Thursday, 25 July 2024

ঠিকানাহীন চিঠি - ১০

প্রিয়তমা পত্রাবলী,


তোমাকেই উদ্দেশ্য করে এবারে একটা চিঠি লিখে ফেলছি। ব্যাপারটা কি খুবই মাছের তেলে মাছ ভাজা, গঙ্গাজলে গঙ্গাপুজো মার্কা হচ্ছে? সেটা না হলেও, নিতান্তই অ্যাবস্ট্রাক্ট, বিমূর্ত একটা ধারণাকে ভাষ্যরূপ দেওয়ার অক্ষম চেষ্টাই কি আমি করছি না? তুমি তো কেবলই চিঠি, শুধুই বার্তার আদান-প্রদান তোমার কাজ৷ তোমাকেই কেন লিখতে বসেছি আমি তাহলে?


তোমার সঙ্গে চেনা বহুদিনেরই৷ স্কুলে পড়ার সময় থেকেই মেরে-ধরে তোমার অস্তিত্বকে মাথায় ঢোকানোর চেষ্টা করা হতো। কিন্তু, ব্যাপারটা অতোটাই কি সোজা? অতো সহজেই তোমাকে চিনে যাবো? তোমাকে একটা কাঠামোতে বেঁধে ফেলা হয়েছিলো শুরু থেকেই। সেই কাঠামোতেই কাটিয়ে গেছিলাম বহুদিন, বহুযুগ ধরে। বাঁধাধরা এক গতের বাইরে, নিয়মনীতির ক্রিসক্রসের বাইরে গিয়ে তোমাকে চিনতে পারিনি৷ দেরি হয়ে গিয়েছিলো অনেক, বা হয়নি। কে জানে! অনেক জানা-না জানার, বোঝা-না বোঝার আপেক্ষিক কাঁটাতারের এপারে-ওপারে নিরর্থকই আমরা এক্কাদোক্কা খেলে চলি, যার নিট ফল হয় শেষমেশ শূন্য। 


বুদ্ধদেব গুহ-র লেখা পড়তে গিয়ে তোমার সঙ্গে প্রথম ঠিক করে মোলাকাত। এভাবেও তোমাকে ভাবা যায়? এভাবেও তোমাকে নিরাভরণ, নিরাবরণ করে তোমার শরীরের ওমে নিজেকে সঁপে দেওয়া যায়? যেই বয়েসে পৌঁছোলে মন এবং শরীর, দুইই হঠাৎ করে মাথা চাড়া দিয়ে বেড়ে উঠতে থাকে, সেই বয়েসে পৌঁছে তোমাকে খুঁজে পেলাম - শুরু হলো নতুন করে তোমাকে চেনা। ‘জানা’ ব্যাপারটা তখনো আসেনি। তখন তোমার মুগ্ধতায় নতুন করে গা ভাসাচ্ছি। আমার সব প্রতিরোধ, সব আমিত্ব, আমার সব অস্তিত্ব-অনস্তিত্ব ভেসে যাচ্ছে তোমার মোহনায় - অথচ মোহ না, এটাই বা বলি কীভাবে? তোমাতেই ডুবছি, তোমাতেই ভাসছি। 


তোমাকে প্রথম জানার সুযোগ হলো সাহিত্য নিয়ে অ্যাকাডেমিকালি পড়তে গিয়ে। নানারকমের প্রকরণের ব্যাপারে পড়তে গিয়ে এপিস্টোলারি রাইটিং নিয়ে পড়তে হয়েছিলো, এবং অবশ্যই তার কাটাছেঁড়া৷ সেইসব করতে গিয়েই তোমাকে আক্ষরিক অর্থে ‘জানা'টা হলো।


জানো, তুমি একেবারে, এক্কেবারে আলাদা। সবার থেকে। তুমি হয়তো বলবে, ন্যাকামি করছি। নিছকই স্তুতি এ, নেহাতই কথার মালা গাঁথা। কিন্তু, আমি বলার জন্যই শুধু বলছি না। 


অন্যান্য প্রকরণ, বা ফর্মে আমরা ঠিক ‘আমি’ হয়ে উঠতে পারি না। নিজেদের অনেক টুকরো করে ছড়িয়ে দিই সেইসব লেখায় ইতস্ততভাবে। কবিতায় তাও খানিকটা সুযোগ থাকে, ‘আমি’ হয়ে ওঠার - কিন্তু, কবিতা ব্যাপারটাই যে সবথেকে বেশি ফ্লুইড! ফলে, কবিতাকে এর বাইরেই রাখছি। কিন্তু, তোমার কাছে এসেই একমাত্র আমরা মাথা হেঁট করতে পারি, নিজেকে বিকিয়ে দিতে পারি, বুঁদ হতে পারি, সঁপে দিতে পারি। নিজেকে তুলে ধরতে পারি। ‘ছিন্নপত্র’ পড়তে গিয়ে সবথেকে বেশি দেখেছিলাম এটা। রবীন্দ্রনাথ এক জায়গায় লিখছেনও, “...তোকে লেখা এই চিঠিগুলোয় আমার মনের ভাব যেভাবে প্রকাশ পেয়েছে, তা আর কোথাও হয়নি।” প্যারাফ্রেজ করলাম সম্ভবত - ভার্বাটিম একদম খেয়াল নেই, তবে মোটমাট ভাবটা এটাই ছিলো। ব্যাপারটার সঙ্গে আমি একেবারে, একেবারে সহমত। আগেরদিন আমার এক বন্ধুকে বলছিলামও, জানো, যে রবীন্দ্রনাথের সারাজীবনের শিল্পকর্মের জিস্ট হলো ‘ছিন্নপত্র’৷ শুধু ওই চিঠিগুলো লিখেই যদি তিনি সব ছেড়ে দিতেন, তাহলেও ওঁর ভূমিকা কিছুমাত্র কম হতো না। কেন? কারণ, এই চিঠিগুলোতেই উনি সম্পূর্ণ, সম্পূর্ণ স্বচ্ছ৷ তোমার কাছে এসেই আমরা স্বচ্ছ হতে পারি, নিজের ভিতরের সব উজাড় করে দিতে পারি। তোমার কাছে আসি দুদণ্ড শান্তির উদ্দেশ্যে, দুফোঁটা অমৃতের সন্ধানে, নিজেদের বুকের চাপচাপ দুঃখ মন্থন করে বহুদিনের জমে থাকা গরল উদগীরণ করতে। 


