Wednesday, 4 September 2024

পুলিশ না মানুষ?

বিগত বেশ কিছুদিন ধরে এই আরজিকর কাণ্ডকে কেন্দ্র করে একটা অদ্ভুত বাইনারি ন্যারেটিভ সমাজমাধ্যমে, তথা সমাজমানসে চলছে। বাইনারিটা একটা খুব অদ্ভুত পেশানির্ভর ক্লাসভিত্তিক আর ডিক্লাসডের বাইনারি - পুলিশ বনাম মানুষ। এই শব্দবন্ধটায় অনেকের আপত্তি থাকতেই পারে, আছেও - হয়তো কিছুটা সঙ্গত কারণেই। তবে, এইধরনের শব্দচয়নকে এড়িয়ে থাকার ব্যাপারটা হতে পারে না।


হিস্টোরিকালি, সবরকম বামপন্থা(কমিউনিজমের বাইরেও বামপন্থা এক্সিস্ট করে, মাইরি বলছি) বিশ্বাস করে এসেছে, রাষ্ট্রযন্ত্র মূলত নিপীড়ক। ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের রাজনীতি তাই বরাবর কোনো বিশেষ ব্যক্তি, মুষ্টিমেয় ব্যক্তিবর্গ বা নির্দিষ্ট শ্রেণির হাতে ক্ষমতা যাওয়ার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে এসেছে। তত্ত্বের কথা ছেড়ে মোদ্দায় বললে, রাষ্ট্রের স্বার্থ আলাদা, সাধারণ মানুষের আলাদা। রাষ্ট্র ম্যাক্রোস্কেলে দেখে, সাধারণ মানুষ মাইক্রোস্কেলে। ফলে, রাষ্ট্রের সঙ্গে সাধারণ মানুষের বিরোধ থাকবেই।


এই বিরোধ-বিভাজন স্পষ্টতর হয় যখন কোনো কোনো সঙ্কটের মুহূর্ত উপস্থিত হয়। অন্যান্য সময়ে যে বিরোধের ধারা অন্তঃসলিলা ফল্গুর মতো অদৃশ্যভাবে বয়ে চলে, সঙ্কটকালে সেই বিরোধের ধারাই নগ্নভাবে প্রকাশিত হয়। দেখা যায়, সঙ্কটকে ঘিরে কীভাবে রাষ্ট্র এবং সাধারণ মানুষের দাবিদাওয়াগুলো আলাদা হয়ে যাচ্ছে, স্বার্থসংঘাত ঘটছে৷ এই ডায়ালেক্টিকাল কনফ্লিক্টে সাধারণ মানুষের অস্ত্র কালেক্টিভ কনশাসনেস বা গোষ্ঠিক চেতনা, ক্লাস ইন্টারেস্ট বা শ্রেণিস্বার্থ এবং সঙ্ঘবদ্ধতা। আর রাষ্ট্রের হাতে? আইন, প্রশাসন, পুলিশ। স্টেট মেশিনারি বনাম সাধারণ মানুষের যুদ্ধটা ফলে বরাবরই অসম। 


