Sunday, 28 July 2024

সব খেলার সেরা...

আপনারা কোনোদিন ফুটবল খেলেছেন? নির্ঘাত খেলেছেন। জীবনে ফুটে বল ছোঁয়ায়নি, এমন কূট কাজ কেউ করেছে বলে তো মনে হয় না - আর, ফুটবল খেলেনি, এমনটাও মুখ ফুটে বলে না কেউ। আমিও একবার ফুটবল খেলে ফেলেছিলাম স্কুলে থাকাকালীন, সেই ঘটনাই বলার।


আমি ছোটো থেকেই একটু গোলগাল গোছের, তেমন মারকুটে নই - যাকে লালু ছেলে বলে আরকী। তবে লালু ছেলে হলেও স্বভাবে শরৎচন্দ্রের লালুর মতো ছিলাম - যারজন্য কপালে বরাবর অর্ধচন্দ্র জুটেছে, লালু হওয়ার ফলে তালুতে গজিয়েছে আলু। খেলাধুলোতেও চালু ছিলাম, ক্রিকেট বিশেষ করে। কিন্তু ফুটবলটাকে ম্যানেজ দিতে পারতাম না - কোনো এজেই ম্যান-সুলভ (দয়া করে জেন্ডার ন্যারেটিভ আনবেন না, আনার আগে একবার বাংলা মিডিয়াম বয়েজ স্কুলে ফুটবল খেলে নেওয়ার অনুরোধ জানাবো) ভাবে খেলাটাকে edge করতে পারিনি, গেঁজেই গেছে বরাবর। ফুটবল বরাবরই তাই আমার কাছে ঝুটবল হয়েই থেকে গেছে - এক্কেবারে ঝুটো হয়ে, দুটো বার খেলার কথাও ভাবিনি। 


ভাগ্যের ফেরে একদিন আমাকেও যদিও পথে, মানে মাঠে নামতে হলো৷ 


তখন ক্লাস নাইনে পড়ি। সে এক ভয়াবহ সময়। ঠোঁটের ডগায় গুম্ফ আর জীবনে লম্ফঝম্প, দুইই সমানভাবে লাফাতে ঝাঁপাতে আসছিলো। যে বয়েসটায় হঠাৎ করে বেড়ে যায় লোকে, কাপড়চোপড় বেমানান হয়ে যায়, গলা ভাঙতে থাকে - সেই লিবার্টিচাওয়া পিউবার্টির বয়েস আমার তখন। স্কুলে যাই, প্রবল পেঁয়াজি মারি, সব স্যারেরা আমাকে কাসভের মতো পিটিয়ে রাসভ থেকে ঘোড়া বানাতে অপারগ হয়ে মনের দুঃখে আসবাসক্ত হয়ে পড়েছেন - যা সব অবস্থা! 


এরকমই এক সময়, স্কুলে ফুটবল টুর্নামেন্ট হচ্ছে। ইন্টারক্লাস টুর্নামেন্ট, ফার্স্টক্লাস খেলা - ফার্স্ট ক্লাসের পরেই সবাই বল হাতে, থুড়ি বল পায়ে নেমে পড়ছে। 


সেদিন সেমিফাইনাল খেলা ছিলো নাইনের সঙ্গে ইলেভেনের। মার্কিনদের কাছে তা যেমন দুঃস্বপ্নের মতো, আমাদের কাছেও তাই - ইলেভেনের দলটা স্কুলের মধ্যে সেরা ছিলো। নিজে নাই খেলি, ক্লাসের জন্য অন্তত চিয়ার-আপ ইত্যাদি করার কাজটা সানন্দে করতাম, সোৎসাহে করতাম, আর ক্লাস হেরে গেলে মন খারাপ হতো খুব, একদম ভাল্লাগতো না। খুবই ডিক্লাসড লাগতো, ক্লাস্টার্ড হয়ে যেতাম। ফলে, খুবই চিন্তার বিষয়ে। ইলেভেনের টিমে ছিলো দুঁদে স্ট্রাইকার গৌতমদা - আন্ডার-১৯ খেলে ময়দানে। মোহনবাগানের হয়ে নিয়মিত খেলছে। দুপায়ে অনবদ্য শট, তেমনই দুরন্ত গেমসেন্স। তার সঙ্গে মানানসই উইঙ্গার কালামদা আর সুপ্রিয়দা - উইং দিয়ে বাঘের মতো দৌড়ে কখন যে সুইং করে ঢুকে যাবে, বলা মুশকিল। মাঝমাঠও প্রশংসনীয়। ডিফেন্সে বেঁটে, গাঁট্টাগোঁট্টা সেন্টারহাফ আকাশদা - মাছিও ওর কাছে পারমিশন চেয়ে নেয় গলে যাওয়ার আগে; আর লেফটব্যাক সাজিদদা। চোরাগোপ্তা মারে সিদ্ধহস্ত, বা সিদ্ধপদ - কেরদানি মারতে গেলে বিচ্ছিরি ট্যাকল করবে, হেকলও। আর গোলে প্রায় সাড়ে ছ'ফুট লম্বা চিত্তদা - শুটআউটেও পর্যন্ত মাথা ঠাণ্ডা রেখে সব বল সামলে দিতো। চিত্তদা গোলে দাঁড়ানো, আর বল দেওয়ালে মারা প্রায় সমার্থক। 


এই ভীতিপ্রদ লাইনাপের বিরুদ্ধে আমাদের যে টিম নামবে, তারা মোটামুটি বাতাবিলেবু দিয়ে খেলার যোগ্য - আমাদের সেন্টার ফরওয়ার্ড সৃজন একেবারেই বিশ্রীজন - ডাচ টোটাল ফুটবলের ন্যায় সে সব পজিশনেই খেলতে থাকে, নিজের বাদে। সৃজন পকেটে করে গ্লাভস নিয়ে আসে কিনা, যাতে হঠাৎ মাঠের মধ্যেই পরে নিয়ে গোলে একটু দাঁড়িয়ে নেবে কিনা - এই নিয়ে আমরা খুবই সন্দেহপ্রকাশ করতাম। আমাদের দুটো উইং তথৈবচ, রেডবুল খেলে যদি উইং ফিরে পাওয়া যায়; মাঝমাঠে অর্ক আর সায়ন সেন্টার মিডফিল্ডে নিজেদের মধ্যেই মারামারি করে হলুদ কার্ড খায়; রাইটব্যাকে শুভ, যে অপোনেন্টের স্ট্রাইকার দেখলেই আরো ব্যাকে পিছোতে পিছোতে গোলের পিছনে চলে যায়। একমাত্র ভরসা আমাদের ক্যাপ্টেন বিশ্ব, সেন্টারহাফ। গোলকিপার প্রমথ অলিভার কানের ভক্ত, কিন্তু অলিভারের চোখ পায়নি। আর, অদ্ভুত ভাবে, প্রমথ প্রতিবার হিসেব করে শটের ঠিক বিপরীতে ঝাঁপাতো। ওকে অনেকেই আমরা বুঝিয়েছিলাম, গেম থিওরির মতো হিসেব কষে উল্টোদিকে ঝাঁপাতে - মানে, ডানদিকে ঝাঁপাতে ইচ্ছে হলে বাঁদিকে ঝাঁপাতে, বা ভাইসি-ভার্সা। প্রতিবারই ও ঘাড় নাড়তো, আর ঠিক একই জিনিস করতো। ম্যাচের পর গালাগাল খেলে দেঁতো হাসি হেসে বলতো, ‘'আহা, আমার গুলিয়ে যায়। ফুটবল তো আসলে ভাগ্যের খেলা…” 


এই দুর্মদ টিম যে কীভাবে সেমিফাইনালে গেলো, সেটা আমরা যেমন জানি না, যারা খেলছে, তারাও জানে না। 


যাইহোক, খেলার দিন, আমরা সাইডলাইনে দাঁড়িয়ে। খেলা তখনো শুরু হয়নি। রেফারি বাংলা স্যার, লাইন্সম্যান আরেক বাংলা স্যার আর অ্যাকাউন্টেন্সি স্যার - ওঁরা আস্তে আস্তে আসছেন। বাকি স্যারেরাও মোটামুটি এসে জড়ো হচ্ছেন একে একে। 


এমনসময়ে আমাদের ক্যাপ্টেন বিশ্ব দেখলাম মাঠের এক কোণের বারান্দা থেকে (ওটাই ড্রেসিংরুম ছিলো) চিন্তিত মুখে এগিয়ে আসছে। বিশ্বের ওরকম রূপ, বিশ্বরূপ দেখে চিন্তিত হলাম। 


“কী হয়েছে ভাই?”


“বলিস না আর। জনির পা মচকেছে। হতচ্ছাড়াকে কতোবার বলেছি, খালি পায়ে কাদার মধ্যে নাচানাচি করবি না। ইডিয়ট!”


জনি আমাদের লেফটব্যাক। খুব ভালো খেলে না, তবে মাঝে মাঝে সুন্দর ক্লিয়ার করে দেয়। আর সমস্যা হলো, আমাদের সাবস্টিটিউট রেডি নেই তখন।


“তাহলে? এবার কী করবি?”


আমাদের চিন্তিত প্রশ্ন। 


“এই অর্চি, তুই তো দেখি রোজই ফুটবলের নামে বোতল লাথাস। একটু উদ্ধার করে দে বাপ!” বিশ্বের নিঃস্ব হাহাকার!


দুটো হেঁচকি উঠলো আমার। জীবনে বলে পা ছোঁয়াইনি - তখনো আমি নাবালক, এবং না-বালাকও বটে। চালাকও নই। এই ভয়াবহ গুরুদায়িত্ব আমাকে কেন! অনেকেই তো আছে!


এসব ভেবে কাঁচুমাঁচু মুখে বললাম, “ইয়ে মানে, ভাই, আমাকেই কেন? আমার আজকে পেটটা, ইয়ে মানে…”


“কোনো ইয়েটিয়ে না। তোর ঘাড় খেলবে! জনির একসেট কিট আছে, চুপচাপ পরে ফ্যাল।”


আমার অবস্থা তখন বলির পাঁঠার মতো৷ তারমধ্যে হতচ্ছাড়া বন্ধুগুলো পাশ থেকে আওয়াজ দিচ্ছে, “ভাই, নেমে যা। পাশে আছি!”


সে অভিমন্যুর পাশেও ভীম ছিলো - কিন্তু তারপর কী হইলো, জানে শ্যামলাল - মনে মনে ভাবি আমি। ভাবী দুরবস্থা কল্পনা করে অল্প না, বেশ চিন্তিত হলাম।


বিশ্ব এক ধাক্কা মেরে ঠেলে দিলো। 

“দশ মিনিটে ম্যাচ শুরু। নাটকবাজি পরে হবে। এখন নাম, পরে দেখছি কী করা যায়। ড্রেস আপ!”


গুটি গুটি পায়ে ড্রেসিংরুমে, মানে বারান্দায় উঠলাম। জার্সি গলিয়ে দেখি, সেই জার্সির মধ্যে হাসতে হাসতে আরো একটা আমাকে ঢুকিয়ে দেওয়া যাবে। জনি লম্বা এবং বেশ পৃথুলও। 


“ভাই, জার্সি বড়ো হচ্ছে!” আমার মার্সি ভিক্ষা বিশ্বের কাছে। 


“তা তুমি কি বাপের বিয়ের বরযাত্রী যাচ্ছো নাকি? ওঁকে আবার মাপমতো জার্সি দিতে হবে, তাতে সোনার বোতাম দিতে হবে! চুপচাপ পরে ফ্যাল!”


অগত্যা। ঢোলা জার্সি পরে, পায়ে স্পাইক এঁটে, শিনগার্ড ইত্যাদি পরে কোনোমতে তৈরি হয়ে বধ্যভূমি, থুড়ি, মাঠের দিকে এগোলাম। তারমধ্যে মাঠ কাদায় কাদা। বর্ষাকাল, প্যাচপেচে দশা পুরো। কাদা দেখে কাঁদা উচিত কিনা, এটাই ভাবছিলাম।


রেফারি স্যার মারাত্মক মারকুটে লোক। ক্লাসে তো বটেই, ভুলচুক হলে মাঠেই পিটিয়ে দিতেন। স্যার দেখলাম ঘড়ি দেখছেন আর কটমটে চোখে আমাদের দিকে তাকিয়ে। আমাকে দেখে স্যার ঘাবড়ে গেলেন।


“অ্যাঁ? তুই খেলবি? ইয়ার্কি হচ্ছে নাকি? তাও চশমা পরে?”


আমি কিছু বলার আগেই বিশ্ব আমাকে হাঁটু দিয়ে এক গুঁতো মারলো। ফলে ঠিক উত্তর না বেরিয়ে মুখ থেকে শুধু “কোঁক” করে একটা আওয়াজ বেরোলো। 


“কোঁক মানে?”


“ও কিছু না স্যার। ওর একটু হেঁচকির সমস্যা আছে। আসলে স্যার, জনির তো পা মচকেছে। ওকেই নামাচ্ছি তাই। পেলাম না তেমন কাউকে। আসেওনি কেউ আজ বিশেষ।”


স্যার আর বিশেষ কিছু বললেন না। গম্ভীর ভাবে “হুম!” বলে চলে গেলেন। 


বিশ্ব আর গৌতমদা টস করলো। গৌতমদা টসে জিতে সেন্টার নিলো। 


বিশ্ব আমাদের ডাকলো। 


“ভাই, এই ম্যাচ জিততেই হবে। জানি, ওরা ভালো, তবে আমরা চেষ্টা করলেই পারি। আমরা কি পারি না, আমাদের লুপ্ত গৌরব ফিরিয়ে আনতে, নিজেদেরকে প্রমাণ করতে, দেখিয়ে দিতে যে নাইনও পারে - নাইন মানেই শুধু জার্মান ‘নাইন’ নয়, তা সুপারফাইনও হতে পারে? বল, আমরা কি পারিনা নিজেদের একটা পরিচিতি পৃথিবীর - মানে, দেশের - ধুত্তোর, মানে স্কুলের মধ্যে রেখে যেতে?”


