Sunday, 24 November 2024

বিদায়, পত্রাবলী...

ভার্চুয়াল চিঠি নিয়ে কদিন বেশ মেতে থাকা গেল যা-হোক। কিছু ভালো অভিজ্ঞতার পাশাপাশি, খারাপ লাগার রেশটুকুও রইলো।


আমাকে যাঁরা একটু হলেও চেনেন, তাঁরা জানেন চিঠি জিনিসটা আমার কতটা প্রাণের। আমি মনে করি, চিঠির থেকে সৎ, আপন এবং হৃদয়াবেত্তাসম্পন্ন লেখা আর কিচ্ছুটি হতে পারে না। যে আবেগানুভূতিকে 'ম্যাচিওর' মানুষজন ব্রাত্য করে রাখেন - মানে, ফেসবুক পোস্টে প্রবল আবেগ দেখান এবং ব্যক্তিগত স্তরে সেই আবেগকে নিয়ে ঠাট্টা-ইয়ার্কি মারেন - সেই আবেগানুভূতিকে সবথেকে স্পষ্ট, সহজ, সরল, রাখঢাকহীনভাবে কেউ যদি তুলে ধরতে পারে, তবে তা হল চিঠি। তার মধ্যে ভান নেই, কোনো লুকোচুরি নেই, নিজেকে মেলে ধরতে কোনো বাধা নেই। চিঠি একটা মানুষের মনকে যেভাবে তুলে ধরে, তা অত্যন্তই বেনজির - যেজন্য, আমরা কোনো মানুষকে জানতে গেলে, বিশেষ করে বিখ্যাত মানুষদের - চিঠি বা ডায়রির শরণাপন্ন হই।


এইজন্যই, বরাবর আমি চিঠি লিখতে ভালোবাসি। প্রথম চিঠি লিখেছিলাম একটি মেয়েকে, যাকে আমার পছন্দ ছিল। তখন পড়ি লোয়ার কেজিতে। মেয়েটি আমাদের ফ্ল্যাটেই থাকতো আর আমার সঙ্গে স্কুলে পড়ত। সম্ভবত এক ক্লাস উঁচুতে পড়ত সে। হারিয়ে-যাওয়া মামাবাড়ির বারান্দায় এক শীতের দুপুরে বসে বসে তাকে ৫ পাতার একটা চিঠি লিখেছিলাম, যাতে 'তোমাকে না দেখলে আমার খুব মন খারাপ করে, তুমি স্কুলে রোজ আসো না কেন, তোমার ওই লাল রিবন দিয়ে বাঁধা বেণী আমার খুব ভালো লাগে, তুমি চাঁদের মতো স্নিগ্ধ' ইত্যাদি লিখেছিলাম। কচি বয়েস থেকেই সুমন-মান্না শুনে গাছপাকা আমি চিঠিতে গানের লাইনটাইনও দিয়েছিলাম বিস্তর। সবই ভালো, কিন্তু সেই চিঠি তাকে আর সাহস করে দিয়ে উঠতে পারিনি। ব্যাপারটা মনে পড়লে এখন বেশ হাসিই পায়, তার মধ্যে আবার সামনের মাসে তার বিয়ে।


ভালোবাসলে চিঠি লেখা ব্যাপারটা সেই তবে থেকে আমার সঙ্গে অদ্ভুতভাবে জুড়ে গিয়েছে। কিন্তু, অদ্ভুতভাবেই - সেই অনুভূতিগুলো কোনোদিন ফিরে আসেনি আমার কাছে। কোনোদিন বললে হয়তো মিথ্যে হবে যদিও। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সেই অনুভূতিগুলোকে দেখেছি খোলা বাজারে বিকিয়ে যেতে। ভালোবেসে চিঠি লিখে উত্তর না পাওয়ায় যত না কষ্ট হত, তার থেকে বেশি খারাপ লাগতো সেই চিঠিগুলো নিয়ে উদ্দিষ্ট ব্যক্তির পরিচিতরা ঠাট্টা-তামাশা করছে। আবেগ, যা কিনা একান্তই আপন, সেই ধবধবে শ্বেতশুভ্র আবেগকে কুৎসিত তামাশার কালিঝুলি মেখে রাস্তায় পড়ে থাকতে দেখতাম।


তাও, হাল ছাড়িনি। লিখে ফেলতাম চিঠি। ভালোবাসলে চিঠির থেকে দামি আর কিছু হতে পারে, এমনটা মনে হয়নি কোনোদিন।


