Monday, 1 December 2025

'ঠাকুরমার ঝুলি'

 আজকে আমার ঠাকুমার মৃত্যুবার্ষিকী। ২০২১ সালের এই দিনেই তিনি গত হয়েছিলেন।


এইটুকু পড়েই অনেকে হয়তো, 'ওঁ শান্তি, আত্মার শান্তি কামনা করি, তিনি যেখানেই থাকুন ভালো থাকুন' ইত্যাদি মন্তব্য করবেন। তাঁদের উদ্দেশে বক্তব্য, বাকি পোস্টটুকু পড়ে দেখলে ভালো হয়।


আমাদের সাধারণ একটা প্রবৃত্তি হল এই যে, মানুষের মৃত্যুতে আমরা তার সমস্ত দোষ মাপ করে দিই। ভাবখানা এই, যে মৃত্যু একখানা বিরাট বড় ইরেজার - জীবনখাতার প্রতি পাতায় আমরা যত ভুলচুক করে থাকি, মৃত্যু দিয়ে সেটাকে প্রাণপণে ঘষে তুলে দেওয়া যায়। এর উল্টোটাও দেখা যায় যদিও বা; কোনো বিখ্যাত লোক মারা গেলেই তিনি জীবনে সামান্যতম ভুল করলে সেটাকে ছিদ্রান্বেষণ করে খুঁড়ে বের করে এনে 'দেখুন, যাঁর উদ্দেশে আপনারা হ্যাজাচ্ছেন, তিনি কত বড় অপরাধী!’ মর্মে পোস্ট নামানো শুরু হয়ে যায়। সেই স্বার্থভিত্তিক ব্যাপারটাকে আপাতত বাইরে রেখে বলার, মানুষকে মৃত্যুর পর একটা অত্যন্ত উঁচু ডেকচেয়ারে নিয়ে গিয়ে বসিয়ে দেওয়া হয়, যেখানে দোষ-পাপ-অপরাধ ইত্যাদির ছায়া ট্যানজেন্ট হয়ে পড়ে না। 


আমার আবার ব্যক্তিগতভাবে এই ব্যাপারটায় কিঞ্চিৎ আপত্তি আছে। যিনি সারাজীবন ধরে অন্যের কান্নার কারণ হলেন, অন্যের মানসিক স্বাস্থ্যকে শেষ করে দিলেন সম্পূর্ণভাবে - সেই মানুষ মারা গেলে আমি 'আহা গো, কী দুঃখ গো, যাকগে, সব ভুলে যাই গে, তিনি তো এখন আত্মা, প্রেত, ভূত, পেত্নি, মাথায় হ্যালো ইত্যাদি’ করটে পারিনা। যিনি খারাপ, তিনি খারাপই - তাঁকে মৃত্যু, জন্ম, অন্নপ্রাশন, শ্রাদ্ধ, বাৎসরিক কিস্যুই মহান-মহীয়সী করে দিতে পারেনা। 


আমার ঠাকুমা ঠিক এইরকমই এক মানুষ ছিলেন। এর শিকার? আমার মা। 


আমার মায়ের বিয়ে হয় '৯৬ সালে। ৬ বছরের প্রেমপর্ব শেষে বিয়ে হয় মা-বাবার। বিয়ের পরে মা শ্বশ্রুগৃহে পদার্পণ করে। উলেক্ষ্য, আমার মা পরিণয়কালে ছিলেন একজন মাস্টারডিগ্রি হোল্ডার, প্রেসিডেন্সি এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কলার। না, সে স্কলার হয়ে যে উদ্ধার করেছে, তেমনটা ঠিক না। আসলে, যাঁরা মনে করেন, 'মিসেস’ সিনেমাটি খুবই বাস্তববিমুখ (আমি নিজে দেখিনি যদিও বা), খুবই মিথ্যাচার করা হয়েছে - তাঁদের জন্য এই ক্ষুদ্র তথ্যটা পরিবেশন করলাম - যে, হ্যাঁ - উচ্চশিক্ষিত এবং কোয়ালিফায়েড মেয়েরাও এইসমস্ত ঘটনার সম্মুখীন হন, শিকার হন। আর যাঁদের জীবনে শিক্ষার আলো সেভাবে পড়েনি, প্রিভিলেজ যাঁদের খিড়কিতে কড়া নাড়তে পারেনি - তাঁদের যে কী অবস্থা হতে পারে, তা বলাই বাহুল্য।


যাইহোক, ধান ভানতে শিবের গীত হয়ে যাচ্ছে। আসল কথায় ফেরা যাক। 


আমার দাদু (ঠাকুরদা)-রা তিন শরিক মিলে একই বাড়িতে থাকতেন। আমার মায়ের দুই খুড়শ্বশুর এবং খুড়শাশুড়ির মদতপুষ্ট হয়ে আমার ঠাকুমা এবং দাদু শুরুর দিন থেকেই শুরু করে দিলেন বধূনির্যাতন। শারীরিক নির্যাতন করতে পারেনি যদিও, আমার বাবা মায়ের পক্ষ নিয়েছিল বলে - কিন্তু, মানসিক নির্যাতন নিরবচ্ছিন্নভাবে চলত। কীরকম? একটু নজির দেওয়া যাক।



আমার মা বাড়িতে ম্যাক্সি/নাইটি পরে অভ্যস্ত। বিয়ের পর থেকেই ফতোয়া জারি করা হল, সে শাড়ি ব্যতীত অন্য কিচ্ছুটি পরতে পারবে না, এবং - মাইন্ড ইট, সময়টা ১৯৯৬ এবং আমার ঠাকুমা নিজে শিক্ষিতা (?), স্থানীয় স্কুলের পার্টটাইম টিচারও ছিলেন - বাইরের লোকজনের সামনে, পরপুরুষের সামনে ‘ঘোমটা’ দিয়ে থাকতে হবে। মাকে সরাসরি বলে দেওয়া হয়েছিল, ‘শোনো, বিয়ের আগে যা হয়েছে হয়েছে। এখন থেকে আগের মতো ওসব চলবে না আর।’ 

আমার মা যতই শাড়ি ভালোবাসুক, সারাদিন শাড়ি পরে থাকার মতো কোনোদিনই ভালোবাসত না। এখনও না। এমনিও, বাড়িতে সবারই খোলামেলা থাকতে ইচ্ছে করে। গরমকালে আমার দাদুরা ঊর্ধাঙ্গ অনাবৃত করে ঢোলাঢালা লুঙ্গি পরে ঘুরবেন, আমার বাবা-কাকারা হাফপ্যান্ট পরে ঘুরবেন - আর আমার মা, সারাগায়ে ‘ফাইভ ইয়ার্ড অফ এলিগ্যান্স’ জড়িয়ে, মাথায় ঘোমটা দিয়ে গলদঘর্ম হয়ে ঘুরবেন। খুবই ভালো সিদ্ধান্ত, এতে সন্দেহ নেই কোনো। 


আমার মা একেবারে বিড়াল প্রকৃতির - মাছ ছাড়া মা খেতেই পারত না। মাছ শুধু খেতোই না, উপভোগ করে খেতো রীতিমতো - কাঁটাটাঁটা চিবিয়ে একেবারে চেটেপুটে খেতো। আর সত্যি বলতে, মা বাপের বাড়িতে থাকাকালীন প্রায় সবসময়েই বড়ো, ভালো মাছটা পেতো - অত্যন্ত ভালোবাসত বলেই। আমার দিদা অন্যদিকে অত্যন্ত অসভ্য প্রকৃতির মহিলা, মা-ভল্টু (মায়ের বাবা)র জীবন অতিষ্ঠ করে তুলেছিলেন - কিন্তু তিনি অবধি মাকে বড়ো মাছটা দিতেন। এমনকী, বিয়ের সময়েও ভল্টু আমার দাদুকে অনুরোধ করেছিল করজোড়ে, যে, ‘দাদা, আমার মেয়েটা খুব মাছ ভালোবাসে। একটু মাছ দেবেন ওকে ভালো!’ যাইহোক - আমার দাদু মাছ খেতো না নিজে। মাছ খাওয়ার লোক তিনজন - আমার বাবা, ঠাকুমা আর মা (শরিকরা একান্ন ছিল না)। আমার ঠাকুমা খেতে দেওয়ার সময়ে হাতা দিয়ে মায়ের সামনে রীতিমতো বাছত - যে মাছটা সবথেকে বড়ো, সেটা বাবা পেতো; তার পরের বড়ো মাছটা ঠাকুমা, আর শেষের সবথেকে ছোটো যে মাছ, সেটা পেতো মা। অনেকসময়ে বড়ো মাছের পিসকে আদ্ধেক করে মাকে দুবেলা ওই হাফ পিস করে দেওয়া হতো। আহা, বাড়ির বৌ - মাছটাছের মতো অত কিছু দেওয়ার কী আছে? খেতে দিচ্ছে, এই অনেক!


যখন আমি মায়ের পেটে, তখন মা'র এটা ওটা সেটা খেতে খুব ইচ্ছে জাগত - আর আমার চিরকালের আত্মসম্মানী মা, যে মুখ ফুটে নিজের চাহিদার কথা কোনোদিন বলতে পারত না, সে পর্যন্ত থাকতে না পেরে বলে ফেলত - হাঁসের ডিম, পাঁঠার মাংস, ইলিশ মাছের কথা। একবার মায়ের ইলিশ মাছ খেতে ভারি ইচ্ছে করছে। ভরা বর্ষা তখন - ইলিশ বিকোচ্ছে জলের দরে। বার বার মা তখন কাকুতিমিনতি করে যাচ্ছিল, যেন একটু ইলিশ আনা হয়। আমার দাদু নির্বিকার - চারাপোনা ইত্যাদি যত যা সস্তা মাছ হয়, সেইসবই আনত। আমার দাদু এয়ারফোর্সের পেনশন পাওয়া লোক, নিজেরও অন্যান্য সোর্স অফ ইনকাম ছিল - ফলে তারা যে ঠিক দিন-আনা দিন-খাওয়া ছিল, এমনটাও না। ইলিশ একদিন আনা যাবে না, এমন দারিদ্র‍্য তাদের চৌকাঠ কোনোদিন মাড়ায়নি। বাধ্য হয়ে একদিন বাড়ির ঘর মোছা-বাসন মাজতেন যিনি - দুর্গা পিসি - তিনি পর্যন্ত বলে বসলেন, ‘তোমরা কি মানুষ ন'কাকা? ভরা পেট বৌটার, তাকে একদিন ইলিশ খাওয়াতে পারছ না? এখন ইলিশের যা দাম, আমাদের মতো মানুষদের ঘরেও প্রায় রোজই ইলিশ হচ্ছে। পয়সা নিয়ে কি সগ্গে যাবে?’ 

তাকে যথারীতি ‘তুই থাম দুগ্গা, আমাদের নিজেদের ব্যাপারে তোকে কথা বলতে হবে না।’ বলে থামিয়ে দেওয়া হয়। যদিও, মজার ব্যাপার - এই দুর্গা পিসি, বা বাসন্তী পিসি (রান্না করতেন) - এঁদের সঙ্গে আমার ঠাকুমা নিয়মিত মায়ের ব্যাপারে সমালোচনা করে যেতেন - সে কতটা দেমাকি, কতটা অসভ্য, তার বাবা বিয়েতে কিস্যু দেয়নি ইত্যাদি ইত্যাদি। তখন যদিও ব্যাপারটা নিজেদের ছিল না বোধকরি। 


আমার মা বইয়ের পাশাপাশি টিভি বলতে অজ্ঞান ছিল। খড়দহে দ্বিতীয় টিভিসেট আসে মা’দের বাড়িতেই (প্রথমটা আসে খড়দহের ডাকসাইটে বড়লোক পালচৌধুরীদের বাড়িতে)। ফলে, ছোটো থেকেই মা চুটিয়ে খেলা দেখত, ফলো করত, স্পোর্টস্টারের পাতা কেটে জমাত, ক্রিকেট-ফুটবল-টেনিস সবই সমানতালে দেখত, বাকি সিনেমা-চিত্রহার তো ছেড়েই দিলাম। সেই মায়ের টিভি দেখায় ইতি পড়ে গেল শ্বশুরবাড়িতে আসার পর। সেই শ্বশুরবাড়িতে উঠোনের বারান্দা পেরিয়ে ঢুকলেই ছিল ড্রয়িংরুম, যাতে সারাক্ষণই গাঁক গাঁক করে টিভি চলত। অথচ, আমার ঠাকুমা বা দাদু যদি ঘুণাক্ষরেও টের পেতেন যে মায়ের কোনো একটা প্রোগ্রাম ভালো লাগছে, বা দেখতে ইচ্ছে করছে - তখন তাঁরা টিভির চ্যানেল ঘুরিয়ে দিতেন, গম্ভীর মুখ করে বসে থাকতেন (এবং উত্তর দিতেন না কথার - বাড়ির বৌ হচ্ছে টিকটিকি, তার কথা শুনতে ভারি বয়েই গিয়েছে) এবং প্রয়োজনে টিভি অফ করেও দিতেন। 

একবার টিভি-তে 'দেবী’ হচ্ছিল, আমার দাদু বসে দেখছিলেন। মা শুনতে পেয়ে খাটে গিয়ে বসে পড়ে। উচ্ছ্বসিত হয়ে দাদুকে বলে, ‘বাবা, কী দারুণ সিনেমা, না? আসল গল্পটাও অনবদ্য!’ 

