Wednesday, 9 November 2022

রাইটার্স ব্লক-টক...

 আজকাল আর কিছু লিখতে পারি না৷ অজস্র না-পারার মধ্যে যে সামান্য পারাটুকু পারানির কড়ি করে এগিয়ে চলার জোর পাচ্ছিলাম, সেটা ছিলো লেখালিখি। হারাধনের ন'টি ছেলেকে ফলো করে সেও যে কখন কেলো করে গুটিগুটি পায়ে বিদায় জানিয়ে 'জয় মা ভবানী' বলে ভাঁড়ে মা ভবানী হয়ে গেছে, সেটা বুঝতে পারিনি, বা হয়তো বুঝতে পারলেও মেনে ও পেনে নিতে পারিনি, ফলে লেখার চেষ্টা জোরকদমে হু-হু-হুঙ্কার দিয়ে চালিয়ে গেছি।


আজকাল যখন লিখতে বসি, ভেতরে সারাক্ষণ হাতড়ে চলি শব্দ। আগে লেখার জন্য বিন্দুমাত্র ভাবতে হতো না। খারাপ হোক, ভালো হোক, কিছু না কিছু লেখা বেরিয়ে আসতো। এখন লিখতে বসলে একটা কি দুটো শব্দের পর আর এগোতে পারিনা। মনে হয়, ধুর, এটা কী লিখছি? কেন লিখছি? কেন লিখব এইসব? প্রথম কথা, কেউ পড়বে না। এটা শুনে হয়তো মনে হতেই পারে, যে না পড়বে তো না পড়ুক! কী এসে যায়? এসে যায়, আমার অন্তত খুব এসে যায়। আমি কাফকাও না, জীবনানন্দও না। খুব সামান্য এক মানুষ, আশেপাশের কেউকেটাদের দেখলেও বুক (এবং আরো অনেককিছু) কাঁপতে থাকে। আমি ওরকম 'লিখতে হয় বলে লিখে যাচ্ছি, নাহলে তো, কবেই কিবোর্ড ভেঙে দিতাম' মার্কা ভাস্করোচিত ধ্যাষ্টামির সারেগামা বাজাতে পারি না। আমি লিখবো, লোকে পড়বে, লোকে মতামত দেবে। নিন্দেই করুক, কিন্তু করুক। আমার ভ্যালিডেশন দরকার হয়, প্রতিমুহূর্তে দরকার হয়। টিনেজার হৃদয়ের থেকেও বেশি ভঙ্গুর আত্মবিশ্বাস নিয়ে চলতে হয় যেহেতু, তাই দরকার হয়।