আমার প্রাক্তন প্রেমিকা আমাকে প্রথম প্রথম দুয়েকটা চিঠি লিখেছিল। তারপরে আস্তে আস্তে দূরত্ব বাড়ে। একটা চিঠির থেকে আরেকটা চিঠির দূরত্ব বাড়তে থাকে, বাড়তে বাড়তে চিঠিগুলো হারিয়ে যায়। আমি তবুও লিখতাম। থামাইনি। কখনো পড়ত সে, কখনো না। বেশিরভাগ সময়েই একটা 'তুই কী সুন্দর লিখিস!' মার্কা স্টক উত্তর তার ঠোঁটের গোড়ায় লেগেই থাকত। অথচ, আমি আমার লেখার প্রশংসা শুনতে চাইতাম না। চাইতাম, সে যেন পড়ে। আমাকে স্তোক দিতে নয়, ভালোবেসে। সেটার উত্তর লেখে। চিঠির উত্তর দেওয়া কি খুবই কঠিন? হয়তো নয়। কিন্তু, মনকেও সায় দিতে হয়। চিঠির উত্তর অঙ্ক নয়, যে জোর করলেই মিলবে।


তাকে শেষ চিঠিটা লিখেছিলাম গত বছর ডুয়ার্সে বেড়াতে গিয়ে। চিলাপাতার জঙ্গলে বসে ঝিঁঝিঁর ডাক শুনতে শুনতে, এক মনকেমন করা সন্ধেতে, অখিলবন্ধু শুনতে শুনতে তাকে চিঠি লিখেছিলাম।


সে পড়েনি। 'অত বড়ো চিঠি পড়তে ভাল্লাগছে না। পরে দেখা যাবে।'


পড়েনি আর সে। জানতাম, পড়বে না। আমিও অনুরোধ-উপরোধের পথ বহুদিন হলো হাঁটা বন্ধ করে দিয়েছিলাম, শান্তির জন্য।


শান্তি। কত ছোটো শব্দ, কিন্তু কী প্রবল প্রভাব তার। সারাটা জীবন, আমরা শুধু পাগলের মতো শান্তি খুঁজে চলি। পাই না কেউই। যে কোনো কিছুর বিনিময়ে আমরা শুধু শান্তি কিনতে চাই দুমুঠো, কিন্তু পাই না। সেই দাম চুকিয়ে দেওয়ার মতো ঋদ্ধ হতে পারিনা আমরা।


সে ছেড়ে যাওয়ার পরে নিজের মতো করেই একের পর এক না-পাঠানো চিঠি লিখে যেতাম। আমি নিজের চিঠিগুলোর অধিকাংশই কাউকে উদ্দেশ্য না করে লিখে যেতাম আগেও - 'ঠিকানাবিহীন চিঠি' নামে। সেরকমই লিখে যাচ্ছিলাম।


তখনই, ভালো লাগল একজনকে। যা হয়। একটা শূন্যতা ভরাট করতে গিয়ে ভালো লেগে যাওয়া। তাকেও পরের পর চিঠি লিখে গেছি। নিরর্থক। সে তার মতোই, দিব্যি চলে গিয়েছে। 'সময়েই যে যাওয়ার যায়, মেনে নিতে শিখেছি বিদায়...' সুমন লিখেছিলেন।


তারপরেও, তারপরেও ভালোবেসেছি। চিঠি লিখেছি। অপমানিতও হয়েছি। শুধু ভালোবেসে যে এতটা অপমানিত হওয়া যায়, তা জানা ছিল না। বন্ধুদেরকেও চিঠি লিখেছি। তারাও, দুয়েকজন বাদে, কেজো-কেঠো উত্তর দিয়েছে। কিন্তু, যাদের থেকে পাওয়ার ছিল, তারা কেউ ফিরিয়ে দেয়নি। সত্যিই, চিঠি লেখা বড্ড কঠিন। অনেক সময় লাগে। অনেক কষ্টস্বীকার। আবেগ-টাবেগের মতো ছেঁদো জিনিস মানায় না। আমার বয়সোপযোগীও নয়, পেশাপযোগী তো আরোই নয়।


একটা সময়ে হাল ছাড়তেই হয়। হার মেনে নিতে হয়। এগিয়ে যেতে হয়। নিয়েছি। চিঠি লেখা বন্ধ করে দিয়েছি। আমার ভালোবাসার চিঠিলেখাকে যত্ন করে চুল্লিতে ঢুকিয়ে দিয়েছি। নেড়েঘেঁটে তার নাভি নিয়ে ভাসিয়ে দিয়েছি গঙ্গায়।


ভালো থাক চিঠিরা। যে চিঠিগুলো কোনোদিন ঠিকানা পেল না, ভালোবাসা পেল না, উত্তর পেল না, প্রত্যুত্তর পেল না - তারা সবাই ভালো থাকুক। আমি না লিখলে যদি তারা ভালো থাকে, তবে তাই সই। 



