Sunday, 1 September 2024

খোলা চিঠি, ঋতুপর্ণ-কে


ঋতুদা,

প্রথমেই জানাই, শুভ জন্মদিনের অ-গুনতি শুভেচ্ছা। আচ্ছা, দাদা বলে সম্বোধন করায় কিছু মনে করছ না তো? তোমাকে হয়তো 'দাদা' বলাটা উচিত না। আমার থেকে তুমি বয়সে অন্তত অনেকই বড়ো। যদিও তুমি চিরতরুণ, একটা স্থায়ী বিন্দুতে এসে তোমার বয়েস থমকে থেমে গেছে - জরা নামক সর্বগ্রাসী দৈত্য তোমাকে আর ছুঁতেও পারবে না কোনোদিন। তবুও, তুমি আজ যদি থাকতে, তাহলে বয়স নামক বিচ্ছিরি এক সামাজিক নির্মাণের মাপকাঠি, যা সহজেই মুড়িমিছরিকে একই দামে বেচে দেয়, তার নিরিখেই আরকী, তুমি আমার থেকে অনেকটাই বড়ো হতে। তবুও, ঋতুদা, আন্তরিকতার দিক থেকে দাদা ব্যতীত আর কী বলেই বা ডাকতাম, বলো?


ঋতুদা, আর পাঁচটা অসংবেদনশীল বাঙালির মতো, ছোটো থেকেই জেনেছি, ঋতুপর্ণ ঘোষ সিনেমা বানান, সংবাদপত্রটত্রের সঙ্গে যুক্ত, আর — মেয়েলি। ব্যাস, শেষ। মানুষটা কী, কেমন সব কাজটাজ করেন, কিচ্ছু না। মেয়েলি৷ চেনা ছকের বাইরে, চেনা কাঠামোর জিগস পাজলে আটকাচ্ছে না - অতএব, হ্যাটা৷ আর ততোধিক কৌতূহল। ও কি সমকামী? হিজড়ে? বাবা, কী বিচ্ছিরি না? চিকিৎসা হয় না? নাকি নাকি গলায় তোমার মিমিক্রি বানিয়ে ফেললাম আমরা৷ হাহাহাহাহা, কী হাসি। টিআরপি উপচে পড়ছে, উপচে পড়ছে আমাদের ভসভসিয়ে সোডার গ্লাসের মতো উচ্ছ্বাস, উপচে পড়ছে চরম দৈন্যদশা। এবাবা, ব্যাটাছেলেটা গড়িয়াহাটে গিয়ে দুল কেনে? কানে দুল পরে, পরে হাতে চুড়ি, চোখে কাজল-লাইনার, হাতে নেলপালিশ? ছ্যা ছ্যা। ভাগ্যিস আমাদের ঘরে এরকম হয়নি!


ভাগ্যিস হয়নি ঋতুদা। ভাগ্যিস। কেউ চলে গেলে আমরা তখন এমন বিচ্ছিরিভাবে হেদিয়ে পড়ি, দেখে হাসিও পায়। তুমি অন্যধারার সিনেমা বানাও, কিছু সিনেমা খুব ঘরোয়া, মেয়েদের কথা মেয়েদের মাথায় রেখে তুলে ধরেছো.. ব্যাস। শেষ। তোমার লেখা, তোমার কথা, তোমার চিন্তা, তোমার প্রজ্ঞা - তার কতটুকু তল পাওয়ার চেষ্টা আমরা করেছি? 


অথচ মজা দেখো ঋতুদা, তোমাকে নিয়ে এখন কী বিচ্ছিরি বাড়াবাড়িটাই না হয়! লিঙ্গসচেতনতার হদ্দমুদ্দ ঘটিয়ে সবাই এখন তোমাকে মাথায় তুলে নাচে। তোমার কাজের ভিতরের সূক্ষ্মতা তুলে ধরে, ন্যারেটিভ খোঁজে, কাটাছেঁড়া চলে তোমার কাজের। আগে চলতো তোমার চরিত্রের, তোমার অস্তিত্বের - এখন তোমার সিনেমার। ফার্স্ট পার্সন নিয়ে বাঙালির কী আবেগ, আহাবাহা! মজাই লাগে বেশ, জানো তো? আমাদের মতো হিপোক্রিট, মাইরি, একটাও হয় না। তোমাকে সারা জীবন কর্নার করে গেলাম, আদারাইজ করে গেলাম, হেটেরোনর্মেটিভ বাইনারির চেনা ছকের বাইরে পড়ো বলে তোমাকে ধর্তব্যের মধ্যেই ধরলাম না - আর সেই তুমি-টাকেই আমরা এখন পূজ্যপাদ করে তুলেছি। লজ্জাও নেই আমাদের! 