বিশ্বের চোখ ছলছল করছে। অর্ক আর সৃজন প্রায় কেঁদেই ফেললো। আমিও কাঁদবো কিনা, মানে বিশ্বের কথায় না নিজের ভবিষ্যৎ ভেবে, ভাবতে ভাবতে ‘ফ্যাঁচ’ করে হেঁচে ফেললাম।


সবাই কটমট করে তাকালো। বিশ্ব আমাদের বললো, “শোন, জনির জায়গাটায় অর্চি এক্স্যাক্টলি খেলিস না। আমি রাইট ব্যাক খেলছি। অর্চি সিডিএমে (সেন্ট্রাল ডিফেন্সিভ মিডফিল্ড) খেল। তোর কাজ হলো ওরা বল নিয়ে মিডফিল্ড থেকে উঠতে গেলেই শুধু বল ক্লিয়ার করা, আর বল পায়ে পেলে শুধু পাস করে দেওয়া। তোকে বিশেষ কিছু করতে হবেনা। শুধু ভালো করে ক্লিয়ার করিস।”


আমি বাধ্য পাঁঠার ন্যায় ঘাড় নাড়লাম।


বিশ্ব দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো, “তাহলে আর কী। চল। আর শুভ, তুই যদি আজ পিছিয়েছিস, তোকে আমি গুছিয়ে ক্যালাবো। সুপ্রিয় বা গৌতম তোর দিকে ঢুকলে তুই শুধু ক্লিয়ার কর, বাকি ওদের দেখে নেবো আমি।”


শুভ ক্লিয়ার করার পরে বিশ্ব আর কী দেখবে, বুঝতে পারলাম না। শুভও বোঝেনি নির্ঘাত। সে টক করে ঘাড় নেড়ে দিলো।


“আর প্রমথ, তুই আজকে যদি উল্টোদিকে লাফিয়েছিস, তোর উপর আমি লাফাবো স্পাইক পরে।”


এসব জটিল আলোচনার শেষে আমরা পজিশন নিলাম। কিক-অফের বাঁশি বাজলো।


সেন্টার হলো বল। আমি বক্সের একটু উপরে কচ্ছপ - নট-নড়নচড়ন। এমনিতেও ওই ঢোলা জার্সি, শিনগার্ড, স্পাইক ইত্যাদি পরে মধ্যযুগীয় নাইট লাগছে নিজেকে - ফাইট দিতে পারবো কিনা, সেটাই বুঝতে পারছিনা। 


মাঝমাঠে লাথালাথি হচ্ছে। হঠাৎ বল নিয়ে তড়িৎ বেগে উঠলো তড়িৎ দা, ইলেভেনের অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার। একেবারে গরিবের ইনিয়েস্তা। তড়িদাহত আমি বুঝতে পারলাম, বলটা এদিকেই আসবে। পেটটা কেমন মুচড়ে উঠলো।


“অর্চি ক্লিয়ার!”


ডাক শুনে হঠাৎ চেগে গিয়ে দাঁতমুখ খিঁচিয়ে তড়িৎদার দিকে দৌড় দিলাম এক হুঙ্কার তুলে। 


তড়িৎদা ঘাবড়ে গেলো হঠাৎ। ওরকম একটা জার্সি দৌড়ে আসছে মুখচোখ বিকৃত করে, হাঁক পাড়তে পাড়তে - সে যে কী ভয়াবহ দৃশ্য… তড়িৎ দা টেম্পোরারিলি টেম্পোতে ভুল করে ফেললো, আর বলটা দেখলাম সামনে লাউ গড়্গড় করছে। দিলাম জয় মা বলে পা চালিয়ে। বল উড়ে গেলো মাঠের বাইরে। থ্রো। 


“শাব্বাশ ভাই, দারুণ ক্লিয়ারেন্স!”


উচ্ছ্বসিত চিৎকার ভেসে এলো। নিজেকেই নিজে বিশ্বাস করতে পারলাম না। সেকী, আমি ক্লিয়ার করেছি? আমি? বোতলপেটানো আমি কিনা স্কুলের ইনিয়েস্তা তড়িৎদাকে নাস্তানাবুদ করে দিলাম? 


আত্মপ্রসাদে মন ভরে উঠলো। 


সেই আত্মপ্রসাদ বেশিক্ষণ টিকলো না যদিও। কিছুক্ষণের মধ্যেই বল নিয়ে দেখি গৌতমদা ঢুকছে আমাদের হাফে। দেখেই আমার সমস্ত বলভরসা শুকিয়ে গেলো৷ আমাদের দুই মিডফিল্ডার অর্ক আর সায়নকে যেভাবে হেলায় কাটিয়ে খেলায় মুগ্ধ করে আমার দিকে বল নিয়ে এগোলো, আমি ডিফেন্ড করবো নাকি অটোগ্রাফ নেবো - এই দ্বন্দ্বে পড়ে গেলাম। শেষমেশ ডিফেন্ড করাই শ্রেয়, এই ভেবে কায়দাবাজি মেরে স্লাইড ট্যাকল করতে গেলাম। কাদা ভরা মাঠ - স্লাইড করতে অসুবিধে হলো না। কলেজে ভর্তি হওয়ার পর যেভাবে এসজিপিএ মসৃণভাবে পিছলে নিচে চলে গেছিলো, ঠিক ওরকমই পিছলে গেলাম। কিন্তু সমস্যা হলো ট্যাকলে। স্লাইডের চোটে গৌতমদাকে টপকে সোজা গিয়ে লাথি মারলাম লাইনসম্যান অ্যাকাউন্টেন্সি স্যারকে। স্যার মুখ দিয়ে “ঘুঁরুৎ” করে একটা আওয়াজ করে পড়ে গেলেন। সেই কাজের অ্যাকাউন্টেবিলিটি নেওয়ার আগেই দেখলাম, গৌতমদা আমাদের বক্সে। অদ্ভুত কায়দায় বিশ্বকে একটা হাফটার্নে কাটিয়ে, প্রমথর মাথার উপর দিয়ে লব করে পোস্টের হরে ভ'রে দিলো। 


“গো-ও-ও-ও..” চিৎকার উঠলো। 


কিন্তু না। ওল নয়, কচু। ওদিকের লাইন্সম্যান পতাকা তুলেছেন। ওদের একজন অফসাইড ছিলো। উফ, নিশ্চিন্দি! 


হঠাৎই চুলের মুঠি ধরে দেখি কে ঝাঁকাচ্ছে। তাকিয়ে দেখি, অ্যাকাউন্টেন্সি স্যার। আমি ওঁকে লাথি মেরে ধরাশায়ী করে ওঁর গায়েই হেলান দিয়ে বসে খেলা দেখছিলাম। খেয়াল হতেই লাফিয়ে দাঁড়ালাম। স্যার রোষকষায়িত নয়নে একবার তাকিয়ে আর কিছু বললেন না। 


তারপরে শুরু হলো পুরো ধ্বস্তাধ্বস্তি খেলা। খেলা হচ্ছে পুরো আমাদের হাফে। হাঁফিয়ে যাচ্ছি আমরা। ওদিকের গোলে দেখি, চিত্তদা বারের গায়ে হেলান দিয়ে ঘুমোচ্ছে, ধন্যি মেয়ে সিনেমার ঘণ্টার মতো, আর এদিকে গোলে হরিবোল। 


শেষমেশ বাঁশি বাজলো। হাফটাইম। 


ড্রেসিংরুমে, থুড়ি ড্রেসিংবারান্দায় একটা খণ্ডযুদ্ধ লেগে গেছে দেখি অর্ক আর সায়নের মধ্যে। কী? না, অর্ক সায়নকে কখন যেন ল্যাং মেরে ফেলে দিয়েছে, তাই অর্ক নাকি বল নিয়ে উঠতে পারেনি।


“তুই আমাকে আটকালি কেন? ল্যাং মারবি আমাকে? দেখতে পাস না?”


“চুপ কর তো! খেলতে পারে না! আমি ট্যাকল করতে গেছি ওদের ওই তড়িৎকে, তুই ওরকম মাঝপথে চলে আসবি কেন উজবুক?”


“তোর বাবা উজবুক!”


“তবে রে..”


একটা শুম্ভনিশুম্ভ লেগে গেলো। বিশ্ব দৌড়ে এসে আলাদা করলো ওদের৷ 


“কী হচ্ছে এগুলো? ইয়ার্কি হচ্ছে? আমরা নিজেদের মধ্যে মারামারি করতে এসেছি? আমরা জিতবো না? পারবো না আমরা জিততে? এই টুর্নামেন্ট আমাদের জিততেই হবে। এটা নিজেদের কাছে নিজেদের লড়াই একটা। অনেক অবহেলা, অপমান সহ্য করে, জীবনযুদ্ধে হেরে যাওয়া কিছু মানুষ আমরা নিজেদের শেষ রক্তবিন্দুটুকু নিংড়ে দেবো বলে নেমেছি। এখানে তোরা মারামারি করে…”


গলা ধ'রে এলো বিশ্বর। কিন্তু বিশ্ব যে ক্লাস নাইনে কোন জীবনযুদ্ধে হেরেছে, বুঝলাম না। বিশ্বর বাবা ডাক্তার, মা প্রফেসর। আনন্দপুরী অঞ্চলে বিশাল তিনতলা বাড়ি, উচ্চবিত্ত পরিবারের ছেলে। আর যারা খেলছি, তারাও অনেকেই মোটামুটি সচ্ছ্বল ঘরের৷ কোন জীবনযুদ্ধে বিশ্ব হেরে নিঃস্ব হয়ে গেছে, জানতে ইচ্ছে হলো - কিন্তু চুপ করে গেলাম। আবেগের কোনো অভিধান নেই ইত্যাদি। 


বিশ্ব আমার পিঠ চাপড়ে দিলো। “শাব্বাশ, ভালোই তো খেলেছিস! আর ৩৫ মিনিট ভাই। পারবি তুই!”


আমার বুক তখন হাপরের মতো উঠছে-নামছে। মাথা ভোঁ ভোঁ করছে। গলা শুকিয়ে কাঠ৷ লাইন্সম্যানকে ল্যাং মারা আর তড়িৎদার ঠ্যাং থেকে বল ক্লিয়ার করা বাদে কী করলাম, বুঝিনি। যাইহোক। 


হাফটাইম শেষ হলো। গ্লুকনডি ইত্যাদি খেয়ে, মুখেচোখে জল দিয়ে নামলাম আবার। এবার হেস্তনেস্ত করেই ছাড়বো। তারমধ্যে বিশ্ব আবার আমাদের ডেকে একটা ভাষণ দিলো -


“কমরেডস, আমাদের আজ বীরের মতো এগোতে হবে। গভর্নমেন্ট স্কুলের ভাগ্যাকাশে আজ দুর্যোগের ঘনঘটা। লেডি এমিলি ইডেন, ডঃ ভোলানাথ বসুর পদধন্য এই বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ, তাতে আমরা বিরোধীদের অনুপ্রবেশ মেনে নেবো না। অনেক সংগ্রামের ফল আমাদের এই বিদ্যালয়, এই মাঠ, এই ক্লাস নাইন। এই বিদ্যালয় আমাদের মা, আর আমাদের মা আজ অন্য কারোর করায়ত্ত। আমরা পারবো না, আমাদের মা-কে ফিরিয়ে আনতে?”


বিশ্বর গলা কাঁপতে থাকে। পাছে আরো কিছু বলে, আমরা তাই তাড়াতাড়ি পজিশন নিলাম আবার।


পিঁইইইইপ…


বাঁশি বাজলো। কিক-অফ। আমি দাঁড়িয়ে চুইংগাম চিবুচ্ছি। হঠাৎ দেখি, আমাদের দল প্রায় ওদিকের হাফে। আমাকে শুভ দৌড়ে এসে ডাকলো, “ভাই, ওদিকেই তো সবাই৷ চ’ ঘুরে আসি!”


ভাবখানা এমন, যেন পুজোর সময়ে হোলনাইট ঘুরে ক্লান্ত, এবার একটু ম্যাডক্সে গিয়ে বসে আসি!


দুজনে দৌড় দিলাম। ওদিকের হাফে তখন ষাঁড়াষাঁড়ি বানের মতো মারামারি হচ্ছে৷ গোল না দিলেই বিশ্বর ভয়াবহ বক্তৃতা শুনতে হবে - ফলে সবাই জানপ্রাণ লাগিয়ে দিচ্ছে।


আমি গোলমালের মধ্যে ঢুকে পড়লাম৷ পুরো পানিপথের যুদ্ধ চলছে - মাঠের পথে পানিকাদায় ভর্তি এমনিও।


হঠাৎই অর্ক বল কাটিয়ে নিয়ে ছুটতে শুরু করলো উইং ধরে। আমার কী মনে হলো - আমিও পাশাপাশি ছুটতে থাকলাম। চারপাশে তাকিয়ে দেখি, সবাই ছুটছে আমাদের সঙ্গে - সৃজন দৌড়োচ্ছে, বিশ্ব দৌড়োচ্ছে, শুভ দৌড়োচ্ছে, সায়ন দৌড়োচ্ছে, পিছনে দেখি আমাদের প্রমথ গোল ছেড়ে উঠে এসে ও-ও দৌড়োচ্ছে। দেখেই আমার চক্ষু চড়কগাছ। এ কে রে ভাই! এমনকী, আমাদের সঙ্গে রেফারিও দৌড়োচ্ছে। দেখে মনে ভারি পুলক হলো। 


অর্ক উইং ধরে বল নিয়ে দৌড়ে একটা অদ্ভুত সুন্দর ক্রস তুললো। ক্রসের পিছনে দৌড়োতে গেছি, হঠাৎই দেখি পাশে সৃজন “ঘঁচাৎ” করে একটা আওয়াজ করে বসে পড়লো। সাজিদদার ক্লিন ট্যাকল। 


রেফারির বাঁশি। ফ্রি-কিক। 


আমাদের ফ্রি-কিক নিতো বিশ্ব। বিশ্ব এগিয়ে এলো। ওদিক থেকে সৃজনকে ডাকলো - দুজনে কানে কানে কী আলোচনা করে নিলো। পরে শুনেছিলাম, সৃজন মারতে এসে লাফিয়ে যাবে, আর বিশ্ব শট নেবে - এই হয়েছিলো আলোচনা।


হঠাৎ দেখি, সৃজন দৌড়ে এসে দমাস করে ওয়ালে মেরে দিলো, ডিফ্লেক্ট হয়ে আমাদের কার একটা পায়ে লেগে গোল কিক। 


পিছনে তাকিয়ে দেখি, বিশ্ব সৃজনের গলা ধরে বুকে বসে পড়েছে।


“হতচ্ছাড়া (ছাপার অযোগ্য) ইয়ার্কি মারিস? বললাম এতো করে, কথাবার্তা কি (ছাপার অযোগ্য) ঢুকিয়ে রাখিস?”