এই অসম যুদ্ধের কিছু ঐতিহাসিক মোড় ঘোরানো ন্যারেটিভ রচনা হয়েছিল ১৭৮৯-এর ফরাসি বিপ্লবে, ১৯১৭-এর নভেম্বর বিপ্লবে। কিন্তু, বর্তমান পরিস্থিতি তার থেকে সম্পূর্ণই আলাদা। কেন? আক্ষরিক অর্থে যেটাকে লিবারাল ডেমোক্রেসি বলা হয়, সেই উদারনৈতিক গণতন্ত্রের বিকাশ ঘটতে তখনো অনেক দেরি। বাকস্বাধীনতার বিরুদ্ধে যাঁরা এখন বলেন, তাঁরা আশা করি এটা অন্তত স্বীকার করবেন, সেইসব সময়ে বাকস্বাধীনতার অবস্থা কী ছিলো। সেই নিরিখে বর্তমানে অনেকটাই আছে। সম্পূর্ণ বাকস্বাধীনতা হতে পারে কি না, তাই নিয়ে অবশ্যই প্রয়োজনীয় প্রতর্কের পরিসর রয়েছে। সেসব দূরে ঠেলে রেখে বলা যায়, যোগাযোগ মাধ্যমের সঙ্গে বাকস্বাধীনতার এক সমানুপাতিক সম্পর্ক বর্তমান। মানুষের প্রকাশের অ্যাভিনিউ যত খুলে যাবে, যত বিবিধ প্রকাশমাধ্যমের মধ্যে দিয়ে মানুষ নিজেকে মেলে ধরতে পারবে, ততই বাকস্বাধীনতা, মতপ্রকাশের বিভিন্নতা বাড়বে।


এই বিভিন্নতার কারণেই বর্তমানে মানুষ প্রশাসনের বিরুদ্ধে অনেক বেশি সরব হতে পারে, সচেতনভাবেই। ১৭৮৯-তে শতকরা যত সংখ্যক মানুষ 'ষোড়শ লুইয়ের গলা, যাবে গিলোটিনের তলা' মর্মে স্লোগান দিতো, তার থেকে শতকরা বেশিসংখ্যক মানুষ দিদি-মোদিকে সমালোচনার খাঁড়ার তলায় ফেলেন। 


এই সরবতার বাইপ্রোডাক্ট হিসেবেই বেরিয়ে আসে 'পুলিশ বনাম মানুষ' - এর বাইনারি বিভাজনের আখ্যান। পুলিশ মানে খারাপ, কারণ তারা অত্যাচার করে। সাধারণ মানুষকে মারে, লাঠি চালায়, জলকামান ছোঁড়ে, কাঁদানে গ্যাস ছোঁড়ে। সরকারের নির্দেশে গুলিও চালায়, হতাহত হয় সাধারণ মানুষ। 


অথচ, এরই বিপ্রতীপে দাঁড়িয়ে থাকে দেশের সেনাবাহিনীর অবদান নিয়ে এক দক্ষিণপন্থী দেশাত্মবোধক রাজনৈতিক চেতনার আখ্যান। নিঃসন্দেহে, যেকোনো মৃত্যুই দুঃখজনক, বিশেষ করে ইন-সার্ভিস মৃত্যু। অথচ, সেনাবাহিনীর কোনো সদস্য মৃত্যুবরণ করলে যে রোমান্টিসিজম হয়, পুলিশবাহিনীর কেউ করলে ততটা হয় না - এক যদি না তার পিছনে কোনোভাবে সন্ত্রাসবাদ আটকানো,কাউন্টার-ইনফিল্ট্রেশন জড়িয়ে থাকে। যে কারণে, ২৬/১১-তে মৃত পুলিশকর্মীরা এখনো বীরের সম্মান পান, অথচ কোনো স্থানীয় এনকাউন্টারে মৃত পুলিশকর্মীর স্মৃতি মুছে যায় মানুষের কালেক্টিভ স্মৃতি থেকে।


যাইহোক। এসব বিতর্কিত বিষয়। 


বস্তুত, আমরা যেটা ভুলে যাই, সেটা হল সমস্ত আক্রমণ মূলত আসে একটা সিস্টেমের স্ট্রাকচারকে লক্ষ্য করে। আর, যেকোনো কাঠামোই নিজেদের কাঠামোত্ব বজায় রাখতে ব্যক্তিসত্তাকে মেরে ফেলে, তুলে ধরে গোষ্ঠিক পরিচয়কে। একই ছাঁচে না ফেলতে পারলে সিস্টেমচক্র মসৃণভাবে গড়গড়িয়ে চলতে পারবে না।


