Sunday, 17 November 2024

ভেন্ডারকথন

 রমাপদ চৌধুরী তাঁর স্মৃতিকথা 'হারানো খাতা'-য় লিখেছিলেন, ভারতে রেলব্যবস্থার পত্তন কীভাবে পরোক্ষভাবে জাতীয়তাবাদী সত্তাকে জাগিয়ে তুলেছিল - ফার্স্ট ক্লাসের কামরা ইউরোপীয় সাহেবদের, সেকেন্ড ক্লাসের কামরা মোটামুটি বড়োলোকদের, আর সাধারণদের জন্য ভরসা থার্ড ক্লাস। থার্ড ক্লাসে জাতপাত-বর্ণধর্ম-ছোঁয়াছুঁয়ি সব ঘুচে যেত। অত্যন্ত ধর্মপ্রাণ, গোঁড়া ব্রাহ্মণের সঙ্গে উঠতেন নিম্নবর্ণের মানুষও। থার্ড ক্লাস সব্বাইকে আপন করে নিতো, মনে করিয়ে দিতো যে তাদের একমাত্র পরিচয় ভারতীয়-ই। এই একই রকম অনুভূতি আমার হয়েছিল ভেন্ডার কামরায় উঠে। 


ট্রেনের ভেন্ডার কামরা -- এক অদ্ভুত, সমাজবিচ্যুত, দ্বীপের ন্যায়, চতুর্মাত্রিক কোনো এনটিটি, যার তুল্য অস্তিত্ব ওই কামরার বাইরে কোথাও নেই। ভেন্ডার কামরা যে ধরনের সাম্যবাদ প্রোমোট করে, স্বয়ং গ্রামসি তাঁর কালচারাল হেজিমনির তত্ত্ব ভুলে যেতেন দেখলে। 


ডেলিপ্যাসেঞ্জারের জীবনে পা দেওয়ার আগে যখনই ট্রেনে চড়তাম, বরাবর জেনারেল কামরাতেই উঠেছি। ভেন্ডার কামরা যখনই পাশ দিয়ে যেতো, নাকে গোঁত্তা মারত এক বিটকেল ছানাপচা টক-টক গন্ধ। ওই গন্ধে প্রাণ ওষ্ঠাগত হয়ে যেতো। ফলে, কোনোদিন কল্পনাতেও আসেনি ভেন্ডারে ওঠবার কথা। 


কিন্তু অদৃষ্ট - প্রথম কলেজে মাস দেড়েক 'লাইফ ইন আ মেট্রো' হওয়ার পরে, ট্রেনের দীর্ঘযাত্রার সুযোগ জুটে গেল, অন্তত বছর তিনেকের জন্য। দীর্ঘ মানে, খড়দা থেকে শেয়ালদা। খাতায়-কলমে ১৮ কিমি রাস্তা, ৩৮ মিনিটের শিডিউল্ড টাইম - যেটা ঢুকতে প্রায় ৫০-৫৫ মিনিট লেগেই যেত আমাদের সময়ে। শিয়ালদা নর্থের ট্রেন লেট করা এবং ঝোলানোর উপর আমার যা বিশ্বাস ছিল, অত বিশ্বাস নিজের প্রাক্তন প্রেমিকাকে অবধি কোনোদিন করে উঠতে পারিনি। 


প্রথম কিছুদিন আপ ট্রেন ধরে ব্যারাকপুর গিয়ে ফের ডাউন ব্যারাকপুর লোকাল ধরে বসে বসে যেতাম। কিন্তু তার জন্য যত সকালে উঠতে হত, তা আমার পক্ষে রীতিমতো টর্চারের শামিল। পড়াশুনোও করব, কলেজেও পড়ব, আবার সকালেও উঠব - এ কেমন অবিচার?


নিকুচি করেছে বসা - এই বলে সোজা বেরিয়ে পড়লাম গটগট করে। খড়দায় এসে দাঁড়ানো ডাউন ট্রেনের ভিড় দেখেই প্রবল জেদ ফুস হয়ে গেল। এবার? এইজন্যই বলে, মা-বাবার কথা শোনা উচিত। 


ইতিউতি তাকিয়ে দেখি, প্রথম ভেন্ডার কামরাটি 'গড়ের মাঠ' না হলেও, 'পেছনে একদম ফাঁকা, খালি গাড়ি কালীঘাট' মার্কাও নয়। অন্তত উঠে দাঁড়ানো যাবে। কিন্তু গন্ধ... 


'ধুত্তোর অলফ্যাক্টরি' বলে উঠে পড়লুম ভেন্ডারে। উঠতেই নাকে ঝাপটা মারল ভেপসে যাওয়া ছানা, পচা শাক, কাঁচা মাছ - সব মিলিয়ে একেবারে রাজা এজিয়ানের আস্তাবলের মতো ব্যাপার। আমি তো আর হারকিউলিস নই - কী করি এবার?