দাদু তৎক্ষণাৎ টিভি অফ করে দেয়, এবং গম্ভীর মুখে বলে - 'অত জানিনা, আমরা তো আর তোমার মতো শিক্ষিত নই!’


মা পড়াশুনো জানত, বই পড়ত, পড়াশুনো করত বলে প্রতিটা মুহূর্তে ঠেস মেরে কথা। এমনকী, মা যাতে পড়তে না পারে - তার জন্য, মা পড়তে বসলে জোরে টিভি চালিয়ে দেওয়া, অকারণে কোনো একটা কাজের জন্য ডেকে পাঠানো (যেটা তক্ষুণি না করলেও চলে/ বাড়িতে কাজের লোক রয়েছে সেই কাজের জন্য), আলোপাখা নিভিয়ে দেওয়া - ইত্যাকার যা যা করণীয় এবং অকরণীয়, সবই আমার ঠাকুমা ও ঠাকুমার প্ররোচনায় দাদু প্রাণপণে করে চলতেন। ফলে, আমার মাকে বিএডের পড়া, চাকরি পড়া সবই করতে হত সবাই ঘুমিয়ে পড়লে - এবং, মোমবাতি জ্বালিয়ে। আলো জ্বালালে যে ইলেকট্রিক খরচা হবে! 


এছাড়া, আরও নানাবিধ ঘটনা-নিত্যনৈমিত্তিক অপমান তো লেগেই থাকত প্রতিমুহূর্তে মনে করিয়ে দেওয়া, যে বিয়েতে বাপের বাড়ি থেকে সে সেভাবে কিছুই আনেনি; তার বাবা নিয়মিত দেখা করতে আসাটা অনুচিত; বাপের বাড়িতে তাকে যেতে হলে তিন-চার দফায় 'অনুমতি’ নিতে হবে; টেলিফোন করতে গেলে নিতে হবে অনুমতি। যদি তাঁদের ইচ্ছা হয়, তবেই এই 'দেমাকি’ বৌ যেতে পারবে বাপের বাড়ি, বা করতে পারবে একটা টেলিফোন। ব্যাঙ্কের লকার শেয়ার করা প্রসঙ্গে আমার দাদু আমার বাবাকে বলেছিলেন, ‘না, আমি চাই না করতে - যদি তোর স্ত্রী (স্বাভাবিক, আমার মায়ের পরিচয় নেই কোনো - একেবারে মনুর বই থেকে লাফ মেরে নেমেছে) সমস্ত গয়না গলিয়ে নেয়?’ 


যাকগে। এরকম বলতে থাকলে লেখাটা আরও বড় হতে থাকবে - ফুরোবে না। আর এমনিতেও, মানুষের ধৈর্য নেই বিশেষ, এইসব লেখা পড়ে দেখার। তাই আর বিশেষ বাড়াচ্ছি না। শুধু এটাই বলার, যে বিয়ের বছরখানেকের মধ্যেই মা সিভিয়ার ক্লিনিকাল ডিপ্রেশনে চলে যায় - সারাক্ষণ ওষুধ খেয়ে থাকতে হতো (যা নিয়েও তির্যক নানা মন্তব্য শুনতে হয়েছে তাকে)। বিয়ের চার বছরের মাথায় সে ভাগ্যিস একটা চাকরি পায়, এবং অন্যত্র চলে যায় সংসার নিয়ে - নয়তো, তাকে যে কী পথ বেছে নিতে হত, তা জানা নেই। জানতেও চাই না। 


এইরকমটা আজও হয়ে চলে ঘরে-ঘরে। 'মিসেস’ বা 'গ্রেট ইন্ডিয়ান কিচেন’ সমাজবহির্ভূত সিনেমা নয়, বা খুবই সংকীর্ণ আঙ্গিক থেকে একটা জিনিসকে তুলে ধরা নয়। সত্যিটা যদি মানতে আপত্তি থাকে আপনাদের, তবে আপনারা সেই সমস্যার একটা অংশ। 


যাইহোক - মৃত্যু জীবনকে সবসময় আলো দেয়, এমনটাও নয়। মৃত্যু শুধুমাত্র একটা স্টেট অফ বিয়িং থেকে স্টেট অফ নন-বিয়িং ব্যতীত আর কিচ্ছুটি নয়। তাতে একটা মানুষের সমস্ত কর্ম মিথ্যে হয়ে যায় না, ইনভ্যালিড হয়েও যায় না। 


ফলে, আমার ঠাকুমা-দাদু - যাঁদের সমাজ অন্তত চেনে অত্যন্ত মিষ্টভাষী, ভদ্র, ভালো বলে - তাঁদের আসল রূপটা জেনে, দেখে অন্তত আমি তাঁদের পুজো করতে অক্ষম। 




পুনশ্চ - উপরোক্ত শরিকদের একজন আমার আর মায়ের ফ্রেন্ডলিস্টে রয়েছেন, যিনি সেইসময়ে উপরোক্ত ব্যাপারগুলোয় দিব্য মদত দিতেন, প্ররোচনাও - বর্তমানে তিনি সাধু সেজে এখান-ওখান থেকে টাকা ধার করে ও সেটা মেরে দিয়ে দুদিন অন্তর বাসা বদলান, স্ত্রী জীবিত থাকাকালীনও গুছিয়ে পরকীয়া করতেন, এবং এখন অল্পবয়সী মেয়েদের সঙ্গে ফেসবুকে 'বন্ধু হবে ডিয়ার?’ করে বেড়ান - এখন তিনিই আবার 'বাবা কেমন আছিস, মা কেমন আছিস’ করে দেখনদারি নাটক মারতে আসেন।


সত্য সেলুকাস, কী চুতিয়া এই আত্মীয় জাতটা!

Saturday, 11 October 2025

কবি, জীবনচরিতে আছো?

সভ্যতা, মানে যাকে আক্ষরিক অর্থে সভ্যতা বলা যায় আরকী – জ্ঞানচর্চায় এবং শিল্পচর্চার চচ্চড়িতে যার বিকাশ, সেই সভ্যতার আদিলগ্ন থেকে একটা ষাঁড়াষাঁড়ি বানের মতো মারামারি চলে আসছে এই ফান্ডামেন্টাল প্রশ্নটা নিয়ে, যে শিল্প আর শিল্পী, এরা এক এবং অদ্বিতীয়, নাকি এরা আলাদা আলাদা। সুদূর গ্রিস-রোম থেকে অধুনা গুগল ক্রোম, সব জায়গায় লোকে এই একটা প্রশ্নের সন্ধান করে এসেছে। সেই প্রশ্নটারই উত্তর নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রবল জলঘোলা হয়, বিশেষ করে যখন কোনো শিল্পী কোনো বিতর্কিত মন্তব্য করেন/কাজ করেন/আচরণ করেন৷ এই সমাজের এক সুধী নাগরিক হিসেবে যখন পৃথিবীর প্রতিটা বিষয়ে নিজের মতামত রেখে যাওয়ার গুরুভার নিজেই নিজের কাঁধে টেনে নিয়েছি, তখন এইটেই বা বাদ যায় কেন?

কিছু লোকের, বা আমার দেখা অধিকাংশেরই বক্তব্য, শিল্পী ভুল করতেই পারেন না। শিল্পী যদি ভুল করেন, তবে তিনি শিল্পী নন – তিনি কুলপি বা ঝুলপি, বা নিদেনপক্ষে তল্পি। কিন্তু শিল্পী কোনোমতেই নন৷ যিনি নারীবাদের উপন্যাস লিখছেন, তিনি মেয়েদের রাতে বেরোনো নিয়ে মন্তব্য করছেন; যিনি সাম্যবাদের গান লিখছেন, তিনিই রিকশাওয়ালাকে মস্তি করে খিস্তি দিচ্ছেন – এগুলো কী করে হতে পারে কাকা? নারীবাদ নিয়ে লিখছো মানে তুমি নারী বাদে অন্য কিছু ভাবতেই পারবে না। আরে পাগল, শিল্প আসলে কী? শিল্প হচ্ছে আবেগের উজালাজলে ভেজানো স্যান্ডো গেঞ্জি, যেটা নিংড়োলেই ফোঁটা ফোঁটা শিল্প ঝরে পড়ে। প্রতিদিনের রোজনামচাই শিল্প। আমরা প্রস্রাব করলে শিল্প, মলত্যাগ করলে শিল্প, মলে গেলে শিল্প, হাঁটলে শিল্প, হাঁচলেকাশলেনাচলে শিল্প। শিল্প জীবনের প্রতিটা পরতে টক্সিক এক্সের ন্যায় জড়িয়ে না থাকলে সেটার প্রতিফলন শিল্পে কীভাবে দেখা যায়? তারমানে শালা শিওর ভণ্ড৷ অতএব, ব্যাঅ্যাঅ্যাঅ্যান কর শালাকে, মুখে জুতো মার, তার গানবাজনাছবিলেখাসিনেমানাটক সব বয়কট কর। এরকম ভণ্ডকে মেনে নিই কীভাবে?

আমরা আসলে ভুলে যাই, বা ডিনায়ালে থাকি, আমরা মানুষরা সবাই কমবেশি হিপোক্রিট। এই যে সভ্যতার কথা শুরুতেই বললাম, সেই সভ্যতা, হাজারহাজার বছরের সভ্যতা আমাদের উপর একটা প্রলেপ তৈরি করেছে, যেটা আমাদের না-মানুষদের থেকে আলাদা করেছে। বিবর্তনের পথে আমরা মানুষ হয়ে এগিয়েছি ঠিকই, কিন্তু নিজেদের না-মানুষি প্রবৃত্তিকে তো রাস্তায় ফেলে রেখে আসিনি? সেইটার উপরেই একটা ভদ্রতার প্রলেপ, সামাজিক রীতিনীতির একটা মোটা প্রলেপ পড়েছে এতো হাজার হাজার বছর ধরে৷ সেই তৈরি করা একটা সামাজিক আমির সঙ্গে ভিতরের লুকিয়ে থাকা আমিটার সারাক্ষণ দ্বন্দ্ব চলতে থাকে – সেটা আপনি স্বীকার করুন, আর নাই করুন। এই দ্বন্দ্বের ফলস্বরূপই নানা আউটবার্স্ট ঘটে যায়, জিতে যায় আপনার পাশবিক প্রবৃত্তি – যা এই সমাজের, এই সভ্যতার মেকি পোশাকি নিয়মকানুন মানে না। আপনি সত্যি করে বলুন তো, আপনি বিশ্বাস করেন যে সেট অফ আইডিয়ালসে, সেগুলোর একটাও কখনো লঙ্ঘন করেননি? করেছেন৷ আপনি নিজেও জানেন, করেছেন। সেটা কি ঠিক? অবশ্যই নয়। এটা প্রাকৃতিক আর স্বাভাবিক। আর মজা হচ্ছে, আমরা যে হিপোক্রিট, এটা আমরা সবাই জানি – আর এই জানা থেকেই আমরা ভুগতে থাকি এক অপরাধবোধে, এক গিল্টে। তাকে গিলতে বা উগরোতে না পেরে আমরা শুরু করি ন্যায়বিচার – যার দায় বা দায়িত্ব কোনোটাই আমাদের কেউ দেয়নি। আমরা ঠিক করে নিই, এর কর্তব্য এই, তার কর্তব্য সেই। শিল্পী শুধু শিল্প বানাবে, সেই শিল্প পবিত্র, অপাপবিদ্ধ, নিষ্কলুষ – এবং শিল্পীও পুরো টাইড দিয়ে কাচা ঝাক্কাস মাল – মুখহাত ইত্যাদি যাই খুলবে, শুধু পবিত্র শিল্প বেরোবে, যা তার নিজের জীবনেরই প্রতিফলন।