আর, আক্রমণের লক্ষ্যবিন্দু হয় এই সিস্টেমই। যখন আমরা বলি, ‘পুলিশ অত্যাচারী’, বা ‘পুলিশ নিরস্ত্রদের মারছে’, বা ‘পুলিশ গুলি চালিয়েছে’, সেটা কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট কনস্টেবল, এএসআই, এসআই, ডিএসপি, ডিসিপি, জয়েন্ট সিপি ইত্যাদিদের লক্ষ্য করে নয়। হ্যাঁ, কিছু ক্ষেত্রে অবশ্যই হয় - নকশাল আন্দোলন দমনে রুনু গুহনিয়োগীর ভূমিকা যেমন। ওই সময়ে রুনু নিজেই হয়ে উঠেছিলেন স্বয়ংসম্পূর্ণ এক সিস্টেম, অত্যাচারী এক তন্ত্রের প্রতিভূস্বরূপ। সেরকম ব্যতিক্রম ছেড়ে দিই যদি, তাহলে কি কেউ বলতে পারবেন - পুলিশকর্মী বা অন্য কেউ - কোনো বিশেষ কর্মসূচিতে পুলিশি নিপীড়নের বিরুদ্ধে সমালোচনা যখন হয়, সেটা কি কারোর নাম করে হয়? এমনটা কি বলা হয়, ‘এসআই কখগ সরকারের দালাল, নিরস্ত্র জনতার উপরে অত্যাচার চালিয়েছে’? না। বা, পুলিশকে কি নির্দেশ দেওয়া হয়, ‘আন্দোলনকারী চছজ (নীল গেঞ্জি)র উপরে গুলি/লাঠি/জলকামান চালাও’? সেটাও না, আশা করি!


লড়াইটা পুলিশ বনাম মানুষের নয়। লড়াইটা মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনী শক্তির সঙ্গে একটা প্রশাসনিক প্রত্যঙ্গের। সেখানে ইন্ডিভিজুয়াল মানুষ বা পুলিশ, কেউই দায়ী নন। তাঁদের ব্যক্তিগত ভূমিকাও এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ নয়। যে যাঁর ডিউটি পালন করছেন কেবল। অনেকেই বলতে পারেন, সাধারণ নিরস্ত্র মানুষের উপর লাঠি চালানো কি ডিউটির মধ্যে পড়ে? এখানে প্রশ্নটা ‘ডিউটি’ ঠিক কী, তার উপরেও নির্ভর করছে। বা, ডিউটি কার? পুলিশব্যবস্থা যে আসলে রাষ্ট্রযন্ত্রেরই একটা অংশ, সেটা বিস্মৃত হয়ে যাওয়াটা মূঢ়তা। আর, এই রাষ্ট্র-জনতার সংঘাতের এই চিরকালীন ডায়ালেক্টিক্সে বরাবর মুখ্য হয়ে এসেছে ব্রুট ফোর্স। প্রথম চার্লসকে হত্যা করেই ক্ষমতায় এসেছিলেন অলিভার ক্রমওয়েল। আবার, ক্রমওয়েল স্বৈরাচারী হয়ে যাওয়ায় তাঁকেই ফের হত্যা করা হয়। ষোড়শ লুইকে ফেলা হয়েছিল গিলোটিনের তলায়। আবার, ভাগ্যেরই ফেরে, গিলোটিনের তলাতেই যেতে হয়েছিল দাঁতন-রোবসপিয়েরকেও। ব্রুট ফোর্স কখন কার কতটা বেশি, কতটা ইমপ্যাক্টফুল - তার উপরেই নির্ভর করে, কে টিকে থাকবে। সৃষ্টির গোড়ার থেকেই, যেকোনো কিছুর এগিয়ে যাওয়ার জন্য যে শক্তির দরকার - বের্গসঁ যাকে ‘এলঁ ভিতাল’, বা ভাইটাল ফোর্স অফ লাইফ আখ্যা দিয়েছেন, এক প্রয়োজনীয় জৈবী শক্তি - সেই জৈবী শক্তিরই এক রূপান্তরিত রূপ হল এই ব্রুট ফোর্স। যেকোনো ডায়ালেক্টিক কনফ্লিক্টের একটা চালিকাশক্তির ফলেই সমস্তকিছু এগিয়ে চলে, সমাজব্যবস্থার বিবর্তন হয় - সেই চালিকাশক্তি হলো ব্রুট ফোর্স - আদিমতম শক্তি। 