জীবনে তো কত কিছুই ছাড়তে হয়। না হয়, নিজের সবথেকে আপন চিঠি লেখাটাই ছাড়লাম! অপমানের থেকে, অবহেলার থেকে, উপেক্ষার থেকে, তাচ্ছিল্যের থেকে তা অনেক ভালো।



তাই এই কদিন একটু এই চিঠি-নামের খেলনা চিরকুটে, বেনামী খেলায় মেতে ছিলাম। তার পালা মিটল। ধন্যবাদ, যাঁরা আমাকে লিখেছেন। যাঁরা লেখেননি, তাদেরও ধন্যবাদ। যাদের চিঠির আর উত্তর দেওয়া হবে না, তাদের কাছে দুঃখিত। তবে, কথা হবে, গল্প হবে। 


বিদায়, পত্রাবলী। :)  


Sunday, 17 November 2024

ভেন্ডারকথন

 রমাপদ চৌধুরী তাঁর স্মৃতিকথা 'হারানো খাতা'-য় লিখেছিলেন, ভারতে রেলব্যবস্থার পত্তন কীভাবে পরোক্ষভাবে জাতীয়তাবাদী সত্তাকে জাগিয়ে তুলেছিল - ফার্স্ট ক্লাসের কামরা ইউরোপীয় সাহেবদের, সেকেন্ড ক্লাসের কামরা মোটামুটি বড়োলোকদের, আর সাধারণদের জন্য ভরসা থার্ড ক্লাস। থার্ড ক্লাসে জাতপাত-বর্ণধর্ম-ছোঁয়াছুঁয়ি সব ঘুচে যেত। অত্যন্ত ধর্মপ্রাণ, গোঁড়া ব্রাহ্মণের সঙ্গে উঠতেন নিম্নবর্ণের মানুষও। থার্ড ক্লাস সব্বাইকে আপন করে নিতো, মনে করিয়ে দিতো যে তাদের একমাত্র পরিচয় ভারতীয়-ই। এই একই রকম অনুভূতি আমার হয়েছিল ভেন্ডার কামরায় উঠে। 


ট্রেনের ভেন্ডার কামরা -- এক অদ্ভুত, সমাজবিচ্যুত, দ্বীপের ন্যায়, চতুর্মাত্রিক কোনো এনটিটি, যার তুল্য অস্তিত্ব ওই কামরার বাইরে কোথাও নেই। ভেন্ডার কামরা যে ধরনের সাম্যবাদ প্রোমোট করে, স্বয়ং গ্রামসি তাঁর কালচারাল হেজিমনির তত্ত্ব ভুলে যেতেন দেখলে। 


ডেলিপ্যাসেঞ্জারের জীবনে পা দেওয়ার আগে যখনই ট্রেনে চড়তাম, বরাবর জেনারেল কামরাতেই উঠেছি। ভেন্ডার কামরা যখনই পাশ দিয়ে যেতো, নাকে গোঁত্তা মারত এক বিটকেল ছানাপচা টক-টক গন্ধ। ওই গন্ধে প্রাণ ওষ্ঠাগত হয়ে যেতো। ফলে, কোনোদিন কল্পনাতেও আসেনি ভেন্ডারে ওঠবার কথা। 


কিন্তু অদৃষ্ট - প্রথম কলেজে মাস দেড়েক 'লাইফ ইন আ মেট্রো' হওয়ার পরে, ট্রেনের দীর্ঘযাত্রার সুযোগ জুটে গেল, অন্তত বছর তিনেকের জন্য। দীর্ঘ মানে, খড়দা থেকে শেয়ালদা। খাতায়-কলমে ১৮ কিমি রাস্তা, ৩৮ মিনিটের শিডিউল্ড টাইম - যেটা ঢুকতে প্রায় ৫০-৫৫ মিনিট লেগেই যেত আমাদের সময়ে। শিয়ালদা নর্থের ট্রেন লেট করা এবং ঝোলানোর উপর আমার যা বিশ্বাস ছিল, অত বিশ্বাস নিজের প্রাক্তন প্রেমিকাকে অবধি কোনোদিন করে উঠতে পারিনি। 


প্রথম কিছুদিন আপ ট্রেন ধরে ব্যারাকপুর গিয়ে ফের ডাউন ব্যারাকপুর লোকাল ধরে বসে বসে যেতাম। কিন্তু তার জন্য যত সকালে উঠতে হত, তা আমার পক্ষে রীতিমতো টর্চারের শামিল। পড়াশুনোও করব, কলেজেও পড়ব, আবার সকালেও উঠব - এ কেমন অবিচার?


