আমার জীবনে উদ্ভট, বিচিত্র, অদ্ভুতুড়ে ঘটনা খুব কম কিছু ঘটেনি। মজার ব্যাপার হলো, সেই ঘটনাগুলোর অধিকাংশই ঘটেছে আমার গ্র্যাজুয়েশনের ৩ বছরে। খুব ইচ্ছে আছে, ঘটনাগুলোকে লিপিবদ্ধ করে রাখার। কিন্তু লিখতে পারি না বলে সেগুলো আর সেভাবে হয়ে ওঠে না। তবুও, কুঁজোরও তো চিত হয়ে শুতে ইচ্ছে করে, নাকি? সেরকমই একটা ঘটনা নিয়ে লেখা।
আমি স্কুল বা কলেজ, দুটোই ভাগ্যক্রমে শতাব্দীপ্রাচীন পেয়েছি। স্কুল তৈরি হয়েছিলো ১৮৩৭-এ, তৎকালীন বড়লাট লর্ড অকল্যান্ডের ভগিনী লেডি এমিলি ইডেনের বদান্যতায় - ফলে স্কুলের ১৭৫ বছরের ভরসা-ফূর্তি দেখেছি; আর, কলেজ তৈরি হয়েছে ১৮১৭-তে - সেখানে যদিও কোনো একটি বদন না, অনেক বদনের বদান্যতা ছিলো - তারও ২০০ বছরের ভরসা-ফূর্তি দেখেছি। যাইহোক।
কলেজের দ্বিশতবর্ষ, মানে বাইসেন্টিনারির সময়ে তখন বেশ লায়েক হয়ে গেছি, always surrounded by senti naari(s)। যাইহোক - ২০১৭-র জানুয়ারি মাস, ফার্স্ট সেমের শেষ, চারপাশে বসন্তের সুড়সুড়ি, জানুয়ারি মাসের ঈষৎ-শীত ভাব, সবমিলিয়ে মাখোমাখো ব্যাপার। বাইসেন্টিনারির চক্করে সারাক্ষণই ভালোমন্দ খেয়ে বেড়াচ্ছি। ক্লাস চুলোয় গেছে (এমনিও গেছিলো), ভবিষ্যৎকে কালের গর্ভে ফেলে রেখে গর্বের সঙ্গে ঘুরে বেড়াচ্ছি ক্যাম্পাসে, পাশে বন্ধুদের পাশে বেঁধে। প্রতিদিনই কেউ না কেউ বিখ্যাত লোক এসে বক্তিমে ঝাড়ছেন। প্রণব মুখুজ্যে, মনমোহন সিং - কে আসেননি!
আরো দুজন বিখ্যাত লোকও এসেছিলেন। তাঁদের নিয়েই এই মজার ঘটনাটা।
তখন ক্যাম্পাসে লোহিয়ারাজ চলছে। কর্পোরেটাইজেশন শুরু হয়ে গেছে ভালোই, চারপাশে রেনোভেশনের নামে হোয়াইটওয়াশও সুন্দর চলছে। সিকিওরিটি গার্ডরা ভিসা অফিসের থেকেও গুরুত্ব দিয়ে আইকার্ড, আধার কার্ড, রেশন কার্ড, মাধ্যমিকের অ্যাডমিট, ড্রাইভিং লাইসেন্স, পাসপোর্ট ইত্যাদি চেক করে, গায়ে মেটাল ডিটেক্টর, গাইগার-ম্যূলার কাউন্টার, সিজমোমিটার ইত্যাদি বসিয়ে মেপে তারপর ঢুকতে দিচ্ছে। কলেজে ঢুকছি না পোখরান - এ বুঝতে বুঝতেই প্রাণ হয়রান, আর এভাবেই দিন গুজরান।
একদিন মূল ফটকের কাছের গাড়িবারান্দা, যাকে আমরা ভালোবেসে 'পোর্টিকো' বলে ডাকি, সেখানে সকাল সকাল দাঁড়িয়ে রাজা-উজির মারছিলাম। হঠাৎ গেটের সামনে দেখি কীসব তর্কাতর্কি চলছে সিকিওরিটি গার্ডদের সঙ্গে দুয়েকজন বৃদ্ধের। মাথা গলাতাম না। এরকম ক্যাচাল সারাক্ষণই কোথাও না কোথাও হচ্ছেই। হঠাৎ কী মনে হতে একবার তাকালাম, আর তাকিয়ে ভালো করে দেখেই স্ট্যাচু হয়ে গেলাম। অ্যাঁ!? ইনি?!