ফলে, এখানে ব্যাপারটা কোনোদিনই মানুষ বনাম পুলিশ নয়। ‘উর্দির নিচেও তো আছে মানুষ’ নয়। একটা পুলিশ, দুটো পুলিশ, আন্দোলনরত একটা কি দুটো মানুষ - এরা সিনে থাকে না। ম্যাক্রো আর মাইক্রোকে গুলিয়ে দেখবেন না, অনুরোধ। দুটো আলাদা পক্ষকে কীভাবে আলাদা আলাদা চশমা, সেটাও নিজের ইচ্ছেমতো - কীভাবে দেখা যায়? 


আবারও, এখানে পুলিশ একটা সিস্টেম। বা, বলা ভালো, একটা লার্জার সিস্টেমের একটা প্রয়োজনীয় সাবসেট। ‘এই পুলিশই রাত জাগে বলে আপনি বেরোতে পারেন’, এটাও যেমন ভুল, ‘পুলিশ মাত্রেই ঘুষখোর’-টাও ভুল। সিস্টেমাবয়ব কোনোদিনই ইন্ডিভিজুয়াল-নির্ভর নয়। ঠিক যেমন হাতের পাঁচটা আঙুল (হ্রত্বিকোচিত হলে ছয়) পাকিয়ে ঘুষি মারলে বোঝা যায় না, তার মধ্যে অপমানজনক মধ্যমা, দুর্বল কনিষ্ঠা, আলাদা থাকা বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ রয়েছে, ঠিক তেমনই সিস্টেমের পদক্ষেপের বিরুদ্ধে সমালোচনাটাও সিস্টেমেরই। এতে কেউ ব্যক্তিআক্রমণ করলে, বা সিস্টেমের সমালোচনাকে নিজের গায়ে টেনে ‘আমি পুলিশ, আমাকে সবাই আনফ্রেন্ড করুন’ মর্মে শাহাদাৎ দাবি করতে চাইলে সেটা সচেতনতার অভাব ব্যতীত আর কিছুই নয়। দু’পক্ষেরই বোঝার সময় এসেছে, আসল বেলিগারেন্টস মূলত কারা। 


প্রসঙ্গত, ‘পুরুষরা ধর্ষক’ স্টেটমেন্টটাও পুরুষতান্ত্রিক সিস্টেম এবং তার নিয়ন্তাদের বিরুদ্ধে। যেসব স্বল্পবুদ্ধিসম্পন্নরা ‘নট অল মেন’ মর্মে প্রতিবাদের ভাষ্য রচতে যায়, তাঁদেরও বোঝা উচিত, সিস্টেম এবং ইন্ডিভিজুয়াল এক না। সিস্টেমের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ উঠলে যদি কেউ ‘না, আমি তো কলা ধরেও দেখিনি’ মর্মে ছলাকলা দেখাতে আসেন, সেটাও তাঁদের সচেতনতার অভাব, বোধের রিক্ততা। এইটুকুই।


আবারও, সিস্টেমের ম্যাক্রোতে সংকীর্ণ মাইক্রো ঢুকিয়ে দেবেন না, বা জুমড-ইন মাইক্রোযাপনকে মাপতে যাবেন না ম্যাক্রোর গরুড়াবলোকন দিয়ে। অনুরোধ!

No comments:

Post a Comment

Luxury v/s Comfort - A ‘Food’ for Thought

In the 2022 culinary-thriller The Menu, the climactic scene was knitted with sheer artistic brilliance, and was extremely symbolic. The male...