Monday, 30 September 2024

বিদায়, সেপ্টেম্বর...


সেপ্টেম্বর, 

বিদায়ের বেলা আসন্ন। তোমার মেয়াদ ফুরিয়ে এল। আর তো মাত্র কয়েকটা মুহূর্ত, তার অব্যবহিত পরেই তোমার খণ্ড-অস্তিত্ব মিশে যাবে ডায়রির পাতায়, মিলতে না পারা অঙ্কের খাতায়। চলে যেতে হচ্ছে বলে তোমার মন কি ভারাক্রান্ত? যে শেষ বিদায়গুলো জানিয়ে যাওয়া হল না, স্টেশনে-বন্দরে একা পড়ে রইলো একপাক্ষিক আলিঙ্গনের রিক্ততাটুকু - তার শূন্যতাটুকু কি তোমার পাঁজরের মাঝে ছড়িয়ে দিচ্ছে করুণ বিধুরতা? কুড়োনো হল না যে ফুলগুলো, তারই কি নিরস্তিত্ব মালা গেঁথে চলেছো নিরন্তর?

 

সেপ্টেম্বর, যেতে তোমাকে হতোই। জগতের এটাই নিয়ম। আগমনীর মধ্যেই মিশে থাকে বিদায়ের নীরব প্রতিশ্রুতি, আসন্নের মধ্যেই থাকে আগামী। প্রকৃতির অদ্ভুত লটারির খেলায় তোমার হাতে পড়ল একটা কম দিন - নইলে, তুমিও বেঁচে দেখিয়ে দিতে, কীভাবে বাঁচা যায়। অথচ, এমনটা হয় না। যার ভাগ্যে যেটুকু পড়ে, সেটুকুর মধ্যেই যত্ন করে গুছিয়ে নিতে হয় নিজের ঝরাপাতার জীবনকে। অসংখ্য না-পাওয়াগুলোকে যদি গুনতে বসি, ভিড়ের শেষে অধীর অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকা মলিন মুখের বাচ্চাটার মতোই, ‘পাওয়া’গুলোর জন্য তো আর কিচ্ছুটি পড়ে থাকবে না! যা আছে, তাই ভালো। যেটুকু অপ্রাপ্তি, তাদের যেতে দাও। আঁকড়ে থেকো না। মায়া একেই অতি বিষম বস্তু, তার মধ্যে অপ্রাপ্তির মায়া আরো বেশি। হাসিমুখে বিদায় জানাও। চলে যখন যেতেই হবে, তখন তুচ্ছতা বাদ দাও। ওতে সংকীর্ণতা বাড়ে বই কমে না। মনকে কখনো ক্ষুদ্র হতে দেবে না, ডোবার মতো হতে দেবে না, আটকা পড়তে দেবে না কোথাও।


অথচ কী জানো, এসব বলার পরেও কোথাও গিয়ে একটা অবশ অভিমান কাজ করে। শরীর চলতে চায় না, পা এগোতে চায় না - ক্লান্তিতে নুয়ে পড়ে দেহ। মনের ভিতরে নেমে আসে অবসন্ন সন্ধে। অ্যালপ্রাজোলাম হাতড়ে নিতে হয় ড্রয়ার খুঁজে, যাতে পরের দিনটুকু রঙিনভাবে বাঁচা যায়। যে সেপিয়াগন্ধী দুঃখগুলো ঠেলে উঠতে চায়, তাদের ছিপিবন্দী করে রাখতে হয়। তুমি তো জানোই সেপ্টেম্বর, প্যান্ডোরার বাক্স থেকে প্রথমে কী বেরিয়েছিল। চেপে রাখতে রাখতে যখন অসহ্য লাগে, ফিরে যেতে হয় জলের কাছে। গর্তের কাছে। সমস্তটা উজাড় করে দিতে হয় সেখানে, দিয়ে মাটি চাপা দিয়ে দিতে হয়। 


এতো চাপাচুপি দিয়ে রাখার পরেও, দুঃখগুলো কীভাবে যেন ছাড়া পেয়ে যায়। ড্যান্ডেলিয়নের পাপড়ির মতো, চেরিফুলের পাতাঝরার মতো তারা ভেসে ভেসে ইতিউতি ঘুরে বেড়ায়। দেখো, জানালার বাইরে তাকাও, তাকালেই দেখতে পাবে তাদের। হাত বাড়ালেই ধরতে পাবে। কারোর না কারোর দুঃখ এই শহরের বুকে সবসময়ে ভেসে বেড়ায়। সবাই আসলে বড্ড দুঃখী, বুঝলে কিনা!


সেপ্টেম্বর, তুমি মনখারাপের মাস। একাকীত্বের মাস। তোমাকে কেউ চায় না। তোমার চলে যাওয়ার দিন গোনে সবাই। তুমি চলে গেলে পুজো আসবে। তুমি চলে গেলে এক রোদ-ঝলমলে শারদ ভোরবেলায় গা-ঝাড়া দিয়ে উঠে বসবে সবাই। গান বেজে চলে, ‘ওয়েক মি আপ, হোয়েন সেপ্টেম্বর এন্ডস…’। তুমি শুধু একলাটিই দাঁড়িয়ে থাকো, বর্ষাশেষ-শরৎশুরুর এক একলা সাঁকো হয়ে - চুপচাপ, টুপটাপ। অবহেলিত, বিস্মৃত - যে শিশুটিকে কেউ খেলায় নিতে চায় না বলে একা একা চুপটি করে মাঠের পাশটায় বসে থাকে। সে দুর্বল, সে দুধভাত। গলার কাছে দলা পাকিয়ে উঠতে থাকে আবেগাভিধানের বাইরের কোনো অনুভূতি। মিথ্যে সান্ত্বনাটুকুও তিতকুটে ট্যাবলেটের মতো লাগে। তুমি একলাই থেকে যাও, একা হয়ে। কী অদ্ভুত, না? শহরজুড়ে একা মানুষ এতো, তাও একলা তুমিটাকে কেউ টেনে নেয় না কাছে। নিজের করে নেয় না, আপন ভাবে না। অন্যমনস্ক-ইতিউতি-গয়ংগচ্ছ কাটিয়ে দেয়, যতক্ষণ না আজকের এই দিনটা এসে দোরগোড়ায় দাঁড়ায়।


শেষপাতে থাকে কিছু খুচরো বিদায়সম্ভাষণ, কিছু কেজো লৌকিকতা। ‘সাবধানে যাস-আবার আসবি’-র একঘেয়েমি। সমস্তটা মিটিয়ে উদাস পায়ে পথে নামা। ফের সামনের বছর। ততদিন, বিস্মৃতির ভিতর আরেক বৃহৎ বিস্মৃতিকে নিয়ে কাটিয়ে দেওয়ার নিঃশব্দ অশ্রুযাপন।

কোহেন সেপ্টেম্বর হতে চেয়েছিলেন। পারেননি। বা হয়তো পেরেছিলেন। সবাই সেপ্টেম্বর হতে পারে না। সেপ্টেম্বর হওয়া সহজ নয়। 


বিদায়। যাত্রা শুভ হোক।

Sunday, 29 September 2024

আমেজী ভালোবাসা, ফুল ফোটার কাল, ফুলেলা কিছু বছর - ওয়ং কার-ওয়াইয়ের নান্দনিকতার ভাষ্য


[ডিসক্লেইমার - ১) আমি ফিল্ম স্টাডিজের লোক নই, কোনো বোদ্ধাও নই। নিজের যেটুকু বোধ, তার উপরে ভিত্তি করে লেখা। ফলে, কোনো বক্তব্য থাকলে সরাসরি বলবেন।

২) ফিল্ম রিভিউ জিনিসটা আমার ফোর্টে নয় (সে কিছুই ফোর্টে নয়, এফোর্টে হতে পারে বড়োজোর)। ফলে, একটু বড়ো হয়ে গিয়েছে, এবং সম্ভবত ইনকোহেরেন্টও। ক্ষমাঘেন্না করে পড়ে বক্তব্য জানালে খুশি হব।]

ভালোবাসার কি সত্যিই বিশেষ ‘আমেজ’ থাকে? সমস্তটা জুড়েই কি ভালোবাসা নয়? নাকি, মুহূর্তের পর মুহূর্ত বুনে তৈরি হয় ভালোবাসার পশমি অস্তিত্ব? ভালোবাসা কি সামগ্রিকতা নাকি খণ্ডযাপন? সময়ের নিক্তিতে কি তীব্রতা মেপে নেওয়া যায় ভালোবাসার? ভালোবাসা ঠিক কতটা রঙিন, কতটা মোনোক্রোম, কতটা গ্রেস্কেল? আদৌ উচ্ছ্বাস, নাকি স্থবিরতা? 