ঠিক এই কারণেই, আমরা সহজেই বলে দিতে পারি – কোন গায়কের ‘ফাক ইউ’ বলা ‘মানায় না’ ; কোন গীতিকারের নোংরা গালাগাল দেওয়া অনুচিত; কোন অভিনেত্রীর ‘আজকাল সবাই ল্যাম্পপোস্টের নিচে দাঁড়ানো মেয়েদের মতো শাড়ি পরে’ বলা একদম বেঠিক (যদিও তারপরের লাইনেই সেই অভিনেত্রী জানিয়েছেন, তিনি সেই ল্যাম্পপোস্টের নিচে দাঁড়ানোর পেশাকেও সম্মান করেন, কিন্তু সবার সেই একই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত শাড়ি পরার ধরনকে তিনি পছন্দ করেন না) – অতএব এঁদের শিগ্গির বয়কট কর, ব্যান কর। এঁদের গান আজ থেকে শুনবো না, এঁদের লেখা পড়বো না, এঁদের সিনেমা দেখবো না। এঁদের শিল্পকীর্তি ভালো? হোক। যে মানুষ খারাপ, তার শিল্প আমি দেখি না – কারণ রাজহাঁসের পালক ছিঁড়ে ফেলে আমার জন্ম, গোয়ালাদের সঙ্গে বাজি ধরে দুধমেশানো জল থেকে চোঁ চোঁ করে দুধটা মেরে দিতে শিখেছি আমি।

প্রশ্ন উঠতেই পারে, এগুলো কি জাস্টিফায়েড? এঁদের কথা, কাজ, এগুলো? বহু শিল্পী তাঁদের ক্ষমতার ডায়নামিক্সের সুযোগ নিয়ে যাচ্ছেতাই নোংরামো চালিয়ে গেছেন – সেগুলোকে সাপোর্ট করবো? লাখো লাখো সত্যিকারের ‘মিটু’কে ‘আহা, শিল্পী ওরকম করতেই পারে’ বলে এন্যাবলিং করবো? যে প্রখ্যাত অভিনেতা পিডোফিলিয়ার অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়েছেন, সেটার মতো ঘৃণ্য কাজকে সাপোর্ট করবো? না। সেগুলো কেউ বলছে না। আপনি চাইলে করতেই পারেন সাপোর্ট, তাতে আপনার বিকৃত মানসিকতারই পরিচয় পাওয়া যাবে। কিন্তু, চশমা-আঁটা সমালোচক দাদাদিদিরা, আপনারা কখনো একটু নিজেদের দিকে তাকিয়ে দেখেছেন? ভেবে দেখেছেন, আঁতে ঘা পড়লে, অস্তিত্বসঙ্কট হলে আপনার মধ্যের পাশবিক প্রবৃত্তি কীভাবে হিংস্র হয়ে ওঠে সারভাইভালের জন্য? এই ব্যাপারটা প্রাকৃতিক – যেজন্য বিড়াল কোণঠাসা হলে উচ্চে পুচ্ছ তুলে ফ্যাঁস করে ওঠে, সাপ ফণা তোলে/ছোবল মারে, মৌমাছি হুল ফোটায় আর আপনি পলিটিকালি ইনকারেক্ট মন্তব্য করেন। ফাংশনিংটা একই, শুধু মেথডটা যার যার আলাদা। কিন্তু দাদাদিদিরা, চালুনি হয়ে সূঁচের ছ্যাঁদা দেখে যদি বলেন, সেলাই করতে সূঁচ ব্যবহার করবো না, কারণ তোর পিছনে ফুটো – ব্যাপারটা কীরকম হাস্যকর হবে বলুন দেখি?

একজন শিল্পীর শিল্পীসত্তা আর ব্যক্তিসত্তা, এইদুটো যে সম্পূর্ণ আলাদা আইডেন্টিটি, এটা আমরা বুঝতে চাই না, বুঝতে পারিও না। একটা মানুষের অনেকগুলো সত্তা থাকে – শিল্পীসত্তা তার মধ্যে একটা। কোনো মানুষই একমুখী নন, একসত্তাবিশিষ্ট নন – অজস্র টুকরোটাকরা কোলাজ জুড়ে তৈরি হন একজন মানুষ, যার মধ্যে প্রভাব রয়েছে তাঁর আর্থসামাজিক অবস্থানের, পারিপার্শ্বিকের, বংশগতির – এবং আরো নানা ফ্যাক্টরের৷ সেই মানুষের শিল্পীসত্তা হলো হিমশৈলের চূড়াবিশেষ – এমনকী যেটাকেও আমরা পুরো কোনোদিন দেখতে পাই না। প্রচুর ফিল্টারের মধ্যে ছেঁকে, প্রচুর কাটাছেঁড়াবাদদেয়াপরিবর্তন ইত্যাদির মধ্যে দিয়ে গিয়ে কতিপয় এন্ড প্রোডাক্ট আমরা পাই, আর ভাবি বিন্দুতে সিন্ধু দেখে ফেললাম। তারমধ্যে, সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে এখন ব্যক্তিগত বলে কিছুই নেই। আপনি বন্ধুদের সঙ্গে গালাগাল দিয়ে কথা বলবেন, সেটা চলবে – কিন্তু একজন শিল্পী তাঁর বন্ধুর ফোটোর তলায় একটা চারঅক্ষর লিখে কমেন্ট করবেন, এ ক্যামন নিরক্ষরতা? আপনি ভাবাবেগে কেঁদেককিয়ে একটা ভালোমন্দ কিছু করে ফেলেন প্রায়। একে তো শিল্পীর স্বাধীনতা একটা আস্ত ঘোড়াড্ডিম – সবাই কিছুতে না কিছুতে সারাক্ষণ অফেন্স নিচ্ছে। গালাগাল দিলে দোষ, ভালো কথা বললে দোষ, ছোটো জামা পরলে দোষ, বড়ো জামা পরলে দোষ, ধর্ম নিয়ে কথা বললে দোষ; তাঁর লিঙ্গ থেকে lingo, সবেতেই দোষ। তাঁরমধ্যে যদি সেই শিল্পী কোনো অপরাধ করলে আমরা সবাই বিচারকের আসনে বসে পড়ে হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে পিটিয়ে লাখো লাখো অর্ডার দিয়ে শিল্পী ও শিল্পের চারপাশে একটা বর্ডার টেনে দিই, একঘরে করে দিই। আমাদের সঙ্গে আগেকার দিনের চণ্ডীমণ্ডপ কালচারের খুব একটা পার্থক্য নেই – স্বভাব যায় না ম’লে।একটাই কথা বলার। শিল্পী অপরাধ করুন, বা আপনার তরুণ হিয়ার অরুণ ভাবাবেগকে ভেঙে পদমথিত করে যান, শিল্পকে কাঠগড়ায় তুলবেন না প্লিজ। শিল্প একবার শিল্পীর কাছ থেকে বেরিয়ে গেলে তা সম্পূর্ণভাবেই আমাদের সবার জন্য, তার উপর অধিকার আমাদের সবার। শিল্প নিষ্কলুষ – তার উপরে আপনার অকারণ বেঁড়েমির কাদাজল ছেটাবেন না প্লিজ। ঠিক যেমন, কবীর সুমন যাই আজেবাজে বলুন না কেন (যা অবশ্যই ক্ষমার অযোগ্য), একটা ‘তোমাকে চাই’ বা ‘আমি চাই’ বা ‘আমাদের জন্য’-র মতো গান নিরর্থক হয়ে যায় না – সে যতোই শিল্পীর গানের কথা আর ব্যক্তিগত জীবন বিপ্রতীপ হোক; বা অগুন্তি যৌন নির্যাতনের দোষে দুষ্ট কেভিন স্পেসি বা মার্লন ব্র‍্যান্ডোর ক্ষমার অযোগ্য অপরাধসত্ত্বেও ‘ইউজুয়াল সাসপেক্ট’-এর কাইজার সোজে বা ‘গডফাদার’-এর ভিতো কোরলিওনি-র অতুল্য অভিনয় আবিল হয়ে যায় না। দয়া করে, কবি (মানে শিল্পী)কে তাঁর জীবনচরিতে খোঁজার বদভ্যেস ত্যাগ করুন। শিল্পকে খোলামনে নিতে শিখুন, শিল্পীকে দূরে ঠেলে রেখে। শিল্পীর কোনো দায় নেই, ব্যক্তিগত জীবনে আপনার গুডবুকে গুডবয় বা গুডগার্ল হয়ে থাকার।

আর যদি সেটা না পারেন, মানে মনে করেন যে শিল্পীর শিল্প নির্ভর করে শিল্পীর ব্যক্তিগত জীবনের প্রতিফলনের উপর, তবে তো উল্টোটাও সত্যি হওয়া উচিত? তাহলে একটা কাজ করুন – যিনি খুব ভালো মানুষ, ভালো কথা বলেন ও কাজ করেন, তাঁর হাতে একটা তুলি ধরিয়ে বলুন, একটা ‘ক্যাফে ইন আর্লে’ এঁকে দেখাতে; যিনি NGO চালান, গরিব-দুঃস্থ-পিছিয়ে পড়া মানুষজনের জন্য কাজ করেন, তাঁর হাতে হারমোনিয়াম ধরিয়ে বলুন, একটা ‘মন হারালো হারালো মন হারালো’র মতো গান লিখে ও সুর দিয়ে দেখাতে; অথবা, যিনি খুব পশুপ্রেমী, তাঁকে বলুন একটা ‘লা দলচে ভিতা’ বানাতে। সেকী, আপনার মা দারুণ কুমড়োর ছক্কা রাঁধেন এবং মিষ্টি করে গল্প করেন সবার সঙ্গে, অথচ একটাও গান লেখেননি/সিনেমা বানাননি/অভিনয় করেননি/গল্প-উপন্যাস-কবিতা লেখেননি/ছবি আঁকেননি, নিদেনপক্ষে একটা দারুণ সেলাইয়ের কাজও বানাননি? ধুত, এমন করলে খেলবো না বলে দিচ্ছি, আব্বুলিশ!

Thursday, 4 September 2025

শিক্ষক দিবস...

 হে আমার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষকবৃন্দ,


আজ আপনাদের দিবস, এবং আজ আপনারাই the boss। এই দিবসের আহাউহু দেখে সকাল থেকে মন ভ’রে যাচ্ছে। শিক্ষকরা যে জাতির শিরদাঁড়া, দেশের গর্ব, সমাজের অহঙ্কার... আপনারা বাবা-মা, আপনারা গুরু, আপনারা সমাজ গড়ে তুলেছেন, আপনারা চলতে শিখিয়েছেন, জ্বলতে শিখিয়েছেন...আপনারা যে আসলে কী, তাই সকাল থেকে বুঝে উঠতে পারলাম না। আপনাদের দেখেই কি সুকুমার রায় লিখেছিলেন, “নই জুতা, নই ছাতা, তবে আমি কেউ নই!” ?


মাইরি বলছি, জানেন, আপনাদের প্রতি এতো প্রেম আমার আসে না। আমার জীবনে যেসব শিক্ষকদের আমি পেয়েছি, তারা শিখদের মতো কৃপাণ উঁচিয়ে আমাকে মারতে এসেছে, নয় খক করে কেশে চলে গেছে। শিখ ও খক, এই দুয়ের মিলন আমার জীবনে অন্তত ঘটেনি।


মুশকিলটা হলো, কিছু লোক আমার আগে জন্মে গেছে, আমার আগে একটা পরীক্ষায় বসেছে বা ইন্টারভিউ দিয়েছে এবং শিক্ষক হয়ে গেছে, হয়ে গিয়ে বেত এবং যা যা উঁচোনো যায়, সেইসব উঁচিয়ে হারেরেরে করে প্রবল শিক্ষকত্ব দেখিয়েছে। শিক্ষক এবং ছাত্র – এই দুইয়ের মধ্যে অদ্ভুত একটা ভেদরেখা টেনে চলেছে তারা। আমার কাছে শিক্ষক মানেই হলো প্রবল অহমিকা, ঠুনকো অহঙ্কার, কিচ্ছুটি বোঝাতে না পারার ক্ষমতা, অহেতুক সহজ জিনিসকে জটিল করা এবং বহুক্ষেত্রেই, প্রবল অশিক্ষা। অশিক্ষা না বলে যদিও কুশিক্ষা বলাই ভালো, কারণ তাদের যেটা আছে, সেটা শিক্ষার অভাব নয়; সেটা ভুল, খারাপ শিক্ষা।


হে মহামহিমমহামহোপাধ্যায় শিক্ষকগণ, আসুন, আমরা আজ আত্মসমালোচনায় বসি। শিক্ষক আসলে কী? জাতির গর্বটর্ব ওসব ঢপের কেত্তন রেখে, সোজা পয়েন্টে আসুন। আচ্ছা, আপনারা এটা কোনোদিন শিখতে পারেন না, শিক্ষকও আসলে একজন ছাত্র? শিক্ষকের আদিতে রয়েছে ‘শিখ্‌’ ধাতু, যার অর্থ শিক্ষা। শিখ শব্দের অপর অর্থ শিষ্য। আপনারা শিক্ষক হয়েই ভেবে নিয়েছেন, ব্যাস, আজ থেকে শেখা শেষ, আজ থেকে শেখানো শুরু। আরে আরে, দাঁড়ান মশাই! জানেন, ভালোর কোনো শেষ হয় না? আপনার থেকে অধিক শিক্ষিত(অ্যাকাডেমিকালি অন্তত)কারোর সামনে যদি আপনাদের দাঁড় করাই, তাহলেই তো জারিজুরি ফটাসডুম হয়ে যাবে। যে শিক্ষার বলে বলীয়ান আপনারা, সেই বল প্লাস্টিকের হালকা বলসম ভেসে উড়ে যাবে, যদি সেরকম জায়গায় পড়েন। কী ভাগ্যি, পড়তে হয় না আপনাদের!