নিকুচি করেছে বসা - এই বলে সোজা বেরিয়ে পড়লাম গটগট করে। খড়দায় এসে দাঁড়ানো ডাউন ট্রেনের ভিড় দেখেই প্রবল জেদ ফুস হয়ে গেল। এবার? এইজন্যই বলে, মা-বাবার কথা শোনা উচিত। 


ইতিউতি তাকিয়ে দেখি, প্রথম ভেন্ডার কামরাটি 'গড়ের মাঠ' না হলেও, 'পেছনে একদম ফাঁকা, খালি গাড়ি কালীঘাট' মার্কাও নয়। অন্তত উঠে দাঁড়ানো যাবে। কিন্তু গন্ধ... 


'ধুত্তোর অলফ্যাক্টরি' বলে উঠে পড়লুম ভেন্ডারে। উঠতেই নাকে ঝাপটা মারল ভেপসে যাওয়া ছানা, পচা শাক, কাঁচা মাছ - সব মিলিয়ে একেবারে রাজা এজিয়ানের আস্তাবলের মতো ব্যাপার। আমি তো আর হারকিউলিস নই - কী করি এবার?


মেনে নিতে হল। কোনোমতে নাকমুখ সিঁটকে যাতায়াত শুরু করলাম। দিনদুয়েকের মধ্যে, আশ্চর্যভাবেই, গন্ধটা নাকে অনেকটা সয়ে এলো। আর, গন্ধ সয়ে আসতেই পুরোনো প্রি-কনসিভড নেতিবাচক ধারণা কেটে গেল, এবং ভেন্ডারের বেশ কিছু ভালো দিক চোখে পড়ল। 


ভেন্ডার একমাত্র জায়গা, যেখানে আরামসে ধূমপান করা যায়। কলেজে পড়া আমি চেইনস্মোকার ছিলুম। খড়দা থেকে কলেজ পৌঁছোতে পৌঁছোতে আমার এক প্যাকেট সিগারেট শেষ হয়ে যেতো। সেই আমার জন্য ভেন্ডারের থেকে উৎকৃষ্ট জায়গা আর কী হতে পারে? 


শুধু তাই নয়, ভেন্ডারে হইহই করে ব্রিজ খেলা চলত। আমার তখন মারাত্মক ব্রিজের নেশা। রাজ্য ব্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের মেম্বার হয়েছি, ব্রিজ খেলতে বড়ো বড়ো ক্লাবে যাচ্ছি, অ্যাসোসিয়েশনের অফিশিয়াল ক্লাবের সদস্যও। রোজ কলেজ সেরে পূর্ণদাস রোডে তাস পেটাতে যেতাম। ফলে, দুই নেশা মিলে ভেন্ডার আমার জন্য এক নতুন স্বর্গরাজ্য হয়ে উঠল। 


ভেন্ডারে কেউ কাউকে রেয়াৎ করে না। আমার যে স্নবারিটুকু ছিল, ভেন্ডারে উঠে দুই খিস্তিতে কেটে গিয়েছিল। আমার কলেজ আমাকে অতটা ডিক্লাসড করতে পারেনি (প্রেসি-যাদবপুরের মতো দুই আঁতেল এবং এলিট, সমাজ-বিচ্যুত প্রতিষ্ঠান এমনিও পারেনা), যতটা ভেন্ডার করেছিল। 


আমার তাস খেলার সঙ্গী ছিলেন বাকি যে তিনজন - তার মধ্যে একজন রাজ্য সরকারি আমলা, একজন সবজির পাইকারি বিক্রেতা, এবং একজন স্কুলশিক্ষক। এদের মধ্যে স্কুলশিক্ষক দমদমে নেমে যেতেন - আর সেই জায়গা নিতেন এক ফুলঝাড়ু বিক্রেতা। 


বাইরে হয়তো অনিমেষদা (নাম পরিবর্তিত) আমলা, ওয়াসিমদা (নাম পরিবর্তিত) সবজি বিক্কিরি করে, তুষারদা (নাম পরিবর্তিত) হাইস্কুলে পড়ায়, রতনদা (নাম পরিবর্তিত) ফুলঝাড়ু বেচে। আমি প্রেসিডেন্সির ভেকধারী আঁতেল। কিন্তু ওখানে আমরা সবাই সমান। একই সিগারেটের কাউন্টার সবার হাতে হাতে ঘুরছে। বাংলা থ্রি নো-ট্রাম্প খেলা অনিমেষদা ডাউন করায় ওয়াসিমদা মা-মাসি তুলে খিস্তি করছে, আর অনিমেষদা 'ভাই রাগ করিস না, গুনতে ভুল হয়েছিল' করে বোঝাচ্ছে। বাইরে আমরা যে যাই হই, ভেন্ডরে আমরা সবাই এক। একটাই আমাদের শ্রেণিপরিচিতি - আমরা ভেন্ডারযাত্রী। কী অদ্ভুত এক সাম্যের পাঠ পেয়েছিলাম! 