দ্বিতীয়ত, লিখতে বসলেই মনে হয়, এটা যে লিখছি, এটা কী করছে? আমার চারপাশের অতিশিক্ষিত, অতিবুদ্ধিজীবী, ছবি আঁকলে মকবুলও ফিদা হয়ে যাওয়া এবং লিখলে জয়েসের ভয়েস বেরোনো, হাঁচলে দেরিদা ও কাশলে নেরুদা বেরোনো লোকজন আমার মতো সাবঅল্টার্ন টেনিদার লেখালিখির স্ট্যান্ডার্ড সম্পর্কে সংশয় এনে দিয়েছে। লিখতে গেলেই মনে হয়, আচ্ছা, এই লেখা না কালজয়ী, না দেশকালজাতির সমস্যা নিয়ে কথা বলে, না সরকারকে গালিগালাজ করে, না চারপাশের সমাজকে তুলে ধরে, অতএব এই কায়দার কীইবা ফায়দা? সমাজকে নিয়ে লিখতে যে ইচ্ছে করে না, তা নয়। কিন্তু লোকজন যে ভয়াবহ লেভেলে সেন্সিটিভ, তাতে কিছু বললেই 'ঘ্যাঁ ঘ্যাঁ ঘ্যাঁচাৎ' বলে তেড়ে এসে কামড়ে দেয়। আগেরদিন একজনকে মজার ছলে বললাম কথাপ্রসঙ্গে, যে বাংলাদেশও কিন্তু এককালে পাকিস্তান ছিলো। সে আমাকে দেড় পাতার একটা হ্যাজ টাইপ করে পাঠালো, কেন বাংলাদেশ পাকিস্তান নয়, বাংলাদেশ কেন পাকিস্তান হতে চায়নি বা না হওয়ার চেষ্টা করেছে, কেন বাংলাদেশ সার্বভৌম, কেন বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ করেছিলো, বাংলা ভাষার জন্য কেন প্রাণ দিয়েছিলো…. বাংলাদেশ নিয়ে পড়াশুনো করতে কেউ আগ্রহী হলে বলবেন, সেই ওয়ার অ্যান্ড পিস-এর ছোটোভাই মার্কা মেসেজটি কপিপেস্ট করে পাঠিয়ে দেবো, অনেক জানতে ও বুঝতে পারবেন। যাইহোক, তারপরে এও শুনলাম, রিচার্ড নিক্সন এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে আমার কোনো তফাৎ নেই, কারণ আমরা তিনজনেই এশিয়াবিদ্বেষী। আমি লাফ মেরে দু'হাত পিছনে গিয়ে ভার্চুয়াল নাকখত দিয়ে রেহাই পেলাম। থাক বাবা, আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি। সেখানে যদি সমাজের অসঙ্গতি নিয়ে লিখি, লোকে চন্দ্রিল ছুঁড়ে পেটাবে(চন্দ্রিলবাবু, আমার নামে মানহানির মামলা করবেন না মাইরি, আমাকে আরবদেশে বেচলেও মামলা লড়ার টাকা জোগাড় হবে না)। অতএব, লেখার বিষয় পাই না। মাঝে কবিতা লেখার চেষ্টা করলাম, সেই কবিতা দেখে আমার এক বন্ধু খুব উদ্বিগ্নভাবে জিজ্ঞেস করছিলো, আমার জন্য কাঁকের তৎকাল টিকিট কেটে দেবে কিনা, আমি তাকে কয়েকমাস পরে ফিরে এসে টাকাটা ফেরত দিলেও সে রাগ করবে না। তারপরে আর কবিতা লেখার রিস্ক নিইনি। একটা গল্প লিখলাম মাঝখানে, সেটা পড়ে মা খুব সন্দেহের দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকালো, দিয়ে এসে মুখ হাঁ করিয়ে গন্ধ শুঁকলো। খুব সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো, 'ছিঃ, শেষে ড্রাগস ধরলি? তোর থেকে এটা আশা করিনি।' দিয়ে বাবাকে ডেকে কাঁদতে কাঁদতে বললো, 'ওগো, তোমার ছেলে ড্রাগ ধরেছে শেষমেশ! আমার কপাল পুড়লো গো…' বলে ডুকরে ডুকরে সাহিত্যের মা-কেও কমপ্লেক্স দিয়ে কাঁদতে লাগলো। বাবা গম্ভীরভাবে কাকে একটা ফোন করে ফেললো, বললো, 'হ্যাঁ রে, তোর চেনা ওই নেশামুক্তি কেন্দ্রটার নাম্বারটা আমাকে দিস তো। হ্যাঁ। আর বলিস না, আমার ছেলেটা শেষমেশ বাড়িতে বেকার বসে থেকে থেকে হতাশায় ড্রাগ ধরে ফেলেছে।' অনেককষ্টে বাড়িতে বুঝিয়েসুঝিয়ে বললাম৷ তারপর থেকে আর গল্প লিখিনা, গল্প দেখলেই আঁতকে উঠে দৌড় মারি। একটা প্রবন্ধ অবধি লিখে ফেলার রিস্ক নিয়েছিলাম, তাও রবীন্দ্রনাথের উপর। সেই প্রবন্ধ আমার বন্ধু অমিতায়ু আবার তার বইতে ছাপিয়েও ফেলেছিলো — কিন্তু তারপরে হয়েছে কি, ওর বই লোকে আর কিনছে না - যারা বা কিনছে, তারা সেটা পড়ে ওকে রেগেমেগে ফোন করে বলছে, 'হ্যাঁ, ওটা কী ছেপেছো? ওটা প্রবন্ধ না কবন্ধ? আমার তিন বছরের মেয়ে এর থেকে ভালো রবীন্দ্রনাথের উপর রচনা লেখে।' এসবের চোটে আমাদের প্রায় বন্ধুবিচ্ছেদ হওয়ার জোগাড়। এদের সবার কাছে আমি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ, যে আমি আর কবিতা-গল্প-প্রবন্ধ লিখবো না। আগে প্রেমপত্র লিখতাম, কিন্তু এখন প্রেমপত্র লিখলে প্রেমিকা কটমট করে তাকিয়ে 'ড্যাকরা, মিনসে, মুখে নুড়ো জ্বেলে দিতে হয়' এসব বলে চলে যায়, নয়তো বলে, 'কোন মেয়ের পাল্লায় আবার পড়েছিস শুনি? তার মুখে খ্যাংরা মেরে বিষ যদি না ঝেড়েছি, আর তোকে নাকখত যদি না দিইয়েছি, তবে আমিও বারুইপুরের বিষ মাল নই!'