বিশাল কেলেঙ্কারি কেস৷ আমরা সবাই গিয়ে ওদের আলাদা করলাম। রেফারি দুজনকেই একটা বেত দিয়ে দুঘা সপাসপ বেতিয়ে দিলেন, আর চেতিয়ে দিলেন যাতে এরকম আর না হয়। সৃজন বেচারা, কিছু না করেও বেতের মার খেয়ে গেলো৷ 


গোলকিক হয়ে আবার খেলা শুরু। 


খেলা আমাদের হাফে আবার। জগতের যা নিয়ম। মারাত্মক প্রেসিং ফুটবল খেলছে ইলেভেন৷ কোনোমতে সামাল দিচ্ছি আমরা। তারমধ্যে ধপাধপ কাদায় আছাড় খেয়ে নীল-সাদা জার্সি ধূসর-সবুজ হয়ে গেছে। মাথাটাথা ঘুরছে।


হঠাৎ দেখি আমার সামনে বল। অগ্রপশ্চাৎ না ভেবে লাথি চালালাম৷ লাথি চালাবার সঙ্গে সঙ্গেই দেখি, ওদের লেফটব্যাক সাজিদদা ‘উরে মারে, মরে গেছি রে’ করে ঠ্যাং ধরে লাফাচ্ছে। কী ব্যাপার? 


রেফারি খেলা থামিয়ে দৌড়ে এলো। দেখি, বলে লাথি মারতে গিয়ে সাজিদদার জুতোয় জুত করে লাথি মেরে দিয়েছি - আর সাজিদদার পা মচকে গেছে। ধরাধরি করে ওকে নিয়ে যাওয়া হলো বাইরে। আমাকে স্যার হলুদ কার্ড দেখালেন, আর আমার কানকে লালকার্ড - মানে কান মলে লাল করে দিলেন। সে ঠিক আছে। ওদের জাঁদরেল ব্যাককে তো অন্তত গ্যালারি (মানে বারান্দা)-তে ব্যাক করালাম! 


মাঠজুড়ে আমার নামে উচ্ছ্বাসধ্বনি। কয়েকজন দর্শক মেক্সিকান ওয়েভ করার একটা চেষ্টা করলো, সেটা কীরকম পুকুরে কাতলা মাছের ঘাই মারার মতো দেখালো।


আর ১০ মিনিট। কোনোমতে সামাল দিতে পারলেই.. চোখে প্রায় ধোঁয়া দেখছি। 


ইলেভেন আমাদের চেপে ধরেছে একেবারে। স্কুলের সেরা টিম, এরকম গোবেচারা টিমকে এখনো গোল দিতে পারেনি - যা হয় আরকী। এরমধ্যে হঠাৎ আমার কাছে সৃজন এলো খোঁড়াতে খোঁড়াতে৷ 


“ভাই, এবার মালটাকে ছাড়বো না।”


আমার পিলে চমকে গেলো। কাকে ছাড়বে না? আমাকে? 


“অ্যাঁ? কেন?”


“শালা, কিছু করলাম না, তাও বেতের বাড়ি মারলো? আমাকে বিশ্ব ক্যালাচ্ছিলো, ওর দোষ, মার খেলাম আমি? এবার হয় এসপার নয় ওসপার!”


সৃজনের চোখ জিঘাংসায় পরিপূর্ণ। আমি প্রমাদ গুনলাম। 


বল নিয়ে উঠছে ওদের লেফট উইং কালামদা। ওদিকে সবাই ব্যস্ত। হঠাৎ সৃজন গিয়ে ট্যাকলের অছিলায় একটা ভয়ানক ট্যাকল করে রেফারিকে ফেলে দিলো। “ঘোঁক” করে একটা আওয়াজ করে রেফারি পা চেপে বসে পড়লো। 


“এবাবা স্যার, সরি সরি। পা পিছলে গেছে স্যার!”

সৃজনের মুখ দেখে কে বলবে, ও এতোক্ষণ ধরে এটার অপেক্ষায় ছিলো! স্যারকে একটা পেন্নামও করে ফেললো। ব্যথা পায়ে হাত দেওয়ায় স্যার আবার “ক্যাঁক” করে একটা আওয়াজ করে উঠলেন। স্যার তখন বিষ চোখে তাকিয়ে। কিন্তু সৃজনের অনুতপ্ত মুখ দেখে স্যারের বোধহয় দয়া হলো। কিন্তু স্যার আর দাঁড়াতে পারছেন না। কাঁধে হাত রেখে স্যারকে বেরিয়ে যেতে হলো। 


রেফারি ইনজিওর্ড। লাইন্সম্যান বাংলা স্যার রেফারি হয়ে নেমে পড়লেন। ওদিকে অ্যাকাউন্টেন্সির স্যার একাই লাইন্সম্যান।


আর ২ মিনিট…


হঠাৎই আমাদের টিম একটা অদ্ভুত মিসপাস ধরে ফেলে কাউন্টার অ্যাটাকে ওঠে। ফাইনাল বাঁশি পড়বে পড়বে। ওদের গোলকিপার চিত্তদাও আমাদের হাফে - সে ঝটিতি দৌড় মেরেছে। এই আমাদের সুযোগ কনভার্ট করার। 


মাঝমাঠে ঢুকে গেছি আমি। হঠাৎই দমাস করে আছাড় খেলাম, চোখ থেকে চশমা গেলো ছিটকে। মাথা ফাথা ভোঁ ভোঁ করে ঘুরছে, কানে তালা লেগে, চোখে অন্ধকার। কানা বেগুনের মতো হাতড়ে হাতড়ে খুঁজছি চশমা। 


“অর্চি, কিক কর…”


কানে বিশ্বর গলাটা কোনোমতে শুনতে পেলাম। যা হবে হোক। দশরথ বা হিমাংশু (চোরাবালি দ্রষ্টব্য)র ন্যায় শব্দভেদী গোল করবো এবার। 


বলটা পায়ের কাছে আন্দাজে বুঝে গোলের দিকটা মেপে শরীরের সব জোর দিয়ে একটা লাথি মারলাম। ফাইনাল হুইসল বাজলো।


মাঠে প্রবল চিৎকার আর হতাশা। আনন্দে, প্রশান্তিতে চোখ বুজে এলো আমার। পেরেছি, আমি পেরেছি। আমার প্রথম ফুটবল ম্যাচেই আমি উইনিং গোল স্কোর করেছি, তাও মাঝমাঠ থেকে মাপা বেল্টারে! জার্সিতে একটা চুমু খেলাম, মাঠে একটা চুমু খেলাম - দিয়ে থু থু করে খানিকটা কাদা ফেললাম। দৌড়ে গিয়ে হাঁটু গেড়ে স্লাইড করে সেলিব্রেট করছি, হঠাৎ খেয়াল হলো, চারপাশটা কেমন নিশ্চুপ। সন্দেহ হল। 


“এই নে, তোর চশমা। একবার দেখ!”


অর্ক এনে দিলো। 


“থ্যাঙ্কস ভাই!”


“আর থ্যাঙ্কস! দেখ একবার!”


সন্দেহ হলো আবারও। চশমাটা কোনোমতে পরে গোলের দিকে তাকালাম। একী, ওদের গোলে লোক কই! তবে কী…


আমাদের গোলের দিকে ভয়ে ভয়ে তাকাই। দেখি, সাদাকালো বলটা আমাদের জালের মধ্যে বাধ্য ছেলের মতো শুয়ে। আমার দিকে সবাই অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে।


একসপ্তাহ স্কুলে যাইনি আর। 


ওই আমার প্রথম, আর শেষ ফুটবল খেলা। ফুটবলে কোনোদিন আর পা ছোঁয়ানোর প্রবৃত্তি হয়নি।


পুনঃ - নাম ইত্যাদি সঙ্গত কারণেই পরিবর্তিত।

Thursday, 25 July 2024

টুকিটাকি..

 আমার জীবনে উদ্ভট, বিচিত্র, অদ্ভুতুড়ে ঘটনা খুব কম কিছু ঘটেনি। মজার ব্যাপার হলো, সেই ঘটনাগুলোর অধিকাংশই ঘটেছে আমার গ্র‍্যাজুয়েশনের ৩ বছরে। খুব ইচ্ছে আছে, ঘটনাগুলোকে লিপিবদ্ধ করে রাখার। কিন্তু লিখতে পারি না বলে সেগুলো আর সেভাবে হয়ে ওঠে না। তবুও, কুঁজোরও তো চিত হয়ে শুতে ইচ্ছে করে, নাকি? সেরকমই একটা ঘটনা নিয়ে লেখা।


আমি স্কুল বা কলেজ, দুটোই ভাগ্যক্রমে শতাব্দীপ্রাচীন পেয়েছি। স্কুল তৈরি হয়েছিলো ১৮৩৭-এ, তৎকালীন বড়লাট লর্ড অকল্যান্ডের ভগিনী লেডি এমিলি ইডেনের বদান্যতায় - ফলে স্কুলের ১৭৫ বছরের ভরসা-ফূর্তি দেখেছি; আর, কলেজ তৈরি হয়েছে ১৮১৭-তে - সেখানে যদিও কোনো একটি বদন না, অনেক বদনের বদান্যতা ছিলো - তারও ২০০ বছরের ভরসা-ফূর্তি দেখেছি। যাইহোক। 


কলেজের দ্বিশতবর্ষ, মানে বাইসেন্টিনারির সময়ে তখন বেশ লায়েক হয়ে গেছি, always surrounded by senti naari(s)। যাইহোক - ২০১৭-র জানুয়ারি মাস, ফার্স্ট সেমের শেষ, চারপাশে বসন্তের সুড়সুড়ি, জানুয়ারি মাসের ঈষৎ-শীত ভাব, সবমিলিয়ে মাখোমাখো ব্যাপার। বাইসেন্টিনারির চক্করে সারাক্ষণই ভালোমন্দ খেয়ে বেড়াচ্ছি। ক্লাস চুলোয় গেছে (এমনিও গেছিলো), ভবিষ্যৎকে কালের গর্ভে ফেলে রেখে গর্বের সঙ্গে ঘুরে বেড়াচ্ছি ক্যাম্পাসে, পাশে বন্ধুদের পাশে বেঁধে। প্রতিদিনই কেউ না কেউ বিখ্যাত লোক এসে বক্তিমে ঝাড়ছেন। প্রণব মুখুজ্যে, মনমোহন সিং - কে আসেননি! 


আরো দুজন বিখ্যাত লোকও এসেছিলেন। তাঁদের নিয়েই এই মজার ঘটনাটা। 


তখন ক্যাম্পাসে লোহিয়ারাজ চলছে। কর্পোরেটাইজেশন শুরু হয়ে গেছে ভালোই, চারপাশে রেনোভেশনের নামে হোয়াইটওয়াশও সুন্দর চলছে। সিকিওরিটি গার্ডরা ভিসা অফিসের থেকেও গুরুত্ব দিয়ে আইকার্ড, আধার কার্ড, রেশন কার্ড, মাধ্যমিকের অ্যাডমিট, ড্রাইভিং লাইসেন্স, পাসপোর্ট ইত্যাদি চেক করে, গায়ে মেটাল ডিটেক্টর, গাইগার-ম্যূলার কাউন্টার, সিজমোমিটার ইত্যাদি বসিয়ে মেপে তারপর ঢুকতে দিচ্ছে। কলেজে ঢুকছি না পোখরান - এ বুঝতে বুঝতেই প্রাণ হয়রান, আর এভাবেই দিন গুজরান। 


একদিন মূল ফটকের কাছের গাড়িবারান্দা, যাকে আমরা ভালোবেসে 'পোর্টিকো' বলে ডাকি, সেখানে সকাল সকাল দাঁড়িয়ে রাজা-উজির মারছিলাম। হঠাৎ গেটের সামনে দেখি কীসব তর্কাতর্কি চলছে সিকিওরিটি গার্ডদের সঙ্গে দুয়েকজন বৃদ্ধের। মাথা গলাতাম না। এরকম ক্যাচাল সারাক্ষণই কোথাও না কোথাও হচ্ছেই। হঠাৎ কী মনে হতে একবার তাকালাম, আর তাকিয়ে ভালো করে দেখেই স্ট্যাচু হয়ে গেলাম। অ্যাঁ!? ইনি?! 


আর্গুমেন্টেটিভ ইন্ডিয়ান-এর এরকম হাতে-কলমে উদাহরণ পেয়ে যাবো, ভাবিনি।


দৌড়ে গেলাম গেটের কাছে। অশীতিপর এক বাঙালি বৃদ্ধ, আর তাঁর সঙ্গে বছর ষাটেকের এক ফরাসি প্রৌঢ় - এদেরকে সিকিওরিটি গার্ডভাই চমকে যাচ্ছে। অশীতিপর বৃদ্ধ খুব কাঁচুমাচু মুখ করে রয়েছেন, বোঝানোর চেষ্টা করছেন  

- 'না, মানে বোঝো তুমি একটু..'

- 'ওসব হবে না বললাম তো! অ্যালুমনাইয়ের কার্ড নাই?'

- 'না, সেটা তো নেই..'

- 'পাস আছে?'

- 'না, তাও তো নেই। কিন্তু তুমি একটু শোনো ভাই..'

- 'না শুনবো না। আমাদের স্ট্রিক্ট অর্ডার আছে, যেই হোক না কেন, কার্ড ছাড়া বা পাস ছাড়া ঢোকানো যাবে না। অনেকেই এসব বলে ঢুকে পড়ে। একদম হবে না। আমার চোখ এড়িয়ে একটা মাছিও গলতে পারে না!'


ফরাসি সেই ভদ্রলোক নাক ঝাড়লেন। পরে বুঝলাম, মাতৃভাষায় কিছু একটা বললেন। এদিকে বৃদ্ধ খুবই নার্ভাস হয়ে পড়েছেন। কীসব বলছেনও দেখলাম ফরাসিবাবুকে। আমি সিকিওরিটি গার্ডকে গিয়ে বললাম,


'আরে দাদা, যেতে দাও এঁদের!'