এরকম হাজারো প্রশ্ন ভিড় করে আসছিল ওয়ং কার-ওয়াইয়ের তর্কাতীতভাবে শ্রেষ্ঠ এবং জনপ্রিয়তম সিনেমা ‘ইন দ্য মুড ফর লাভ’ দেখতে বসে। সিনেমাটা প্রথম দেখেছিলাম পাক্কা দশ বছর আগে। স্কুলে পড়তাম তখন, সদ্য মাধ্যমিক দিয়েছি। মাথায় ভূত চেপেছে সিনেমার। সারাদিন গোগ্রাসে সিনেমা গিলে যাচ্ছি। কিছু সিনেমা বুঝে, অধিকাংশই না বুঝে বা নিজের মতো করে বুঝে… তখনই, হাজারো ক্লাসিক সিনেমার ভিড়ে এই সিনেমাটাও দেখেছিলাম। প্রথম দেখায়, অবশ্যই, ভালো লাগেনি। ষোলো বছরের অপরিপক্ক্ব মাথা নিতে পারেনি ওয়ং কার-ওয়াই। তবে, সিনেমার বর্ণময়তা ভালো লেগেছিল, এইটুকু পরিষ্কার মনে আছে।

আবার যখন সিনেমাটা কিছুদিন আগে, এক বৃষ্টিমুখর বিষণ্ণ দিনে দেখতে বসলাম, তখন মাঝখান দিয়ে কেটে গিয়েছে দশটা বছর। গ্রামার ভাঙা শিল্পের সৌন্দর্য নিয়ে অল্পসল্প ধারণা জন্মেছে। পিকাসো-দালি-ম্যাগরিটের কাজ দেখেছি, দেখেছি বুনুয়েল-দুশঁর কাজ, পড়েছি সার্ত্র-হাক্সলি-মার্কেজ। প্লটের গঠন নিয়ে ধারণা জন্মেছে, ধারণা জন্মেছে উত্তর-অবয়ববাদ, উত্তরাধুনিকতা নিয়ে। খুবই উপরউপর ধারণা, তবুও। যদিও, সিনেমা দেখতে গেলে এগুলোর প্রয়োজনীয়তা কী - এই নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে। অনেক বিজ্ঞ ব্যক্তিই হয়তো বলবেন, সিনেমা আসলে কবিতার মতো। যা বুঝবে তুমি, যা দেখবে, তাই-ই সিনেমা। আমার সেই ব্যাপারটায় একটু আপত্তি আছে। বেশি ডিটেইলে না গিয়ে এটুকুই শুধু বলার, ব্যাকরণ না বুঝলে ব্যাকরণ ভাঙা কেন হচ্ছে - এটা বোঝা যায় না। এসব কচকচি এখানেই থাক বরং।

সিনেমাটা দেখতে গিয়ে যেটা টের পেলাম, একটা জিনিস দশ বছর আগের সঙ্গে একইরকম ভাবে মিলে যাচ্ছে - বর্ণময়তার প্রতি মুগ্ধতা। ইন দ্য মুড ফর লাভ-এ বিষণ্ণ ভালোবাসার যে রঙিন উদযাপন হয়েছে, সেটার মতো অদ্ভুত কনট্রাস্ট খুব কম আছে। এই কনট্রাস্ট থেকেই উঠে আসে ড্রামাটিক কনফ্লিক্ট, বা নাট্যদ্বন্দ্ব। সেসবে পরে আসছি। 

সিনেমাটির গল্প (বা গল্পহীনতা) খুবই সাধারণ। ষাটের দশকের শুরুর কথা, ঘটনাস্থল হংকং। প্রধান কুশীলবেরা হচ্ছেন এক সওদাগরি আপিসের মালিকের সেক্রেটারি সু লি-ৎসেন/মিসেস চ্যান (ম্যাগি চেয়ুং) আর এক সাংবাদিক চাও মো-ওয়ান (টোনি লেয়ুং)। মিসেস চ্যান এবং মিস্টার চাও দুজনেই একটি সস্তাগোছের অ্যাপার্টমেন্টে ভাড়া নিয়ে উঠবেন,পাশাপাশি ঘরে। দুজনেই বিবাহিত, দুজনের সঙ্গীই চাকরিসূত্রে জাপানে রয়েছে। হঠাৎই দুজনে আবিষ্কার করবেন, তাঁদের সঙ্গীরা একে অপরের সঙ্গে পরকীয়ার সম্পর্কে আবদ্ধ। সত্যিকে মেনে নিতে পারা আর না-পারার দোলাচল এবং এক শীতল শূন্যতাকে একটু উষ্ণ আঁচে ভরে নেওয়ার জন্য তাঁরা একে অপরকে সঙ্গ দেন। তাঁদের সম্পর্ক কী কী মোড় নেবে, সেটাকে ঘিরেই সিনেমাটা মূলত এগিয়েছে (বা এগোয়নি?)

ওয়ং কার-ওয়াই-এর সিনেমার একটা প্রধান বিশেষত্ব হল ছকের মধ্যে থেকে ছক ভাঙা। অ-সরলবৃত্তীয় আখ্যান (নন-লিনিয়ার ন্যারেটিভ) নিয়ে সিনেমায় যাঁরাই কাজ করেছেন, তাঁরাই তাঁদের শৈল্পিক স্বাধীনতা নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা চালাতে গিয়ে বহুক্ষেত্রে চলে গিয়েছেন অবস্কিওরিটির দিকে, কখনো বা জোর করে চাপিয়ে দিতে চেয়েছেন নিজের ন্যারেটিভ। তার ফলে ব্যাহত হয়েছে সিনেমার স্বাভাবিক গতি। মনের চেতনাপ্রবাহের সঙ্গে তাল মেলাতে সবসময়ে পারেনি রিলের চেতনা-আখ্যান। এখানে দাঁড়িয়েই ওয়ং কার-ওয়াই শিখিয়ে দিচ্ছেন, পরিমিতিবোধ কতটা দরকার। 

ইন দ্য মুড ফর লাভ মূলত কোলাজধর্মী সিনেমা। নন-লিনিয়ার ন্যারেটিভে যা মূলত হয়, অর্থাৎ কোনো বিশেষ দৃশ্যক্রম থাকে না। আগের ঘটনা, পরের ঘটনা, মাঝের ঘটনা… এসব কিচ্ছু নেই। সবটাই রয়েছে, আবার কিছুই নেই। নিজের মতো করে বসিয়ে নাও। গদারের সিনেমা, বিশেষ করে ‘প্রেইজ অফ লাভ’ দেখলে এটা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। গদার নিজেও বলে গিয়েছেন সেই বিখ্যাত কথাটি - ‘আ স্টোরি শ্যুড হ্যাভ আ বিগিনিং, আ মিডল অ্যান্ড অ্যান এন্ড, বাট নট নেসেসারিলি ইন দ্যাট অর্ডার।’ ‘ইন দ্য মুড…’-এও মোটামুটি একই জিনিস প্রায় দেখা যায়। একের পর এক সিন তৈরি হচ্ছে - জীবনানন্দ ধার করে বলা যায়, ‘তবু কেবলি দৃশ্যের জন্ম হয়’। অজস্র কোলাজ জুড়ে একের পর এক মঁতাজ শট (ব্রজদার ভাষায়, মন তাজা করে দেয় যা), দ্রুত দৃশ্যপটের পরিবর্তন - এককথায় যাকে ‘সিনেমাটিক ব্রিলিয়ান্স’ বলা যায়।

১৯৬৩-এর সময়ের ঘটনা দেখালেও মনে রাখতে হবে, সিনেমাটি ১৯৯০-এর দশকে তৈরি। বিশ্বায়নের খোলা বাজারের যুগ। পৃথিবী যত কাছাকাছি আসছে, মানুষের মধ্যে দূরত্ব তত বাড়ছে। ৯০-এর দশকের এই একাকীত্বকে ওয়ং বসাচ্ছেন ১৯৬০-এর দশকে। ভালোবাসা নামক ইনস্টিটিউশনের যে প্যারাডাইম শিফট, তাকে দুটো টাইমস্কেপে একইসঙ্গে প্লেস করতে গেলে সময়-কালের কাটাকুটি গ্রিডের ব্যাপারে প্রবল ধারণা থাকতে হয়। ওয়ংয়ের সেটা যথেষ্টই ছিল।