কোনোদিন না গেলে, পরে/আগে গেলে খোঁজ নিতো এরা সবাই। ওয়াসিমদার মেয়ের বিয়ের খরচের সিংহভাগ অনিমেষদাই দিয়েছিল, অনেক পরে জেনেছিলাম। রতনদার ছেলে ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করায় তুষারদা ভেন্ডারের প্রত্যেককে মিষ্টি বিলিয়েছিল, চেনা-অচেনা সব্বাইকে। সে আরেক ঝামেলা - ট্রেনে উঠছে লোকে, আর তুষারদা বাক্স খুলে 'এই নিন, খান' বলে বাড়িয়ে দিচ্ছে। লোকে সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখছে, কিন্তু তুষারদার ভ্রুক্ষেপ নেই। 


কলেজ ছাড়ার পরে আর ভেন্ডারে উঠিনি। জানি না, তাদের আজ কী খবর। তবে শূন্যস্থান কখনোই শূন্য থাকে না। আমার জায়গায় অ্যাদ্দিনে নতুন পার্টনার এসে গিয়েছে। অনিমেষদা-রতনদারও রিটায়ার করে যাওয়ার কথা। অন্য কেউ এসে গিয়েছে নির্ঘাত সেখানে। 'ফোর হার্টস' - 'ফাইভ ডায়মন্ডসের' ডাকে কামরা মাতায় অন্যরা এখন।


সব পাল্টে যায় - মানুষ, জীবন, যাত্রা, স্টেশন। শুধু ভেন্ডার এক থেকে যায়। এক রয়ে যায়।..

Thursday, 14 November 2024

বড়ো হয়ে বড়ো হব

আজ নাকি আমাদের, মানে ছোটোদের দিন। সবার কতো ভালো কথা! অন্যদিনগুলোয় ছোটোদের কী অপমান, কী অপমান! একটা কথা যদি শোনে কেউ আমাদের!

 


আরে, ছোটো হওয়া কি ইয়ার্কি নাকি? তোমরা, মানে বড়োরা যে আমাদের এভাবে হতচ্ছেদ্দা করতে থাকো, বোঝো ছোটো হওয়া কত কঠিন? হয়ে দেখেছো কখনো ছোটো? 


তোমাদের যখন বলি, বারান্দায় ঘ্যাঁঘাসুর বসে আছে ঘাপটি মেরে, বেরোতে গেলেই ধরবে, তোমরা বিশ্বাস করেছো? হেসে উড়িয়েই দিয়েছো। কী? না, এসব নাকি হয় না। বললেই হলো? আগেরদিন দীপু মা শীতলার দিব্যি কেটে বলল, ওর বাড়ির বারান্দায় সন্ধে থেকে ঘ্যাঁঘাসুর এসে বসে থাকে। ও মিথ্যে কথা বলেছে, বলো? মা শীতলার দিব্যি কেটে ও মিথ্যে বলবে? বেশ, না হয় বলল। কিন্তু বোসদের পোড়ো আমবাগানটায় যে ঘোলু আর ভোলু বলে দুটো কন্ধকাটা থাকে, সেটা তো সত্যি মানবে? ও মা! তাও দেখি মানো না। বাবাকে বলতে গেলাম, বাবা খুব গম্ভীর মুখে শুনে 'হ্যাঁ, এখন কাজ করছি, বিরক্ত করো না' বলে তাড়িয়ে দিল। কী মুশকিল, ওই আমবাগানের পাশ দিয়েই তো বাবা ফেরে। মানুষের ভালো কি আর করতে আছে? বুঝবে ঠ্যালা, একদিন ঘোলু-ভোলু লম্বা হাত বাড়িয়ে রাস্তা থেকে টেনে নিয়ে গিয়ে গেন্ডুয়া খেলুক। তখন না মেনে থাকে কী ভাবে, দেখব। সব কাজ বেরিয়ে যাবে!


