Monday, 9 September 2024

এলোমেলো...

 সারাদিনের হইহুল্লোড় থেমে গেলে পর মনের মধ্যে একটা ক্লান্ত সন্ধ্যা নামে। এক সীমন্তিনী চুল এলিয়ে তুলসীতলায় মঙ্গলকামনার্থে বাতি দেয়, ধূপ দেখায়। অনেকটা দীর্ঘ উঠোন পেরিয়ে আসে সে। আলো-আঁধারির উঠোন। কে যেন এক এক করে ঘরের সমস্ত আলো নিভিয়ে দেয়। চারপাশটা নিশ্চুপ, নিস্তব্ধ হয়ে যায়। অন্ধকার। নিঃঝুম, বুকঝিম এক অন্ধকার।


অন্ধকারে চৌকাঠে হোঁচট লাগে। আলোর সুইচগুলো কোথায়, খুঁজে পাওয়া যায় না। হাতড়ে দেখলে হয়তো পাওয়া যাবে, কিন্তু হয়ে ওঠে না আর। সবসময়ে হাতড়ে দেখতে ইচ্ছেও করে না। হাতের নাগালেও কিছু থাকা উচিত, আলতো আদরে হাত বাড়ালেই যা পাওয়া সম্ভব। কোনোমতে হোঁচট খেতে খেতে ঘরে এসে বসা হয়। খাট, না সোফা? খাটই হয়তো। যায়-আসে না আর। কিছু একটা হবে। না হলেও হবে। পা তুলে কোনোমতে পিঠটা ঠেকাতে পারলেই হল। তারপর অপেক্ষা, অপেক্ষা। 


কিছু কিছু অন্ধকারে দেখতে পাওয়া যায় না। সেইসব অন্ধকার এতটাই নিকষ, যে চোখ সয়ে ওঠে না। চোখের ভিতরের রড সেলগুলো নিজেদের অস্তিত্বের ক্রাইসিসে গুমরে মরতে থাকে, ল্যাক্রিমাল গ্রন্থিগুলোকে চেপেচুপে ভাসাতে থাকে - যেগুলোকে হঠাৎই কান্না বলে ভ্রম হয়। সেইসব অন্ধকারে, সেইসব কালোডাকা অবসন্ন সন্ধ্যায় ঘুম আসতে চায় না। সমস্ত আলো নিভে যাওয়ার পরে চুপ করে জেগে থাকে কারা যেন। সেইসব জোনাকিমোছা অন্ধকারে জেগে থাকতে ইচ্ছে করে না। কিন্তু কবেই বা ইচ্ছে অনুযায়ী কাজ হয়? 


আস্তে আস্তে মনের ভিতরে সন্ধে গড়াতে থাকে, রাত বাড়ে। ক্লান্তি বাড়ে। চরাচরের শেষ ঝিঁঝিঁর ডাকটুকুও মুছে যাওয়া এক অবসন্ন নিস্তব্ধতা বাড়ে। যে অনস্তিত্বের শূন্যতার উপহার নিয়ে জলের ফোঁটার ন্যায় সান্দ্রযাপন চলতে থাকে গড়িয়ে গড়িয়ে, সেই ভ্যাকুয়াম ভরাট করবার জন্য জোর করে কিছু না কিছু গোঁজবার চেষ্টা চলতে থাকে। প্রকৃতি নাকি শূন্যস্থান রাখে না কোনো, এমনটা বলা হয়ে থাকে। কিন্তু, ব্যতিক্রমী কিছু শূন্যস্থান থেকেই যায়, যা হয়তো অতিপ্রাকৃত। এরকম অজস্র শূন্যতা দিয়ে তৈরি শতছিন্ন এক মনকেমনের চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়তে ইচ্ছে করে। কিন্তু সেই ফুটোফাটলের মধ্যে দিয়ে হাওয়া ঢুকতে থাকে। শীত করে, বড্ড শীত করে...


মনের মধ্যে রাত গভীর হয়। শেষ শিয়ালটা ডেকে চুপ করে গেছে অনেকক্ষণ। ঘড়ির কাঁটা টিকটিক করছে হয়তো। বা করছে না। ঘড়িটা কোনদিকে, বোঝা যায় না। দেখাও যায় না এই অন্ধকারে কিচ্ছুটি। কারা যেন নিয়ম করে এসে আলোগুলোও ঠিক নিভিয়ে দিয়ে যায়। দেখাশোনার ওপারের যে ছুঁতে না পারার বুদ্বুদসত্য, সেখানে কোন মন্ত্রবলে যেন এক মুহূর্তেই টেলিপোর্টেশন হয়ে যায়। অলীক, অবাস্তব, তবুও তা রয়েছে। না থাকাও আসলে একটা থাকা। সমস্তটাই দৃষ্টিভঙ্গি আসলে, পয়েন্ট অফ রেফারেন্স। এসব ভাবতে ভাবতে মনের ভিতরে রাত নামতে থাকে, আরো নামতে থাকে, আরো নামতে থাকে। ভোর হয় না তার আর। ভোর এসে পৌঁছোয় না। ক্লান্তিতে চোখ বুজে আসে, তবু ঘুম আসে না। আসতে চায় না।


শুধু খাটের উপর, বা সোফা - শুয়ে থাকা হয়। ঘড়িটা আছে, নাকি নেই - সেটাও বোঝা হয় না। আর শতচ্ছিন্ন চাদরটার ফাঁকফোকর দিয়ে একপশলা ঠাণ্ডা হাওয়া ছুঁয়ে যায়। শীত করতে থাকে, ভীষণ কনকনে শীত....


1 comment:

  1. মন খারাপ নিয়ে খুব সুন্দর লিখেছ

    ReplyDelete

Landour Diaries - 1

 After watching Musafir Café, while everyone is busy doing postmortem of the interpersonal relationships between the characters, I was revis...