সিকিওরিটি দাদা চেনা। আমাকে বললো,

- 'আরে ভাইপো, না গো। ম্যাডামের আর স্যারের স্ট্রিক্ট অর্ডার আছে, কাউক্কে ছাড়া যাবে না।'

- 'আরে, এঁদের আজ বক্তৃতা আছে ডিরোজিও-তে। আমি বলছি তো। দরকারে ফোন করে নাও। এঁদেরকে নিতে লোকই বা আসেনি কেন?'


সিকিওরিটি দাদা গাঁইগুঁই করে ঢুকতে দিলো ওঁদের।


'ঠিক আছে, ভাইপো বললো বলে আপনাদের যেতে দিচ্ছি। চলে যান এখন।'


আর তখনই দেখলাম, যাদের অনেক আগে থেকে পুষ্পস্তবক ইত্যাদি নিয়ে, লাল মাদুর বিছিয়ে দাঁড়ানোর কথা, তারা দৌড়ে দৌড়ে আসছে। কোনো এক কমিউনিকেশন গ্যাপ এবং কলকাতার মারকাটারি ট্রাফিকের ফলে টাইম-স্পেসজনিত বেশ গলদ হয়ে গিয়েছিলো। 


বৃদ্ধ ও প্রৌঢ় আমাকে 'থ্যাঙ্কিউ' ইত্যাদি বললেন। আমি দুজনকেই বললাম, 'কী বলছেন সারস! এতো বিনয় কেন? আমার সৌভাগ্য যে এটুকু করতে পেরেছি আপনাদের জন্য।'


দুজনেই হেসে এগিয়ে গেলেন। বৃদ্ধ এগোনোর আগে আমার কাঁধে হাত রেখে, জনান্তিকে শুদ্ধ বাংলায় বললেন, 


"কী বানিয়েছো গো!"


এই মহামানবের সঙ্গে এহেন এনকাউন্টার আর কারোর হয়েছে বলে তো মনে হয় না। সৌভাগ্য হিসেবেই ধরি এটাকে। 


প্রৌঢ় আর বৃদ্ধের পরিচয়? প্রৌঢ় হচ্ছেন বিখ্যাত ফরাসি অর্থনীতিবিদ জঁ টিরোল, ২০১৪ সালে অর্থনীতিতে নোবেল পেয়েছিলেন।


আর, ঠিকই ধরেছেন। বৃদ্ধটি সেই রবীন্দ্র-স্নেহধন্য, বিশ্ববরেণ্য মানুষটি - বাঙালির গর্ব করার মতো যে দুয়েকজন এখনো রয়েছে আরকী। 


অমর্ত্য সেন। :)

ঠিকানাহীন চিঠি - ১০

প্রিয়তমা পত্রাবলী,


তোমাকেই উদ্দেশ্য করে এবারে একটা চিঠি লিখে ফেলছি। ব্যাপারটা কি খুবই মাছের তেলে মাছ ভাজা, গঙ্গাজলে গঙ্গাপুজো মার্কা হচ্ছে? সেটা না হলেও, নিতান্তই অ্যাবস্ট্রাক্ট, বিমূর্ত একটা ধারণাকে ভাষ্যরূপ দেওয়ার অক্ষম চেষ্টাই কি আমি করছি না? তুমি তো কেবলই চিঠি, শুধুই বার্তার আদান-প্রদান তোমার কাজ৷ তোমাকেই কেন লিখতে বসেছি আমি তাহলে?


তোমার সঙ্গে চেনা বহুদিনেরই৷ স্কুলে পড়ার সময় থেকেই মেরে-ধরে তোমার অস্তিত্বকে মাথায় ঢোকানোর চেষ্টা করা হতো। কিন্তু, ব্যাপারটা অতোটাই কি সোজা? অতো সহজেই তোমাকে চিনে যাবো? তোমাকে একটা কাঠামোতে বেঁধে ফেলা হয়েছিলো শুরু থেকেই। সেই কাঠামোতেই কাটিয়ে গেছিলাম বহুদিন, বহুযুগ ধরে। বাঁধাধরা এক গতের বাইরে, নিয়মনীতির ক্রিসক্রসের বাইরে গিয়ে তোমাকে চিনতে পারিনি৷ দেরি হয়ে গিয়েছিলো অনেক, বা হয়নি। কে জানে! অনেক জানা-না জানার, বোঝা-না বোঝার আপেক্ষিক কাঁটাতারের এপারে-ওপারে নিরর্থকই আমরা এক্কাদোক্কা খেলে চলি, যার নিট ফল হয় শেষমেশ শূন্য। 


বুদ্ধদেব গুহ-র লেখা পড়তে গিয়ে তোমার সঙ্গে প্রথম ঠিক করে মোলাকাত। এভাবেও তোমাকে ভাবা যায়? এভাবেও তোমাকে নিরাভরণ, নিরাবরণ করে তোমার শরীরের ওমে নিজেকে সঁপে দেওয়া যায়? যেই বয়েসে পৌঁছোলে মন এবং শরীর, দুইই হঠাৎ করে মাথা চাড়া দিয়ে বেড়ে উঠতে থাকে, সেই বয়েসে পৌঁছে তোমাকে খুঁজে পেলাম - শুরু হলো নতুন করে তোমাকে চেনা। ‘জানা’ ব্যাপারটা তখনো আসেনি। তখন তোমার মুগ্ধতায় নতুন করে গা ভাসাচ্ছি। আমার সব প্রতিরোধ, সব আমিত্ব, আমার সব অস্তিত্ব-অনস্তিত্ব ভেসে যাচ্ছে তোমার মোহনায় - অথচ মোহ না, এটাই বা বলি কীভাবে? তোমাতেই ডুবছি, তোমাতেই ভাসছি। 


তোমাকে প্রথম জানার সুযোগ হলো সাহিত্য নিয়ে অ্যাকাডেমিকালি পড়তে গিয়ে। নানারকমের প্রকরণের ব্যাপারে পড়তে গিয়ে এপিস্টোলারি রাইটিং নিয়ে পড়তে হয়েছিলো, এবং অবশ্যই তার কাটাছেঁড়া৷ সেইসব করতে গিয়েই তোমাকে আক্ষরিক অর্থে ‘জানা'টা হলো।


জানো, তুমি একেবারে, এক্কেবারে আলাদা। সবার থেকে। তুমি হয়তো বলবে, ন্যাকামি করছি। নিছকই স্তুতি এ, নেহাতই কথার মালা গাঁথা। কিন্তু, আমি বলার জন্যই শুধু বলছি না। 


অন্যান্য প্রকরণ, বা ফর্মে আমরা ঠিক ‘আমি’ হয়ে উঠতে পারি না। নিজেদের অনেক টুকরো করে ছড়িয়ে দিই সেইসব লেখায় ইতস্ততভাবে। কবিতায় তাও খানিকটা সুযোগ থাকে, ‘আমি’ হয়ে ওঠার - কিন্তু, কবিতা ব্যাপারটাই যে সবথেকে বেশি ফ্লুইড! ফলে, কবিতাকে এর বাইরেই রাখছি। কিন্তু, তোমার কাছে এসেই একমাত্র আমরা মাথা হেঁট করতে পারি, নিজেকে বিকিয়ে দিতে পারি, বুঁদ হতে পারি, সঁপে দিতে পারি। নিজেকে তুলে ধরতে পারি। ‘ছিন্নপত্র’ পড়তে গিয়ে সবথেকে বেশি দেখেছিলাম এটা। রবীন্দ্রনাথ এক জায়গায় লিখছেনও, “...তোকে লেখা এই চিঠিগুলোয় আমার মনের ভাব যেভাবে প্রকাশ পেয়েছে, তা আর কোথাও হয়নি।” প্যারাফ্রেজ করলাম সম্ভবত - ভার্বাটিম একদম খেয়াল নেই, তবে মোটমাট ভাবটা এটাই ছিলো। ব্যাপারটার সঙ্গে আমি একেবারে, একেবারে সহমত। আগেরদিন আমার এক বন্ধুকে বলছিলামও, জানো, যে রবীন্দ্রনাথের সারাজীবনের শিল্পকর্মের জিস্ট হলো ‘ছিন্নপত্র’৷ শুধু ওই চিঠিগুলো লিখেই যদি তিনি সব ছেড়ে দিতেন, তাহলেও ওঁর ভূমিকা কিছুমাত্র কম হতো না। কেন? কারণ, এই চিঠিগুলোতেই উনি সম্পূর্ণ, সম্পূর্ণ স্বচ্ছ৷ তোমার কাছে এসেই আমরা স্বচ্ছ হতে পারি, নিজের ভিতরের সব উজাড় করে দিতে পারি। তোমার কাছে আসি দুদণ্ড শান্তির উদ্দেশ্যে, দুফোঁটা অমৃতের সন্ধানে, নিজেদের বুকের চাপচাপ দুঃখ মন্থন করে বহুদিনের জমে থাকা গরল উদগীরণ করতে। 


তোমার কাছে তাই ফিরে গেছি বার বার, হয়েছি চূড়ান্ত ভালনারেবল - যদিও, এসব ভাল না রে, বল? জানি, একদম ভালো না। কিন্তু আর কেউ অন্তত চুপটি করে শোনেনি, ভরসা যোগায়নি৷ যখন নিজেকে উজাড় করে দিয়েছি তোমার মধ্যে, সম্পৃক্ত হয়ে গেছি, তখনও প্রশ্রয় ছাড়া আর কিচ্ছুটি পাইনি। নিজের অব্যক্ত অনুভূতিগুলোকে তোমার কাছে ছুঁড়ে মেরেছি নিষ্ফল আক্রোশে, তুমি মুচকি হেসে সেগুলো কুড়িয়ে নিয়ে ফুলের তোড়া করে আমার হাতে তুলে দিয়েছো, যাতে তা অন্যের হাতে তুলে দিতে পারি। কী মজা জানো, সেগুলো যাদের হাতে দিয়েছি, তারা হয় সেগুলো দূরে ছুঁড়ে ফেলেছে, নয়তো অবহেলা করে ফেলে দিয়েছে, নয়তো খুব স্বাভাবিকভাবেই নিয়েছে। নাহ, তোমাকে যেভাবে আমি দেখেছি, তারা কেউ সেভাবে তোমাকে দেখেনি - বা, দেখলেও, সেটা আমার জন্য দেখার কথা ভাবেনি তারা। জানি, আক্ষেপ করা উচিত নয়, কিন্তু তবুও - এই ক্ষণিকের বুদবুদ-জীবনে এতোটা অপ্রাপ্তি থাকাও বোধহয় ভালো নয়। আমরা কেউই সব পাইনা। কেউ না - সে যতোই বড়োলোক হোক, গরিব হোক, যাই হোক না কেন। আমরা সবাই কাঁধে করে অপ্রাপ্তির এক ঝোলা বয়ে নিয়ে চলেছি, চলেই যাচ্ছি - কারোরই মনে হয় না, একে অপরের সঙ্গে সেই ঝোলাটা বয়ে নিয়ে বেড়ানোটা ভাগ করে নিই, যাতে বেদনাটা কিছুমাত্র কমে, এই তারাখসা যাপনের প্রতিটা অণুপল যাতে স্মরণীয় হয়ে উঠতে পারে। 


জীবনে অসংখ্য ভুল করেছি, জানো৷ মানিয়ে নিতে নিতে, মানাতে মানাতে, সইতে সইতে পাথরের মতো হয়ে গিয়েছি৷ নিজের পরিচিত আমিটাকে বহুদিন আগেই কোথায় হারিয়ে ফেলেছি - বহু ছায়াপথ দূরে, কোথায় যেন সে এক বিস্মরণের অতলে আস্তে আস্তে ডুবে যাচ্ছে, যাকে আমি খুঁজেই পাচ্ছিনা আর। নিজের সমস্ত আমিটাকে হারিয়ে ফেলে ছায়াময় হয়ে উঠেছি তাই এখন। ছায়া বলেই বোধহয়, আলেয়ার পিছনেই পাগলের মতো ছুটে মরি, জাটিংগা পাখির মতো আগুনে গিয়ে ঝাঁপ দিই - স্বাহা। তবুও, তোমার কাছে প্রতিবার ফিরে গেছি, ফিরে যাই৷ এই নিষ্ফল আকাঙ্খার খুচরো জীবনে যেটুকু কড়ি নিয়ে ঘর করি, তার ঝাঁপিতে আছে তোমারই মায়াকাজল মাখা পরশ৷ তোমার জন্যই ঘরে ফিরতে ইচ্ছে করে সন্ধে হওয়ার আগে। 


থেকে যেও পারলে। জানি, থাকবে। কেউ না থাকলেও তুমি থাকবে। খুব পছন্দের এক মানুষও হারিয়ে যাওয়ার আগে বলে গিয়েছিলো, ‘Archisman means letters to me.’ এটুকু মাধুকরী নিয়েই যেন এই অসীমের পথটুকু পেরিয়ে যেতে পারি৷ আমার সমস্ত অস্তিত্বটাই যে তোমার মধ্যে ধরা রয়েছে!


ভালোবাসা নিও৷ সমস্ত বোঝাকে বোঝার জন্য ধন্যবাদ দিয়ে ছোটো করতে চাইনা।


ইতি,


তোমার একান্ত আপন…

ঠিকানাহীন চিঠি - ৯

 প্রিয়তমা, 

তুমি খুবই ভালো আছো, জানি - তাই অকারণ ‘কেমন আছো’-র কেঠো ও কেজো ফর্মালিটি করতে পারছি না। ভালো থাকবে না-ই বা কেন? আমার শীতল সত্তার রুক্ষ স্পর্শ তোমার আলোঝলমলে জীবনকে এখনো অভিশপ্ত করে তুলতে পারেনি। মেডুসা-হেন এই উপস্থিতি যে কতটা অসহ্য, কাউকে যদি বোঝাতে পারতাম! কেউ বিন্দুমাত্র কাছে আসতে চাইলেই মনে হয় নিজের দু’চোখ চাপা দিয়ে চিৎকার করে বলি, “পালিয়ে যাও, তফাৎ যাও, সব ঝুট হ্যায়!” যাইহোক, সেই দুর্ভাগ্য তোমার যেহেতু এখনো হয়ে ওঠেনি, এবং অদূরেও হবে বলে বোধ হয় না - তাই, আমি মোটামুটিভাবে নিশ্চিত, তুমি ভালোই আছো। আর, ভালো থাকারই তো সময় এটা!