সেদিন দূরের যে লম্বা রাপুঞ্জেলের প্রাসাদটা, যেটাকে দাদা সমানে বলতে থাকে ফোনের টাওয়ার - কী বোকা দেখেছো? - সেটার উপর একটা বিরাট পাখি বসেছিল। দাদাকে যত বলছি, ওটা সিন্দবাদের রক, দাদা হেসেই উড়িয়ে দিচ্ছে। বলছে ওটা নাকি চিল। মানে আছে কোনো, বলো? কলেজে পড়ে আর গোঁফ গজিয়েছে বলে কি সব জেনে গিয়েছে? বেশি হাসুক, আমিও বাড়িতে বলে দেবো ও লুকিয়ে লুকিয়ে সিগারেট টানে। আমি স্পষ্ট দেখেছি, মাক্কালী! ওর ব্যাগে দেশলাই বাক্সও দেখেছি আমি। বড়ো হয়ে গেলে মানুষ বোধহয় এসবই করে! 


এই যেমন, সেদিনকার কথা। ক্লাসে আন্টি জিজ্ঞেস করছিলেন, কে কী হতে চাও বড়ো হয়ে। প্রতীক, আমাদের ফার্স্ট বয় কী একটা বলল আইএস না কী। আন্টি শুনে খুব খুশি! কে জানে ভাই, কী ওটা! আমাকে তো বাপু জিজ্ঞেস করাতে আমি সোজা উঠে দাঁড়িয়ে বললাম, রঘু ডাকাত। বলেই ক্ষান্ত হইনি, মুখে হাত চাপা দিয়ে হা-রে-রে-রে বলে হাঁক পেড়েও দেখালাম। ক্লাসের সবাই হাততালি দিয়ে উঠল! তোমাদের চুপিচুপি বলি, কাউকে বলো না যেন - দুপুরবেলায় ঠাম্মি ঘুমিয়ে পড়ার পর আমি একা একা বাগানে গিয়ে অনেকদিন ধরে এটা অভ্যেস করে করে শিখেছি। ঘোঁতনকে আগেরদিন শোনালাম - ওর চোখগুলো গুল্লি-গুল্লি মার্বেলের মতো হয়ে গিয়েছে শুনে। অথচ, কী অদ্ভুত, আন্টির মুখটা কীরকম রাগী-রাগী হয়ে গেল - দাদুর টেবিলে একটা বাঘের ছবি দেওয়া ক্যালেন্ডার আছে, অনেকটা ওরকম। আন্টি বললেন, বাড়ি থেকে যেন মা-বাবাকে নিয়ে দেখা করি। খবরটা মা-বাবাকে বলতেই ওদের মুখটাও কেমন ওই রাগী বাঘটার মতো হয়ে গেল। কারণ জানতে চাওয়ায় পুরোটা বললাম। শুনে বাবা-মা নিজেদের মধ্যে গজগজ করতে থাকল, আমি নাকি কীসব 'ফ্যান্টাসি' বই পড়ে এমনটা হয়ে যাচ্ছি। কী বলে, বুঝি না বাপু। 


তা বাবা-মা গেলো। প্রিন্সিপাল ম্যাম, আন্টি, বাবা, মা - সবাই রাগী বাঘের মতো মুখ করে বসে। মায়ের মুখটা যদিও মাঝে মাঝে আমাদের পাড়ার হুলোটার মতো হয়ে যাচ্ছিল, যাকে দেখলেই মনে হয় এক্ষুণি কেঁদে ফেলবে। তাই দেখে আমি ফিচফিচ করে হেসে ফেলছিলাম বলে বাবা এক ধমক লাগাল। ওরা কীসব বলল, আমি অত শুনিনি। আমি তখন জানলার বাইরে আকাশ দেখছিলাম। ওদিন পাঁচটা আইস্ক্রিম মেঘ, দুটো গাড়ি, ছটা ব্যাং আর তিনটে কচ্ছপ মেঘ যেতে দেখলাম - আমি পরিষ্কার গুণেছি। আমি কর ধরে ওয়ান, টু করে করে গুণতে পারি। এর মধ্যেই কানে আসছিল, ওরা 'আনমাইন্ডফুল' 'ডেড্রিমিং' 'ইম্ম্যাচিওর' 'নন-সিরিয়াস' কীসব যেন বলছে। তারপর আমাকে ডেকে বলা হল, আমাকে নাকি প্রতীকের পাশে বসতে হবে, কারণ ও আইএস হতে চায়। 