আপনাদের ধারণা, ছাত্র মাত্রেই অশিক্ষিত। যে ছাত্র আপনার বলা সুরে গেয়ে যাবে, সেই আসল ছাত্র। চুপিচুপি বলি, তোতাকাহিনীর তোতা আসলে বিদ্যার ভারে নয়, আপনাদের দেখে হাসতে হাসতে দম ফেটে মজন্তালী সরকারের মতো পেট ফেটে মরেছিলো। হ্যাঁ, অবশ্যই কিছুক্ষেত্রে আপনারা বেশি জানেন, কারণ আর যাই হোক, কিছু বছরের অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান অন্তত আপনারা সঞ্চয় করেছেন। যদিও অনেকেই করেননি, তাদের প্রতি আমার করুণা রইলো। আচ্ছা, আপনার সামনে যে বসে রয়েছে, সে ঘাসপাতা চিবিয়ে বসে রয়েছে, শুধু আপনার তালে তালে ব্যা বা হ্যাঁ কিছু একটা করবে বলে, এমনটা ভেবে নেওয়ার দস্তুর কী? আপনাদের যখন যা ইচ্ছে মনে হয়, পড়িয়ে যান। আপনাদের ছাত্ররাও আপনাদের মতো, “তালে তাল দিয়ে যায় হ্যাঁ-হ্যাঁ বলা সঙ” – ফলে কেউ কিছুই প্রশ্ন করে না। আপনি Wastelandকে বলবেন পশ্চিমভূমি(Westland ভেবে), কারণ হিসেবে বলবেন, যে তা আসলে পশ্চিমের লোকজনদের নিয়ে তা লেখা; উইকিপিডিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ করে মুখস্থ পড়িয়ে যাবেন, ভাববেন কেউ ধরতে পারবে না; ডিরোজিওর ‘ইয়ং বেঙ্গল’এর সদস্য দক্ষিণারঞ্জন মুখোপাধ্যায়কে মিত্র মজুমদার বলে চালিয়ে দেবেন, তিনি ‘ঠাকুমার ঝুলি’র “লেখক” বলে। কতো বলবো? আমার জীবনে ৯০% প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষককে দেখলাম ভুল পড়াতে। তাও বেশ, ভুল পড়ানো মেনে নিলাম(যদিও ভুল পড়াবো কেন – এটাই বুঝলাম না, এইটুকু বেসিক রিসার্চ করে পড়াতে কী কষ্ট হয়), সেটা নিয়ে আপনারা আবার তর্ক করেন, যদি কেউ প্রতিবাদ করে, বা আপনাদের ভুলটুকু ধরিয়ে দেয়। এমনকী, যদি আপনাদের হাতে থাকে, আপনারা কারোর কেরিয়ারের ক্ষতি করতেও পিছপা হন না, এমনই আপনাদের ইগো। আপনারা হয়তো জানেন আপনারা ভুল (বা জানেন না, বইয়ের সঙ্গে সম্পর্ক বহুযুগ আগেই ঘুচিয়ে দিয়েছেন), তাও আপনারা স্বীকার করবেন না, যদি ছাত্র – যারা আপনাদের তুলনায় হীন, কীটসম যাদের অস্তিত্ব, তাদের কাছে যদি আপনারা ছোটো হয়ে যান! প্রসঙ্গত বলি, আমার এক শিক্ষককে একবার ফেসবুকে পোস্ট দিতে দেখেছিলাম, নিজেকে 'ছাত্র' মনে করা, মাথা ঝুঁকিয়ে ক্লাসে ঢোকা ইত্যাদি বড়ো বড়ো কথা বলে। সেই ভদ্দর(?)লোককেই আবার দেখেছি, তাঁর ক্লাসনোট ঝাড়া মুখস্থ লিখিনি বলে নাম্বার না দিতে, নাম্বার দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রবল পার্শিয়াল্টি দেখাতে, ছাত্রদের সঙ্গে মতবিরোধ হলে প্রবল ইগোসর্বস্ব হয়ে ঘুরে বেড়াতে, এবং লোকজনের ব্যক্তিগত ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করতে এবং নিজের ‘ক্ষমতা’ প্রদর্শন করতে। অন্তত আমি তার শিকার। বাকিরা হয়তো তাঁর নাম উচ্চারণ করলেই অজ্ঞান হয়ে ধপ্পাস করে পড়ে যাবে, তাঁর প্রশস্তিতে খান বিশেক বই লিখে ফেলতে পারে, আমাকে প্লেনে তুলে দেশান্তরে পাঠিয়ে দিতে পারে, বা নিদেনপক্ষে ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে শালিশালাজ তুলে গালিগালাজ করতে পারে। তাদের নিয়ে আমি বিন্দুমাত্র ভাবিত নই। সত্যের কাছে মাথা নত করার দায় আমার, আর কারোর কাছে নয়। নিরর্থক তোষণ আমার আসে না, ব্যক্তিপূজাও একদমই পারি না।  দুঃখিত, আপনারা শিক্ষক হওয়ার উপযুক্ত নন। একবার অন্তত মাথা ঝুঁকিয়ে বসুন, ‘আমি বেশি জানি’ – এই মোহ থেকে একবার বেরোন। নিজেকে ছোটো ভাবলে কেউ ছোটো হয় না, এটা একবার মাত্র বুঝুন। বেশি না, মাত্র একবার। সেটা শুধু মুখে বলা নয়, উপলব্ধি করা। মুখে ওরকম বলতে বা ফেসবুকে বাতেলা ঝাড়তে সবাই পারে।


 


অদ্ভুত ব্যাপার হলো, এই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষকদের বাদ দিলে, সবার কাছ থেকে আমি জীবনে নানা শিক্ষা পেয়েছি। না, আকাশ আমায় উদার হতে শিক্ষাটিক্ষা দেয়নি, বা বায়ুও আমাকে কর্মী হওয়ার মন্ত্র দেয়নি। বা, সবার আমি ছাত্র – এহেন দাবিও দিতে পারবো না। কিন্তু সবাই আমাকে কিছু না কিছু শিখিয়েছে, জীবনের শিক্ষা।


আপশোষ একটাই, জানেন। আমারও খুব ইচ্ছে করে আপনাদের জয়গান গাইতে, কিন্তু আপনারাই আপনাদের স্বভাবে ও শিক্ষকত্বের অভাবে অনেক দূরে চলে গেছেন। আমার বন্ধুরা জানে, ভালো শিক্ষকের ছাত্র হওয়ার আকুলতা আমার কতখানি, ভালো শিক্ষকের শিষ্যত্ব নিতে আমি কতখানি ব্যাকুল। সেই পিয়াসা মেটাতে পারলেন না আপনারা, এটাই দুঃখের।


যাকগে। আপনাদের গুরুপূজায় শামিল হতে পারলাম না, দুঃখিত।


 


ইতি,


আপনাদের এক দুর্বিনীত, অবাধ্য, অভব্য ছাত্র


অর্চিষ্মান



(অনেক বছর আগে লেখা। ফের পোস্টালাম।)

Monday, 25 August 2025

Let Me Say It Now by Rakesh Maria, IPS (retd.) : A Review

What do you do when you find yourself enmeshed by scores of spurious allegations pinpointing you? What do you do when you find yourself deep in a conspiratorial quagmire, where your own existence, integrity, morality is highly affected - taking a toll not only on you, but also on your near and dear ones? Do you keep mum, being a calm, composed and mature person - hoping ignorance will sew things up, or do you react to it? If you react, how do you do it? Do you vehemently oppose everything that had been thrown on you, or do you strike a balance between being polite and being firm? Do you write a book, or do you post on social media, or make a video about the whole fiasco that’s being untangled? What exactly do you do?


These were the exact thoughts which have been bugging me since I finished reading the autobiographical memoir, ‘Let Me Say it Now’, of a venerated IPS (retd.) officer and the ex top-cop of Mumbai police, Rakesh Maria. I have always taken a keen interest in administration - both civil and police, so this was indeed a must-read for me. Somehow this magnum opus of him, despite coming out in 2020, had missed my radar. Anyway, better late than never is the consolation I can provide myself with. 


The title aptly evinces that the auteur has something to ‘say’, to share with the audience that we readers are, and the time is ripe ‘now’ - which further betokens that he could not have done it before, as something must have prevented him from doing so. What could it possibly be? Well, evidently, his professional liability. The conditions and conventions of Mr. Maria’s service warrant a certain level of secrecy and confidentiality, which if not followed will jeopardise a lot of things. Hence, he committed himself to penning this only after he officially retired from the service, being a responsible person and policeman.


Simply put, the book is completely unputdownable. Picking up a 614-page book would be extremely challenging for me, thought I; however, from the very beginning, I was glued onto the pages. So much so that I flipped the pages till 5 AM today until the book was finished! 


Memoirs have a tendency to be blemished with an unnecessary amount of personal accounts and self-congratulatory narcissistic narrative. Obviously, everyone is the protagonist of his or her own life, so this is quite instinctive. However, one has to keep in mind while writing a memoir that it also requires to be neutral to a certain extent and engaging. Rakesh Maria, despite not being a seasoned author to the best of my knowledge, has mastered the art of this. His memoir, hence, is almost an unbiased account, albeit being dictated from his own POV. A book spanning 35 chapters, there are as little as possible mentions of his personal life - his family, his childhood etc. There ARE mentions of it, though. But, being an experienced civil servant, he does possess one great quality - balance. Hence, the accounts are extremely reticent and assiduously crafted, so as to give the reader an idea of his personal life, but to an extent that his personal life remained PERSONAL throughout. That is extremely commendable for someone to achieve in his maiden venture. 


In his illustrious career spanning 30 odd years, Rakesh Maria, being an IPS officer of the Maharashtra cadre has handled many important posts - Deputy Commissioner of Police (Detection), Crime Branch, Mumbai Police; Joint Commissioner of Police, Crime Branch, Mumbai Police; Commissioner of Police, Mumbai Police Commissionerate to name a few. What makes his account quite an intriguing one is his involvement in several cases that made it into the headlines for days, months, years on end and was of severe national as well as international importance. For example, 1993 Mumbai Serial Blasts - the first instance of Urban Terrorism that was played along the fault lines of religion and fissured the infamous Mumbai underworld; arrest of Sanjay Dutt for keeping illegal arms in possession under the TADA Act (in connection with the Mumbai serial blasts); arresting the infamous Mumbai underworld don Arun Gawli aka ‘Daddy’; crackdown of the Indian Mujahideen modules which were responsible for terror attacks and several blasts during the mid-2000s; the Sheena Bora murder case, the extremely sensitive and high-profile case during his tenure as the CP, Mumbai which (allegedly) caused his early promotion to DG, Home Guards so that he is (allegedly) removed from this case - and this deserves a separate discussion which I do not wish to indulge into for the sake of the future readers; and, obviously, the 2008 Mumbai Attacks, aka ‘26/11’. 


This voluminous work has been meticulously divided into different chapters in a manner that every incident or case gets due representation as per their proportional importance. Every detection, every chase, every mystery is so vividly painted that it becomes quite inclusive. The use of words, phrases, lucidity and his command of the language is something I am extremely in awe of, in all honesty. Mind you, this book is not penned by someone who is a regular columnist, an established author. Such an enjoyable read coming from someone who is deft in drafting chargesheets, crime reports, briefings and legal papers, is something that should take one aback. However, the only con that I can think of is delving into too many details and nitty-gritties of a case, which might be difficult to keep a track on for a regular reader who is not used to such accounts. 


Truth be told, I do not want to discuss what’s inside the book. The onus is on the readers to read and find out for themselves. It’s all about narratives - the side of the story that we are not privy to. The side of the story which needs to be told, for silence is not always golden.

Hence, let Mr. Maria say it now. 


PS: Will highly recommend this book. 

PPS: Thanks to maa for gifting me this book. 😊







 

Saturday, 1 February 2025

Late-night Meaningless Rambles

Dearest,  


I'm not sure whether I should address you by that anymore. Or anything, at all. I'm not even sure whether you exist. Did you, like ever, exist even? I can't really tell for sure. Your whole existence appears to be blurry - like a distant signal through the fog. Fog of memories, memories that I've locked secretly in a box. 