মেনে নিতে হল। কোনোমতে নাকমুখ সিঁটকে যাতায়াত শুরু করলাম। দিনদুয়েকের মধ্যে, আশ্চর্যভাবেই, গন্ধটা নাকে অনেকটা সয়ে এলো। আর, গন্ধ সয়ে আসতেই পুরোনো প্রি-কনসিভড নেতিবাচক ধারণা কেটে গেল, এবং ভেন্ডারের বেশ কিছু ভালো দিক চোখে পড়ল। 


ভেন্ডার একমাত্র জায়গা, যেখানে আরামসে ধূমপান করা যায়। কলেজে পড়া আমি চেইনস্মোকার ছিলুম। খড়দা থেকে কলেজ পৌঁছোতে পৌঁছোতে আমার এক প্যাকেট সিগারেট শেষ হয়ে যেতো। সেই আমার জন্য ভেন্ডারের থেকে উৎকৃষ্ট জায়গা আর কী হতে পারে? 


শুধু তাই নয়, ভেন্ডারে হইহই করে ব্রিজ খেলা চলত। আমার তখন মারাত্মক ব্রিজের নেশা। রাজ্য ব্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের মেম্বার হয়েছি, ব্রিজ খেলতে বড়ো বড়ো ক্লাবে যাচ্ছি, অ্যাসোসিয়েশনের অফিশিয়াল ক্লাবের সদস্যও। রোজ কলেজ সেরে পূর্ণদাস রোডে তাস পেটাতে যেতাম। ফলে, দুই নেশা মিলে ভেন্ডার আমার জন্য এক নতুন স্বর্গরাজ্য হয়ে উঠল। 


ভেন্ডারে কেউ কাউকে রেয়াৎ করে না। আমার যে স্নবারিটুকু ছিল, ভেন্ডারে উঠে দুই খিস্তিতে কেটে গিয়েছিল। আমার কলেজ আমাকে অতটা ডিক্লাসড করতে পারেনি (প্রেসি-যাদবপুরের মতো দুই আঁতেল এবং এলিট, সমাজ-বিচ্যুত প্রতিষ্ঠান এমনিও পারেনা), যতটা ভেন্ডার করেছিল। 


আমার তাস খেলার সঙ্গী ছিলেন বাকি যে তিনজন - তার মধ্যে একজন রাজ্য সরকারি আমলা, একজন সবজির পাইকারি বিক্রেতা, এবং একজন স্কুলশিক্ষক। এদের মধ্যে স্কুলশিক্ষক দমদমে নেমে যেতেন - আর সেই জায়গা নিতেন এক ফুলঝাড়ু বিক্রেতা। 


বাইরে হয়তো অনিমেষদা (নাম পরিবর্তিত) আমলা, ওয়াসিমদা (নাম পরিবর্তিত) সবজি বিক্কিরি করে, তুষারদা (নাম পরিবর্তিত) হাইস্কুলে পড়ায়, রতনদা (নাম পরিবর্তিত) ফুলঝাড়ু বেচে। আমি প্রেসিডেন্সির ভেকধারী আঁতেল। কিন্তু ওখানে আমরা সবাই সমান। একই সিগারেটের কাউন্টার সবার হাতে হাতে ঘুরছে। বাংলা থ্রি নো-ট্রাম্প খেলা অনিমেষদা ডাউন করায় ওয়াসিমদা মা-মাসি তুলে খিস্তি করছে, আর অনিমেষদা 'ভাই রাগ করিস না, গুনতে ভুল হয়েছিল' করে বোঝাচ্ছে। বাইরে আমরা যে যাই হই, ভেন্ডরে আমরা সবাই এক। একটাই আমাদের শ্রেণিপরিচিতি - আমরা ভেন্ডারযাত্রী। কী অদ্ভুত এক সাম্যের পাঠ পেয়েছিলাম! 


কোনোদিন না গেলে, পরে/আগে গেলে খোঁজ নিতো এরা সবাই। ওয়াসিমদার মেয়ের বিয়ের খরচের সিংহভাগ অনিমেষদাই দিয়েছিল, অনেক পরে জেনেছিলাম। রতনদার ছেলে ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করায় তুষারদা ভেন্ডারের প্রত্যেককে মিষ্টি বিলিয়েছিল, চেনা-অচেনা সব্বাইকে। সে আরেক ঝামেলা - ট্রেনে উঠছে লোকে, আর তুষারদা বাক্স খুলে 'এই নিন, খান' বলে বাড়িয়ে দিচ্ছে। লোকে সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখছে, কিন্তু তুষারদার ভ্রুক্ষেপ নেই। 


কলেজ ছাড়ার পরে আর ভেন্ডারে উঠিনি। জানি না, তাদের আজ কী খবর। তবে শূন্যস্থান কখনোই শূন্য থাকে না। আমার জায়গায় অ্যাদ্দিনে নতুন পার্টনার এসে গিয়েছে। অনিমেষদা-রতনদারও রিটায়ার করে যাওয়ার কথা। অন্য কেউ এসে গিয়েছে নির্ঘাত সেখানে। 'ফোর হার্টস' - 'ফাইভ ডায়মন্ডসের' ডাকে কামরা মাতায় অন্যরা এখন।


সব পাল্টে যায় - মানুষ, জীবন, যাত্রা, স্টেশন। শুধু ভেন্ডার এক থেকে যায়। এক রয়ে যায়।..

No comments:

Post a Comment

Luxury v/s Comfort - A ‘Food’ for Thought

In the 2022 culinary-thriller The Menu, the climactic scene was knitted with sheer artistic brilliance, and was extremely symbolic. The male...