এসব থ্রেট পাওয়ার পরে মাইরি, আর কি লিখতে ইচ্ছে করে?



তাই আজকাল আর কিছুই লিখি না। ভাবলাম, এই বেদনা সবার সঙ্গে একটু ভাগ করে নিই। এ তো ট্রিট বিস্কুট নয়, যে ভাগ করা যায় না। যদিও, এ ব্যথা কী যে ব্যথা, তা আনজনে ছাই বুঝবে, তবুও, কোনো সজনী যদি রজনীকালের এই ব্যথা বোঝার চেষ্টাটুকু করে, তাতেই সুখমস্তি, অর্থাৎ সুখ ও মস্তি। অলমিতি! (ফ্যাঁচ!)

Monday, 5 September 2022

Midnight Rants

 Some nights turn out to be longer ones. 


Upon hearing the clock ticking, a numbness starts grasping you slowly, like the first sip of a single-malt. You realise that there's something you should do, but you can't really work out what. All your feelings accumulated expel you from the world that you're currently in.


You start drowning. As you reach the edge of your subconscious, you cease. You look for something, but you don't know what is that. Things that you crave, don't come in the form as you expect them to be, they say. Maybe all of us are looking for things deep down that won't come in the exact form we expect them to be. This weary pursuit fills in the void with numbness. 


The clock announces the hour. The call of the real life breaks into your reverie. The numbness is still there. You realise to be sustaining a severe headache. You look in every nook and cranny for a pill, but it isn't there. Probably it was never. You try to lie down. You can't. You feel like there's an omen calling you out. You hear it. You actually can. As you approach, everything goes topsy-turvy for awhile, and you get transfixed. You can't really explain what's happening around you. You see the memories that you are trying to get rid of, start chasing you. You become way too frightened, and run. Running for something that's not there. Probably it was never. You are nervous, sweaty, afraid. You are breathing heavily. You collide with a tree, and you fall on the grounds, and lose consciousness.


As you regain it, you try to stand up, but you can't. You see the memories that were after you are enclosing you. They are merciless. It'd take a blink of an eye for them to destroy you. You are hopeless. Numb. 


Suddenly you wake up as if nothing has happened. You reach for the water-bottle kept beside your bed. You turn on the lights, glance at the clock. It's still ticking, lifelessly.

Sunday, 4 September 2022

'Miles to go before I sleep...'

It's midnight. The street-dogs have become tired of their incessant barking by now. The surroundings have become silent long ago. The whole environment is so serene that sometimes it feels like everyone has died. Buried in an uninterrupted slumber - isn't it a kind of demise? 