Why am I writing to you in the first place? I was not supposed to. Still, we tend to do things we are not supposed to - such as, me falling for you. We promised to each other, that come what may, we will fall together. It took me quite a long time to realise that I was the only one who fell - and nobody was there to pick me up. I was falling, and falling, and falling - frantically searching for your hand to hold me and pick me up - but it was nowhere to be seen or felt. Like my existence in your life, it too was something that was just inside my head. 


Someday, perhaps I will gather the courage to come out of this foggy hideout. It's very dampy here. The air is so heavy to breathe in. So heavy that I sometimes feel breathless. Not sometimes, but always maybe. Or maybe not. Certainty is not something I'm certain of. Someday, I will come out of this fog and be certain. Of everything. Of you. Of me. I will be forgetful of the fact that I brought you roses. I wrote you letters. You are the last one I wrote letters to. Now letters don't come to me anymore. I don't visit them anymore. The only thing that I know that I will not be writing letters anymore. Or bring roses. 


With an abstract feeling that can never be expressed, just felt -


Yours (in the past, at least)

.....

Wednesday, 22 January 2025

ভালো-বাসা

 আজকে আমার এক বান্ধবীর স্টেটাসে তার নব-নব প্রেমজীবনের একটি ক্ষুদ্র বিম্ববিশেষ দেখলাম। তার প্রেমিক তার ব্যাপারে কিছু গদগদ কথা লিখেছে, আর সে সেটার স্ক্রিনশট নিয়ে পোস্ট করেছে। সেই স্টেটাসে মিলেমিশে ছিল প্রেমের নিশ্চুপ গর্ব, অধিকারবোধের ভালোলাগা, প্রথম স্পর্শের শিহরণ। মজার ব্যাপার, হয়তো খানিকটা অপ্রাসঙ্গিকও - এককালে এই বান্ধবীটিকে আমার ভীষণই ভালো লাগত, এবং তার কথা অনুযায়ী, তাকে প্রথম ‘প্রেমপত্র’-ও নাকি আমিই লিখেছিলাম। 

তার স্টেটাসটা দেখে মনটা ভারি ভালো হয়ে গেল। আজকাল সোশ্যাল মিডিয়াতে আসতে ইচ্ছে করে না। প্রতিটি পোস্টেই সবাই সর্বক্ষণ গরলোদ্গীরণ করে চলেছে। নিজেদের যাবতীয় ইনসিকিওরিটি, হীনম্মন্যতা, জীবনজগতের সমস্ত খারাপটাই শুধু সমাজমাধ্যমে উঠে আসছে। প্রবল, প্রবল তিক্ততা। সেই তিক্ততা-অসূয়া-পরশ্রীকাতরতা-হিংসা-ঘৃণার পূতিগন্ধে সমস্তকটা ইন্দ্রিয় অসাড় হয়ে যায়। সেই সঙ্গে রয়েছে মিম-রিল-’শিটপোস্টিং’-এর আড়ালে চটুল-অবান্তর-নিরর্থক রসিকতা। মানুষের রুচিবোধ, সুকুমার বৃত্তিগুলো ভোঁতা হয়ে যাচ্ছে দিন দিন - অন্তত এমনটাই মনে হয় আজকাল। 

একই সঙ্গে রয়েছে প্রেমের প্রতি তীব্র বিবমিষাবোধ। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার তিক্ততার চশমাজোড়া দিয়ে জগতের সমস্ত প্রেম বিষবৎ ঠেকে মানুষের কাছে। সেইজন্যই ‘১৪ ফেব্রুয়ারি জোড়ায় দেখলেই ঢিল ছুঁড়ব’, ‘রাত জেগে মেসেজ করিস না, ও ঠিক কেটে যাবে’ শীর্ষক পোস্ট সমাজমাধ্যম ছেয়ে থাকে সর্বক্ষণ। হাহা দিয়ে ভরে থাকে সেইসব পোস্ট। সেই হাসিগুলোও বড্ড ফাঁপা শোনায়। এতো ঈর্ষা, এতো রিরংসা মানুষের মনে! সবাই সবাইকে সারাক্ষণ ঠকাবে, সবাই সারাক্ষণ সবাইকে আঘাত দেবে, পালাবে, অত্যাচার করবে, মন ভাঙবে… অনেককে এমনও বলতে শুনেছি, ‘যাকে চিনিনা-জানিনা, সে ইনস্টাগ্রামে ক্লোজড স্টোরিতে জোড়ায় জোড়ায় ছবি দিচ্ছে! বিরক্তিকর, ধরে ব্লক করে দিয়েছি!’ এতো অসহিষ্ণু আমরা? 

ঠিকই, জীবন ফুলেল বিছানা নয়। তাতে কাঁটা আছে বিস্তর। কিন্তু আমরা ভুলে যাই, কাঁটা আছে বলে, নেতিবাচকতা আছে বলেই জীবন এত সুন্দর। খারাপ বলে যদি কিছু না থাকত, ভালো মুহূর্তগুলোর আস্বাদন এতোটা সুস্বাদু হত না। বোনলেস চিলি চিকেন সুস্বাদু, কিন্তু একঘেয়ে। মাংসের হাড় চিবোনোর মধ্যেই প্রকৃত রসাস্বাদন থাকে। একঘেয়েমি থেকে আমাদের বাঁচিয়ে দেয় এই খারাপগুলো। 

এই অজস্র খারাপ-হিংসার মধ্যেই আমার বান্ধবীর করা ওই পোস্টের মতো ঘটনাগুলো বড্ড মন ভালো করে দেয়। এখনো মানুষ স্বপ্ন দেখে, প্রেমে পড়ে। ঘর বাঁধে, ভালোবাসে, ঝগড়া করে, অভিমান করে। অভিমান ভাঙায় উল্টোদিকের মানুষটা, সেটা জেনেই অভিমান করে। 

এইসব দেখলে নিজের ফেলে আসা সুখস্মৃতিগুলো মনে পড়ে যায়। প্রথম প্রেমের দিনগুলো, অজস্র অপেক্ষা, মানঅভিমান, স্বপ্ন দেখা একসঙ্গে, বোকা বোকা আচরণ, মনে থেকে যাওয়ার মতো হাস্যকর এবং অ্যাডভেঞ্চারাস কোনো কাজ, মানুষটাকে দেখার জন্য ক্লান্ত, ঘুমন্ত পায়ে অনেকটা দূর যাওয়া, তাকে দূর থেকে এক ঝলক দেখলেই অদ্ভুত প্রশান্তিতে মনটা ভরে আসা… 

সেইসমস্ত অনেক, অনেক পিছনে ফেলে রেখে এসেছি। মানুষের জীবনে প্রেম একবারই আসে, প্রেমের মতো প্রেম - যা জীবনকে দেয় মাহাত্ম্য, আর্তকে দেয় আশ্বাস, আহতকে দেয় বেদনার উপশম। আমার জীবনেও তা এসেছিল, কালের নিয়মে তা চলেও গিয়েছে। প্রেমের পূর্ণতা গোছের একটা অদ্ভুত হিসেব অনেকেই কষে - কিন্তু প্রেম মাত্রেই পূর্ণ, তার আবার কীসের পূর্ণতা? ৬ দিন হোক, কি ৬ বছর, কি ৬ জন্ম - প্রেম মাত্রেই প্রেম। ফুরিয়ে গেলে পরে সেই প্রেমেরই দরজা হাসিমুখে বন্ধ করেও দিতে হয়, দিয়েওছি তা। টুকরো স্মৃতির চন্দনকাঠের বাক্সে ঝুল পড়তে থাকে। তখনই এই সমস্ত পোস্ট চোখে পড়ে। আবার হাতড়ে হাতড়ে সেই চন্দনকাঠের বাক্স নামাই। ঝুলটুল ঝেড়ে সযত্নে রাখা স্মৃতিগুলোকে উলটেপালটে দেখি। নতুন প্রণয়ীযুগলের মধ্যে নিজেকে দেখতে পাই, নিজের ফেলে আসা সময়কে। ভালোলাগায় দ্রব হয়ে ওঠে মন। ভালো হয় যেন ওদের। সবার ভালো হোক। যারা ভালোবাসে, তাদের ভালো হোক। প্রেম মহার্ঘ্য বস্তু, তা যেন বেঁচে থাকে এভাবেই - যুগে যুগে, সময়ের প্রয়োজন অনুযায়ী নিজেকে বদলে। প্রেম আছে বলেই মানুষ আছে, এই প্রবল এবং তথাকথিত দুঃসময়ের মধ্যেও মানুষ আছে। সেই প্রেমকে দেখলে যারা দূর থেকে দাঁত কিড়মিড় করে, শাপশাপান্ত করে, নারী-পুরুষবিদ্বেষী নানা তর্ক তুলে এনে মানুষের মনকে বিষিয়ে দেয় - তাদের দেখলে করুণা হয়। বড্ড করুণা হয়। 

ভালো থাক ওরা। ভালো থাকুক ভালোবাসা। এই দমবন্ধকর সমাজে ওদের, এবং এরকম আরো অনেকের শত-শত ভালোবাসা অক্সিজেন দিতে থাকুক নিয়ত। আর হিংসুটেদের জন্য তো ইয়াব্বড় কাঁচকলা রয়েইছে! 🙂


Monday, 20 January 2025

To Presi, with Love..

 Dearest Alma Mater,

While penning this letter to you, I am already inundated by a plethora of emotions, which are likely to hold sway over my faculty of articulation. Cohesion, even though unwarranted in an informal write-up, is utterly imperative as it bespeaks perspicuity. However, as foretold, one can shun it while pouring one’s heart - some things are better left incoherent, for grey lets one delve deeper. Hence, pardon if you may, for the way I will be jotting this for you. You have always been accommodative, warm, and clement - this time too it should not be an exception, or so my expectations tell me. 

You are turning 208-year-young today. Aging like a fine wine, you have still managed to hold your head high amidst all the different kinds of debris that has been surrounding you all along this journey, ensuring your existence as the red oleander that you are. For all that, I was initially of the view that your presence must be very overbearing, intimidating. But, the more I had the privilege to explore, I realised it was never you, rather a select class of people that roam about your premises, the ones that carry your name to create an identity of their own, hitherto nonexistent. Certainly, the association with you is not merely an academic one, but also that of legacy, of history, of resistance, of the many voices that culminated into the collective consciousness that places you at an elevated altar of identity. Still, if an individual’s identity is replaced by that of you, then it is a bit problematic, and that leads to a different kind of socio-cultural intimidation, an identity elitism. Anyway, that is a lot of rant. I warned you, this is not going to be very cohesive. 

When I first stepped into the campus through that black iron-gate, which has now become a thing of yore - I felt very, very much at home. Yes, that certainly sounds very cliché, I know. But it is what it is. You did feel like home. Home, where there is comfort. But who knew that so-called would be so short-lived?

Before I could properly settle with the dynamic life that you offered, my reverie was shattered and I was stabbed with the sharp knife that reality is. The ones I considered friends, turned into foes overnight - or were they ever ‘friends’ per se? Maybe it was my naivety that I mistook amiability with friendship, smile with trust. And, as one must, I too had to pay for my naivety. I shifted the burden of blame on your shoulder and held you accountable for pushing me to my nadir. 

And then it rained. The rain of grief. Grief, that indicates the thawing of the Winter-snow of melancholia and embraces the Spring of acceptance that follows. Peace came dropping slowly, and I found myself lying on your ever-embracing comfortable lap. The quads (erstwhile basins) where I spent most of my time inside your premises, actually felt like your lap. It had that warmth, that coziness, that comfort, that motherly affection. It still has, I presume. It’s been long since I went there. I don’t think I belong there anymore. Nevertheless, that warmth of yours opened my eyes and epiphanic realisations hit me harder than my notion of reality that I knitted inside my head. 

You are not at all home. At least, to me, you are not home. Maybe to a lot of pretentious people you are, but to me, you are not home. Home is where comfort is, where peace is. And, lest one forgets, home is not just a construction of cement-sand-mortar-bricks. Such a lifeless building can never be a ‘home’. It’s always the people. It has always been like this. The people that you are surrounded with nowadays are the most toxic people one can even conceive of. Their actions, regardless of the intentions, ensure that the premises are never, never comfortable and homely for an individual. 

But, even if not home, you posed yourself as a mother to me. The suburb kid, with a head full of unrealistic expectations, was saved by you. Had you not exposed the true colours of what goes around and the so-called ‘Presidencians’, the journey of enlightenment would have been quite cumbersome. You always pushed me to waddle, but also watched my steps and carefully tagged along so that if I fell, I fell into your lap. Not sure if I should be grateful to you, or happy, or indifferent for this. Should I take you for granted, or should I thank you for your thankless role? 