বিধাতাপুরুষও কী অদ্ভুত ও বিচিত্র সব কাজ করেন, না? মাঝেমধ্যে আমাদের ছোটোছোটো ক্রীড়নকের মতো তুলে ধরে এখানেওখানে বসিয়ে দেন; একজনের পথের বাঁকে, জীবনের পাকদণ্ডীতে অন্য আরেকজনকে এনে বসিয়ে দেন - দিয়ে অলক্ষ্যে মিচকি হাসতে থাকেন, আর আমরা ভাবি অদৃষ্ট, সমাপতন। আমাদের কোনোভাবেই কি কোনোদিন দেখা হওয়ার কথা ছিলো, নাকি আলাপ হওয়ার কথা ছিলো? ব্যাপারটা কতোখানি অসম্ভব, সেটা একটু তলিয়ে ভাবলেই বুঝবে আশা করি। কিন্তু তাও, যেহেতু কল্পগল্পকে বাস্তবের ঘটনা বরাবরই দশ গোল দিয়ে এসেছে, তাই এই অসম্ভবও সম্ভব হয়ে উঠেছিলো৷ আমাদের কথা হলো, দেখা হলো, চেনা হলো - বা, সত্যিই কি আমরা একে অপরকে জানতে পারি? জানতে পেরেছি কোনোদিন? যার সঙ্গে দীর্ঘদীর্ঘকাল সময় কাটিয়েছি, তাকেও আজকাল ভীষণ, ভীষণ অচেনা লাগে - যেন কোনোদিন মুখ ছুঁয়ে দেখিনি আমরা, মুখোশের ভিড়েই শুধু হাত বুলিয়েছি। রবি ঠাকুরের মতো বলতে পারলে ভালোই হতো, 

 

 “তোর সাথে চেনা

 সহজে হবে না,

 কানে কানে মৃদুকণ্ঠে নয়।

 করে নেব জয়

 সংশয়কুণ্ঠিত তাের বাণী;

 দৃপ্ত বলে লব টানি

 শঙ্কা হতে, লজ্জা হতে, দ্বিধা-দ্বন্দ্ব হতে

 নির্দয় আলােতে।”


মুশকিল হচ্ছে, এতো জোর আমার কারোর উপরেই খাটে না - তোমার উপরে তো আরোই খাটাতে পারবো না। জোর খাটানোর জন্য অধিকারবোধের প্রয়োজন, অধিকারবোধের জন্য সমর্পণের। সমর্পণ করতে পারি, তুমি তো গ্রহণে সক্ষম নও! নেওয়ার মতো দুঃসাহস তুমি দেখাবেও না, এবং সত্যি বলতে কি, তা কাম্যও নয়। 


কিছু কিছু মানুষের সঙ্গে দেখা হলে মনে হয়, হয়তো দেখা না হলেই ভালো ছিলো৷ অনস্তিত্বের অতলে তারা কোথায় ডুবে থাকতো, আমরা উপরিতল থেকে টেরটুকুও পেতাম না। দেখা হলেই বিপদ - একে ভোলাও যায় না, ফেলাও যায় না - মনে হয়, এতো জটিলতা থেকে কোথাও ছুট্টে পালিয়ে যাই, কিন্তু উপায় নাস্তি। পালানোর উপায় নেই৷ সবসময়ে রুখে দাঁড়াতেই হবে, চোখে চোখ রেখে মোকাবিলা করতে হবে। কিচ্ছু করার নেই। তোমার সঙ্গেও যদি কোনোদিন পরিচয় না হতো, তাহলে দুজনের জন্যই ভালো হতো। আমার অস্তিত্বও তোমাকে বিচলিত করতো না, তোমার উপস্থিতিতেও আমার ভিতর উথালপাতাল হতো না। আমারও অবস্থা দেখো, ক্রমাগত অবহেলা-উপেক্ষা সহ্য করেও নতজানু হয়ে বসেছি মাথা পেতে, কিছু পাবো না জেনেও। না পেতে পেতে সেটাই আসলে অভ্যেসে দাঁড়িয়ে গেছে। আবারও, যদি পেয়েও যেতাম, সেটা আবার তোমার জন্য মঙ্গল হতো না। 


জানিনা কতোটা বোঝাতে পারলাম, কী বোঝাতে পারলাম, বা আদৌ কিছু বোঝাতে পারলাম কিনা। যদিও আমার বোঝানোর কোনো দায় অন্তত নেই, তবে তুমি একটুও যদি অনুভব করতে পারো, তাহলেই সার্থক মনে করবো। 


প্রসঙ্গত, আমার অত্যন্ত প্রিয় মানুষ ও সাহিত্যিক, বুদ্ধদেব গুহ তাঁর ‘হলুদ বসন্ত’ উপন্যাসে একটা কথা লিখেছিলেন - আমার বক্তব্যকে এর থেকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরা আমার নিজের পক্ষেও সম্ভব হতো না। 


“আমার অশেষ আর্তি তার সুখকে কোনোদিনও যেন বিঘ্নিত না করে।’’ 


ভালো থেকো। সুখে থেকো, স্বস্তিতে থেকো। তোমার অন্তহীন অপেক্ষায় থাকবো। 


ইতি,


…..

বর্ষামঙ্গল

শেষমেশ বর্ষা এলেন। ভৈরব হরষে না হলেও, তিনি এলেন - আগমন তো নয়, যেন আবির্ভাব। ভূগোল (যাতে আমি প্রচণ্ড ভালো, এটা আমার ধারণা - তবে মধ্যশিক্ষা পর্ষদের বা আমার স্কুলের ছিলো না) পড়তে গিয়ে একটা জিনিস পড়েছিলাম, যাকে NLM বা Northern Limit of Monsoon বলে - ম্যাপের উপর একটা আইসোলাইন টানা হয়, যেটা দিয়ে কোথায় কোথায় কবে বৃষ্টিপাত আসে এই পোড়া দেশে, সেটা দেখা যায়, এবং যত দিন বাড়ে, তা উত্তরে সরতে থাকে। সেই NLM অনুযায়ী, ভারতে (আন্দামান নিকোবর এবং কেরালা) বর্ষা আসে মোটামুটি ১লা জুন, আর পশ্চিমবঙ্গে আসতে আসতে প্রায় ১০ই জুন। কিন্তু সমস্যা হলো, এতো গালভরা কথা আমি জানি, ভূগোল জানে, NLM-ও হয়তো জানে - বর্ষা কি জানে? আমার ধারণা, হয় সে জানে না, বা বেশি জেনে যাওয়ার ফল হিসেবেই, মানে না। আবহাওয়া দপ্তর আর কালিদাসকে ইল্লি দেখিয়ে খিল্লি করে সে মক্কেলের ঠিক করে আসতে আসতে লেগে যায় প্রায় জুনের শেষাশেষি - আর এবারেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। অবশেষে, তিনি এলেন, দেখলেন - এবং ভিনি-ভিডির পরে ‘ভিসি’ বলার বদলে সারমেয়ের হিসির ন্যায় দু-চারফোঁটা ঝরিয়ে বিদায় নিলেন। তাতে ছাতা বা ছাতার মাথা, কোনোটাই লাগছে না, উল্টে মাথা গরম হয়ে যাচ্ছে - কিন্তু কী আর করার। প্রকৃতির ডাক, সেই জানে কখন সাড়া দেবে…


এই বর্ষা নিয়ে যুগে যুগে কালে কালে বহু শিল্পী-সাহিত্যিক-গায়ক-নাট্যকার এবং বিশেষ করে কবিরা পাতার পর পাতা ধারাবিবরণী নামিয়েছেন। মেঘদূত তো বটেই, কালিদাস ঋতুসংহার-এ বর্ষাবর্ণনা অংশে মোটামুটি আগুন লাগিয়ে দিয়েছেন - যেটা পড়তে গেলেই আমার বরাবর মনে হয়, ‘মোহরা'-র ‘টিপ টিপ বরষা পানি'র এতো সুন্দর সংস্কৃত ভাবানুবাদ বোধহয় কালিদাস ছাড়া আর কেউ করতে পারতেন না। যাইহোক, কালিদাস তো ক্লিশে, সেই দিশেতে হাজার বছর ধরে পথ হেঁটেছেন অনেকেই। জয়দেবের ‘মেঘৈর্মেদুরম্বরং বনভূবস্তমালদ্রুমৈঃ’ ইত্যাদি বলে গাছে উঠিয়ে মই কেড়ে নেওয়া তো আছেই। বিদ্যাপতি বর্ষা দেখলেই মোটামুটি জন্তুদের কোরাস-কনসার্ট বসিয়ে দিতেন - এক্কেরে হাতি নাচছে, ঘোড়া নাচছে কেস। চারপাশে প্রোষিতভর্তৃকারা বসে সমস্বরে বিলাপ করছে, তাদের প্রেমিকভাইরা দূরপ্রবাসে গিয়ে তাদের ‘আউট অফ সাইট, আউট অফ মাইন্ড’ করে দিয়েছে, ময়ূর-টয়ূরেরা কেয়াঁ কেঁয়া কেঁয়া হুঁয়া তেঁরা ওঁয়াদা বলে গান ধরেছে… পুরো যাকে আজকালকার ছেলেমেয়েরা ‘ভাইব’ বলে মামা! তারমধ্যে ছোটোবেলায় ‘মত্ত দাদুরি'টাকে পড়ে ভাবতাম, বৃষ্টির ওয়েদার দেখে কোনো দাদু নির্ঘাত টান্টু হয়ে বসে আছেন। বড়ো হয়ে যখন দাদুরির অর্থ জানবার সৌভাগ্য হলো, তখন প্রতিক্রিয়ায় ‘ধুর ব্যাং!’ বাদে আর কিছুই বলতে পারিনি। আর রবীন্দ্রনাথ তো, ছেড়েই দিলাম। ভদ্দরলোক পদ্মাবোটে বসে দাড়ি চুমরে চুমরে বর্ষা নিয়ে যা সব লিখে গেছেন, সেইসব দেখলে স্বয়ং বর্ষা কমপ্লেক্স খেয়ে যাবে, যে ‘ভাই আমার মধ্যে তুই এতো কী দেখলি?’ সত্যিই, প্রেম আর কবি, উভয়েই অন্ধ। রবীন্দ্রনাথ বৃষ্টিতে মেতেছেন, নেচেছেন, মনকে ময়ূরের মতো নাচিয়েছেন, বৃষ্টিকে বাঈজী বানিয়ে নূপুরনিক্বণ সহযোগে নাচিয়েছেন… সাধে তিনি গুরুদেব! যাইহোক, সাহিত্যের ইতিহাসের উইয়ে খাওয়া পাতা পেরিয়ে, দেশকালপাত্রের সীমানা ছাড়িয়ে বরাবর বর্ষাকাল নিয়ে লোকজন চূড়ান্ত মাতামাতি করেছেন, এখনো করেন। নারাণ গঙ্গো যেটা নিয়ে লিখেছিলেন, কবিরা বোশেখ মাসে দোর এঁটে ‘বাদলরাণীর নূপুর বাজে তাল-পিয়ালের বনে’ লেখে, যাতে আষাঢ়ে গিয়ে তা ছাপা হতে পারে।


প্রশ্নটা হচ্ছে, এই মাতামাতি কেন? কী এমন আছে এই ঋতুতে, যার জন্য এমন কেজি কেজি আবেগ ঢেলে চচ্চড়ি বানানো হয়? 