The stream of consciousness flows. Slowly. You can feel it. But you can't control it. Your mind has transcended the level of your consciousness by now. You're just a body, leaning over the grills of your balcony. You are smoking a cigarette. Perhaps it was you who was smoking. Perhaps not. You can never be sure of it, can you? 


Some of the streetlights are blinking now and then, casting some dancing shadows. Shadows, which are made of light and darkness. Light hits a solid object and a shadow is cast. Shadow. Black. Dancing. Bleak. You start feeling like a shadow. Probably you were never there. Probably it was a shadow. Probably it's a shadow. A shadow, made of light and darkness.


Suddenly you start feeling very calm. The destiny, the home you've been looking for, you've probably found it. Why probably, surely. The calmness rings the bell, ensuring the very fact that you were stumbling upon some time ago. A home. You have heard of it, you know someday you'll probably find it - and eventually, you find it. Your weary pursuit has found its way. You've always dreamt of a home. You know what it feels like. You know how it smells.  Sometimes, they say, home can even be a person. Or a thing. Or nothing at all. Perhaps this nothingness is home. You know what it feels like. You know how it feels. But you've never seen it. Or the person. Or the thing. Or the nothingness. Home.


Once you used to dream about death. Your own death. Or someone else's death. You are not sure. You have dreamt about a person falling from the cliffs of a high mountain. That person is falling, falling, falling, falling... Suddenly, that person evanesces into stupor, leaving you with astonishment. You've seen deaths, you've dreamt about deaths. You've always wanted to know how it feels to die. How it feels like. You never wanted to die, but you wanted to know. Surprisingly, you don't want to die anymore. Or maybe you do. You are not sure. 


Time flows. Time keeps flowing. Time inundates the shorelines of your consciousness. You are standing on your balcony. Suddenly you don't feel the grills there anymore. You are now scared. Suddenly you fall. You started falling. A fall, that you've been awaiting since long. La Chute. 


You fall, you fall, you fall, you're falling... Slowly, like a cinematic sequence. You're falling calmly. Gently. You are flying. Falling. Flying. Falling. You suddenly hit the ground, but you don't feel any pain. Suddenly you see, you're lying on someone's lap. Probably a lady. Her face is blurry. You can see her, you can feel her, you can hear her. You just can't see her face. You don't recognise her. You heave a sigh of relief, and fall asleep. Probably this is the home you've been seeking. The home you've always dreamt of, but have never been there. 


A burning sensation brings you back to your consciousness. You notice that the cigarette's totally burnt, even the butt, causing a burning sensation in your fingers. You throw it off. You're still standing on your balcony. The street-dogs have fallen asleep long ago. The surroundings are still serene. The streetlights are still blinking, casting some dancing shadows. Everything is in its place, as it's supposed to be. Intact. A night. Probably a different night. Though you are not very much sure.

Wednesday, 13 July 2022

চেতনাপ্রবাহের আঁকিবুঁকি

 একেকটা রাত অন্যগুলোর থেকে আলাদা হয়। এরকম কিছু কিছু রাত আসে, যখন এক অজানা কষ্টে কণ্ঠ দ্রব হয়ে আসে। আপনি চুপ করে শুয়ে শুয়ে কনট্যাক্ট লিস্ট হাতড়ান, আর দেখেন সবাই যে যার মত ব্যস্ত। এদিকে হয়তো আপনি দুটো কথা বলবেন বলে কাউকে খুঁজছেন, কিন্তু পাচ্ছেন না। কথা বলতে গেলেও যে বলতে পারবেন, এমনটা নয় ; তবুও, খুঁজছেন। আপনি কথা বলার লোক খুঁজতে থাকেন, আর আপনার অনুচ্চারিত কথাগুলো ঢেকে যায় প্যাসিভ-অ্যাগ্রেসিভ ইমোজিতে।  


