ঠিকানাহীন চিঠি : ১১
প্রিয়তমা,
আমার অধিকাংশ চিঠির মতোই, এই চিঠিরও কোনো ঠিকানা নেই। কাকে লেখা, তাও কি জানি? জানি হয়তো। তবে ভেবেছিলাম, তোমাকে এই চিঠিটা লিখবো না। কী লাভ বলো? এই চিঠিটা, বা পরের চিঠিগুলো তো কোনোদিনই তোমাকে পাঠাতে পারবো না! পুরো ব্যাপারটাই অকারণ, অহেতুক - ভস্মে ঘি ঢালা। তারমধ্যে কী জানো, তোমাকে কোনোদিন যদি পাঠাতেও পারতাম, তাহলেও উত্তর পেতাম না৷ কিন্তু, সবকিছু কি সত্যিই কার্যকারণ সম্পর্কের দ্বিঘাত সমীকরণ মেনে চলে? সত্যিই কি সবক্ষেত্রে প্রত্যাশা নামক গোমড়ামুখো যুক্তিকে বসানোর কোনো মানে হয়? এতো ভেবেচিন্তে কাজ করতে গেলে তো কবেই রোবটটোবট হয়ে যেতাম। হলে মন্দ হত না যদিও।
এক অদ্ভুত ধূসর সময়ে তুমি এলে। জীবনে বরাবরই দেখেছি, এরকমটাই হয় ঠিক। ক্যানভাস থেকে এক এক করে রং যখন সব মুছে যায়, উপরে বাসা বাঁধতে থাকে ঝুল-মাকড়সার জাল, ঠিক তখনই শিশুর মতো কৌতূহলী, বিস্ময়ভরা মায়াময় চোখ নিয়ে কেউ এসে দাঁড়ায়। কচি-কচি হাত দিয়ে সরিয়ে দেয় ঝুলজালের আস্তরণ৷ অনভ্যস্ত হাতে প্যালেটের উপর মেশানো রংগুলো হাতে মেখে ক্যানভাসের উপর হাতের ছাপ দিয়ে দিয়ে আবার রঙিন করে তোলে।
প্রিয়তমা, এরকমই এক বিবর্ণ জীবনে আচমকাই তুমি এলে। চৌকাঠ পেরিয়ে আসতে অনেকটা সময় লাগল তোমার। তুমি আসলে, আমার ভাঙাচোরা ঘর রোদজোছনায় ভেসে গেল। বুঝলাম, আমার ধ্বংসের খেলা শুরু হল আজ থেকেই। বাঁচার জন্য প্রতিদিন, প্রতি পলে যে মরতে থাকা, সেই মরণের জয়গান গেয়ে তুমি এলে। তুমি এলে, আমার অগোছালো বিছানায় বসলে। অপ্রস্তুত আমিটাকে আরো অপ্রস্তুত করে দিলে। আমি শুধু তাকিয়েই থাকলাম। খুব ভুল করছিলাম কি? হৃদয়ের ভিতরের বিবর্ণ শীতে শরীর-মন কালি হয়ে গেলে পর একমুঠো উষ্ণতার দেখা যদি পায় কেউ, সে কি নিজেকে সেঁকে নেবে না? আমি দেখে নিচ্ছিলাম, প্রাণপণে দেখে নিচ্ছিলাম। চোখ দিয়ে টেনে এনে মনে বসাচ্ছিলাম। শুধু দেখে যে এতো সুখ, সুখের মধ্যে যে এতো অপ্রাপ্তি, পাশে বসে থেকেও যে এতোটা দূর, চাওয়ার মধ্যেও যে এতটা না-পাওয়া - এগুলো লিখে বোঝানোর মতো ভাষাজ্ঞান আমার নেই। আমি শুধু দেখেই যাই।