স্বীকার করতে দোষ নেই ঋতুদা, আমি নিজেও এককালে এরকমই ছিলাম। তুমি যখন চলে গেলে এক্কেবারে, তখন আমি সবে ক্লাস টেন। অত বোধ, চেতনা তৈরি হয়নি তখনো। এখনো কি সত্যিই চেতনা এসেছে? কে জানে। তবুও, সেনসিটাইজেশনের মাইক্রোফাইবার কাপড় দিয়ে যেদিন ঘোলাটে চশমাটা মুছতে শিখলাম, তবে থেকেই তোমার সঙ্গে একটা একপাক্ষিক বন্ধুত্ব গড়ে উঠলো। খুব আপশোষ হতে থাকলো - কেন তোমার সঙ্গে আলাপের সু্যোগ হল না? তুমি কাউচে বসে আছো, আমি মেঝেতে বসে কাউচের গায়ে মাথা হেলিয়ে বসে তোমার বকবক শুনছি। তোমার কথা শোনার, তোমার উন্নত ভাবনাচিন্তার, তোমার উদার মনের শরিক হওয়ার সুযোগ এই যে হলো না, ঋতুদা - এই দুঃখ আমার কোনোদিন ঘুচবে না।


লিঙ্গসচেতনতার পাশাপাশি, তোমার প্রতিটা লেখা, প্রতিটা সিনেমা, কথা, হাসি, সব - সবকিছুর থেকে একটা জিনিস বের করে আনা যায়। যদিও, সবাই পারবে না সেটা। তোমার সামগ্রিক অস্তিত্ব আসলে একাকীত্বের উদযাপন। এই একাকীত্ব কখনো স্বেচ্ছাবসরের, কখনো উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, কখনো বা পরিস্থিতিজনিত। কিন্তু, সেই একাকীত্বকে তুমি এমনভাবে তুলে ধরেছো, যা কেউ করে না। তোমার সিনেমার প্রতিটা চরিত্রই কীভাবে নিজের মতো করে একা, ঋতুদা? কীভাবে সুখী দম্পতির মধ্যেও অভিমানের একাকীত্বের একটা দেওয়াল থাকে, প্রবল প্রেমেও মিশে থাকে নিঃসঙ্গতার নোনাজলের টুপটাপ, বন্ধুত্বেও থাকে দূরত্বের বোবা অভিযোগ, ভালোবাসা পাওয়ার হাহাকার? 


কীভাবে তুমি বুঝে ফেললে বলো তো ঋতুদা, এক মেট্রো লোকের মধ্যে যেতে যেতেও অদ্ভুত একাকীত্বের ধূসরতা ঘিরে ধরে? অফিসে বসে কেজো লেখা লিখতে লিখতে একটা মনখারাপের আদুরে বেড়াল কোলে এসে শুয়ে পড়ে? বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডার মাঝে বসে চোখে জল চলে আসে, অভিমানে দ্রব হয়ে যায় কণ্ঠ? আমার সঙ্গে কোনোদিন একটা কথা না বুঝেও, কীভাবে আমার দুঃখগুলো, আমার নিঃসঙ্গতাগুলো তোমার হলো, ঋতুদা? তোমার সমস্ত জার্নালে, ফিচারে, স্ক্রিপ্টে, দৃশ্যায়নে সেই একাকীত্ব কীভাবে ফুটে উঠলো? কীভাবে তুমি জানলে, খুব আনন্দের খবর জানানোর জন্য ফোন হাতড়ে দরকারি নাম্বারটা খুঁজে পাওয়া যায় না - তখন হয় সেই আনন্দটা গিলে ফেলতে হয়, নয়তো যাকে খুশি একটা ফোন করে ঝেড়ে ফেলতে হয় ও পরে সেই ছদ্মদেখনদারির অপরাধবোধে ভুগতে হয়? এতোটা উঁকি মারাও কি ঠিক?


আসলে, আমাদের এক করে দেয় নিঃসঙ্গতা। যে নিঃসঙ্গতার অপার অভিমান আমাদের স্তব্ধ করে দেয়, যে চিঠিগুলোর উত্তর আসে না কোনোদিন, যে তলটা ছুঁয়ে ফেলার মতো ডুবুরি হয়ে ওঠা শেষমেশ সম্ভব হয় না, যে অপ্রত্যাশিত আঘাতের অভিঘাতটুকু সামলে ওঠার মতো শক্ত ভিত থাকে না, ঘা কমানোর যে সর্বরোগহরা মিরাকিউরল-মলমটা হাতড়ে হাতড়েও খুঁজে পাওয়া যায়না - সেই সবকিছুই আমাদের কোথাও গিয়ে এক করে দেয়।

আমরা যারা একা, আমরা যারা নিঃসঙ্গ, যাদের উদাস দুপুরে কুবো পাখি ডেকে যায় ঘ্যানঘ্যান করে - আমাদের সবার একাকী যাপনে তুমি আছো, ভীষণ করে আছো।

পরপার বলে যদি কিছু থাকে আদৌ, জমিয়ে আড্ডা হবে ঋতুদা। প্লিজ, তখন অন্তত ছেড়ে যেও না। দুই একাবোকা যেন পিঠে পিঠ ঠেকিয়ে মনেরপ্রাণের অনেক গল্প করতে পারি, বা চুপ করেই নিছক বসে থাকতে পারি। 


ভালো থেকো, ঋতুরাজ। আমার নিঃসঙ্গ সম্রাট। আমার একলা রাজা। তোমার জন্মদিন আর আগাম বিশ্ব পত্র দিবস উপলক্ষ্যেই এই খোলা চিঠিটা রইলো। 


ইতি,

তোমার না-চেনা এক বহুদূরের সমমনস্ক সুহৃদ,

অর্চিষ্মান

No comments:

Post a Comment

Luxury v/s Comfort - A ‘Food’ for Thought

In the 2022 culinary-thriller The Menu, the climactic scene was knitted with sheer artistic brilliance, and was extremely symbolic. The male...