Nonetheless - toast to the ‘mother’ who taught me to introspect, to alter my perspective and take things with a pinch of salt, and to keep my friends close - but enemies closer, so that they are befooled by the masquerade that I put on. The mother who taught me what 'life' really is. 

Once again, a very happy birthday to you, Presidency. It would have been quite impossible to have come this far. It really would have been. 

To infinity and beyond.

Love, 

Archisman


Saturday, 11 January 2025

৯৫-এ 'রাজনৈতিক' টিনটিন...

২০০৪ সাল। তখন আমার বয়স ঐ বছর ছয়েক। মা-ভল্টুর(মাতামহ) কল্যাণে ছোটো থেকেই বইপোকা ও বেঁড়েপাকা হওয়ার কারণে প্রতিবছরই খড়দহ বইমেলায় যেতুম। কলকাতা বইমেলা তখন একটা দূরতম দ্বীপ, তার আভাস বা নাগাল কোনোটাই এই মফস্বলে সেভাবে সাড়া জাগাতো না। চাকরিবাকরি এবং সংসার সামলে মা-বাবার পক্ষেও নিয়ে যাওয়া হয়ে উঠতো না। ফলে, খড়দহ বইমেলাই সই। এবং, সত্যি বলতে, খড়দহ বইমেলা তখন এখনকার মতো গেঁজে যায়নি, এবং বইমেলার মলাটের ভিতর খাদ্যসংস্কৃতি মেলা হয়েও ওঠেনি। তাই দুধের স্বাদ ঘোল বা পিটুলি গোলা জল নয়, অন্তত মিল্ক পাউডারে পুষিয়ে নিতে পারতাম দিব্য। 

২০০৪ সালেই সেই বইমেলাতেই প্রথম কিনে ফেলেছিলাম 'কাঁকড়া রহস্য'। কে টিনটিন, কেন টিনটিন - তার বিশেষ ধারণা ছিল না। শুধু চরিত্রগুলোর নাম কোনোভাবে জানতাম, সম্ভবত ফেলুদা পড়েই (সোনার কেল্লা - টুনটুনির নয়, টিনটিনের বই, টিনটিন ইন টিবেট ইত্যাদি দ্রষ্টব্য)। তখনও বাংলা গ্রাফিক নভেলের সেরকম রমরমা হয়নি। ফলে সাধারণ বাঁধাই, সাধারণতম কাগজেই সেই বই কেনবার সৌভাগ্য হয়েছিল। অ্যাসিড-ফ্রি পেপার জিনিসটা তখনো বাংলাবাজারে আসতে ঢের দেরি। স্মৃতি খুব বিশ্বাসঘাতকতা যদি না করে, তবে সেই টিনটিনটির দাম পড়েছিল ৭৫ টাকা। এখনকার হিসেবে কিছুই না, কিন্তু ২০০৪ সালের হিসেবেও সেটি বেশ মহার্ঘ্যই ছিল। কিন্তু আমাকে বই কিনে দিতে, বইয়ে দিতে আমার মা-বাবা-ভল্টু কোনোদিনই কার্পণ্য করেনি। ৫০ টাকার নিরর্থক খেলনা চেয়ে পাইনি, কিন্তু ৫০০ টাকার বই এককথায় কিনে দিয়েছে - এমন ঘটনা যে কতো হয়েছে, গুনে শেষ করতে পারব না। 

'কাঁকড়া রহস্য' সেই রাতেই উদঘাটন করে ফেলেছিলাম। নারায়ণ দেবনাথ অবধি তখন কমিকসের দৌড় আমার, সেখানে ওরকম একটা অন্য ধাঁচের জিনিস পড়ে রীতিমতো চমকে গিয়েছিলুম। একবার পড়েই ক্ষান্ত হইনি - বারবার, বহুবার করে পড়ে ফেলেছিলাম বইটা। মলাট ইত্যাদি আমার পড়ার চাপে খুলেও এসেছিল রীতিমতো। রীতিমতো মজে থাকতাম কারাবুজানের রহস্যে। মজার ব্যাপার, ক্যাপ্টেন হ্যাডকেরও আবির্ভাব সেই কাঁকড়া রহস্যেই। বালুখাঁড়ির আড়ালে লুকিয়ে থাকা অবস্থায় মদের বোতলে গুলি এসে ভেঙে যাওয়ায় একটা লোক ফাঁকা রাইফেল উঁচিয়ে কীভাবে 'বেবুন শুয়োর গণ্ডার জলহস্তী গেঁড়িগুগলির ঝাঁক' বলে একদল সশস্ত্র আরবকে তাড়া করে ভাগিয়ে দিয়ে নিজের মাথায় নিজেই রাইফেলের বাঁট মেরে অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছে - কাঁচা বয়সে সেই অভূতপূর্ব গ্রাফিক বিবরণের যে কী প্রভাব, তা লিখে বোঝানো অসম্ভব। ওই রসে যাঁরা সিক্ত হয়েছেন, তাঁরাই বুঝবেন সে কী অপূর্ব জিনিস। 

তারপরে টিনটিনের সঙ্গে বেশ বহু বছরই যোগাযোগ হয়নি। কাঁকড়া রহস্যটা মাঝে মাঝেই পড়েছি যদিও, তবে একটা সময়ের পরে সম্পৃক্ত হয়ে যায় সবকিছুই। ফলে টিনটিনপ্রীতি বেশ কমেই গিয়েছিল।

টিনটিনকে আবার নতুন করে আবিষ্কার করি মাধ্যমিকের পর। ২০১৪ সালে। পাক্কা দশ বছর কেটে গিয়েছে প্রথম টিনটিন কেনার পর। তখন বাংলা গ্রাফিক নভেলের উন্নতি হয়েছে, নীরেন্দ্রনাথ চক্কোত্তি অনূদিত টিনটিন আনন্দ পাবলিশার্সের অন্যতম বিক্রীত পণ্য হয়ে উঠেছে। অ্যাসিড ফ্রি কাগজ দিয়ে, ভালো মানের মলাট এবং বাঁধাই করে তখন তার দাম শ'দুয়েকেরও উপরে। ফলে, প্রথমেই বই না কিনে অনৈতিক পথের রাস্তা নিলাম - অর্থাৎ পিডিএফ। সহজেই ২৫টা টিনটিনের বাংলা অনুবাদের পিডিএফ পেয়ে গেলাম। একদম সোভিয়েত থেকে সেই শুরু, বর্ণশিল্প রহস্যে এসে শ্বাস ফেলতে পারলাম। সে যে কী অদ্ভুত নেশা, তা কেমন করে বোঝাই? তখন সবকিছুই টিনটিনের আলোতে দেখছি। দু'কামরার ফ্ল্যাট হয়ে গিয়েছে মার্লিনস্পাইক, শ্রদ্ধেয় হেডমাস্টারমশাইকে দেখে মনে হচ্ছে রাস্টাপপুলাস, ফিজিক্সের একজন স্যার তো একেবারেই প্রফেসর ক্যালকুলাস - তবে স্বভাবের দিক থেকে না যদিও, ঠাকুমাদের ফ্ল্যাটের নিচে একটা সাদা বেড়াল তখন আমার কাছে কুট্টুস (সাদা কুকুর খুঁজে না পাওয়ায় রেসিস্ট আমি রেজিস্ট করতে না পেরে সাদা বেড়াল ধরে এনেছিলাম), আমাদের হেলথ ইনশিওরেন্স করা কাকুটা জলিয়ন ওয়াগ, পাড়ায় সাইকেল ভ্যানে করে হরেক মাল বিক্কিরি করতে আসা কাকুটা অলিভিয়ের দি ফিগুয়েরা - এরকম আরো কত! 

কিছুদিন পর থেকে টিনটিন সম্বন্ধে হয়ে গেলুম সম্পূর্ণ অবসেসড। বাংলাটা তো গিলে এবং গুলে খাওয়া ছিলোই, ইংরেজিটাও পড়ে ফেললাম পর পর। এগমন্ট থেকে বেরোনো লেসলি লন্সডেল-কুপার আর মাইকেল টার্নারের সেই অনবদ্য অনুবাদ আসল ভাষায় টিনটিন পড়তে না পারার দুঃখ একেবারেই পুষিয়ে দেয়। অনেকটাই যদিও পুষিয়ে দিয়েছিলেন নীরেন্দ্রনাথ, বাকিটা ইংরেজিতে পড়ে একেবারেই কেটে যায়। টিনটিন-ট্রিভিয়া বিভিন্ন জায়গা থেকে সংগ্রহ করতে থাকি। টিনটিনের ক্যুইজ-ট্যুইজও করিয়েছি সেইসময়ে। 

এই ট্রিভিয়া সংগ্রহ করতে গিয়েই কিছু জিনিস জানতে পারি, যা পরবর্তীতে  আরো ভালোভাবে বোধগম্য হতে থাকে। টিনটিনের মতো রাজনৈতিক কমিকস যে খুব কমই আছে, সেই ব্যাপারটা বোঝার মতো চেতনা মাধ্যমিক-পরবর্তী সময়ে অন্তত হয়নি। সোভিয়েত দেশে বলশেভিকদের ক্রিয়াকলাপ, বেলজিয়ান উপনিবেশ কঙ্গোতে টিনটিনের 'পদার্পণ', অ্যাপারথেইড এবং নির্বিচারে প্রাণীহত্যা, মিশনারি স্কুলে পড়াতে গিয়ে ব্ল্যাকবোর্ডে লেখা 'বেলজিয়াম ইজ আওয়ার ফাদারল্যান্ড', ১৯২৯-এর গ্রেট ডিপ্রেশন পরবর্তী আমেরিকাতে মাফিয়ারাজ, আল কাপোনের মতো মাফিয়া গ্যাংলর্ডের চরিত্রকে তুলে ধরা (প্রসঙ্গত, কাপোনই একমাত্র বাস্তব চরিত্র, যাঁকে টিনটিনের পাতায় দেখা যায় - বাকি বহু চরিত্র বাস্তব চরিত্রের আদলে হলেও, নামসহ বাস্তব উপস্থিতি দেখা যায় না), মার্কিন ক্যাপিটালিজমের একটা অন্যরকম উপস্থাপনা, রেড ইন্ডিয়ান-সহ আমেরিকান উপজাতিদের প্রতি ব্যবহার, 'ব্লু লোটাস'-এ মাকডেন ঘটনার মধ্যে দিয়ে সাম্রাজ্যবাদী জাপানের আগ্রাসী নীতিতে চিনের মাঞ্চুরিয়া দখল-এর খণ্ডচিত্র, বা পিকারোদের সঙ্গে মিলে জেনারেল টাপিওকাকে অ্যাবডিকেট করানোর মধ্যে ফরাসি কমিউনিস্ট অ্যাক্টিভিস্ট রেজি দেব্রের শে গেভারার সঙ্গে মিলে কাজ করা বা চিলিতে সালভাদোর আলেন্দের সরকার প্রতিষ্ঠা করার মিল - এরকম লিখতে থাকলে অনেক কিছু লেখা যায়। অনেকেই সেই নিয়ে বিস্তর কালিকলম খরচা করেছেন, আমি নতুন কিছু যোগ করব না। 

টিনটিন আমাদের কাছে সম্ভবত এইজন্যই প্রিয়, কারণ টিনটিন বাস্তব। বাস্তব, কারণ রাজনৈতিক। রাজনৈতিক, কারণ ব্যক্তিগত এবং বিশ্ব - দুরকম সমস্যাই তাতে উঠে এসেছে। অ্যার্জেকে কেউ পলিটিকালি কারেক্ট বলবেন, সেটা বোধহয় নয়। শিল্পীর দায় থাকেও না। তবুও, অ্যার্জে সাহস করে তুলে ধরেছিলেন সমকালীন রাজনীতিকে, তাঁর আত্মবীক্ষা ও বিশ্ববীক্ষাকে। রাজনীতি সবকিছুই, কিন্তু রাজনীতির দ্বন্দ্বের আলো যেসকল শিল্পে এসে পড়েছে, সেইসকল শিল্পই কালের গণ্ডি পেরোতে সক্ষম হয়েছে। আজকে আবোলতাবোল বা হযবরল আমাদের প্রিয়, কারণ তা রাজনৈতিক। ব্যোমকেশ প্রিয়, কারণ তা রাজনৈতিক। অ্যাসটেরিক্স প্রিয়, কারণ তা রাজনৈতিক। রাজনীতি মানেই যে শুধু দলাদলি বা ভোটাভুটি - তা তো নয়; আরব বা আদিবাসী বা অশ্বেতাঙ্গদের সাধারণীকরণও রাজনীতি, টাপিওকা-আলকাজারের গৃহযুদ্ধ বা বর্দুরিয়ার অত্যাচারী কুর্ভি-তাশ সরকারের স্বৈরাচারও রাজনীতি। 'টিনটিন ইন সোভিয়েত'-এ বলশেভিকদের হাত থেকে পাঁউরুটি ছিনিয়ে একটা গরিব বাচ্চাকে দেওয়া - তাকে পাঁউরুটি না দেওয়ার কারণ এই, যে সে বলেছে সে কমিউনিস্ট নয় - সেটাও রাজনীতি। আমরা যতই কমফর্ট জোনে বসে থাকি না কেন, সভ্যতার শুরু থেকেই আমাদের মধ্যে রাজনীতিবোধ অত্যন্ত গভীরে প্রোথিত। অ্যাপলিটিকাল ধুয়ো তুলে বড়োজোর দায় এড়াতে পারি, কিন্তু শিশু-কিশোররাও যে সাহিত্য পছন্দ করছে, যে শিল্প উপভোগ করছে, তার মধ্যে রাজনীতি পরতে পরতে লুকিয়ে - এটা কীভাবে জাস্টিফাই করব?