সিনেমাটির অনেকগুলো বিশেষ দিক রয়েছে। প্রথমত, রঙের ব্যবহার। ওয়ং কার-ওয়াইয়ের সিনেমার প্রতিটা ফ্রেমে রঙের ব্যবহার যে ঠিক কতখানি ভিভিড, উজ্জ্বল, বর্ণময় - সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। এক সমালোচককে এককালে দেখেছিলাম, মার্ক রথকোর ছবির সঙ্গে ওয়ংয়ের সিনেমার তুলনা করতে। এর থেকে ভালো তুলনা বোধহয় সম্ভবত আর হয় না। প্রতিটা দৃশ্যের সঙ্গে মানানসই কালার ফিল্ড, এবং বহুক্ষেত্রেই অত্যন্ত আনইউজুয়াল কালারস্কেপ - এর তুলনা খুবই কম। ‘ইন দ্য মুড ফর লাভ’-এ এই কালারস্কেপ অত্যন্ত অদ্ভুত একটা কনফ্লিক্ট তৈরি করেছে, যেটার কথা বলছিলাম। দুটো অত্যন্ত একলা মানুষ, যারা একাকীত্ব থেকে পাথর হয়ে গিয়েছে প্রায় - যারা নিজেদের জন্য রান্নাটুকুও করতে চায় না, যাদের নুডলস কেনার মধ্যেও অদ্ভুত একাকীত্ব মিশে আছে - তাদের ওয়ং কার-ওয়াই সাজিয়ে দিচ্ছেন লাল দৃশ্যপটে। লাল, অর্থাৎ ভালোবাসার রং। উষ্ণতার রং। চাউ আর সু-এর মধ্যে যে উষ্ণতাটা আসবে আসবে করছে, কিন্তু এসে পৌঁছোয় না - তাদের সাদাকালো জঞ্জালে ভরা জীবনে যে লাল রঙের প্রবল অভাব, ব্যাকগ্রাউন্ডে অন্তত ওয়ং তার কোনো অভাব রাখেননি। প্রেম আছে এবং প্রেম নেই - এই দুয়ের এক অদ্ভুত বর্ণময় কনফ্লিক্টে ভর করেই সিনেমাটা গড়গড়িয়ে এগিয়ে চলে। 

প্রসঙ্গত, এই বর্ণময় প্রেম দেখে আরেকটা সিনেমার কথা হয়তো মনে পড়তে পারে - দামিয়েন শ্যাজেলের বিখ্যাত মিউজিকাল রোমান্টিক কমেডি লা লা ল্যান্ড। এমা স্টোন-রায়ান গসলিং এর সম্পর্কের রসায়নেও এই রঙের ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ একটা ভূমিকা আছে। লা লা ল্যান্ড যেমন নৃত্যছন্দে এগিয়েছে, তেমনই এগিয়েছে ইন দ্য…-ও। ওয়ং নিজেই তাঁর এই সিনেমা সম্পর্কে বলতে গিয়ে বলেছেন, ‘টু পিপল ডান্সিং টুগেদার স্লোলি’। ঠিক এই কথাটাকেই আমরা কি ‘লা লা ল্যান্ড’-এর দুটো গান, ‘সিটি অফ স্টারস’ আর ‘আ লাভলি নাইট’-এ ফেলতে পারিনা? তবে, দুটো সিনেমার মধ্যে ফারাকও বিস্তর। ইন দ্য মুড ফর লাভ-এর বিষণ্ণতা কখনোই প্রাণোচ্ছ্বলতায় পর্যবসিত হয় না; লা লা ল্যান্ড-এ প্রাণোচ্ছ্বলতা থেকে বিষণ্ণতার একটা রুটবদল বরং দেখা যায়। লা লা ল্যান্ড-এর থিম্যাটিক রং নীল - আসন্ন বিষণ্ণতার ইঙ্গিতবাহী; ইন দ্য-এর থিম্যাটিক রঙ লাল, একটা অপ্রাপ্তিজাত উষ্ণতার প্রতীকস্বরূপ, আর কিছুক্ষেত্রে সেপিয়া - বিবর্ণ স্মৃতির প্রতিফলন। 

সিনেম্যাটোগ্রাফির দিক থেকে এই সিনেমা মোটামুটি টেক্সটবুকের কাজ করতে পারে। দুই বিখ্যাত সিনেমাটোগ্রাফার এই সিনেমায় কাজ করেছেন - একজন ওয়ং-এর দীর্ঘদিনের সঙ্গী সিনেমাটোগ্রাফার ক্রিস্টোফার ডয়েল, আরেকজন মার্ক লি পিং বিন - তাইওয়ানিজ সিনেমায়, বিশেষ করে তাইওয়ানিজ নিউ ওয়েভ সিনেমার এক অন্যতম পথপ্রদর্শক হৌ সিয়াও-সিয়েনের সঙ্গে ‘ফ্লাওয়ার্স অফ সাংহাই’, ‘মিলেনিয়াম মাম্বো’, ‘থ্রি টাইমস’-এর মতো কাজ করেছেন। ডয়েলের দ্রুতগতির ছোটো ছোটো শট, ক্লোজ শট, আনইউজুয়াল নানা অ্যাঙ্গলের শট আর লি পিং বিন-এর লং শট, তাক লাগানো একেকটা প্যানিং শট - এই দুই চালডাল মিলিয়ে কী স্বাদু খিচুড়ি যে ওয়ং বানিয়েছেন, তার তুলনা সত্যিই বিরল। সু আর চাউয়ের বিভিন্ন দৃশ্য তোলা হয়েছে এমন একেকটা অ্যাঙ্গল থেকে, যাতে মনে হয় চুরি করে তাদের জীবনে উঁকি মারা হচ্ছে। সত্যিই কি তাই নয়? শুরু থেকেই তাদের লক্ষ্য ছিল, ‘গসিপ’-এর বিষয় না হওয়ার। নাকগলানো বাড়িওয়ালি মিসেস সুয়েন, চাউয়ের মদ্যপ ও লম্পট বন্ধু পিং - তাদের জীবনে মাথা গলানোর লোকের অভাব হয়নি। জনবহুল হংকং শহর, ব্যস্ত হংকং শহর - তাও, দুটো একা মানুষের নিজস্ব, ব্যক্তিগত স্পেসের অভাব। এক ছাতার তলায় হাঁটলে, এক ঘরে কাটালে, এক ট্যাক্সিতে করে ফিরলে, নিভৃতে জড়িয়ে ধরে কাঁদলেও অলক্ষ্যে থাকা সদাসতর্ক চোখ নজর রেখে যাবে, ঠিক যেটা ক্যামেরা তুলে ধরতে চেয়েছে। ঝাপসা, আউট অফ ফোকাস, পিপ-ইন করা - অথচ, অন্যের জীবনে মাথা গলানো। সু প্রথম থেকেই বলে গিয়েছিল, ‘আমরা ওদের (তাদের স্বামী ও স্ত্রী) মতো হব না।’ হায় রে ভাগ্যের পরিহাস! হায় রে একাকীত্ব!

আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ আসপেক্ট বাদ দিলে এই সিনেমার কথা কিচ্ছুটি বলা হবে না - তা হল ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর। যে সিনেমা ‘মুড’-এর কথা বলে, সেই সিনেমায় মুডনির্ভর ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর হবে না, তা হতেই পারে না। ট্রাডিশনাল চিনে অপেরার ব্যবহার বাদ দিলে মূলত চারটে স্কোরের জন্য এই সিনেমা অমর হয়ে থাকবে - জাপানি কম্পোজার শিগেরু উমাবায়াশির ‘ইউমেজিস থিম’, আর মার্কিন জ্যাজ গায়ক, ব্যারিটোন কণ্ঠের ন্যাট কিং কোলের গলায় ‘আকুএওস ওহোস ভেরদেস’ (ওই সবুজ চোখদুটি), ‘তে কিয়েরো দিহিস্তে’ (তুমি বললে, ‘ভালোবাসি তোমায়’) আর ‘কিজাস, কিজাস, কিজাস’ (বোধহয়, বোধহয়, বোধহয়)। ইউমেজি’স থিম-এ বেহালার করুণ, বিষণ্ণ, একাকীত্বের আর্তির সঙ্গে চেলোর গম্ভীর, ‘শূন্যতা’র দৃপ্ত অথচ মন্দ্রোচ্চারণ মিলে যে এক অদ্ভুত মনখারাপের হারমোনি তৈরি করেছে, তার যথাযথ ব্যবহার করেছেন ওয়ং। সু-এর একাকী নুডলস কিনতে যাওয়া, চাউয়ের একা একা দাঁড়িয়ে একের পর এক সিগারেট টেনে যাওয়া, বৃষ্টিভেজা রাস্তায় সু আর চাউয়ের একসঙ্গে ভেজা, আলিঙ্গনবদ্ধ হওয়া, হাতদুটো একমুহূর্তের জন্য আশ্লেষে চেপে ধরে ছেড়ে দেওয়া -  সমস্তটা জুড়ে বাজতে থাকে ইউমেজিস থিম। সু ভেজে, চাউ ভেজে, দ্রব হয় দুই হৃদয়, কাছে আসতে না পেরে রক্তাক্ত হয় - আর ভিজতে থাকি আমরা, দর্শকেরা। স্নাত হই দুজনের অবরুদ্ধ কান্নায়। কখনো কখনো আমাদের কান্না বেরিয়ে আসে সু-এর মতোই, শুধু আলিঙ্গনের জন্য কাঁধ পেতে দেয় না কোনো চাউ। ফাঁকা পড়ে থাকে হোটেলের ঘর, সময়ে এসে পৌঁছোনো হয় না। অস্থির অস্থির লাগতে থাকে, হাতছাড়া হয়ে যায় সমস্ত সুযোগ, আর ব্যাকগ্রাউন্ডে ন্যাট কোল কিং ব্যঙ্গ করে যান ‘কিজাস, কিজাস, কিজাস!’... পারহ্যাপস, পারহ্যাপস, পারহ্যাপস বলে। মিলতে পারেনা দুটো হৃদয়, আর সম্ভাবনার তীর ছুঁড়ে ছুঁড়ে তাদের আঘাতে আঘাতে দীর্ণ করে দেওয়া হয়, সমাজের নৈতিকতার সদাজাগ্রত-সদাভিজিল্যান্ট চোখের দৃষ্টিশরে শেষ করে দেওয়া হয় সমস্ত সম্ভাবনা - দিয়ে গাওয়া হয় সম্ভাবনার গান। 