তোমার কাছে তাই ফিরে গেছি বার বার, হয়েছি চূড়ান্ত ভালনারেবল - যদিও, এসব ভাল না রে, বল? জানি, একদম ভালো না। কিন্তু আর কেউ অন্তত চুপটি করে শোনেনি, ভরসা যোগায়নি৷ যখন নিজেকে উজাড় করে দিয়েছি তোমার মধ্যে, সম্পৃক্ত হয়ে গেছি, তখনও প্রশ্রয় ছাড়া আর কিচ্ছুটি পাইনি। নিজের অব্যক্ত অনুভূতিগুলোকে তোমার কাছে ছুঁড়ে মেরেছি নিষ্ফল আক্রোশে, তুমি মুচকি হেসে সেগুলো কুড়িয়ে নিয়ে ফুলের তোড়া করে আমার হাতে তুলে দিয়েছো, যাতে তা অন্যের হাতে তুলে দিতে পারি। কী মজা জানো, সেগুলো যাদের হাতে দিয়েছি, তারা হয় সেগুলো দূরে ছুঁড়ে ফেলেছে, নয়তো অবহেলা করে ফেলে দিয়েছে, নয়তো খুব স্বাভাবিকভাবেই নিয়েছে। নাহ, তোমাকে যেভাবে আমি দেখেছি, তারা কেউ সেভাবে তোমাকে দেখেনি - বা, দেখলেও, সেটা আমার জন্য দেখার কথা ভাবেনি তারা। জানি, আক্ষেপ করা উচিত নয়, কিন্তু তবুও - এই ক্ষণিকের বুদবুদ-জীবনে এতোটা অপ্রাপ্তি থাকাও বোধহয় ভালো নয়। আমরা কেউই সব পাইনা। কেউ না - সে যতোই বড়োলোক হোক, গরিব হোক, যাই হোক না কেন। আমরা সবাই কাঁধে করে অপ্রাপ্তির এক ঝোলা বয়ে নিয়ে চলেছি, চলেই যাচ্ছি - কারোরই মনে হয় না, একে অপরের সঙ্গে সেই ঝোলাটা বয়ে নিয়ে বেড়ানোটা ভাগ করে নিই, যাতে বেদনাটা কিছুমাত্র কমে, এই তারাখসা যাপনের প্রতিটা অণুপল যাতে স্মরণীয় হয়ে উঠতে পারে। 


জীবনে অসংখ্য ভুল করেছি, জানো৷ মানিয়ে নিতে নিতে, মানাতে মানাতে, সইতে সইতে পাথরের মতো হয়ে গিয়েছি৷ নিজের পরিচিত আমিটাকে বহুদিন আগেই কোথায় হারিয়ে ফেলেছি - বহু ছায়াপথ দূরে, কোথায় যেন সে এক বিস্মরণের অতলে আস্তে আস্তে ডুবে যাচ্ছে, যাকে আমি খুঁজেই পাচ্ছিনা আর। নিজের সমস্ত আমিটাকে হারিয়ে ফেলে ছায়াময় হয়ে উঠেছি তাই এখন। ছায়া বলেই বোধহয়, আলেয়ার পিছনেই পাগলের মতো ছুটে মরি, জাটিংগা পাখির মতো আগুনে গিয়ে ঝাঁপ দিই - স্বাহা। তবুও, তোমার কাছে প্রতিবার ফিরে গেছি, ফিরে যাই৷ এই নিষ্ফল আকাঙ্খার খুচরো জীবনে যেটুকু কড়ি নিয়ে ঘর করি, তার ঝাঁপিতে আছে তোমারই মায়াকাজল মাখা পরশ৷ তোমার জন্যই ঘরে ফিরতে ইচ্ছে করে সন্ধে হওয়ার আগে। 


থেকে যেও পারলে। জানি, থাকবে। কেউ না থাকলেও তুমি থাকবে। খুব পছন্দের এক মানুষও হারিয়ে যাওয়ার আগে বলে গিয়েছিলো, ‘Archisman means letters to me.’ এটুকু মাধুকরী নিয়েই যেন এই অসীমের পথটুকু পেরিয়ে যেতে পারি৷ আমার সমস্ত অস্তিত্বটাই যে তোমার মধ্যে ধরা রয়েছে!


ভালোবাসা নিও৷ সমস্ত বোঝাকে বোঝার জন্য ধন্যবাদ দিয়ে ছোটো করতে চাইনা।


ইতি,


তোমার একান্ত আপন…

No comments:

Post a Comment

Luxury v/s Comfort - A ‘Food’ for Thought

In the 2022 culinary-thriller The Menu, the climactic scene was knitted with sheer artistic brilliance, and was extremely symbolic. The male...