আপনার যে আমিটা অনেকদিন আগে হারিয়ে গেছে ফিরবে না বলে, সেই আমিটাকে খুঁজতে গিয়ে আপনি একটা গর্ত খুঁড়ে ফেলেন। খুঁড়তেই থাকেন, খুঁড়তেই থাকেন। চারিদিকে চাপ-চাপ রক্তমাংস ছিটকে পড়ে, তবু আপনি ক্লান্ত হন না। শেষমেশ গিয়ে যখন একটা 'ঠং' করে শব্দ হয়, তখন উৎসাহিত হয়ে আরেকটু খুঁড়ে দেখেন, একটা কঙ্কাল অবহেলায় পড়ে আছে, যেন কোনোদিন কেউ আসবে বলে কথা দিয়ে যায়নি তাকে। 


প্রবল হতাশ হয়ে যখন আপনি ঘরের দিকে মুখ বাড়ান, তখন আর ঘরটা দেখতে পান না। তন্নতন্ন করে আপনি ঘরটা খুঁজতে থাকেন। মুখোমুখি দাঁড়িয়ে একটা বাড়ি মিচকি মিচকি হাসতে থাকে। এই গা-জ্বালানো হাসিকে অগ্রাহ্য করে আপনি বাড়ির দরজা খুলে ভেতরে ঢোকেন, কিন্তু অদ্ভুতভাবেই, ভেতরে ঘরটা নেই। আবার আরেকটা বাড়ি, দরজা, আর তারা মিচকি মিচকি হাসছে। আপনি আক্রোশে দরজার পর দরজা খুলতে খুলতে শেষমেশ দেখেন, এক অদ্ভুত শূন্যতা। ব্যর্থ আস্ফালনে আপনি মাটিতে ঘুষির পর ঘুষি মেরে রক্তাক্ত করে তোলেন হাতটাকে, আর বাড়ির পর বাড়ি, বাড়িগুলো, মিচকি মিচকি হেসে চলে। ভারী কৌতুক!


যে মেয়েটাকে ভালোবাসবেন বলে রাস্তা পেরোতে যাচ্ছিলেন, হঠাৎ করেই দেখতে পান, সেই মেয়েটা উল্টোদিকের ফূটপাথ দিয়ে তার প্রেমিকের হাত জড়িয়ে আইসক্রিম খেতে খেতে নিরুদ্দেশের দিকে মিলিয়ে যেতে থাকে। আপনি মাঝরাস্তায় অবাক হয়ে তাদের হারিয়ে যাওয়ার দিকে নিষ্পলকে তাকিয়ে থাকেন। হঠাৎ করে একটা লরি হুড়মুড় করে এসে আপনার ঘাড়ে পড়ে। আপনি দুটো টোকা মেরে গায়ের ধুলোরক্ত ঝেড়ে আবার তাকিয়ে থাকেন সেইদিকে, যেখান দিয়ে মেয়েটা একটু আগেই আইসক্রিম খেতে খেতে তার প্রেমিকের হাত জড়িয়ে চলে গেল। আপনি মেয়েটার মুখটা খুঁজতে থাকেন, ফোনের গ্যালারি আঁতিপাঁতি করে খুঁজতে থাকেন, দেখেন মেয়েটার মুখ নেই। মুখের জায়গাটা সাদাটে, ফ্যাকাশে - চোখনাককানভুরুঠোঁট কিস্যু নেই। আপনার ভয় করতে থাকে, আপনি ফোনটা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে অন্যদিকে হাঁটতে থাকেন। 


সারিয়্যালিটি আপনাকে অবাক করে না আর। আপনি এখন অনায়াসে দালির ঘড়ি পরে, দ্যুশঁর ফাউন্টেনে পেচ্ছাপ করে, ম্যাগরিটের পাইপ ফুঁকতে ফুঁকতে জীবন কাটিয়ে দিতে পারেন। তবুও, এই খুঁজতে চাওয়া এবং খুঁজতে গিয়ে রক্তাক্ত হওয়া এবং শেষমেশ হারিয়ে যাওয়াটা আপনার অভ্যেস হয়নি এখনো। শিখে যাবেন হয়তো। শেখার মতো অবসাদগ্রস্ততা আপনার আছে, চিন্তা নেই।