সব মিলিয়ে, ইন দ্য মুড ফর লাভ ওয়ং কার-ওয়াইয়ের নান্দনিকতার এক ন্যারেটিভ। না এতে গল্প বিশেষ আছে, না প্লট, না বলিষ্ঠ অভিনয়ের সুযোগ - শুধু রয়েছে জ্যাকসন পোলকের প্যালেটের মতো রঙের খেলা, এডওয়ার্ড হপারের ছবির ব্যাকগ্রাউন্ডে পিয়েট মন্ড্রিয়ানের সিটিস্কেপ, আর নেরুদার কবিতা। সমস্ত গ্রামার ছেড়ে, তত্ত্ব ছেড়ে, চুপ করে মাথা নত করে বসতে হয় এই সিনেমাকবিতার কাছে, যেখানে দুটো হৃদয় চেয়েছিল এক হতে, একে অপরের কাছে আসতে, ভালোবাসতে, বৃষ্টিভেজা এবং ঠকে যাওয়া স্যাঁতস্যাঁতে হৃদয়কে প্রেমের দেশলাই ঠুকে উষ্ণ করে নিতে - কিন্তু, ফুরিয়ে যায় সব। সমস্ত আমেজ, সমস্ত মুড, সমস্ত সময়… ফেলে আসতে হয় ভালোবাসাকে, এগিয়ে যেতে হয়। আর, গোপন কথাকে পাহাড়ের মাথায় গাছের গায়ের কোটরের মধ্যে বলে মাটি চাপা দিয়ে দিতে হয়। বোতলবন্দী করতে হয় আবেগকে, দিয়ে এগিয়ে যেতে হয়। 

অনেকেরই দেখা নির্ঘাত। যদি একান্তই দেখা না থাকে, তবে দেখেই ফেলুন। 

(বিচ্ছিরি পোস্টারটি নিজের অতিকাঁচা হাতে বানানো। ক্ষমা প্রার্থনীয়।

ইন দ্য মুড ফর লাভ x মনে x নেরুদা)


 

Monday, 16 September 2024

ঠিকানাহীন চিঠি : ১১


 প্রিয়তমা,


আমার অধিকাংশ চিঠির মতোই, এই চিঠিরও কোনো ঠিকানা নেই। কাকে লেখা, তাও কি জানি? জানি হয়তো। তবে ভেবেছিলাম, তোমাকে এই চিঠিটা লিখবো না। কী লাভ বলো? এই চিঠিটা, বা পরের চিঠিগুলো তো কোনোদিনই তোমাকে পাঠাতে পারবো না! পুরো ব্যাপারটাই অকারণ, অহেতুক - ভস্মে ঘি ঢালা। তারমধ্যে কী জানো, তোমাকে কোনোদিন যদি পাঠাতেও পারতাম, তাহলেও উত্তর পেতাম না৷ কিন্তু, সবকিছু কি সত্যিই কার্যকারণ সম্পর্কের দ্বিঘাত সমীকরণ মেনে চলে? সত্যিই কি সবক্ষেত্রে প্রত্যাশা নামক গোমড়ামুখো যুক্তিকে বসানোর কোনো মানে হয়? এতো ভেবেচিন্তে কাজ করতে গেলে তো কবেই রোবটটোবট হয়ে যেতাম। হলে মন্দ হত না যদিও।


এক অদ্ভুত ধূসর সময়ে তুমি এলে। জীবনে বরাবরই দেখেছি, এরকমটাই হয় ঠিক। ক্যানভাস থেকে এক এক করে রং যখন সব মুছে যায়, উপরে বাসা বাঁধতে থাকে ঝুল-মাকড়সার জাল, ঠিক তখনই শিশুর মতো কৌতূহলী, বিস্ময়ভরা মায়াময় চোখ নিয়ে কেউ এসে দাঁড়ায়। কচি-কচি হাত দিয়ে সরিয়ে দেয় ঝুলজালের আস্তরণ৷ অনভ্যস্ত হাতে প্যালেটের উপর মেশানো রংগুলো হাতে মেখে ক্যানভাসের উপর হাতের ছাপ দিয়ে দিয়ে আবার রঙিন করে তোলে।


প্রিয়তমা, এরকমই এক বিবর্ণ জীবনে আচমকাই তুমি এলে। চৌকাঠ পেরিয়ে আসতে অনেকটা সময় লাগল তোমার। তুমি আসলে, আমার ভাঙাচোরা ঘর রোদজোছনায় ভেসে গেল। বুঝলাম, আমার ধ্বংসের খেলা শুরু হল আজ থেকেই। বাঁচার জন্য প্রতিদিন, প্রতি পলে যে মরতে থাকা, সেই মরণের জয়গান গেয়ে তুমি এলে। তুমি এলে, আমার অগোছালো বিছানায় বসলে। অপ্রস্তুত আমিটাকে আরো অপ্রস্তুত করে দিলে। আমি শুধু তাকিয়েই থাকলাম। খুব ভুল করছিলাম কি? হৃদয়ের ভিতরের বিবর্ণ শীতে শরীর-মন কালি হয়ে গেলে পর একমুঠো উষ্ণতার দেখা যদি পায় কেউ, সে কি নিজেকে সেঁকে নেবে না? আমি দেখে নিচ্ছিলাম, প্রাণপণে দেখে নিচ্ছিলাম। চোখ দিয়ে টেনে এনে মনে বসাচ্ছিলাম। শুধু দেখে যে এতো সুখ, সুখের মধ্যে যে এতো অপ্রাপ্তি, পাশে বসে থেকেও যে এতোটা দূর, চাওয়ার মধ্যেও যে এতটা না-পাওয়া - এগুলো লিখে বোঝানোর মতো ভাষাজ্ঞান আমার নেই। আমি শুধু দেখেই যাই। 


তোমার গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়তে থাকে অদৃশ্য কান্না। তুমি হাসছো, আর তোমার চোখে ইলশেগুঁড়ি। টুপটাপ মুক্তো জমা হচ্ছে তোমার কোলে। সবাই দেখতে পাবে না। আমি ভাগ্যবান। অনেক জন্মের পুণ্য করলে পাহাড়ের কোণে লুকিয়ে থাকা সেই ঝর্ণা দেখতে পাওয়া যায়। খুব ইচ্ছে করে, হাত বাড়িয়ে মুছিয়ে দিতে। লেপ্টে যাওয়া কাজলটাকে গুছিয়ে দিতে। কাছে টেনে নিতে। পারি না। একটু সাহস করলে এগিয়ে গেলেই পারতাম হয়তো। পারি না। ছুঁয়ে ফেললে যদি বুদ্বুদের মতো মিলিয়ে যাও? যেটুকু আছে, সেটুকুও যদি হারিয়ে যায়? হারাতে হারাতে আমি ক্লান্ত। খুঁজতেও পারি না আর। ইচ্ছেও করে না। যেটুকু আছে, যেভাবে আছে, থাকুক না হয়। তুমি মিলিয়ে গেলে তো ইজেল থেকে ক্যানভাসটাই খসে পড়ে যাবে। ঘর ভরে যাবে নিঃঝুম অন্ধকারে। 


তোমার ঘুমপাড়ানি কণ্ঠস্বর আমার কানে এসে লাগে। কী মায়া, কী মায়া, কী মায়া মিশে যে ওই গলার তন্ত্রী থেকে কথা বেরোয়, তার তুমি কী বুঝবে? সারেঙ্গি কি নিজের কান্না বোঝে? ভাঙনজ্বর থেকে সারিয়ে তোলে তোমার গলা। আচ্ছা, তুমি বোঝো না, তুমি বাকিদের সঙ্গে কথা বললে আমার কী পরিমাণ রাগ হয়? সর্বরোগহর এই মিরাকিউরলের স্বত্ব কেন থাকবে সবার কাছে? ডিবিয়ার্সের হিরে কি সবার হাতে মানায়?


