সেপ্টেম্বর,
বিদায়ের বেলা আসন্ন। তোমার মেয়াদ ফুরিয়ে এল। আর তো মাত্র কয়েকটা মুহূর্ত, তার অব্যবহিত পরেই তোমার খণ্ড-অস্তিত্ব মিশে যাবে ডায়রির পাতায়, মিলতে না পারা অঙ্কের খাতায়। চলে যেতে হচ্ছে বলে তোমার মন কি ভারাক্রান্ত? যে শেষ বিদায়গুলো জানিয়ে যাওয়া হল না, স্টেশনে-বন্দরে একা পড়ে রইলো একপাক্ষিক আলিঙ্গনের রিক্ততাটুকু - তার শূন্যতাটুকু কি তোমার পাঁজরের মাঝে ছড়িয়ে দিচ্ছে করুণ বিধুরতা? কুড়োনো হল না যে ফুলগুলো, তারই কি নিরস্তিত্ব মালা গেঁথে চলেছো নিরন্তর?
সেপ্টেম্বর, যেতে তোমাকে হতোই। জগতের এটাই নিয়ম। আগমনীর মধ্যেই মিশে থাকে বিদায়ের নীরব প্রতিশ্রুতি, আসন্নের মধ্যেই থাকে আগামী। প্রকৃতির অদ্ভুত লটারির খেলায় তোমার হাতে পড়ল একটা কম দিন - নইলে, তুমিও বেঁচে দেখিয়ে দিতে, কীভাবে বাঁচা যায়। অথচ, এমনটা হয় না। যার ভাগ্যে যেটুকু পড়ে, সেটুকুর মধ্যেই যত্ন করে গুছিয়ে নিতে হয় নিজের ঝরাপাতার জীবনকে। অসংখ্য না-পাওয়াগুলোকে যদি গুনতে বসি, ভিড়ের শেষে অধীর অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকা মলিন মুখের বাচ্চাটার মতোই, ‘পাওয়া’গুলোর জন্য তো আর কিচ্ছুটি পড়ে থাকবে না! যা আছে, তাই ভালো। যেটুকু অপ্রাপ্তি, তাদের যেতে দাও। আঁকড়ে থেকো না। মায়া একেই অতি বিষম বস্তু, তার মধ্যে অপ্রাপ্তির মায়া আরো বেশি। হাসিমুখে বিদায় জানাও। চলে যখন যেতেই হবে, তখন তুচ্ছতা বাদ দাও। ওতে সংকীর্ণতা বাড়ে বই কমে না। মনকে কখনো ক্ষুদ্র হতে দেবে না, ডোবার মতো হতে দেবে না, আটকা পড়তে দেবে না কোথাও।
অথচ কী জানো, এসব বলার পরেও কোথাও গিয়ে একটা অবশ অভিমান কাজ করে। শরীর চলতে চায় না, পা এগোতে চায় না - ক্লান্তিতে নুয়ে পড়ে দেহ। মনের ভিতরে নেমে আসে অবসন্ন সন্ধে। অ্যালপ্রাজোলাম হাতড়ে নিতে হয় ড্রয়ার খুঁজে, যাতে পরের দিনটুকু রঙিনভাবে বাঁচা যায়। যে সেপিয়াগন্ধী দুঃখগুলো ঠেলে উঠতে চায়, তাদের ছিপিবন্দী করে রাখতে হয়। তুমি তো জানোই সেপ্টেম্বর, প্যান্ডোরার বাক্স থেকে প্রথমে কী বেরিয়েছিল। চেপে রাখতে রাখতে যখন অসহ্য লাগে, ফিরে যেতে হয় জলের কাছে। গর্তের কাছে। সমস্তটা উজাড় করে দিতে হয় সেখানে, দিয়ে মাটি চাপা দিয়ে দিতে হয়।
এতো চাপাচুপি দিয়ে রাখার পরেও, দুঃখগুলো কীভাবে যেন ছাড়া পেয়ে যায়। ড্যান্ডেলিয়নের পাপড়ির মতো, চেরিফুলের পাতাঝরার মতো তারা ভেসে ভেসে ইতিউতি ঘুরে বেড়ায়। দেখো, জানালার বাইরে তাকাও, তাকালেই দেখতে পাবে তাদের। হাত বাড়ালেই ধরতে পাবে। কারোর না কারোর দুঃখ এই শহরের বুকে সবসময়ে ভেসে বেড়ায়। সবাই আসলে বড্ড দুঃখী, বুঝলে কিনা!
সেপ্টেম্বর, তুমি মনখারাপের মাস। একাকীত্বের মাস। তোমাকে কেউ চায় না। তোমার চলে যাওয়ার দিন গোনে সবাই। তুমি চলে গেলে পুজো আসবে। তুমি চলে গেলে এক রোদ-ঝলমলে শারদ ভোরবেলায় গা-ঝাড়া দিয়ে উঠে বসবে সবাই। গান বেজে চলে, ‘ওয়েক মি আপ, হোয়েন সেপ্টেম্বর এন্ডস…’। তুমি শুধু একলাটিই দাঁড়িয়ে থাকো, বর্ষাশেষ-শরৎশুরুর এক একলা সাঁকো হয়ে - চুপচাপ, টুপটাপ। অবহেলিত, বিস্মৃত - যে শিশুটিকে কেউ খেলায় নিতে চায় না বলে একা একা চুপটি করে মাঠের পাশটায় বসে থাকে। সে দুর্বল, সে দুধভাত। গলার কাছে দলা পাকিয়ে উঠতে থাকে আবেগাভিধানের বাইরের কোনো অনুভূতি। মিথ্যে সান্ত্বনাটুকুও তিতকুটে ট্যাবলেটের মতো লাগে। তুমি একলাই থেকে যাও, একা হয়ে। কী অদ্ভুত, না? শহরজুড়ে একা মানুষ এতো, তাও একলা তুমিটাকে কেউ টেনে নেয় না কাছে। নিজের করে নেয় না, আপন ভাবে না। অন্যমনস্ক-ইতিউতি-গয়ংগচ্ছ কাটিয়ে দেয়, যতক্ষণ না আজকের এই দিনটা এসে দোরগোড়ায় দাঁড়ায়।
শেষপাতে থাকে কিছু খুচরো বিদায়সম্ভাষণ, কিছু কেজো লৌকিকতা। ‘সাবধানে যাস-আবার আসবি’-র একঘেয়েমি। সমস্তটা মিটিয়ে উদাস পায়ে পথে নামা। ফের সামনের বছর। ততদিন, বিস্মৃতির ভিতর আরেক বৃহৎ বিস্মৃতিকে নিয়ে কাটিয়ে দেওয়ার নিঃশব্দ অশ্রুযাপন।
কোহেন সেপ্টেম্বর হতে চেয়েছিলেন। পারেননি। বা হয়তো পেরেছিলেন। সবাই সেপ্টেম্বর হতে পারে না। সেপ্টেম্বর হওয়া সহজ নয়।
বিদায়। যাত্রা শুভ হোক।

No comments:
Post a Comment