তোমার গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়তে থাকে অদৃশ্য কান্না। তুমি হাসছো, আর তোমার চোখে ইলশেগুঁড়ি। টুপটাপ মুক্তো জমা হচ্ছে তোমার কোলে। সবাই দেখতে পাবে না। আমি ভাগ্যবান। অনেক জন্মের পুণ্য করলে পাহাড়ের কোণে লুকিয়ে থাকা সেই ঝর্ণা দেখতে পাওয়া যায়। খুব ইচ্ছে করে, হাত বাড়িয়ে মুছিয়ে দিতে। লেপ্টে যাওয়া কাজলটাকে গুছিয়ে দিতে। কাছে টেনে নিতে। পারি না। একটু সাহস করলে এগিয়ে গেলেই পারতাম হয়তো। পারি না। ছুঁয়ে ফেললে যদি বুদ্বুদের মতো মিলিয়ে যাও? যেটুকু আছে, সেটুকুও যদি হারিয়ে যায়? হারাতে হারাতে আমি ক্লান্ত। খুঁজতেও পারি না আর। ইচ্ছেও করে না। যেটুকু আছে, যেভাবে আছে, থাকুক না হয়। তুমি মিলিয়ে গেলে তো ইজেল থেকে ক্যানভাসটাই খসে পড়ে যাবে। ঘর ভরে যাবে নিঃঝুম অন্ধকারে।
তোমার ঘুমপাড়ানি কণ্ঠস্বর আমার কানে এসে লাগে। কী মায়া, কী মায়া, কী মায়া মিশে যে ওই গলার তন্ত্রী থেকে কথা বেরোয়, তার তুমি কী বুঝবে? সারেঙ্গি কি নিজের কান্না বোঝে? ভাঙনজ্বর থেকে সারিয়ে তোলে তোমার গলা। আচ্ছা, তুমি বোঝো না, তুমি বাকিদের সঙ্গে কথা বললে আমার কী পরিমাণ রাগ হয়? সর্বরোগহর এই মিরাকিউরলের স্বত্ব কেন থাকবে সবার কাছে? ডিবিয়ার্সের হিরে কি সবার হাতে মানায়?
খুব হিংসে হয় আমার তাদের উপর, যারা তোমাকে দেখতে পায়, শুনতে পায়, ছুঁতে পায়। মনে হয়, তোমাকে ছিনিয়ে এনে লুকিয়ে রেখে দিই। কেউ, কেউ যেন খোঁজ না পায়। কেউ জানতে না পারে।
পরমুহূর্তেই নিজের অধিকারবোধ সম্পর্কে সচেতন হয়ে পড়ি। ভাঙা ঘরে জোছনার আলোটুকুই মানায়। চাঁদকে এনে ভাঙা ঘরে রাখা সম্ভব না। চাঁদ সবারই, অথচ কারোর নয়। সবার জন্যই চাঁদ হাসে। ওই জোছনা, ওই স্নিগ্ধতায় আমার ততটুকুই অধিকার, ঠিক যতটা আর পাঁচজন রাম-শ্যাম-যদুর। আমরা শুধু দূর থেকে চাঁদের আলোয় মুগ্ধ হতে পারি, কবিতা লিখতে পারি, ভাসিয়ে দিতে পারি চিঠির স্নিগ্ধশ্রীর অঞ্জলি। দূরত্বটা সেই থেকেই যায়। থেকেই যাবে। একসময়ে তাকিয়ে দেখব, বিছানাটা খালি। শুধু তোমার বসার জায়গাটা সামান্য উষ্ণ হয়ে আছে।
বহুদিন কারোর জন্য প্রার্থনা করিনি, জানো। কাউকে নিজের করে পাওয়ার আকুতিতে সঁপে দিইনি কোনোদিন। জানি মিথ্যে, জানি অলীক, কিন্তু ছায়াও কি সত্যি নয়?
আসতে পারো যদি, চৌকাঠ ডিঙিয়ে এসো কোনোদিন। জ্যোৎস্নাময়ী, তোমার চাঁদের আলোয় অবসান ঘটুক আমার পার্থিব সকল সুখ-দুঃখের।
যে ভালোবাসা তলহীন, যে আবেগ ভাষাহীন, যে আকুতি কামনাহীন, যে স্পর্শ কায়াহীন, সেই ভালোবাসাটুকু নিও।
‘আমার অশেষ আর্তি তার সুখকে যেন কখনো বিঘ্নিত না
করে।’’
ইতি,
তোমারই…
খুব সুন্দর
ReplyDelete