কী জ্বালা! এই আইএসটাইএস কেন হবো আমি? তাকে নাকি সবাই ভয় পায়, শ্রদ্ধা করে। আরে, রঘু ডাকাতকেও তো সবাই ভয় পায়! ভাবো, কত সাহস হলে চিঠি পাঠিয়ে জমিদারবাড়ি ডাকাতি করতে যায়। সবাই ভয়ে কাঁটা হয়ে থাকে। আর শ্রদ্ধা পেতে হলে ক্যাপ্টেন স্কট হবো! এমনিতেও আমি ভেবেইছি, আমি আর ঘোঁতন মিলে আটলান্টিস আর এলডোরাডো খুঁজে বের করব। এই যাহ, তোমাদের বলে দিলাম! আসলে এটা সিক্রেট তো খুব! আমাদের এখানে নন্দীদের যে পুকুরটা আছে, ওই পুকুরের তলা দিয়ে সোজা আটলান্টিসে যাওয়া যায়। ঘোঁতন একদিন সাঁতার কাটতে গিয়ে তলায় একটা টানেল দেখেছে, যার ওদিক দিয়ে আলো আসছিল। আমি আর ঘোঁতন ডুবুরির পোশাক বানাচ্ছি রেনকোট কেটে। হয়ে গেলেই আমরা বেরোব। আর সেসব ছেড়ে, আমি হব নাকি আইএস? প্রতীকটা এক নম্বরের বাজে ছেলে। কিচ্ছু জানে না ও। হেডউইগের ছবি দেখে নাক সিঁটকে বলেছে, এ নাকি এমনিই লক্ষ্মীপ্যাঁচা, এদিকে খুবই পাওয়া যায়। ও আসলে এসব কিচ্ছু পড়েনি। ওর মা আসলে খুব রাগী। সারাক্ষণ পড়তে বসায় ওকে। তার পাশে বসতে হবে আমাকে?


তাহলেই দেখো, আমাদের কতো কষ্ট। আমাদের কে বোঝে? কেউ কিচ্ছু মানতে চায় না। পাড়ার শেষ বাড়িটা যেটা, যেখানে কেউ থাকেনা আর সারাবছর থাকে, ওখানে যে রাতে ভূতে নাচ করে 'হিং হ্যায়, তেল হ্যায়, ইমলি হ্যায়, লসুন হ্যায়' বলে, আর মানিক কুঁজ নিয়ে গেলে তার কুঁজ ফেলে দেয় - এটাও কেউ মানতে চায় না। সবাই বকা দেয়। আমাদের বাড়িতে ভাত খায় যে মেনিটা, ওটাই যে আসলে মজন্তালী সরকার - এটা সব্বাইকে কতবার বলেছি। শুনলে হাসে সবাই। আমি তো বাবা ওকে দেখলেই 'পেন্নাম হই মহারানী' বলি। কী দরকার, রাজার কাছে নালিশ করে যদি?


আর বড়ো হলে কত সুবিধে! শুধু সবার উপর চেঁচিয়ে যাও, বকে দাও। যার যার উপর রাগ হচ্ছে, তার উপর চেঁচাতে না পারলে ছোটো কাউকে ধরে বকে দাও। ওদের ভাবতে হয়, কাল স্কুলের পাশের দোকানটায় ড্র‍্যাগনবলজির স্টিকারগুলো শেষ হয়ে গেলে কী হবে? বা রমেন কাকুর দোকানে যে কুড়িটা রিফিল দেওয়া পেন বিক্রি হয়, যেটা রমেন কাকু এনে দেবে বলেছে, ওটা না এনে দিলে স্কুলে মুখ দেখাতে পারব কিনা? ওদের শুধু চেঁচামেচি করলেই হল, বকলেই হল। 


 ধুর ধুর। ঠিক করে নিলাম, আমি বড়ো হয়ে বড়োই হব। ছোটো হওয়া খুব কঠিন।

Wednesday, 13 November 2024

'আমারে বাঁধিছে রাদিচে..'

উইলিয়াম রাদিচে আর আমাদের মধ্যে নেই। জানতে পারলাম, দু'দিন আগে তিনি চলে গিয়েছেন। বাঙালির কাছে 'শুধুই বাঞ্ছারাম' মনোজ মিত্রের মৃত্যুসংবাদকে ছাপিয়ে তাঁর প্রয়াণের খবর ফেসবুক অ্যালগরিদমে জায়গা করে নিতে পারেনি। স্বাভাবিক। গেঁয়ো যোগীই যেখানে ভিখ পায়না, নাম-না-জানা বিলিতি যোগীর চলে যাওয়ার খবরে সেখানে আহাউহু না হওয়াটাই কাম্য। 


তবুও, রাদিচেকে হয়তো অনেকেই চেনেন। যাঁরা চেনেন, জানি না তাঁদের কাছে রাদিচের গুরুত্ব কতটা। হিসেব মতো, আমার কাছেও থাকা উচিত নয়। জেভিয়ার্সখেদানো-প্রেসিতাড়ানো আমার মতো সামান্য পাঠকছাত্রের উপর রাদিচের প্রভাব ঠিক ততখানিই হওয়ার কথা, যতটা প্রভাব বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় ভার্সেই চুক্তির ছিলো।