টিনটিন অত্যন্ত, মানে অত্যন্তই পলিটিকাল। আর, সেই জন্যই, ৯৫ বছর পেরিয়েও চিরতরুণ টিনটিনকে আমরা ভুলতে পারিনা। টিনটিনের মধ্যে থেকে রাজনীতিটাকে ফেলে দিয়ে যাঁরা নেহাতই শিশুপাঠ্য কমিক্স হিসেবে পড়তেদেখতে চান, তাঁদের প্রতি সমবেদনা রইলো। 

শুভ জন্মদিন, ছোটোবেলার হিরো! 🙂




Tuesday, 24 December 2024

বড়ো দিন

বড়োদিন। দিনের কি আর বড়ো ছোটো আছে রে পাগল? এ দিন দীন বা বড়োলোক কোনোটাই না। কিন্তু, এই দিন-ই-ইলাহীতে এলাহী ব্যবস্থা হয়। স্বয়ং যীশুখ্রিস্টের হ্যাপিবাড্ডে বলে কথা! তার জন্মের সময়ে তিন বৃদ্ধ জ্ঞানী মানুষ উড়ে এসে ধূপচন্দন দিয়ে গেছিলো, যাদের ছোটোবেলায় মাগী বলতাম - যদিও পুরুষমানুষ কীভাবে মাগী হবে, এই ব্যাপারটা সাল্টে উঠতে পারতাম না (তখনও জেন্ডার নিয়ে ধারণা গড়ে ওঠেনি, woke বলতে ঘুম থেকেই জাগা বুঝতাম)। পরে যখন এক ইঞ্জিরিশিক্ষিত বন্ধু বুঝিয়ে দেয় যে ওটা ম্যাজাই, তখন মানবইতিহাসের এক অবোধ্য রহস্যের দ্বার চোখের সামনে উদঘাটিত হয়ে যায়। 

আমরা যারা কনভেন্টলালিত ও কলোনিপালিত নই, তাদের কাছেও বড়োদিন আর পাঁচটা দিনের থেকে অনেকটাই আলাদা ছিলো। যাদের কপাল এবং বাবা-মা ভালো ছিলো, তারা সান্তাক্লজের গিফট পেতো, এবং যাদের বাবা-মা এবং কপাল ভালো ছিলো না, তারা পেতো আমাদের সমবেদনা। এই সান্তাক্লজ আমার কাছে বিশ্বের ত্রয়োদশ আশ্চর্যের মধ্যে ছিলো। কাবুলিওয়ালা আফগান রহমতের এই কমিউনিস্ট ভাইয়ের ঝোলায় হাঁথির পাশাপাশি এতো কিছু কীভাবে যে ধরতো, যেটা নিয়ে সে বিশ্বময় শিশুর চাহিদা পূরণ করতে বেরোয় 'নিয়ে ঝোলা চললো ভোলা' গাইতে গাইতে, সেটা কোনোদিন বুঝিনি। তবে আমার দৃঢ় ধারণা ছিলো, সান্তাক্লজ বাংলা বোঝেনা। একবার চেয়েছিলাম রিমোট কন্ট্রোল ট্রেন, পেয়েছিলাম পথের পাঁচালী। আরেকবার চেয়েছিলাম টিনটিনের বই, পেয়েছিলাম শঙ্কু সমগ্র। দুবারই দেখেছিলাম, বইয়ের মধ্যে খড়দহ বইমেলার বিল। ভেবেছিলাম, সান্তা নিশ্চয়ই বইমেলায় স্টলগুলো বন্ধ হওয়ার আগে হাতের সামনে যা পায়, খাবলা মেরে তুলে নেয়। খারাপই লাগতো। একা একা একটা লোক, সন্ধে থেকে বিশ্বজুড়ে বাজারহাট করতে বেরোয়, এবং এদিকসেদিক হয়ে যায়। হয়তো কোনো জন্মান্ধ শিশুকে রঙিন গগলস গিফট করেছে, বা বধির কোনো শিশুকে নতুন ইয়ারফোন দিয়েছে, এমন ঘটনাও নিশ্চয়ই ঘটে। লাল কাবুলিওয়ালার প্রতি আমার মন মিনি-সম ম্যাক্সি সহানুভূতিতে পরিপূর্ণ হয়ে যেতো। আহারে, একটা লোক খান সাতেক বল্গা হরিণকে চাবকাতে চাবকাতে ঘণ্টা বাজাতে বাজাতে ভুঁড়ি নিয়ে চিমনি বেয়ে নেমে এসে (বাঙালি ঘরে কীভাবে আসে, খোদায় মালুম) গন্ধমোজার পাশে গিফট রেখে যায় অন্ধকারে। কী খাটনি ভাই। তাকে গালাগাল দিয়ে লাভ আছে?

কিন্তু, এমনও একদিন এলো, যেদিন খোঁখা সোসুরবাড়ির মানে বুঝে গেলো, ফলে সান্টা তখন কাবুলিওয়ালা থেকে ডিমোটেড হয়ে গেলো। কিন্তু তবুও, বড়োদিনের আনন্দ কোনোদিনই তেমন মাটি হয়নি। বড়োদিন মানেই রিচুয়াল ছিলো, ভল্টু (আমার মা'র বাবা) কেক আর কমলালেবু নিয়ে সকাল সকাল এসে বেল বাজাবে। খুবই আনন্দে কাটতো সারাদিন - পড়াশুনো তো নেইই, বরং তাধিন তাধিন করে দিনটা কাটানো যাবে। বিকেল বিকেল বেরিয়ে পড়তাম ভল্টুর সঙ্গে, স্কুলের বন্ধুদের জন্য গ্রিটিংস কার্ড কিনতে। আট আনা থেকে একটাকার যে অত্যন্ত প্যাতপ্যাতে, দেড় বাই দুই ইঞ্চির যে কার্ডগুলো, সেগুলো থাকতো সাধারণ বন্ধুদের জন্য। ৫-১০ টাকারগুলো থাকতো বেঞ্চের সদস্যদের জন্য। আর কুড়ি কি তিরিশ টাকার যে কার্ডগুলো, বেশ বড়োসড়ো, খুললে পরে কেক গাড়ি টেডি বেড়াল কুকুর হাতি কেল্লা ইত্যাদির ত্রিমাত্রিক জেল্লা দেওয়া কার্ডগুলো ছিলো বেস্ট ফ্রেন্ড যে, তার জন্য। আবার যদি হিসেবের বাইরের কেউ কার্ড দিতো, তার জন্য আবার গিয়ে কার্ড কিনতে হতো, সে যে দামের দিয়েছে, সেই দামের অনুপাতে। সম্পর্কের উপর ভিত্তি করে কার্ডের দামের অর্থনীতি সেই বালক, বা না-বালক বেলাতেই দিব্য বুঝে গিয়েছিলাম।

আমাদের মফস্বলের বড়োদিন আসলে এরকমই ছিলো কমবেশি। খৃষ্টে আর কৃষ্টে তফাত আছে কি নেই, এই নিয়ে চুলোচুলিও হয়নি কোনোদিন। আবার, বিশ্বায়নের জোয়ারে ভেসে গেলেও হুজুগে মাতিনি কেউ কোনোদিন। পার্ক স্ট্রিটে না এতো ভিড় হতো (যদিও লোকজনের জীবনে তখনো পুলক ছিলো, এখনকার মতো না হলেও), না 'যীশুখ্রিস্টের জন্মদিন কি পার্কস্ট্রিটে?' বলে অত্যন্ত উচ্চস্তরের হিউমার দেখানোর চল ছিলো। পার্কস্ট্রিটের ঝলমলে আলো, সাহেবিয়ানা, ক্রিসমাসের সাজ, অ্যালেন পার্কের সামনের ক্রিসমাস ট্রি - এগুলো সবই কেমন একটা অধরা স্বপ্নের মতো অপাপবিদ্ধ ছিলো, প্রত্যাশার আলোয় ভাস্বর। বড়োদিন মানে আমাদের কাছে ছিলো কাউন্টডাউন - নতুন বছর, স্কুলে ফেরত যাওয়া, আবার গল্প-খেলাধুলো, আবার পড়াশুনো শুরু - মার্চেই অ্যানুয়াল (তখন অদ্ভুত একটা সাইকেল ছিলো)। বড়োদিনের কেক ছিলো, কমলালেবু ছিলো, সান্তা ছিলো, নির্মল আনন্দ ছিলো - আর আমার কাছে আমার ভল্টু ছিলো। 

ভল্টু চলে গেছে অনেকদিন হলো। টেবিলে এখনো কেক আর কমলালেবু রাখা কালকের জলখাবারের জন্য। কিন্তু জানি না কেন, কেক আর কমলালেবু আর আগের মতো মিষ্টি লাগে না। কার্ড কিনতে হয় না - দেবো কাকে? রাতে বিছানায় শুয়ে ঘাপটি মেরে 'এই সান্তা এলো, দেখবো কেমন দেখতে' - ও করতে হয় না। সারপ্রাইজের আনন্দ অনেকদিন আগেই মুছে গেছে। মানুষের তো আর মৃত্যু হয় না, হয় ইনোসেন্সের; বাকি জীবনটা পরিপক্কতার সঙ্গে দ্বন্দ্ব লড়ে যাওয়া কেবল। আসলে, জীবনটাও এই বড়োদিনের মতোই। যতো বয়েস বাড়ে, ততো তার জৌলুস কমতে থাকে। তবুও কোথাও গিয়ে হলেও আমরা অপেক্ষা করে থাকি, যদি ঝুমঝুমি বাজিয়ে এক সাদাদাড়ি বুড়ো এসে এক মুঠো আনন্দ রেখে যায় মোজার ভিতরে। আমেন।




Monday, 2 December 2024

'যাক, যা গেছে তা যাক...'

 এখনকার ছেলেমেয়েদের (ব্যতিক্রম বাদে) গানের টেস্ট দেখলে কষ্ট হয়। ভাবলে হতাশ লাগে, এরা অখিলবন্ধু শোনে না, জটিলেশ্বর শোনে না, মানবেন্দ্র শোনে না, শ্যামল মিত্র শোনে না। মান্না দে, সুবীর সেন, হেমন্ত কিচ্ছু না। বড্ড হিসেবি এই জেনারেশন। এরা প্রেমে পড়ে না, প্রেম করে। 


এরা বলে না, 'সে আমার মনের মানুষ বলে, মরেছি অনেক জ্বালায় জ্বলে...'। এরা 'শুরু হল কবে, এতো চাওয়া-পাওয়া/একই অনুভবে, একই গান গাওয়া'-র আশ্লেষে ভাসে না আর। এরা প্রেমে পড়ে চিঠি লেখে না, 'এমন মাধবী রাতে আমায় যে মালা তুমি পরালে, যে মাধুরী দিয়ে মোর শূন্য জীবন তুমি ভরালে...'। এরা অঙ্ক কষে ভালোবাসে। তুমি দাও, আমিও দেব। তুমি করো, আমিও করব। প্রথম দেখার উদ্বেলতায় ওরা গেয়ে ওঠে না, 'ও কেন তখন উড়িয়ে আঁচল বিনা কাজে সামনে এল? দেখে তো আমি মুগ্ধ হবোই, আমি তো মানুষ!' মিলনাকাঙ্ক্ষায় এদের মাথায় খেলা করে যায় না 'ঝরনা কেমনে হয় নদী, সাগর না ডাকে কাছে যদি?'