খুব হিংসে হয় আমার তাদের উপর, যারা তোমাকে দেখতে পায়, শুনতে পায়, ছুঁতে পায়। মনে হয়, তোমাকে ছিনিয়ে এনে লুকিয়ে রেখে দিই। কেউ, কেউ যেন খোঁজ না পায়। কেউ জানতে না পারে। 


পরমুহূর্তেই নিজের অধিকারবোধ সম্পর্কে সচেতন হয়ে পড়ি। ভাঙা ঘরে জোছনার আলোটুকুই মানায়। চাঁদকে এনে ভাঙা ঘরে রাখা সম্ভব না। চাঁদ সবারই, অথচ কারোর নয়। সবার জন্যই চাঁদ হাসে। ওই জোছনা, ওই স্নিগ্ধতায় আমার ততটুকুই অধিকার, ঠিক যতটা আর পাঁচজন রাম-শ্যাম-যদুর। আমরা শুধু দূর থেকে চাঁদের আলোয় মুগ্ধ হতে পারি, কবিতা লিখতে পারি, ভাসিয়ে দিতে পারি চিঠির স্নিগ্ধশ্রীর অঞ্জলি। দূরত্বটা সেই থেকেই যায়। থেকেই যাবে। একসময়ে তাকিয়ে দেখব, বিছানাটা খালি। শুধু তোমার বসার জায়গাটা সামান্য উষ্ণ হয়ে আছে।


বহুদিন কারোর জন্য প্রার্থনা করিনি, জানো। কাউকে নিজের করে পাওয়ার আকুতিতে সঁপে দিইনি কোনোদিন। জানি মিথ্যে, জানি অলীক, কিন্তু ছায়াও কি সত্যি নয়? 


আসতে পারো যদি, চৌকাঠ ডিঙিয়ে এসো কোনোদিন। জ্যোৎস্নাময়ী, তোমার চাঁদের আলোয় অবসান ঘটুক আমার পার্থিব সকল সুখ-দুঃখের।



যে ভালোবাসা তলহীন, যে আবেগ ভাষাহীন, যে আকুতি কামনাহীন, যে স্পর্শ কায়াহীন, সেই ভালোবাসাটুকু নিও। 


‘আমার অশেষ আর্তি তার সুখকে যেন কখনো বিঘ্নিত না করে।’’


ইতি, 

তোমারই…

Monday, 9 September 2024

এলোমেলো...

 সারাদিনের হইহুল্লোড় থেমে গেলে পর মনের মধ্যে একটা ক্লান্ত সন্ধ্যা নামে। এক সীমন্তিনী চুল এলিয়ে তুলসীতলায় মঙ্গলকামনার্থে বাতি দেয়, ধূপ দেখায়। অনেকটা দীর্ঘ উঠোন পেরিয়ে আসে সে। আলো-আঁধারির উঠোন। কে যেন এক এক করে ঘরের সমস্ত আলো নিভিয়ে দেয়। চারপাশটা নিশ্চুপ, নিস্তব্ধ হয়ে যায়। অন্ধকার। নিঃঝুম, বুকঝিম এক অন্ধকার।


অন্ধকারে চৌকাঠে হোঁচট লাগে। আলোর সুইচগুলো কোথায়, খুঁজে পাওয়া যায় না। হাতড়ে দেখলে হয়তো পাওয়া যাবে, কিন্তু হয়ে ওঠে না আর। সবসময়ে হাতড়ে দেখতে ইচ্ছেও করে না। হাতের নাগালেও কিছু থাকা উচিত, আলতো আদরে হাত বাড়ালেই যা পাওয়া সম্ভব। কোনোমতে হোঁচট খেতে খেতে ঘরে এসে বসা হয়। খাট, না সোফা? খাটই হয়তো। যায়-আসে না আর। কিছু একটা হবে। না হলেও হবে। পা তুলে কোনোমতে পিঠটা ঠেকাতে পারলেই হল। তারপর অপেক্ষা, অপেক্ষা। 


কিছু কিছু অন্ধকারে দেখতে পাওয়া যায় না। সেইসব অন্ধকার এতটাই নিকষ, যে চোখ সয়ে ওঠে না। চোখের ভিতরের রড সেলগুলো নিজেদের অস্তিত্বের ক্রাইসিসে গুমরে মরতে থাকে, ল্যাক্রিমাল গ্রন্থিগুলোকে চেপেচুপে ভাসাতে থাকে - যেগুলোকে হঠাৎই কান্না বলে ভ্রম হয়। সেইসব অন্ধকারে, সেইসব কালোডাকা অবসন্ন সন্ধ্যায় ঘুম আসতে চায় না। সমস্ত আলো নিভে যাওয়ার পরে চুপ করে জেগে থাকে কারা যেন। সেইসব জোনাকিমোছা অন্ধকারে জেগে থাকতে ইচ্ছে করে না। কিন্তু কবেই বা ইচ্ছে অনুযায়ী কাজ হয়? 


আস্তে আস্তে মনের ভিতরে সন্ধে গড়াতে থাকে, রাত বাড়ে। ক্লান্তি বাড়ে। চরাচরের শেষ ঝিঁঝিঁর ডাকটুকুও মুছে যাওয়া এক অবসন্ন নিস্তব্ধতা বাড়ে। যে অনস্তিত্বের শূন্যতার উপহার নিয়ে জলের ফোঁটার ন্যায় সান্দ্রযাপন চলতে থাকে গড়িয়ে গড়িয়ে, সেই ভ্যাকুয়াম ভরাট করবার জন্য জোর করে কিছু না কিছু গোঁজবার চেষ্টা চলতে থাকে। প্রকৃতি নাকি শূন্যস্থান রাখে না কোনো, এমনটা বলা হয়ে থাকে। কিন্তু, ব্যতিক্রমী কিছু শূন্যস্থান থেকেই যায়, যা হয়তো অতিপ্রাকৃত। এরকম অজস্র শূন্যতা দিয়ে তৈরি শতছিন্ন এক মনকেমনের চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়তে ইচ্ছে করে। কিন্তু সেই ফুটোফাটলের মধ্যে দিয়ে হাওয়া ঢুকতে থাকে। শীত করে, বড্ড শীত করে...


মনের মধ্যে রাত গভীর হয়। শেষ শিয়ালটা ডেকে চুপ করে গেছে অনেকক্ষণ। ঘড়ির কাঁটা টিকটিক করছে হয়তো। বা করছে না। ঘড়িটা কোনদিকে, বোঝা যায় না। দেখাও যায় না এই অন্ধকারে কিচ্ছুটি। কারা যেন নিয়ম করে এসে আলোগুলোও ঠিক নিভিয়ে দিয়ে যায়। দেখাশোনার ওপারের যে ছুঁতে না পারার বুদ্বুদসত্য, সেখানে কোন মন্ত্রবলে যেন এক মুহূর্তেই টেলিপোর্টেশন হয়ে যায়। অলীক, অবাস্তব, তবুও তা রয়েছে। না থাকাও আসলে একটা থাকা। সমস্তটাই দৃষ্টিভঙ্গি আসলে, পয়েন্ট অফ রেফারেন্স। এসব ভাবতে ভাবতে মনের ভিতরে রাত নামতে থাকে, আরো নামতে থাকে, আরো নামতে থাকে। ভোর হয় না তার আর। ভোর এসে পৌঁছোয় না। ক্লান্তিতে চোখ বুজে আসে, তবু ঘুম আসে না। আসতে চায় না।


শুধু খাটের উপর, বা সোফা - শুয়ে থাকা হয়। ঘড়িটা আছে, নাকি নেই - সেটাও বোঝা হয় না। আর শতচ্ছিন্ন চাদরটার ফাঁকফোকর দিয়ে একপশলা ঠাণ্ডা হাওয়া ছুঁয়ে যায়। শীত করতে থাকে, ভীষণ কনকনে শীত....