কিন্তু আমার সৌভাগ্য, সম্ভবত রাদিচের দুর্ভাগ্যও, রাদিচের সঙ্গে আমার পরিচিতি হয়ে যায়। আমার মতো মূঢ় মানুষ কোনোদিনই তাঁকে খুঁজে পেতো না, যদি না আমার জীবনে ড. ঋতম্‌ মুখোপাধ্যায়ের মতো একজন প্রফেসর থাকতেন।


থার্ড ইয়ারে পড়ি তখন। পঞ্চম সেমিস্টার। মধ্যযুগের অকূল পাথারে ভরাডুবি হয়ে আধুনিক সাহিত্যে এসে একটু হাঁপ ছাড়ছি সবে। সিলেবাসে রবীন্দ্রনাথের উপর একটি পেপার ছিল, যার মধ্যে একটি মডিউল ছিল রবীন্দ্র কবিতা। মডিউলটি ঋতম্‌বাবু পড়িয়েছিলেন।


'সোনার তরী' পড়ানোর কথা একদিন। ক্লাসে এসে স্যার সবার আগে ধরেছিলেন রাদিচে। আমি বুঝভুম্বুল। কী জ্বালা, এখন অনুবাদ থেকে রবীন্দ্রনাথ পড়ব কেন? কী দরকার এসবের? আচ্ছা ঝামেলা তো! 


ভাগ্যিস পড়িয়েছিলেন স্যার। ভাগ্যিস স্যার রাদিচের সঙ্গে আলাপ করিয়েছিলেন। নয়তো সারা জীবন ট্রান্সলেশন স্টাডিজের সঙ্গে পরিচিতি হত না। জানতে পারতাম না, কীভাবে একটা প্রাইমারি টেক্সটকে ভেঙেচুরে তার যথার্থ অনুবাদ করতে হয়। অনুবাদের ভাষা ও প্রাইমারি টেক্সটের ভাষার মধ্যে যোগসূত্র কীভাবে তৈরি হয়, কীভাবে লেখক বা অনুবাদকের ছাপ পড়ে ভাষাকে ছাপিয়ে যাওয়া ভাবের মধ্যে, সেসব কিচ্ছু শিখতাম না। রাদিচে-অনূদিত 'গোল্ডেন বোট' এবং রবীন্দ্রনাথের স্ব-অনূদিত 'গোল্ডেন বোট'-এর মধ্যে ফারাকটাও জানতে পারতাম না। জানতে পারতাম না, কেন রাদিচে পাটনীকে স্ত্রীলিঙ্গবাচক করে তুলেছেন। একটা নতুন দিক খুলে দিয়েছিলেন স্যার, এবং অবশ্যই, রাদিচে। 


তারপরে বিস্তর ঘেঁটেছি রাদিচে নিয়ে। স্যারের সঙ্গে কথা হয়েছে ট্রান্সলেশন স্টাডিজ নিয়ে। ডিসার্টেশন করার কথাও ভেবেছিলাম স্যারের কাছে, জাপানি সাহিত্য এবং বাংলা অনুবাদের উপর। স্যার প্রবল উৎসাহ দেওয়া সত্ত্বেও, গাইড হিসেবে স্যারকে না পাওয়ায় তা আর হয়ে ওঠেনি। 


ঋতম্‌বাবু, এবং সর্বোপরি রাদিচে না থাকলে অনুবাদ ব্যাপারটাকে কোনোদিনই অন্য চোখে দেখতে পারতাম না, বা ডিসিপ্লিন হিসেবে ট্রান্সলেশন স্টাডিজের মাহাত্ম্য বুঝতাম না৷ আমার মতো তুচ্ছ মরমানুষের জীবনে এই পাওয়াগুলোই বা কম কী?


ভালো থাকবেন, রাদিচে। আপনার ভূমিকা আমার সাহিত্যচিন্তন গড়ে ওঠার পিছনে যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ, সেটা বোঝাতে আমি ক্লাসে একটা মজার কথা বলতাম - 'আমারে বাঁধিছে রাদিচে।' 



Rest in peace. :)

'ঠাকুরমার ঝুলি'

 আজকে আমার ঠাকুমার মৃত্যুবার্ষিকী। ২০২১ সালের এই দিনেই তিনি গত হয়েছিলেন। এইটুকু পড়েই অনেকে হয়তো, 'ওঁ শান্তি, আত্মার শান্তি কামনা করি, তি...