বর্ষা নিয়ে বিশেষ করে আমার অন্তত আবেগগুলো বড্ড কম। এই নিয়ে লোকজন আঁতকে ওঠার আগে জানাই, বছরতিনেক কলেজ স্ট্রিট-আমহার্স্ট স্ট্রিটে পুরো বর্ষাকাল কাটানোর সৌভাগ্য (বা দুর্ভাগ্য) হয়েছে আমার। আমাদের কলেজ শুরু হয়েছিলো বর্ষাকালে। প্রথম দিন থেকেই বর্ষাভাই তিতিবিরক্ত করে তুলেছিলেন। মনে আছে, ১১ই অগাস্ট প্রথম ক্লাস ছিলো। কলেজের গেট থেকে ডিপার্টমেন্টের বিল্ডিং-এর দূরত্ব ছিলো হেঁটে মিনিট দুয়েক। একটা সিগারেট ধরিয়ে আশ্লেষে টানতে টানতে কদম কদম বাড়িয়ে গেলে আগুন ফিল্টার ছোঁয়ার আগেই পা নেতাজী সুভাষ বিল্ডিং (যেখানে ক্লাস হতো)-এর সিঁড়ি ছুঁয়ে ফেলতো। প্রথম দিনেই হেঁটে ক্লাসে পৌঁছোতে পৌঁছোতে একপশলা বৃষ্টি কিশোরী মেয়ের হৃদয়ের মতো আমাকে ভিজিয়ে দিয়ে গেছিলো। সেই অলপ-বয়সী-বালার প্রেমোচ্ছ্বাসে ভিজে ক্লাসে ঢুকে সুন্দর কাব্যরমণ করছিলাম নতুন বন্ধুদের সঙ্গে, ততক্ষণে গা-হাতপা বেশ শুকিয়েও গেছিলো। খানিকক্ষণ পরে বাইরে শুকনো আকাশ এবং দুয়েকজনের শুকনো ঠোঁট দেখে ভোটাভুটি করে ঠিক হয়, ক্যান্টিনে গিয়ে চা-সিগারেট ঠেঙিয়ে আসা হবে। বেরোতে না বেরোতেই, কীমাশ্চর্যম, আবার এক পশলা বৃষ্টি, আবার আবার সেই কামান গর্জন.. তখন থেকেই বুঝেছিলাম, কিশোরীর প্রেমে পড়াটা তারানাথ বাদে আর কারোরই কাম্য নয় - এরকম মুড সুইং কার হয়! তখন থেকেই আমার বৃষ্টি (এবং কিশোরী)র প্রতি বিতৃষ্ণা। তার দুয়েকদিন বাদে বিভাগে টিচার্স ডে ছিলো, যেটা আমরাই পালন করতুম (মানে ফ্রেশাররা)। সেই টিচার্স ডে-উপলক্ষে ঠিক করা হলো, প্রফেসরদের মিষ্টি ইত্যাদি খাওয়ানো হবে। আর অবশ্যই, সর্বঘটের কাঁঠালিকলা ছিলাম আমি - বেরিয়ে পড়লাম বন্ধু-সহপাঠী নীলাব্জর সঙ্গে মিষ্টি কিনতে পুঁটিরামের উদ্দেশ্যে। গেলাম, দেখলাম, কিনলাম, পুঁটিরামের কচুরি-মিষ্টি দই খেয়ে যখন বেরোচ্ছি, তখনও আকাশ ফরসা। ঠিক বাইরে বেরোলাম, আর ট্রমা ডাম্প করার মতো করে আকাশ জল পাম্প করা শুরু করে দিলো। ভাইরে ভাই, সে কী বৃষ্টি! কলেজ স্ট্রিটে আছি, নাকি প্রশান্ত মহাসাগরের কোনো এক ঘূর্ণাবর্তে - বোঝাই চাপ। বৃষ্টির তোড়ে আর ঝড়ে চারপাশে কিছু দেখা যাচ্ছে না। আমি নীলাব্জ ভেবে বেমক্কা একটি অচেনা মেয়ের হাত টেনে ধরে হিড় হিড় করে ‘চল ভাই, কেচ্ছা হয়ে যাবে তাড়াতাড়ি না ঢুকলে’ বলে হাঁটা শুরু করলাম হনহনিয়ে। হঠাৎ শুনি, পাশ থেকে কম্বুকণ্ঠে এক রমণী বলছেন ‘বাবু, এতো রাগ করিস না। সরি বলছি তো!’ বুঝলাম, কেস জন্ডিস করেছি। নীলাব্জ-র জায়গায় নীলাব্জকুমারীর হাত ধরে টেনেছি, এবং ব্যাপারটা তার বোধগম্য হলে দৃষ্টি এবং আরো অনেক কিছু বঙ্কিম হয়ে যাবে। সেই ঘন প্রাবৃটকালে ওই অসহায়া, বাবুহারা রমণীর চম্পকশুভ্রা করকমল পরিত্যাগ করিবার নিমিত্ত বিন্দুমাত্র কালক্ষেপ করিলাম না। কলেজে ফিরে শুনি, নীলাব্জ এক ঠেলাওয়ালাকে আমি ভেবে তার সঙ্গে বিড়ি ফুঁকতে ফুঁকতে চলে এসেছে কলেজে। সেবার দুজনেই খুব মার খেতে খেতে বেঁচেছিলাম। এরকম কতোবার বৃষ্টিতে ছাতা হারিয়ে, ম্যানহোল বাঁচিয়ে, রাস্তার পাশ দিয়ে যাওয়া গাড়ির সস্তার হোলিখেলায় ধ্বস্ত হয়ে বর্ষা কাটিয়েছি, আর মনে মনে কবি-সাহিত্যিকদের বাপ-ভাই তুলে গালাগাল করেছি। প্রমথ চৌধুরীর ‘বর্ষার কথা’ পড়ে মনের জ্বালা একটু জুড়িয়েছিলো। আমার সহপাঠীরা জানে, গোটা বর্ষাকাল আমার ব্যাগে খাতাপত্র না থাক, এক সেট জামা-প্যান্ট থাকবেই - কেউ আটকাতে পারবে না। সারা বর্ষাকাল গুলিখোরদের মতো ভিটামিন সি ট্যাবলেট চুষে যাচ্ছি, আর দাঁতমুখ খিঁচিয়ে রয়েছি। এই ঋতুকে ভালো লাগে কোনোভাবে? যে শালা হতচ্ছাড়ারা বারান্দায় দাঁড়িয়ে ধোঁয়া ওঠা কফি-কাপ হাতে বাইরে উদাস দৃষ্টিতে তাকিয়ে ‘ঝম্পি-ঘন-গরজন্তিসন্ততি ভুবন ভরি বরিখন্তিয়া’ মার্কা ধ্যাষ্টামো মারে, তাদের ছেড়ে দিতে হয় বর্ষাকালের উত্তর কলকাতায়। অ্যামহার্স্ট স্ট্রিটে কিছুকাল আগেও নৌকা চলতো বর্ষাকালে, ইয়ার্কি মনে হলে পুরোনো লোকেদের সঙ্গে ক্রসচেক করে নেবেন। আর কলেজ স্ট্রিটে তো, বাবা। রাস্তাঘাটে থুতু ফেলতে অবধি ভয় পেতাম, যদি জল জমে! কিছু হতে না হতেই কলেজের সামনে এক কোমর জল। নিজেকে হ্যান্ডমেড মারমেইড মনে হতো, মাইরি। সারাক্ষণ সবাই পোলো খেলতে খেলতে অথৈ জলে থইথই করে ভেসে বেড়াচ্ছি। সাঁতরে সাঁতরে ক্লাসে যাচ্ছি, ক্যান্টিনে যাচ্ছি। যারা সিগারেট খেতুম, তাদের যে কী দুর্দশা! অনেক ভেবেচিন্তে উপায় বের করেছিলুম একটা - একটা ট্রেনে বিক্রি হওয়া বাদামের প্লাস্টিকের লম্বাটে ঠোঙার দুদিক ফুটো করে মাঝখান দিয়ে সিগারেট ঢুকিয়ে টানতাম। গায়ে রেনকোট পরে, ভেসে ভেসে মুখে ওই প্লাস্টিক গুঁজে শ্যালদা থেকে যখন আসতাম, দেখে হয় বিধুশেখর, নয় অ্যাং, নয় সাপ-ব্যাং-বিচ্ছু গোত্রের ভয়াবহ কিছু একটা লাগতো। 


তবে বর্ষার কী সবই খারাপ ছিলো? নাঃ। অন্তত একটা বর্ষাকালের জন্য আমি চাতক পাখির মতো তাকিয়ে থাকতাম। তখন যে মেয়েটিকে খুব ভালোবাসতাম, সেই মেয়েটি বজবজ থেকে শ্যালদা আসতো, আমি খড়দা থেকে - দুজনে নর্থ-সাউথ এক হয়ে শ্যালদা থেকে হেঁটে কলেজ যেতাম - আর প্রাণপণে চাইতাম, যেন বৃষ্টি নামে। বৃষ্টি আমাকে নিরাশ করেনি। বৃষ্টি নামলেই আমি মুখ কুঁচকে ‘যাহ, ছাতা আনিনি আজ’ মার্কা প্রচণ্ড সত্যি বলতাম, আর ব্যাগের ভিতরে থাকা মহেন্দ্র দত্ত আমাকে প্রচণ্ড গাল পাড়ছে, এমনটা বুঝতাম। সেই মেয়েটি তখন ছাতা বের করতো, দুজনে এক ছাতার তলায় হাঁটতাম কলেজ অব্ধি। ওইটুকু, ঠিক ওইটুকুর জন্যই, বৃষ্টিকে আমি ক্ষমা করতে রাজি আছি। মুহূর্তের ঘনিষ্ঠতা, গায়ে গা লেগে যাওয়া, গালে গাল ছুঁয়ে যাওয়ার যে ওম, তার আঁচকে নিভিয়ে না দিয়ে তাজা করে তোলাই যে বৃষ্টির কাজ! দুর্ভাগ্যবশত, বা তার সৌভাগ্যবশত, সে হয়তো এখন অন্য কারোর সঙ্গে ছাতা নিয়ে হাঁটে, আমিও আজকাল আর নিজের ছাতা ছাড়া পথ হাঁটি না। প্রত্যেকের জীবনেই এরকম একেকটা বৃষ্টি থাকে, যা তাদের প্রচণ্ডভাবে ভিজিয়ে দিয়ে যায় - যে ভেজা থেকে সেরে ওঠা আর হয় না কোনোদিনই। 


বৃষ্টি নিয়ে কেন এতো লেখালিখি, তার উত্তরটা বোধহয় এই শেষছত্রেই লুকিয়ে আছে। বৃষ্টি একই সঙ্গে আশা জাগায়, আশা ভাঙেও। প্রবল দগ্ধ দুপুরের শেষেও প্রকৃতিচক্রের অদ্ভুত খেয়ালে বৃষ্টি যে নামবেই, যতই দেরি করুক না কেন - এই আশায় বুক বাঁধে কতো মানুষ। বৃষ্টি সেই বুক বাঁধারই প্রতীক, যে ‘দের আয়ে, পার দুরুস্ত আয়ে।’ আবার বৃষ্টি আশা ভাঙেও। এই বৃষ্টির দিনের মনকেমনিয়া সুরের ছলনায় দূরে সরে যায় মানুষ, দূরে চলে যায়। বৃষ্টি তাই বিরহের ঋতু, মিলনেরও - সমগ্র নিসর্গপ্রকৃতি মিলিত হয়, আর প্রিয়াহৃদয় দূরপ্রবাসে থাকা কান্তের জন্য মন উচাটন করে গুমরে গুমরে মরে;


‘কান্ত এখন দূর প্রবাসে,

মন উচাটন। বর্ষা আসে।’’


বিরহে আমরা সবাই তাই আসলে উতলা রাধা৷ আমাদের সবার বুকেই প্রবল বর্ষা ঝরে পড়ে, যার একটা বিবর্ধিত প্রতিফলন বিশ্বপ্রকৃতির বুকে দেখি। তাইই হয়তো বর্ষা ঋতুশ্রেষ্ঠ!

Tuesday, 23 July 2024

মহাবিদ্যাদর্পণ

*মহাবিদ্যাদর্পণ*


শাস্ত্রে বলে, চুরিবিদ্যা মহাবিদ্যা, যদি না পড়ো ধরা। আমি চিরকালের বিদ্যানুরাগী, ফলে এই মহাবিদ্যাতেও আমার স্বাভাবিকভাবেই চূড়ান্ত আগ্রহ। এমনিতেও, চুরি ব্যাপারটা আমার বরাবরই দারুণ এক্সাইটিং লাগে - যদিও তা কিছু ক্ষেত্রে এক্স-সাইটিং এর মতোই বেদনাদায়ক। কিন্তু, বেদনা না থাকলে কোনোকিছুতেই প্লেজার আসে না, বরং বেজার মুখে থাকতে হয়। বেদনাই সুখের মূল - এই মূল কথাটাকে সার মেনে বরাবর এগিয়েছি।


জীবনে চুরি অনেক করেছি - বাবার পকেট থেকে সিগারেট বা ক্যাবিনেট থেকে বোতল, অসংখ্য মেয়েদের মন, অন্যের জীবনের শান্তি, রান্নাঘর থেকে খাবার ইত্যাদি৷ কিন্তু সবথেকে বেশি অদ্ভুত এবং খতরনাক (কারণ প্রায় নাক খত দিতে হয়েছিলো) অভিজ্ঞতা হয়েছিলো বই চুরি করতে গিয়ে। নিজের জীবনের এই অসংখ্য খুচরো পাপ, বা কিছুক্ষেত্রে বড়োসড়ো পাপও এক-এক করে স্বীকার করে রাখা উচিত।


বই চুরি না করলে প্রকৃত আঁতেল ও শিক্ষিত হওয়া যায় না, এমনটা বহু বিদগ্ধজন ফেসবুকে বরাবর দাবি করে এসেছেন। বহু লোক যে কলকাতা বইমেলা পিছু হাজার পঞ্চাশেক টাকার বই ঝেঁপে দেন, এমনটা মেপেঝুপে দিব্যি বলে দিতেন, আর আমি স্বপ্নালু চোখ করে সেইসব পোস্ট পড়তাম, আর নিজের অক্ষমতায় দীর্ঘশ্বাস ফেলতাম। আমিও কি পারবোনা এদের মা'কে মাসি বলতে? এইসব ভুবনভোলানো ভাবনা ভাবতাম।


২০১৬ সালে কলেজে উঠলাম, আর কলকাতা বইমেলা ধ্যাদ্ধেড়ে গোবিন্দপুর, থুড়ি মিলনমেলার সঙ্গে বিচ্ছেদের খেলা খেলে নতুন খেলা খেলতে এলো সেন্ট্রাল পার্কে। পাড়ার ছোট্টো পার্ক না হলেও, তাতে ঘাস ছিলো না আর ধুলো প্রচুর ছিলো - তবুও, অসম্ভব অ্যাকসেসিবল একটা জায়গা হওয়াতে মনটা বেশ নেচে উঠলো। আসছে, বইচুরির দিন আসছে। প্রেসিডেন্সিতে পড়ি, আঁতলামির হদ্দমুদ্দ না করলে শান্তি নেই - আর তাতে কাঁটা হয়ে আছে এক বইপড়া। যদিও আমার এক বহুপূর্বের বিভাগীয় সিনিয়র আঁতলামির পরাকাষ্ঠা রচেছিলো ২০০৭ সালে বার্গম্যানের মৃত্যুতে মস্তকমুণ্ডন করে। যদিও তাতে বার্গম্যান পদপল্লব উদার করে উঁচিয়ে তেড়ে এসেছিলেন কিনা, সেই তথ্য ইতিহাস জানায় না। যাইহোক, এতো উঁচুতে সেট করা বারের বাড়াবাড়িতে না গিয়ে, বা অতি বাড়ে পড়ে ঝরে না গিয়ে বাকিগুলোয় ছিলাম। এইসব খুচরো পাপের মধ্যে ফার্স্ট সেমেস্টার থেকেই বন্ধুবান্ধবদের পাকড়ে ডায়ালেক্টিক্স বোঝানো, দুমদাম নেমড্রপিং - দিনের মধ্যে অন্তত দুবার গ্রামশির নাম না নিলে মুখ আমসি হয়ে যেতো, আলথুজার না বললে মুখ ব্যাজার আর বাকুনিন না বললে উদাসীন হয়ে যেতাম, সিনেমা সম্পর্কে কিচ্ছু না বুঝে দমাস করে কিম-কি-দ্যুক, কিয়েসলোস্কি ইত্যাদি হ্যাজানো… সবকিছুই করে যাচ্ছি। কিন্তু বইমেলা থেকে যতক্ষণ পর্যন্ত বই চুরোতে না পারছি, ততোক্ষণ এই আঁতেলসমাজ আমাকে কড়ে আঙুল কেটে ইয়াকুজা বা বুড়ো আঙুল কেটে একলব্য, কোনোটাই করবে না - বরং বুড়ো আঙুল দিয়ে (নাকি দেখিয়ে?) ভাগাবে। অতএব, আমিও ভাবলাম, এবার অ্যাকশনে নামতে হবে। দেখিয়ে দেবো বাঙালি কী পারে। পথে এবার নামো সাথি ইত্যাদি… 


এবার, অ্যাকশনের আগে কচুগাছ লাগবে। কচুগাছ কোথায় পাই? অনেকভেবেচিন্তে মনে পড়লো, আমাদের খড়দহ বইমেলাই আছে, হাতের পাঁচ। কচু তো বটেই, কচুগাছ হওয়াও অস্বাভাবিক নয়। অতএব, খড়দহ বইমেলা দিয়েই হাতেখড়ি, বা হাতেচুরি শুরু। 


জনা চারেক বন্ধু এবং এক বন্ধুর দাদাকে নিয়ে বইমেলার বন্ধুর পথে এগোলাম। খড়দহ বইমেলায় টু-ফ্যাক্টর অথেন্টিকেশন সিস্টেম - ঢোকার সময়ে টিকিট দেখে, আর বেরোবার সময়ে বিল দেখে বেরোতে দেয়। মানে বিল না দেখিয়ে তোমার ‘আসি’ বলার জো নেই - বিলাসীতার চরম। ফলে, এই খেলায় যদি পাশ করি, তাহলে কলকাতার সবুজ, থুড়ি ধুলোঢাকা ধূসর মাঠ আমার জন্য অপেক্ষা করছে, গ্যালারিতে সারি সারি লোকজন.. 


