোখে জল চলে আসে, অভিমানে দ্রব হয়ে যায় কণ্ঠ? আমার সঙ্গে কোনোদিন একটা কথা না বুঝেও, কীভাবে আমার দুঃখগুলো, আমার নিঃসঙ্গতাগুলো তোমার হলো, ঋতুদা? তোমার সমস্ত জার্নালে, ফিচারে, স্ক্রিপ্টে, দৃশ্যায়নে সেই একাকীত্ব কীভাবে ফুটে উঠলো? কীভাবে তুমি জানলে, খুব আনন্দের খবর জানানোর জন্য ফোন হাতড়ে দরকারি নাম্বারটা খুঁজে পাওয়া যায় না - তখন হয় সেই আনন্দটা গিলে ফেলতে হয়, নয়তো যাকে খুশি একটা ফোন করে ঝেড়ে ফেলতে হয় ও পরে সেই ছদ্মদেখনদারির অপরাধবোধে ভুগতে হয়? এতোটা উঁকি মারাও কি ঠিক?


আসলে, আমাদের এক করে দেয় নিঃসঙ্গতা। যে নিঃসঙ্গতার অপার অভিমান আমাদের স্তব্ধ করে দেয়, যে চিঠিগুলোর উত্তর আসে না কোনোদিন, যে তলটা ছুঁয়ে ফেলার মতো ডুবুরি হয়ে ওঠা শেষমেশ সম্ভব হয় না, যে অপ্রত্যাশিত আঘাতের অভিঘাতটুকু সামলে ওঠার মতো শক্ত ভিত থাকে না, ঘা কমানোর যে সর্বরোগহরা মিরাকিউরল-মলমটা হাতড়ে হাতড়েও খুঁজে পাওয়া যায়না - সেই সবকিছুই আমাদের কোথাও গিয়ে এক করে দেয়।

আমরা যারা একা, আমরা যারা নিঃসঙ্গ, যাদের উদাস দুপুরে কুবো পাখি ডেকে যায় ঘ্যানঘ্যান করে - আমাদের সবার একাকী যাপনে তুমি আছো, ভীষণ করে আছো।

পরপার বলে যদি কিছু থাকে আদৌ, জমিয়ে আড্ডা হবে ঋতুদা। প্লিজ, তখন অন্তত ছেড়ে যেও না। দুই একাবোকা যেন পিঠে পিঠ ঠেকিয়ে মনেরপ্রাণের অনেক গল্প করতে পারি, বা চুপ করেই নিছক বসে থাকতে পারি। 


ভালো থেকো, ঋতুরাজ। আমার নিঃসঙ্গ সম্রাট। আমার একলা রাজা। তোমার জন্মদিন আর আগাম বিশ্ব পত্র দিবস উপলক্ষ্যেই এই খোলা চিঠিটা রইলো। 


ইতি,

তোমার না-চেনা এক বহুদূরের সমমনস্ক সুহৃদ,

অর্চিষ্মান

'ঠাকুরমার ঝুলি'

 আজকে আমার ঠাকুমার মৃত্যুবার্ষিকী। ২০২১ সালের এই দিনেই তিনি গত হয়েছিলেন। এইটুকু পড়েই অনেকে হয়তো, 'ওঁ শান্তি, আত্মার শান্তি কামনা করি, তি...