Wednesday, 4 September 2024

পুলিশ না মানুষ?

বিগত বেশ কিছুদিন ধরে এই আরজিকর কাণ্ডকে কেন্দ্র করে একটা অদ্ভুত বাইনারি ন্যারেটিভ সমাজমাধ্যমে, তথা সমাজমানসে চলছে। বাইনারিটা একটা খুব অদ্ভুত পেশানির্ভর ক্লাসভিত্তিক আর ডিক্লাসডের বাইনারি - পুলিশ বনাম মানুষ। এই শব্দবন্ধটায় অনেকের আপত্তি থাকতেই পারে, আছেও - হয়তো কিছুটা সঙ্গত কারণেই। তবে, এইধরনের শব্দচয়নকে এড়িয়ে থাকার ব্যাপারটা হতে পারে না।


হিস্টোরিকালি, সবরকম বামপন্থা(কমিউনিজমের বাইরেও বামপন্থা এক্সিস্ট করে, মাইরি বলছি) বিশ্বাস করে এসেছে, রাষ্ট্রযন্ত্র মূলত নিপীড়ক। ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের রাজনীতি তাই বরাবর কোনো বিশেষ ব্যক্তি, মুষ্টিমেয় ব্যক্তিবর্গ বা নির্দিষ্ট শ্রেণির হাতে ক্ষমতা যাওয়ার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে এসেছে। তত্ত্বের কথা ছেড়ে মোদ্দায় বললে, রাষ্ট্রের স্বার্থ আলাদা, সাধারণ মানুষের আলাদা। রাষ্ট্র ম্যাক্রোস্কেলে দেখে, সাধারণ মানুষ মাইক্রোস্কেলে। ফলে, রাষ্ট্রের সঙ্গে সাধারণ মানুষের বিরোধ থাকবেই।


এই বিরোধ-বিভাজন স্পষ্টতর হয় যখন কোনো কোনো সঙ্কটের মুহূর্ত উপস্থিত হয়। অন্যান্য সময়ে যে বিরোধের ধারা অন্তঃসলিলা ফল্গুর মতো অদৃশ্যভাবে বয়ে চলে, সঙ্কটকালে সেই বিরোধের ধারাই নগ্নভাবে প্রকাশিত হয়। দেখা যায়, সঙ্কটকে ঘিরে কীভাবে রাষ্ট্র এবং সাধারণ মানুষের দাবিদাওয়াগুলো আলাদা হয়ে যাচ্ছে, স্বার্থসংঘাত ঘটছে৷ এই ডায়ালেক্টিকাল কনফ্লিক্টে সাধারণ মানুষের অস্ত্র কালেক্টিভ কনশাসনেস বা গোষ্ঠিক চেতনা, ক্লাস ইন্টারেস্ট বা শ্রেণিস্বার্থ এবং সঙ্ঘবদ্ধতা। আর রাষ্ট্রের হাতে? আইন, প্রশাসন, পুলিশ। স্টেট মেশিনারি বনাম সাধারণ মানুষের যুদ্ধটা ফলে বরাবরই অসম। 


এই অসম যুদ্ধের কিছু ঐতিহাসিক মোড় ঘোরানো ন্যারেটিভ রচনা হয়েছিল ১৭৮৯-এর ফরাসি বিপ্লবে, ১৯১৭-এর নভেম্বর বিপ্লবে। কিন্তু, বর্তমান পরিস্থিতি তার থেকে সম্পূর্ণই আলাদা। কেন? আক্ষরিক অর্থে যেটাকে লিবারাল ডেমোক্রেসি বলা হয়, সেই উদারনৈতিক গণতন্ত্রের বিকাশ ঘটতে তখনো অনেক দেরি। বাকস্বাধীনতার বিরুদ্ধে যাঁরা এখন বলেন, তাঁরা আশা করি এটা অন্তত স্বীকার করবেন, সেইসব সময়ে বাকস্বাধীনতার অবস্থা কী ছিলো। সেই নিরিখে বর্তমানে অনেকটাই আছে। সম্পূর্ণ বাকস্বাধীনতা হতে পারে কি না, তাই নিয়ে অবশ্যই প্রয়োজনীয় প্রতর্কের পরিসর রয়েছে। সেসব দূরে ঠেলে রেখে বলা যায়, যোগাযোগ মাধ্যমের সঙ্গে বাকস্বাধীনতার এক সমানুপাতিক সম্পর্ক বর্তমান। মানুষের প্রকাশের অ্যাভিনিউ যত খুলে যাবে, যত বিবিধ প্রকাশমাধ্যমের মধ্যে দিয়ে মানুষ নিজেকে মেলে ধরতে পারবে, ততই বাকস্বাধীনতা, মতপ্রকাশের বিভিন্নতা বাড়বে।


এই বিভিন্নতার কারণেই বর্তমানে মানুষ প্রশাসনের বিরুদ্ধে অনেক বেশি সরব হতে পারে, সচেতনভাবেই। ১৭৮৯-তে শতকরা যত সংখ্যক মানুষ 'ষোড়শ লুইয়ের গলা, যাবে গিলোটিনের তলা' মর্মে স্লোগান দিতো, তার থেকে শতকরা বেশিসংখ্যক মানুষ দিদি-মোদিকে সমালোচনার খাঁড়ার তলায় ফেলেন। 


এই সরবতার বাইপ্রোডাক্ট হিসেবেই বেরিয়ে আসে 'পুলিশ বনাম মানুষ' - এর বাইনারি বিভাজনের আখ্যান। পুলিশ মানে খারাপ, কারণ তারা অত্যাচার করে। সাধারণ মানুষকে মারে, লাঠি চালায়, জলকামান ছোঁড়ে, কাঁদানে গ্যাস ছোঁড়ে। সরকারের নির্দেশে গুলিও চালায়, হতাহত হয় সাধারণ মানুষ। 


অথচ, এরই বিপ্রতীপে দাঁড়িয়ে থাকে দেশের সেনাবাহিনীর অবদান নিয়ে এক দক্ষিণপন্থী দেশাত্মবোধক রাজনৈতিক চেতনার আখ্যান। নিঃসন্দেহে, যেকোনো মৃত্যুই দুঃখজনক, বিশেষ করে ইন-সার্ভিস মৃত্যু। অথচ, সেনাবাহিনীর কোনো সদস্য মৃত্যুবরণ করলে যে রোমান্টিসিজম হয়, পুলিশবাহিনীর কেউ করলে ততটা হয় না - এক যদি না তার পিছনে কোনোভাবে সন্ত্রাসবাদ আটকানো,কাউন্টার-ইনফিল্ট্রেশন জড়িয়ে থাকে। যে কারণে, ২৬/১১-তে মৃত পুলিশকর্মীরা এখনো বীরের সম্মান পান, অথচ কোনো স্থানীয় এনকাউন্টারে মৃত পুলিশকর্মীর স্মৃতি মুছে যায় মানুষের কালেক্টিভ স্মৃতি থেকে।


যাইহোক। এসব বিতর্কিত বিষয়। 


বস্তুত, আমরা যেটা ভুলে যাই, সেটা হল সমস্ত আক্রমণ মূলত আসে একটা সিস্টেমের স্ট্রাকচারকে লক্ষ্য করে। আর, যেকোনো কাঠামোই নিজেদের কাঠামোত্ব বজায় রাখতে ব্যক্তিসত্তাকে মেরে ফেলে, তুলে ধরে গোষ্ঠিক পরিচয়কে। একই ছাঁচে না ফেলতে পারলে সিস্টেমচক্র মসৃণভাবে গড়গড়িয়ে চলতে পারবে না।


আর, আক্রমণের লক্ষ্যবিন্দু হয় এই সিস্টেমই। যখন আমরা বলি, ‘পুলিশ অত্যাচারী’, বা ‘পুলিশ নিরস্ত্রদের মারছে’, বা ‘পুলিশ গুলি চালিয়েছে’, সেটা কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট কনস্টেবল, এএসআই, এসআই, ডিএসপি, ডিসিপি, জয়েন্ট সিপি ইত্যাদিদের লক্ষ্য করে নয়। হ্যাঁ, কিছু ক্ষেত্রে অবশ্যই হয় - নকশাল আন্দোলন দমনে রুনু গুহনিয়োগীর ভূমিকা যেমন। ওই সময়ে রুনু নিজেই হয়ে উঠেছিলেন স্বয়ংসম্পূর্ণ এক সিস্টেম, অত্যাচারী এক তন্ত্রের প্রতিভূস্বরূপ। সেরকম ব্যতিক্রম ছেড়ে দিই যদি, তাহলে কি কেউ বলতে পারবেন - পুলিশকর্মী বা অন্য কেউ - কোনো বিশেষ কর্মসূচিতে পুলিশি নিপীড়নের বিরুদ্ধে সমালোচনা যখন হয়, সেটা কি কারোর নাম করে হয়? এমনটা কি বলা হয়, ‘এসআই কখগ সরকারের দালাল, নিরস্ত্র জনতার উপরে অত্যাচার চালিয়েছে’? না। বা, পুলিশকে কি নির্দেশ দেওয়া হয়, ‘আন্দোলনকারী চছজ (নীল গেঞ্জি)র উপরে গুলি/লাঠি/জলকামান চালাও’? সেটাও না, আশা করি!