মেলার মাঠে ঢুকে বন্ধুবান্ধবদের আমার প্ল্যান বললাম। বন্ধুরা এই বন্ধুর প্রকৃতির প্ল্যানের কথা শুনে তৎক্ষণাৎ রাজি। আমার আনন্দ দেখে কে! এই তো আমার কমরেড, এই তো আমার আঁতেলভাই.. চোখে জল চলে এলো। হুডির খুঁটে মুছে নিলাম চোখ। তলেতলে স্টলে ঢোকা শুরু হলো। 


সমস্যা হলো, বই চুরি তো হবে, এবার কী বই ঝাঁপি? আমার বন্ধুরা হাতের সামনে যা পাচ্ছে, আমাকে পাস করে যাচ্ছে। কেউ বেণুদির রান্নাবান্না, কেউ সচিত্র জ্যোতিষচর্চা, তো কেউ সহজে পশুপাখি চিনুন। নিজের এবং মেলার উপর মেলা হতাশ হয়ে পড়ছিলাম। আনন্দ বা দে’জ-এ যাইনি - ওই একঘেয়ে বই চুরি করার থেকে বইপড়া ছেড়ে দেওয়া ভালো। আমাদের এখানে আনন্দ আসে শুধুই টিনটিন, স্মরণজিৎ, সুচিত্রা আর ফেলুদা বেচতে - তাতে একটুও আনন্দ হয় না। দে'জেও খুবই লিমিটেড - মূলত শংকর, কিছু বুদ্ধদেব গুহ। আমার আবার তখন ইংরেজি বইয়ের নেশা চাগিয়ে উঠেছে। কী করার? 


অবশেষে এক স্টলে ঢুকে তুলনামূলক পদের বই পেলাম কিছু। ভেবেচিন্তে ঠিক করলাম, পছন্দের উপন্যাসটা নেবো - আগেই পিডিএফে পড়া, কিন্তু বইটা ঝাড়বো। কী বই? না, জেডি স্যালিঞ্জারের বিখ্যাত বিল্ডুংসরোমান, ক্যাচার ইন দ্য রাই। জয় বাবা হোল্ডেন জপতে জপতে বইটিকে হাত করলাম, হাতালাম। হাতিয়ে সোজা হুডির তলায় - শাক দিয়ে মাছ ঢাকার মতো। বুক তখন ঢিপঢিপোচ্ছে। চারপাশে বহু লোকের ভিড় থাকায়, ক্যাশিয়ার ক্যাশের ইয়ার হয়ে ক্যাশ গোনায় ব্যস্ত থাকায় খুব একটা অসুবিধে হয়নি যদিও। 


এবার হুডিতলায় তো তিনি গেলেন, কিন্তু তাঁকেও তো বেরোতে হবে। আর গেটের সামনে বিল চাইবে - বিলোতে না পারলেই কিলোবে, তাও বিলো দ্য বেল্ট। ভেবেচিন্তে ঠিক করা হলো, আরেকটা বই কেনা হবে। দাদার বাবার জন্য একটা রামকৃষ্ণ কথামৃত গোছের কিছু একটা নেওয়া হলো। সেই বিলের তলায় ক্যাচার ইন দ্য রাই-এর নাম লেখা হবে, সেটা ঠিক হলো। কিন্তু সমস্যা দেখা গেলো অন্য জায়গায়। কারোর কাছে একটাও পেন নেই। জীবনে এতো পেন, অথচ কারোর কাছে একটাও পেন নেই - ভাবতেই পারছি না। আমরা তখন পাগলের মতো পেন খুঁজছি। যাকেই দেখছি, তাকেই ‘দাদা একটা পেন…’ বলতে না বলতেই সে তিড়িং করে এক লাফ মেরে ‘না না বাপু, ক্ষমা করো। কী জ্বালা, এরা বইমেলাতেও পেন বেচতে চলে এসেছে!’ বলে লম্বা দিচ্ছে।


এসব শুনে প্রায় হতাশ আমরা যখন, ভাবছি বইমেলাতেই রাতে থেকে যাবো কিনা, তখন এক পরিচিতা দিদির সঙ্গে মোলাকাত। সেই দিদি ছিলেন কার্যনির্বাহী কমিটির মেম্বার আবার। মজার ব্যাপার, দিদির আবার আমাদের সেই সঙ্গী দাদাটির উপর প্রবল ব্যথা ছিলো। সেই পেইনকে কাজে লাগিয়ে পেনও জুটে গেলো - দিদিটিই অনেক ছোটাছুটি করে পেন জোগাড় করে দিলো। সেই দিয়ে বিলে লেখা হলো। কী ভয়ানক সেই বিল! ১ নং এন্ট্রি রামকৃষ্ণ কথামৃত, ২ নং এন্ট্রিতে ‘ক্যাচার’ লেখা শুধু, ব্যাপারটার মধ্যে অরিজিনালিটি আনতে। একই বিলে রামকৃষ্ণ আর হোল্ডেন কওলফিল্ড - এ যে কী ভয়াবহ আঁতাত, তা ক্যাচার.. যাঁরা পড়েছেন, তাঁরাই জানেন। একটাই আশা, যাঁরা বিল দেখেন, তাঁরা অতোশতো পড়েননি। শিক্ষার অভাবও যে আশীর্বাদ, সেদিন টের পেয়েছিলাম। যাইহোক, সেই কাণ্ড করে অবশেষে বইমেলা থেকে মানে মানে বেরোনো। 


মিশন কচুগাছ কমপ্লিট। এবার ডাকাত হয়ে কাত করে ফেলার পালা, দিয়ে আঁতেলসমাজের ভার্চুয়াল পিঠচাপড়ানির সুযোগ। জানুয়ারি এলো, সঙ্গে সঙ্গে শীত আর বইমেলাও হাত ধরাধরি করে চলে এলো।


বইমেলায় যাওয়াটা কলেজ থেকে বেশ সুবিধের ছিলো। ট্রেন ধরো, বিধাননগর নামো, অটো ধরো.. তখনো শ্যালদা থেকে ইস্ট-ওয়েস্ট মেট্রো চালু হয়নি। কেউ মেট্রোয় একান্তই যেতে চাইলে এমজি রোড/সেন্ট্রাল থেকে মেট্রো ধরে শোভাবাজারে অবতরণ, এবং ব্রেকজার্নি বা রুটের বাস (বোধহয় ২১৮ যেতো করুণাময়ী অবধি, এখন খেয়াল আসছে না)। আমি ট্রেনপথেই যেতাম।


একদিন, পাঁজিপুঁথি না দেখেই, আঁতেলদের গুরু দেরিদা আর ফুকোর নাম জপতে জপতে ট্রেনপথে বেরিয়ে পড়লাম। প্রবল মারামারি করে উল্টোডাঙায় মানুষের ষাঁড়াষাঁড়ি বান সামলে নেমে, অটোযোগে বইমেলাবতরণ করলাম। সেদিন পুরো নাদির শাহ মুডে ছিলাম। নেমেই একজনের হাত থেকে টান মেরে ম্যাপ চুরি করলাম ভিড়ের মধ্যে। সেই ভদ্রলোক বুঝতে পারেননি কে নিয়েছে - একেবারে রেগে কাঁই। পাশের এক মহিলাকে তিনি রেগেমেগে জিজ্ঞেস করছেন দেখলাম,


"আমার ম্যাপ নিলেন যে বড়ো? আমি এখন চলবো কী দেখে? ইয়ার্কি হচ্ছে?"


মহিলাও ছাড়বার পাত্রী নন। সটান জবাব দিলেন, “ও মা! কে এলেন রে বড়ো! আপনি কি মৃত্যুঞ্জয় নাকি, যে আপনার থেকে ম্যাপ কেড়ে ধারাগোল খুঁজবো? এসব আজেবাজে বকলে সোজা পুলিশের কাছে দিয়ে দেবো বলছি!’’


লোকটি আরো চটে গেলেন। বললেন, “হ্যাঁ, তাই চলুন। দেখবো আজ ম্যাপচোরের কী হয়!”


এইসব হুমকি দিয়ে দুজনে হনহনিয়ে ফটকের সামনের পুলিশদের দিকে এগিয়ে গেলেন। এদিকে চোরাই ম্যাপ নিয়ে আমি ফাঁপরে - শেষমেশ যঃ পলায়তি ইত্যাদি আউড়ে কেটে পড়লাম। 


ইতিউতি হাঁটতে হাঁটতে ভাবলাম, একজন অ্যাকম্পলিস হলে কাজটা অ্যাকমপ্লিশ করতে সুবিধেই হবে। ফোন করলুম আমার এক স্কুলতুতো বন্ধুকে - যে খোট্টা হওয়ায় আমরা তাকে ‘বা’ বলে ডাকতাম (তার কথায় মারাত্মক ভোজপুরী টান ছিলো বলে)। বা পড়তো সল্টলেক টেকনো ইন্ডিয়া কলেজে। 


বা ফোন ধরে বললো, “হেঁ ভাই বোল।”


“ভাই, বইমেলায় এসেছি। আসবি? অনেকদিন দেখা হয় না।” 


বইচুরির প্ল্যান বললে ও যে আসবে না, নিশ্চিত ছিলাম। হেব্বি ভিতু ছেলে। অতএব, সত্যগোপন করলাম।


“হেঁ ভাই, কোখোন আসতে হোবে, তুই সুধু একবার বোল।”

“এখনই চলে আয়। আমি বইমেলাতেই আছি।”

“আচ্ছা ভাই। আমি আধা ঘোন্টেমে আসছি।”


বা তো আধা ঘোণ্টায় আসবে, কিন্তু ততক্ষণ আমি কি ঘণ্টা বাঁধবো? ইতিউতি হেঁটে, হাত বাড়িয়ে ধরতে চাওয়া নতুন কবি-লিটলম্যাগসম্পাদক জুজুদের এড়িয়ে, দুয়েকটা স্টল ঘুরে দেখলাম। বুঝলাম, এসব জায়গায় বই ঝাঁপতে গেলে সত্যিই শিল্পী হতে হয়। খরদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সবাই। তবে, খেপ খেলার মাঠ থেকে বার্নাবেউতে খেলতে গেলে তো ঢেউ সামলাতেই হবে কাকা! আঁতেল হতে এসেছি, এইটুকু না করলে চলে? 


অনেক স্টল ঘুরে, ব্যাপারটাকে স্টল করতে করতে শেষমেশ গিয়ে ঢুকলাম রূপা-র স্টলে। ঢোকামাত্রই বুঝলাম, রূপার স্টল সুপার ব্যাপার, এক্কেরে চোরের স্বর্গরাজ্য। রীতিমতো বইয়ের দোকান হয়ে আছে, আমিও তাই দোকান-কাটার মতো, দোকান কাটবার মতো হয়ে ঢুকে পড়লাম - চারিদিকে বইয়ের তাক, দেখেই তাক লেগে যাচ্ছে। আর অন্ততপক্ষে খান ষাটেক লোক একসঙ্গে ভিতরে। চোখটোখ ঝলমল করে উঠলো। যাক, বা আসার আগেই বউনি করে নিতে পারবো। 


একটা তাকের তলায় কাঁধের আড়াইমণি বোঝাটা নামালাম (আমার বন্ধুরা জানে, আমার ব্যাকপ্যাক আর আমার হৃদয় বরাবরই ভারাক্রান্ত থাকে)। ঠিক যেভাবে লোকে মাচা থেকে শশা পাড়ে, ওভাবে টপাটপ বই নামাতে থাকলাম ব্যগ্র হয়ে - ব্যাগে রো ধরে সেই বইগুলোকে ঢোকাতে থাকলাম। ক্রিস্টির 'মাউসট্র‍্যাপ', 'ব্ল্যাক কফি', 'অ্যান্ড দেন দেয়ার ওয়্যার নান', 'মার্ডার অন দ্য ওরিয়েন্ট এক্সপ্রেস', 'ডেথ অন দ্য নাইল' - এতোগুলো ঝেড়ে ভাবলাম, পরেরপরে ক্রিস্টি নিলে ব্যাপারটা দৃষ্টিকটু বড্ড - খুবই অনাসৃষ্টি হতে পারে। এছাড়াও, আমার কৃষ্টি তো এতোটাও ক্রিস্টি নির্ভর নয়। অগত্যা, আগাথা ছাড়ো। অন্য গাথার দিকে এগোলাম। অন্য একটা তাকের তলায় এসে দাঁড়ালাম। অনেক বেছেবুছে রুডিয়ার্ড কিপলিং-এর কিম ঝেঁপে দিয়ে যখন নিজেকে মনে মনে শুধোচ্ছি, ‘অতঃ কিম?’, তখনই বা-ভাই ফোন করলো।


“হেঁ ভাই, আমি এসে গেচি।”


ভাবলাম, নাহ। রূপার থেকেই সব নিলে তো হবে না - আমি তো আর হিমু নই - ফলে এই পানিপথ থেকে এখন বেরোই। আর, এবার বা-ও এসেছে, দুজনে মিলে ভালো করে ঝাড়বো।


বেরিয়ে এলাম। বা-কে আমার প্ল্যানটা বলাতে সে প্রথমে ঘাবড়ে গেলো, কিন্তু বইগুলো দেখাতে বেশ খুশি হলো। 


“হাঁ ভাই, তুই এতোগুলো বোই চোরি করিয়েছিস? কিচু বোলেনি তোকে বা?”