ভালোলাগার মানুষটার উল্টোদিকে বসে কারোর আর 'না-বলা কথায় থরথর অধর কাঁপা..'-র অনুভূতি হয় না। কাছের মানুষটাকেই পেয়ে কেউ আর 'এই জীবনে যে-কটি দিন পাব, তোমায়-আমায় হেসেখেলে কাটিয়ে যাব দোঁহে, স্বপ্নমধুর মোহে'-র আকাঙ্ক্ষা করে না। এরা 'ক্রাশ' খায়, অথচ কেউ 'কী নামে ডেকে বলব তোমাকে, মন্দ করেছে আমাকে ওই দুটি চোখে' বলে না। এদের 'হার্টব্রেক' এবং 'ক্লোজার' হয়, কিন্তু 'ওই পথ দিয়ে বধূবেশে সেজে যেদিন গেল সে হারিয়ে, সেদিন আমার সজল হৃদয় দুপায়ে গিয়েছে মাড়িয়ে - যাক, যা গেছে তা যাক...' হয় না।


এদের অভিমানও হয়না। এদের অধিকাংশই যন্ত্রবৎ, যুক্তির ইঁট দিয়ে তৈরি। কেউ এরা বলে না, 'যখনই আসবে সে, তখনই যেতে হবে - আমি কি এমনতরো ফ্যালনা?'। বা, অভিমানে গেয়ে ওঠে না, 'ও রূপের মিথ্যে গরব অমন যদি বিরূপ থাকে, ও গুণের কী দাম বলো লাজেই যদি আগুন ঢাকে..'।  বলে না, 'এত সুর আর এত গান, যদি কোনোদিন থেমে যায়, সেইদিন তুমিও তো ওগো, জানি ভুলে যাবে যে আমায়...'। এরা বড্ড কাঠকাঠ।


এই সব গান আস্তে আস্তে হারিয়ে যাবে। যাচ্ছেও। কালকেই যেমন জানলাম, একটি বিশেষ খ্যাতনামা কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের পড়ুয়াদের কেউ 'তখন তোমার ২১ বছর বোধহয়' গানটা শোনেনি। এভাবেই আস্তে আস্তে হারাচ্ছে বাংলা গানের স্বর্ণযুগ, যেভাবে হারিয়ে যাচ্ছে প্রেম। হারিয়ে গিয়েছে প্রেম। হারিয়ে গিয়েছে ভালোবাসা, আবেগ, প্রেমে 'পড়া', একজনের প্রতিই অনুরক্ত থাকা। 'ভালোবাসায় শরীর আসা' বদলে গিয়েছে 'শরীরী ভালোবাসায়'। 


এভাবেই হারিয়ে যায় সময়। মরে যায় সময়। মৃত্যু হয় ইনোসেন্সের। আবেগের। মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে কঠোরকঠিন যুক্তি। 


'যাক, যা গেছে তা যাক...' :)

Sunday, 24 November 2024

বিদায়, পত্রাবলী...

ভার্চুয়াল চিঠি নিয়ে কদিন বেশ মেতে থাকা গেল যা-হোক। কিছু ভালো অভিজ্ঞতার পাশাপাশি, খারাপ লাগার রেশটুকুও রইলো।


আমাকে যাঁরা একটু হলেও চেনেন, তাঁরা জানেন চিঠি জিনিসটা আমার কতটা প্রাণের। আমি মনে করি, চিঠির থেকে সৎ, আপন এবং হৃদয়াবেত্তাসম্পন্ন লেখা আর কিচ্ছুটি হতে পারে না। যে আবেগানুভূতিকে 'ম্যাচিওর' মানুষজন ব্রাত্য করে রাখেন - মানে, ফেসবুক পোস্টে প্রবল আবেগ দেখান এবং ব্যক্তিগত স্তরে সেই আবেগকে নিয়ে ঠাট্টা-ইয়ার্কি মারেন - সেই আবেগানুভূতিকে সবথেকে স্পষ্ট, সহজ, সরল, রাখঢাকহীনভাবে কেউ যদি তুলে ধরতে পারে, তবে তা হল চিঠি। তার মধ্যে ভান নেই, কোনো লুকোচুরি নেই, নিজেকে মেলে ধরতে কোনো বাধা নেই। চিঠি একটা মানুষের মনকে যেভাবে তুলে ধরে, তা অত্যন্তই বেনজির - যেজন্য, আমরা কোনো মানুষকে জানতে গেলে, বিশেষ করে বিখ্যাত মানুষদের - চিঠি বা ডায়রির শরণাপন্ন হই।


এইজন্যই, বরাবর আমি চিঠি লিখতে ভালোবাসি। প্রথম চিঠি লিখেছিলাম একটি মেয়েকে, যাকে আমার পছন্দ ছিল। তখন পড়ি লোয়ার কেজিতে। মেয়েটি আমাদের ফ্ল্যাটেই থাকতো আর আমার সঙ্গে স্কুলে পড়ত। সম্ভবত এক ক্লাস উঁচুতে পড়ত সে। হারিয়ে-যাওয়া মামাবাড়ির বারান্দায় এক শীতের দুপুরে বসে বসে তাকে ৫ পাতার একটা চিঠি লিখেছিলাম, যাতে 'তোমাকে না দেখলে আমার খুব মন খারাপ করে, তুমি স্কুলে রোজ আসো না কেন, তোমার ওই লাল রিবন দিয়ে বাঁধা বেণী আমার খুব ভালো লাগে, তুমি চাঁদের মতো স্নিগ্ধ' ইত্যাদি লিখেছিলাম। কচি বয়েস থেকেই সুমন-মান্না শুনে গাছপাকা আমি চিঠিতে গানের লাইনটাইনও দিয়েছিলাম বিস্তর। সবই ভালো, কিন্তু সেই চিঠি তাকে আর সাহস করে দিয়ে উঠতে পারিনি। ব্যাপারটা মনে পড়লে এখন বেশ হাসিই পায়, তার মধ্যে আবার সামনের মাসে তার বিয়ে।


ভালোবাসলে চিঠি লেখা ব্যাপারটা সেই তবে থেকে আমার সঙ্গে অদ্ভুতভাবে জুড়ে গিয়েছে। কিন্তু, অদ্ভুতভাবেই - সেই অনুভূতিগুলো কোনোদিন ফিরে আসেনি আমার কাছে। কোনোদিন বললে হয়তো মিথ্যে হবে যদিও। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সেই অনুভূতিগুলোকে দেখেছি খোলা বাজারে বিকিয়ে যেতে। ভালোবেসে চিঠি লিখে উত্তর না পাওয়ায় যত না কষ্ট হত, তার থেকে বেশি খারাপ লাগতো সেই চিঠিগুলো নিয়ে উদ্দিষ্ট ব্যক্তির পরিচিতরা ঠাট্টা-তামাশা করছে। আবেগ, যা কিনা একান্তই আপন, সেই ধবধবে শ্বেতশুভ্র আবেগকে কুৎসিত তামাশার কালিঝুলি মেখে রাস্তায় পড়ে থাকতে দেখতাম।


তাও, হাল ছাড়িনি। লিখে ফেলতাম চিঠি। ভালোবাসলে চিঠির থেকে দামি আর কিছু হতে পারে, এমনটা মনে হয়নি কোনোদিন।


আমার প্রাক্তন প্রেমিকা আমাকে প্রথম প্রথম দুয়েকটা চিঠি লিখেছিল। তারপরে আস্তে আস্তে দূরত্ব বাড়ে। একটা চিঠির থেকে আরেকটা চিঠির দূরত্ব বাড়তে থাকে, বাড়তে বাড়তে চিঠিগুলো হারিয়ে যায়। আমি তবুও লিখতাম। থামাইনি। কখনো পড়ত সে, কখনো না। বেশিরভাগ সময়েই একটা 'তুই কী সুন্দর লিখিস!' মার্কা স্টক উত্তর তার ঠোঁটের গোড়ায় লেগেই থাকত। অথচ, আমি আমার লেখার প্রশংসা শুনতে চাইতাম না। চাইতাম, সে যেন পড়ে। আমাকে স্তোক দিতে নয়, ভালোবেসে। সেটার উত্তর লেখে। চিঠির উত্তর দেওয়া কি খুবই কঠিন? হয়তো নয়। কিন্তু, মনকেও সায় দিতে হয়। চিঠির উত্তর অঙ্ক নয়, যে জোর করলেই মিলবে।


তাকে শেষ চিঠিটা লিখেছিলাম গত বছর ডুয়ার্সে বেড়াতে গিয়ে। চিলাপাতার জঙ্গলে বসে ঝিঁঝিঁর ডাক শুনতে শুনতে, এক মনকেমন করা সন্ধেতে, অখিলবন্ধু শুনতে শুনতে তাকে চিঠি লিখেছিলাম।


সে পড়েনি। 'অত বড়ো চিঠি পড়তে ভাল্লাগছে না। পরে দেখা যাবে।'


পড়েনি আর সে। জানতাম, পড়বে না। আমিও অনুরোধ-উপরোধের পথ বহুদিন হলো হাঁটা বন্ধ করে দিয়েছিলাম, শান্তির জন্য।


শান্তি। কত ছোটো শব্দ, কিন্তু কী প্রবল প্রভাব তার। সারাটা জীবন, আমরা শুধু পাগলের মতো শান্তি খুঁজে চলি। পাই না কেউই। যে কোনো কিছুর বিনিময়ে আমরা শুধু শান্তি কিনতে চাই দুমুঠো, কিন্তু পাই না। সেই দাম চুকিয়ে দেওয়ার মতো ঋদ্ধ হতে পারিনা আমরা।


সে ছেড়ে যাওয়ার পরে নিজের মতো করেই একের পর এক না-পাঠানো চিঠি লিখে যেতাম। আমি নিজের চিঠিগুলোর অধিকাংশই কাউকে উদ্দেশ্য না করে লিখে যেতাম আগেও - 'ঠিকানাবিহীন চিঠি' নামে। সেরকমই লিখে যাচ্ছিলাম।


তখনই, ভালো লাগল একজনকে। যা হয়। একটা শূন্যতা ভরাট করতে গিয়ে ভালো লেগে যাওয়া। তাকেও পরের পর চিঠি লিখে গেছি। নিরর্থক। সে তার মতোই, দিব্যি চলে গিয়েছে। 'সময়েই যে যাওয়ার যায়, মেনে নিতে শিখেছি বিদায়...' সুমন লিখেছিলেন।


তারপরেও, তারপরেও ভালোবেসেছি। চিঠি লিখেছি। অপমানিতও হয়েছি। শুধু ভালোবেসে যে এতটা অপমানিত হওয়া যায়, তা জানা ছিল না। বন্ধুদেরকেও চিঠি লিখেছি। তারাও, দুয়েকজন বাদে, কেজো-কেঠো উত্তর দিয়েছে। কিন্তু, যাদের থেকে পাওয়ার ছিল, তারা কেউ ফিরিয়ে দেয়নি। সত্যিই, চিঠি লেখা বড্ড কঠিন। অনেক সময় লাগে। অনেক কষ্টস্বীকার। আবেগ-টাবেগের মতো ছেঁদো জিনিস মানায় না। আমার বয়সোপযোগীও নয়, পেশাপযোগী তো আরোই নয়।


একটা সময়ে হাল ছাড়তেই হয়। হার মেনে নিতে হয়। এগিয়ে যেতে হয়। নিয়েছি। চিঠি লেখা বন্ধ করে দিয়েছি। আমার ভালোবাসার চিঠিলেখাকে যত্ন করে চুল্লিতে ঢুকিয়ে দিয়েছি। নেড়েঘেঁটে তার নাভি নিয়ে ভাসিয়ে দিয়েছি গঙ্গায়।


ভালো থাক চিঠিরা। যে চিঠিগুলো কোনোদিন ঠিকানা পেল না, ভালোবাসা পেল না, উত্তর পেল না, প্রত্যুত্তর পেল না - তারা সবাই ভালো থাকুক। আমি না লিখলে যদি তারা ভালো থাকে, তবে তাই সই। 



জীবনে তো কত কিছুই ছাড়তে হয়। না হয়, নিজের সবথেকে আপন চিঠি লেখাটাই ছাড়লাম! অপমানের থেকে, অবহেলার থেকে, উপেক্ষার থেকে, তাচ্ছিল্যের থেকে তা অনেক ভালো।



তাই এই কদিন একটু এই চিঠি-নামের খেলনা চিরকুটে, বেনামী খেলায় মেতে ছিলাম। তার পালা মিটল। ধন্যবাদ, যাঁরা আমাকে লিখেছেন। যাঁরা লেখেননি, তাদেরও ধন্যবাদ। যাদের চিঠির আর উত্তর দেওয়া হবে না, তাদের কাছে দুঃখিত। তবে, কথা হবে, গল্প হবে। 


বিদায়, পত্রাবলী। :)  


'ঠাকুরমার ঝুলি'

 আজকে আমার ঠাকুমার মৃত্যুবার্ষিকী। ২০২১ সালের এই দিনেই তিনি গত হয়েছিলেন। এইটুকু পড়েই অনেকে হয়তো, 'ওঁ শান্তি, আত্মার শান্তি কামনা করি, তি...