লড়াইটা পুলিশ বনাম মানুষের নয়। লড়াইটা মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনী শক্তির সঙ্গে একটা প্রশাসনিক প্রত্যঙ্গের। সেখানে ইন্ডিভিজুয়াল মানুষ বা পুলিশ, কেউই দায়ী নন। তাঁদের ব্যক্তিগত ভূমিকাও এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ নয়। যে যাঁর ডিউটি পালন করছেন কেবল। অনেকেই বলতে পারেন, সাধারণ নিরস্ত্র মানুষের উপর লাঠি চালানো কি ডিউটির মধ্যে পড়ে? এখানে প্রশ্নটা ‘ডিউটি’ ঠিক কী, তার উপরেও নির্ভর করছে। বা, ডিউটি কার? পুলিশব্যবস্থা যে আসলে রাষ্ট্রযন্ত্রেরই একটা অংশ, সেটা বিস্মৃত হয়ে যাওয়াটা মূঢ়তা। আর, এই রাষ্ট্র-জনতার সংঘাতের এই চিরকালীন ডায়ালেক্টিক্সে বরাবর মুখ্য হয়ে এসেছে ব্রুট ফোর্স। প্রথম চার্লসকে হত্যা করেই ক্ষমতায় এসেছিলেন অলিভার ক্রমওয়েল। আবার, ক্রমওয়েল স্বৈরাচারী হয়ে যাওয়ায় তাঁকেই ফের হত্যা করা হয়। ষোড়শ লুইকে ফেলা হয়েছিল গিলোটিনের তলায়। আবার, ভাগ্যেরই ফেরে, গিলোটিনের তলাতেই যেতে হয়েছিল দাঁতন-রোবসপিয়েরকেও। ব্রুট ফোর্স কখন কার কতটা বেশি, কতটা ইমপ্যাক্টফুল - তার উপরেই নির্ভর করে, কে টিকে থাকবে। সৃষ্টির গোড়ার থেকেই, যেকোনো কিছুর এগিয়ে যাওয়ার জন্য যে শক্তির দরকার - বের্গসঁ যাকে ‘এলঁ ভিতাল’, বা ভাইটাল ফোর্স অফ লাইফ আখ্যা দিয়েছেন, এক প্রয়োজনীয় জৈবী শক্তি - সেই জৈবী শক্তিরই এক রূপান্তরিত রূপ হল এই ব্রুট ফোর্স। যেকোনো ডায়ালেক্টিক কনফ্লিক্টের একটা চালিকাশক্তির ফলেই সমস্তকিছু এগিয়ে চলে, সমাজব্যবস্থার বিবর্তন হয় - সেই চালিকাশক্তি হলো ব্রুট ফোর্স - আদিমতম শক্তি। 


ফলে, এখানে ব্যাপারটা কোনোদিনই মানুষ বনাম পুলিশ নয়। ‘উর্দির নিচেও তো আছে মানুষ’ নয়। একটা পুলিশ, দুটো পুলিশ, আন্দোলনরত একটা কি দুটো মানুষ - এরা সিনে থাকে না। ম্যাক্রো আর মাইক্রোকে গুলিয়ে দেখবেন না, অনুরোধ। দুটো আলাদা পক্ষকে কীভাবে আলাদা আলাদা চশমা, সেটাও নিজের ইচ্ছেমতো - কীভাবে দেখা যায়? 


আবারও, এখানে পুলিশ একটা সিস্টেম। বা, বলা ভালো, একটা লার্জার সিস্টেমের একটা প্রয়োজনীয় সাবসেট। ‘এই পুলিশই রাত জাগে বলে আপনি বেরোতে পারেন’, এটাও যেমন ভুল, ‘পুলিশ মাত্রেই ঘুষখোর’-টাও ভুল। সিস্টেমাবয়ব কোনোদিনই ইন্ডিভিজুয়াল-নির্ভর নয়। ঠিক যেমন হাতের পাঁচটা আঙুল (হ্রত্বিকোচিত হলে ছয়) পাকিয়ে ঘুষি মারলে বোঝা যায় না, তার মধ্যে অপমানজনক মধ্যমা, দুর্বল কনিষ্ঠা, আলাদা থাকা বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ রয়েছে, ঠিক তেমনই সিস্টেমের পদক্ষেপের বিরুদ্ধে সমালোচনাটাও সিস্টেমেরই। এতে কেউ ব্যক্তিআক্রমণ করলে, বা সিস্টেমের সমালোচনাকে নিজের গায়ে টেনে ‘আমি পুলিশ, আমাকে সবাই আনফ্রেন্ড করুন’ মর্মে শাহাদাৎ দাবি করতে চাইলে সেটা সচেতনতার অভাব ব্যতীত আর কিছুই নয়। দু’পক্ষেরই বোঝার সময় এসেছে, আসল বেলিগারেন্টস মূলত কারা। 


প্রসঙ্গত, ‘পুরুষরা ধর্ষক’ স্টেটমেন্টটাও পুরুষতান্ত্রিক সিস্টেম এবং তার নিয়ন্তাদের বিরুদ্ধে। যেসব স্বল্পবুদ্ধিসম্পন্নরা ‘নট অল মেন’ মর্মে প্রতিবাদের ভাষ্য রচতে যায়, তাঁদেরও বোঝা উচিত, সিস্টেম এবং ইন্ডিভিজুয়াল এক না। সিস্টেমের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ উঠলে যদি কেউ ‘না, আমি তো কলা ধরেও দেখিনি’ মর্মে ছলাকলা দেখাতে আসেন, সেটাও তাঁদের সচেতনতার অভাব, বোধের রিক্ততা। এইটুকুই।


আবারও, সিস্টেমের ম্যাক্রোতে সংকীর্ণ মাইক্রো ঢুকিয়ে দেবেন না, বা জুমড-ইন মাইক্রোযাপনকে মাপতে যাবেন না ম্যাক্রোর গরুড়াবলোকন দিয়ে। অনুরোধ!

Sunday, 1 September 2024

খোলা চিঠি, ঋতুপর্ণ-কে


ঋতুদা,

প্রথমেই জানাই, শুভ জন্মদিনের অ-গুনতি শুভেচ্ছা। আচ্ছা, দাদা বলে সম্বোধন করায় কিছু মনে করছ না তো? তোমাকে হয়তো 'দাদা' বলাটা উচিত না। আমার থেকে তুমি বয়সে অন্তত অনেকই বড়ো। যদিও তুমি চিরতরুণ, একটা স্থায়ী বিন্দুতে এসে তোমার বয়েস থমকে থেমে গেছে - জরা নামক সর্বগ্রাসী দৈত্য তোমাকে আর ছুঁতেও পারবে না কোনোদিন। তবুও, তুমি আজ যদি থাকতে, তাহলে বয়স নামক বিচ্ছিরি এক সামাজিক নির্মাণের মাপকাঠি, যা সহজেই মুড়িমিছরিকে একই দামে বেচে দেয়, তার নিরিখেই আরকী, তুমি আমার থেকে অনেকটাই বড়ো হতে। তবুও, ঋতুদা, আন্তরিকতার দিক থেকে দাদা ব্যতীত আর কী বলেই বা ডাকতাম, বলো?


ঋতুদা, আর পাঁচটা অসংবেদনশীল বাঙালির মতো, ছোটো থেকেই জেনেছি, ঋতুপর্ণ ঘোষ সিনেমা বানান, সংবাদপত্রটত্রের সঙ্গে যুক্ত, আর — মেয়েলি। ব্যাস, শেষ। মানুষটা কী, কেমন সব কাজটাজ করেন, কিচ্ছু না। মেয়েলি৷ চেনা ছকের বাইরে, চেনা কাঠামোর জিগস পাজলে আটকাচ্ছে না - অতএব, হ্যাটা৷ আর ততোধিক কৌতূহল। ও কি সমকামী? হিজড়ে? বাবা, কী বিচ্ছিরি না? চিকিৎসা হয় না? নাকি নাকি গলায় তোমার মিমিক্রি বানিয়ে ফেললাম আমরা৷ হাহাহাহাহা, কী হাসি। টিআরপি উপচে পড়ছে, উপচে পড়ছে আমাদের ভসভসিয়ে সোডার গ্লাসের মতো উচ্ছ্বাস, উপচে পড়ছে চরম দৈন্যদশা। এবাবা, ব্যাটাছেলেটা গড়িয়াহাটে গিয়ে দুল কেনে? কানে দুল পরে, পরে হাতে চুড়ি, চোখে কাজল-লাইনার, হাতে নেলপালিশ? ছ্যা ছ্যা। ভাগ্যিস আমাদের ঘরে এরকম হয়নি!