এসব বলে মুগ্ধ, গর্বিত দৃষ্টিতে সে আমার চৌর্যকর্মের ফল দেখতে থাকে। 


“টিক আচে ভাই, আমি তোর জোন্নো বোই চোরি কোরবো। কোনো চিন্তা নেই।”


কিন্তু চিন্তা যে আছে, সেটা কে জানতো!


যাগ্গে। দুজনে মিলে ভেবেচিন্তে সোজা গিয়ে ঢুকলাম একটা হলে। এদিকওদিক দেখে বেছে নিলাম কলেজের সামনের, কফি হাউসের উপরের বিখ্যাত দোকানের স্টল (কাকতালীয়ভাবে, রূপা-ও কফি হাউসের উপরেই ছিলো) - চক্রবর্তী ও চ্যাটার্জি। 


ঢুকে শুধু কমিক্স-গ্রাফিক নভেলের সম্ভার দেখেই চোখ টেরিয়ে গেলো। ইংরেজি কমিক্স, গ্রাফিক নভেলের যে কী ভয়াবহ দাম হতে পারে, তা কন্যোজার মাত্রেই জানেন। আমরা অনেক ভেবেচিন্তে দুটো ডিসির মোটকা বই, একটা অ্যাভেঞ্জার্সের বই ইত্যাদি তুলেও রেখে দিলাম। ভয়াবহ দাম - চুরি করতে গেলে প্যাঁদানি খাওয়ার সম্ভাবনা আছে। আর, ব্যাগ অলরেডি বিচ্ছিরি ভারি। 


“ভাই, এই ডিসি আর মার্ভেলগুলো বোরোং কাল এসে লিয়ে যাবো বা। আজ এতো নেওয়া চাপ হোবে, ফেঁসে যেতে পারি বা।”


বা-র কথা শুনে ভাবলাম, ঠিকই বলেছে। বরং কাল ফাঁকা ব্যাগে এসে এগুলো তুলে নিয়ে যাবো। আজ অল্প কিছুই নিই। এইসব ভেবে তুলে নিই কয়েকটা ফ্যান্টম, আর ডিসির কিছু ব্যাটম্যানের পুরোনা ইস্যুর রিপ্রিন্ট। নিয়ে সেই চুরি করা ম্যাপের মধ্যে বইগুলো জড়িয়ে অনেক কায়দা করে ব্যাগে ঢোকালাম। মন তখন কনফিডেন্সে টগবগ করছে। উফফ, বইচুরি এতো সোজা? তাইজন্যই লোকে এরকম লাখলাখ টাকার বই ঝাড়ে। আচ্ছা, আমার মতো নভিসই যদি দিনে তিন-চার হাজার টাকার বই ঝেঁপে দেয়, তাহলে পুরো বইমেলায় সে কতো ঝাড়বে? পনেরো দিন বইমেলা হয়, পনেরো ইন্টু চার হাজার, মানে ষাট হাজার! আর একজন অভিজ্ঞ চোরাঁতেল..


গেটের সামনে একজন আটকানোতে আমার মানসাঙ্ক কষা থেমে গেলো। চোখ দিয়ে রীতিমতো কশাঘাত করে তিনি সোজা বললেন, “ব্যাগ খোলো।”


আমি অবাক, বিস্মিত, আহত, ব্যাহত, নিহত, সুভা (রবিঠাকুর দ্রষ্টব্য), যামিনী রায়ের আঁকার ন্যায় বড়ো বড়ো আয়ত চোখদুটো মেলে তাঁর দিকে তাকালাম। কিন্তু কাকু স্ট্রেট ছিলেন, ফলে স্ট্রেটকাট আমাকে আবার ব্যাগ খুলতে বললেন, আমার স্টেয়ারে বিন্দুমাত্র কেয়ার না করে।


আমি ব্যাগ নামিয়ে একটা অন্য চেইন খুলে তাঁকে দেখালাম। তিনি বললেন, “ওটা না। পিছনের চেইনটা খোলো।”


আমি বুঝলাম, পতন অবশ্যম্ভাবী। কামাল করতে গিয়ে বামাল ধরা পড়তে চলেছি। ধরণী, আর্থকোয়েক ইত্যাদি করে দ্বিধাটিধা হও… 


ধরণীর ভারি বয়ে গেছে। সে দিব্যি নট-নড়ন-চড়ন-ঠকাস-মার্বেল ভঙ্গিতেই রইলো। আমি কলিযুগকে গালাগাল দিতে দিতে অভিশপ্ত পিছনের চেইন খুললাম। 


খুলতেই কাকা ছোঁ মেরে ম্যাপে জড়ানো বই আর আমাদের নিয়ে সোজা কাউন্টারে। 


“ধরেছি, এই যে। অনেকক্ষণ ধরে এদের ওয়াচ করেছি। এবার ব্যবস্থা হবে এদের।”


আমার তখন বুক এবং আরো অনেককিছুই ফাটছে। কিন্তু সেসব বাইরে বুঝতে দেওয়া যাবে না। এদিকে বা আমার হাত ধরে কেঁদে উঠেছে, “ভাই, এ কী করলি বা? এবার হামাদের তো জেলে দেবে বা! আমার পিতাজী-মাম্মি তো মোরে (ডিপার্টমেন্টাল স্টোর নহে) যাবে বা! হামি তো আর জোব (চার্নক নহে) পাবো না বা…”


এসব মড়াকান্না শুনে ওকে এক কড়া ধাতানি দিয়ে বললাম, “তুই থাম। আমি দেখছি।”


কী যে দেখছি, তা আমিই জানি। চোখে শুধুই সর্ষেফুল দেখছি তখন। কিন্তু ওই হতচ্ছাড়াকে না থামালে মুশকিল। মহা গেরো!


ওদিকে কাউন্টারের লোকটা আমাকে মোটামুটি ‘বাংলায় তস্করতা ও তার প্রতিকার’ শিরোনামের একটা রচনা শুনিয়ে দিলো।


“হ্যাঁ, ইয়ার্কি পেয়েছো? তোমরা বাচ্চা ছেলে, জানো না চুরি করা কতো খারাপ? অর্থশাস্ত্রে তস্করতার জন্য প্রাণদণ্ডের নিদান পর্যন্ত দেওয়া আছে। আমাদের কতো ক্ষতি হতো বলো তো? তোমাদের তো হাতও পাকেনি। এখন চুরির ফলে তোমরা বড়ো হয়ে ঘুষখোর হবে, নেতা হবে। জাতীয় আয়ের কতো শতাংশ চুরি করা ধন, জানো?”


তখন ওসব বিজাতীয় কথা শুনতে বয়েই গেছে। আমি হ্যাঁ হ্যাঁ, আসলে স্টুডেন্ট তো, ভুল হয়ে গেছে ইত্যাদি করে ম্যানেজ দিচ্ছি। ওদিকে বা-হতচ্ছাড়াটা সমানে “পিতাজী হামার কী হোলো গো” “মাম্মি হামাকে তুমি শমা (ক্ষমা) করে দিও, হামি তোমার মুখ ডোবালাম” “বোন তোর এই দাদা অমানুষ” “দাদাজী হামি একটা ব্লেকসিপ” এসব র‍্যান্ট করে চলেছে। অন্যসময় হলে ওকে ঠাটিয়ে দুটো থাবড়া মারতাম। সেটাও পারছি না। 


কাউন্টারের সামনে মোটামুটি ভিড় লেগে গেছে। আমাদের রাজ্যে এই জিনিসটার অদ্ভুত চল। টিসি যদি ডাব্লুটি-কে ধরে, অথবা ট্রাফিক পুলিশ কোনো আইনলঙ্ঘনকারীকে, বা এক্ষেত্রেও, বইচোর মানে আমাদের ধরা হয়েছে - সেখানেই সব ভিড়, সব এফোর্ট। ওদিকে সেই ফাঁকে হাজারো ডাব্লুটি, বা হেলমেট ছাড়া বাইক, বা অন্য কোনো বইচোর দশগুণ বেশি বই নিয়ে কেটে পড়লো - এতে তাদের কিছু এসে যায় না। সবাই মজা দেখছে। 


“ছিঃ, এই আমাদের সমাজ!”

“আহারে, গরিব দুটো ছেলে। শুধু বইই তো পড়তে চেয়েছে। বিদ্যার কি কোনো দাম হয়?”

“কেউ গরিব না। ওরা নির্ঘাত পাকা চোর। পুলিশ ডাকো।”

“পুলিশ কিচ্ছু হবে না। গিল্ডের লোক ডাকো।”

“গিল্ড ডেকে কী কচুপোড়া হবে শুনি? সব বোঝেন?”

“তুমি সব বোঝো?”

“তবে রে ব্যাটা ইস্টুপিট!”


হেব্বি একটা ঝামেলা বেধে গেলো। 


এক সিকিউরিটির লোক এসে দেখি, আমাদের দিকে ফোন তাক করে ছবি তুলছে। আমি স্বভাববশত পোজ দিতে গিয়ে বুঝলাম, এক্ষেত্রে ঠিক হবে না। আর বা ক্যামেরা দেখেই পাপারাজ্জি দেখা নায়িকার মতো ভেঙে পড়লো। নিজের বাবাকে ফোন মেরে দিলো সঙ্গে সঙ্গে -


“পিতাজী হামাকে খোমা কোরে দিন। হামি পারলাম না।”


“....”


“না না, হামি সুসাইট কোরছি না। হামি ধোরা পোড়েছি। আপনার মুখ রাখতে পারলাম না পিতাজী। এবার জেলে দেখা হোবে।”


“....”


“না পিতাজী, না। গোয়না না। বোই চোরি কোরেছি হামি আর ওর্চি। মা সরোসসোয়াতি তাই হামাদের পাপ দিলেন পিতাজী।”


“...”


“না পিতাজী, বেল কোরানোর কোনো দোরকার নেই। হামি এটা ডিজার্ভ কোরি। হামাকে খোমা কোরবেন। আপনার বেটা একটা ব্লেকসিপ।”


আমি আর নিতে না পেরে ওর থেকে ফোনটা কেড়ে নিলাম। বললাম,

“ভাই, কী শুরু করেছিস? থামবি না মার খাবি?”

“না ভাই, হামার গিল্ট হামাকে কামড়ে খাচ্ছে। হামি পারছিনা ভাই।”

“তোর গিল্ট তোকে চেটেচুষেকামড়ে যেভাবেই খাক, যদি ড্রামা না থামাস, তোর গিল্ট বেল্ট দিয়ে পিটিয়ে তাড়াবো। চুপ করবি?”


ঝাড় খেয়ে থামলো।


রচনাকাকু আরেকটা রচনার স্ক্রিপ্ট ভাঁজছিলেন। ভাবলাম, এখনই রাস্তা। 


“কাকু..”


“বলো? ক্ষমাটমা হবে না। চোররা এ সমাজের… “


“কাকু প্লিজ না। আপনি এর থেকে মারুন, কিন্তু আর এরকম বলবেন না। হাতজোড় করছি!”


কাকু বিরক্ত হলেন, দিয়ে থামলেন। রচনার প্রয়াস চটকে গেলো বলে খুবই চটে গেলেন বলে মনে হলো।


আমি লোহা ঠাণ্ডা হওয়ার আগেই আবার হাতুড়ি চালালাম - “কাকু, আমরা পে করে দিচ্ছি। কথা দিচ্ছি, এমনটা আর হবে না। আমরা ভদ্রঘরের ছেলে, একটু অ্যাডভেঞ্চারাস হয়ে করে ফেলেছি। বিশ্বাস করুন।”


বা হঠাৎ “মামাজী” বলে ডুকরে উঠলো। রচনাকাকু ঘাবড়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “অ্যাঁ? তোমার মামা আমি?”


“না না কাকু। হামার মামা খুব সোত ইনসান বা। সে জোখোন জানবে তার ভাঞ্জা এইসন করিয়েছে, তোখোন সে কী কোস্টো পাবে বা…”


এসব বলে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলো। আমি আবার তেড়েমেড়ে গালাগাল দিতে যাচ্ছি, তখন রচনাকাকু বললেন, “আহা, কেঁদো না। মামার কথা আগে ভাবা উচিত ছিলো। ঠিক আছে, তোমাদের ছেড়ে দিচ্ছি। দাম দিয়ে দাও। কোনো ডিসকাউন্টও দেবো না।”


আমি চমৎকৃত হলাম। আরিব্বাস, হতচ্ছাড়ার কান্নায় চিঁড়ে ভিজবে জানলে তো মালটাকে কেলিয়ে কাঁদাতাম। যাইহোক, আমি তখন সব টাকা দিতে রাজি। ডিসকাউন্ট? পারলে আমিই ওনাকে মার্জিন মানি দিয়ে আসি ওর উপরে। 


পকেট হাতড়ে, ক্যাশ-ডেবিটকার্ড মিলিয়ে সমস্ত টাকা বিলিয়ে দিলাম - Bill-ইয়ে দিলাম। এই Bill-আসিতার ফলে একেবারে ট্যাঁকখালির জমিদার হয়ে বেরোলাম। মাথা নিচু। উল্টোডাঙা স্টেশন হেঁটে ফিরতে হবে - অটোর ভাড়াও নেই। হাঁটা লাগালাম। 


“ভাই, কালকে তাহোলে হামরা বোই চুরি কোরতে কিন্তু আর আসবো না।”


কড়া চোখে বায়ের দিকে তাকিয়ে একটা অনুচ্চারিত গালাগাল গিলে নিলাম।

'ঠাকুরমার ঝুলি'

 আজকে আমার ঠাকুমার মৃত্যুবার্ষিকী। ২০২১ সালের এই দিনেই তিনি গত হয়েছিলেন। এইটুকু পড়েই অনেকে হয়তো, 'ওঁ শান্তি, আত্মার শান্তি কামনা করি, তি...