আর্গুমেন্টেটিভ ইন্ডিয়ান-এর এরকম হাতে-কলমে উদাহরণ পেয়ে যাবো, ভাবিনি।
দৌড়ে গেলাম গেটের কাছে। অশীতিপর এক বাঙালি বৃদ্ধ, আর তাঁর সঙ্গে বছর ষাটেকের এক ফরাসি প্রৌঢ় - এদেরকে সিকিওরিটি গার্ডভাই চমকে যাচ্ছে। অশীতিপর বৃদ্ধ খুব কাঁচুমাচু মুখ করে রয়েছেন, বোঝানোর চেষ্টা করছেন
- 'না, মানে বোঝো তুমি একটু..'
- 'ওসব হবে না বললাম তো! অ্যালুমনাইয়ের কার্ড নাই?'
- 'না, সেটা তো নেই..'
- 'পাস আছে?'
- 'না, তাও তো নেই। কিন্তু তুমি একটু শোনো ভাই..'
- 'না শুনবো না। আমাদের স্ট্রিক্ট অর্ডার আছে, যেই হোক না কেন, কার্ড ছাড়া বা পাস ছাড়া ঢোকানো যাবে না। অনেকেই এসব বলে ঢুকে পড়ে। একদম হবে না। আমার চোখ এড়িয়ে একটা মাছিও গলতে পারে না!'
ফরাসি সেই ভদ্রলোক নাক ঝাড়লেন। পরে বুঝলাম, মাতৃভাষায় কিছু একটা বললেন। এদিকে বৃদ্ধ খুবই নার্ভাস হয়ে পড়েছেন। কীসব বলছেনও দেখলাম ফরাসিবাবুকে। আমি সিকিওরিটি গার্ডকে গিয়ে বললাম,
'আরে দাদা, যেতে দাও এঁদের!'
সিকিওরিটি দাদা চেনা। আমাকে বললো,
- 'আরে ভাইপো, না গো। ম্যাডামের আর স্যারের স্ট্রিক্ট অর্ডার আছে, কাউক্কে ছাড়া যাবে না।'
- 'আরে, এঁদের আজ বক্তৃতা আছে ডিরোজিও-তে। আমি বলছি তো। দরকারে ফোন করে নাও। এঁদেরকে নিতে লোকই বা আসেনি কেন?'
সিকিওরিটি দাদা গাঁইগুঁই করে ঢুকতে দিলো ওঁদের।
'ঠিক আছে, ভাইপো বললো বলে আপনাদের যেতে দিচ্ছি। চলে যান এখন।'
আর তখনই দেখলাম, যাদের অনেক আগে থেকে পুষ্পস্তবক ইত্যাদি নিয়ে, লাল মাদুর বিছিয়ে দাঁড়ানোর কথা, তারা দৌড়ে দৌড়ে আসছে। কোনো এক কমিউনিকেশন গ্যাপ এবং কলকাতার মারকাটারি ট্রাফিকের ফলে টাইম-স্পেসজনিত বেশ গলদ হয়ে গিয়েছিলো।
বৃদ্ধ ও প্রৌঢ় আমাকে 'থ্যাঙ্কিউ' ইত্যাদি বললেন। আমি দুজনকেই বললাম, 'কী বলছেন সারস! এতো বিনয় কেন? আমার সৌভাগ্য যে এটুকু করতে পেরেছি আপনাদের জন্য।'
দুজনেই হেসে এগিয়ে গেলেন। বৃদ্ধ এগোনোর আগে আমার কাঁধে হাত রেখে, জনান্তিকে শুদ্ধ বাংলায় বললেন,
"কী বানিয়েছো গো!"
এই মহামানবের সঙ্গে এহেন এনকাউন্টার আর কারোর হয়েছে বলে তো মনে হয় না। সৌভাগ্য হিসেবেই ধরি এটাকে।
প্রৌঢ় আর বৃদ্ধের পরিচয়? প্রৌঢ় হচ্ছেন বিখ্যাত ফরাসি অর্থনীতিবিদ জঁ টিরোল, ২০১৪ সালে অর্থনীতিতে নোবেল পেয়েছিলেন।
আর, ঠিকই ধরেছেন। বৃদ্ধটি সেই রবীন্দ্র-স্নেহধন্য, বিশ্ববরেণ্য মানুষটি - বাঙালির গর্ব করার মতো যে দুয়েকজন এখনো রয়েছে আরকী।
অমর্ত্য সেন। :)
No comments:
Post a Comment