ভাগ্যিস হয়নি ঋতুদা। ভাগ্যিস। কেউ চলে গেলে আমরা তখন এমন বিচ্ছিরিভাবে হেদিয়ে পড়ি, দেখে হাসিও পায়। তুমি অন্যধারার সিনেমা বানাও, কিছু সিনেমা খুব ঘরোয়া, মেয়েদের কথা মেয়েদের মাথায় রেখে তুলে ধরেছো.. ব্যাস। শেষ। তোমার লেখা, তোমার কথা, তোমার চিন্তা, তোমার প্রজ্ঞা - তার কতটুকু তল পাওয়ার চেষ্টা আমরা করেছি? 


অথচ মজা দেখো ঋতুদা, তোমাকে নিয়ে এখন কী বিচ্ছিরি বাড়াবাড়িটাই না হয়! লিঙ্গসচেতনতার হদ্দমুদ্দ ঘটিয়ে সবাই এখন তোমাকে মাথায় তুলে নাচে। তোমার কাজের ভিতরের সূক্ষ্মতা তুলে ধরে, ন্যারেটিভ খোঁজে, কাটাছেঁড়া চলে তোমার কাজের। আগে চলতো তোমার চরিত্রের, তোমার অস্তিত্বের - এখন তোমার সিনেমার। ফার্স্ট পার্সন নিয়ে বাঙালির কী আবেগ, আহাবাহা! মজাই লাগে বেশ, জানো তো? আমাদের মতো হিপোক্রিট, মাইরি, একটাও হয় না। তোমাকে সারা জীবন কর্নার করে গেলাম, আদারাইজ করে গেলাম, হেটেরোনর্মেটিভ বাইনারির চেনা ছকের বাইরে পড়ো বলে তোমাকে ধর্তব্যের মধ্যেই ধরলাম না - আর সেই তুমি-টাকেই আমরা এখন পূজ্যপাদ করে তুলেছি। লজ্জাও নেই আমাদের! 


স্বীকার করতে দোষ নেই ঋতুদা, আমি নিজেও এককালে এরকমই ছিলাম। তুমি যখন চলে গেলে এক্কেবারে, তখন আমি সবে ক্লাস টেন। অত বোধ, চেতনা তৈরি হয়নি তখনো। এখনো কি সত্যিই চেতনা এসেছে? কে জানে। তবুও, সেনসিটাইজেশনের মাইক্রোফাইবার কাপড় দিয়ে যেদিন ঘোলাটে চশমাটা মুছতে শিখলাম, তবে থেকেই তোমার সঙ্গে একটা একপাক্ষিক বন্ধুত্ব গড়ে উঠলো। খুব আপশোষ হতে থাকলো - কেন তোমার সঙ্গে আলাপের সু্যোগ হল না? তুমি কাউচে বসে আছো, আমি মেঝেতে বসে কাউচের গায়ে মাথা হেলিয়ে বসে তোমার বকবক শুনছি। তোমার কথা শোনার, তোমার উন্নত ভাবনাচিন্তার, তোমার উদার মনের শরিক হওয়ার সুযোগ এই যে হলো না, ঋতুদা - এই দুঃখ আমার কোনোদিন ঘুচবে না।


লিঙ্গসচেতনতার পাশাপাশি, তোমার প্রতিটা লেখা, প্রতিটা সিনেমা, কথা, হাসি, সব - সবকিছুর থেকে একটা জিনিস বের করে আনা যায়। যদিও, সবাই পারবে না সেটা। তোমার সামগ্রিক অস্তিত্ব আসলে একাকীত্বের উদযাপন। এই একাকীত্ব কখনো স্বেচ্ছাবসরের, কখনো উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, কখনো বা পরিস্থিতিজনিত। কিন্তু, সেই একাকীত্বকে তুমি এমনভাবে তুলে ধরেছো, যা কেউ করে না। তোমার সিনেমার প্রতিটা চরিত্রই কীভাবে নিজের মতো করে একা, ঋতুদা? কীভাবে সুখী দম্পতির মধ্যেও অভিমানের একাকীত্বের একটা দেওয়াল থাকে, প্রবল প্রেমেও মিশে থাকে নিঃসঙ্গতার নোনাজলের টুপটাপ, বন্ধুত্বেও থাকে দূরত্বের বোবা অভিযোগ, ভালোবাসা পাওয়ার হাহাকার? 


কীভাবে তুমি বুঝে ফেললে বলো তো ঋতুদা, এক মেট্রো লোকের মধ্যে যেতে যেতেও অদ্ভুত একাকীত্বের ধূসরতা ঘিরে ধরে? অফিসে বসে কেজো লেখা লিখতে লিখতে একটা মনখারাপের আদুরে বেড়াল কোলে এসে শুয়ে পড়ে? বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডার মাঝে বসে চোখে জল চলে আসে, অভিমানে দ্রব হয়ে যায় কণ্ঠ? আমার সঙ্গে কোনোদিন একটা কথা না বুঝেও, কীভাবে আমার দুঃখগুলো, আমার নিঃসঙ্গতাগুলো তোমার হলো, ঋতুদা? তোমার সমস্ত জার্নালে, ফিচারে, স্ক্রিপ্টে, দৃশ্যায়নে সেই একাকীত্ব কীভাবে ফুটে উঠলো? কীভাবে তুমি জানলে, খুব আনন্দের খবর জানানোর জন্য ফোন হাতড়ে দরকারি নাম্বারটা খুঁজে পাওয়া যায় না - তখন হয় সেই আনন্দটা গিলে ফেলতে হয়, নয়তো যাকে খুশি একটা ফোন করে ঝেড়ে ফেলতে হয় ও পরে সেই ছদ্মদেখনদারির অপরাধবোধে ভুগতে হয়? এতোটা উঁকি মারাও কি ঠিক?


আসলে, আমাদের এক করে দেয় নিঃসঙ্গতা। যে নিঃসঙ্গতার অপার অভিমান আমাদের স্তব্ধ করে দেয়, যে চিঠিগুলোর উত্তর আসে না কোনোদিন, যে তলটা ছুঁয়ে ফেলার মতো ডুবুরি হয়ে ওঠা শেষমেশ সম্ভব হয় না, যে অপ্রত্যাশিত আঘাতের অভিঘাতটুকু সামলে ওঠার মতো শক্ত ভিত থাকে না, ঘা কমানোর যে সর্বরোগহরা মিরাকিউরল-মলমটা হাতড়ে হাতড়েও খুঁজে পাওয়া যায়না - সেই সবকিছুই আমাদের কোথাও গিয়ে এক করে দেয়।

আমরা যারা একা, আমরা যারা নিঃসঙ্গ, যাদের উদাস দুপুরে কুবো পাখি ডেকে যায় ঘ্যানঘ্যান করে - আমাদের সবার একাকী যাপনে তুমি আছো, ভীষণ করে আছো।

পরপার বলে যদি কিছু থাকে আদৌ, জমিয়ে আড্ডা হবে ঋতুদা। প্লিজ, তখন অন্তত ছেড়ে যেও না। দুই একাবোকা যেন পিঠে পিঠ ঠেকিয়ে মনেরপ্রাণের অনেক গল্প করতে পারি, বা চুপ করেই নিছক বসে থাকতে পারি। 


ভালো থেকো, ঋতুরাজ। আমার নিঃসঙ্গ সম্রাট। আমার একলা রাজা। তোমার জন্মদিন আর আগাম বিশ্ব পত্র দিবস উপলক্ষ্যেই এই খোলা চিঠিটা রইলো। 


ইতি,

তোমার না-চেনা এক বহুদূরের সমমনস্ক সুহৃদ,

অর্চিষ্মান

'ঠাকুরমার ঝুলি'

 আজকে আমার ঠাকুমার মৃত্যুবার্ষিকী। ২০২১ সালের এই দিনেই তিনি গত হয়েছিলেন। এইটুকু পড়েই অনেকে হয়তো, 'ওঁ শান্তি, আত্মার শান্তি কামনা করি, তি...