এভাবেই, একেকটা রাতকে আলাদা করে ফেলেন আপনি আরেকটার থেকে, কষ্টেদুঃখেপ্যাসিভ-অ্যাগ্রেশনের কামড় খেতে খেতে। এভাবেই, এভাবেই আপনি, আপনার অস্তিত্ব, আপনার অনস্তিত্ব, আপনার অবসাদ, মনখারাপ, দুঃখকষ্ট সবকিছু লাখ-লাখ লোকের হাততালি কোড়ায়, আর কম্যুনারিজমের শিকার হন আপনি, আর এভাবেই, এভাবেই রাতগুলো একটার থেকে আরেকটা আলাদা হয়ে যায়।

Tuesday, 12 July 2022

ক্রান্তিকাল

 এক অদ্ভুত যন্ত্রণা, যার কোনো ব্যাখ্যা হয় না, এবং যার কোনো পরিচিত ওষুধও নেই - সেই যন্ত্রণার মত মারণরোগ বোধহয় আর নেই। 

রোগেভোগে মরে যাওয়া অনেক সহজ। ভেতরে ভেতরে মরে যাওয়ার মত দুঃখ আর কিছুতে নেই।

যখন নেরুদা ছুঁয়ে আমরা প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, কেউ কাউকে ছেড়ে যাব না - ভাবিনি, কেবল একপক্ষই সেই কথা রাখবে। দূরত্ব বাড়বে, যন্ত্রণা বাড়বে, প্রত্যেকটা রাত বেদনার্ত হতে হতে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেবে, আর দূর থেকে মুচকি হেসে সম্রাট নিরো তার বেহালাটা তুলে নেবে। 

তোমার জানা নেই হয়তো, বেহালাও কাঁদে। ছড়ের টানে নয়, দুঃখে। যন্ত্রণায়। বুকের ভেতরে যে অব্যক্ত ব্যথা কুরে কুরে খেতে থাকে, সেই যন্ত্রণার মূর্ছনায় বেহালাও আর্তনাদ করে ওঠে, আর আমরা ভাবি বাখ।


চলে যাওয়া বড়ই সহজ। থাকতে গেলে অনেক কষ্ট করতে হয়। আমরা সবসময়েই সহজ বিকল্পকে বেছে নিই। সময় বাঁচাতে।


প্রত্যেকটা রাত্রি মলম হয়ে উঠতে চায়। মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে চায়। পারে না। প্রত্যেকটা রাত্রি জানে, মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী। 


থেকে গেলে পারতে হয়তো। স্কেল দিয়ে যে দূরত্ব মাপা যায় না, সেই দূরত্বের একপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আবছা সিল্যুয়েটসম বিলীন হয়ে না গিয়ে, এই দীর্ঘ ছায়াপথটা হেঁটে আসতে পারতে। 


আবার হয়তো কোনোদিন একসাথে নেরুদা পড়ব আমরা। আবার হয়তো কোনো এক কালবোশেখী সন্ধ্যের হাল্কা শীতকে হার মানিয়ে দেবে দুজোড়া হাতের মধ্যবর্তী উষ্ণতা। ব্যর্থ আস্ফালনে বেহালা ছুঁড়ে ফেলে দেবেন নিরো, আর অলক্ষ্যে দাঁড়িয়ে মহাকাল মুচকি হাসবে। হয়তো তুমি চেষ্টা করবে, এই সুদীর্ঘ ছায়াপথটা হেঁটে পার হওয়ার। কিন্তু ততদিনে সব ঝাপসা হয়ে যাবে। কিছু অস্ফুট, অনুচ্চারিত কথা, কিছু অভিমান, কিছু দুঃখ, কিছু অব্যক্ত যন্ত্রণা ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামাবে।


'এমন বৃষ্টির দিন পথে পথে

আমার মৃত্যুর দিন মনে পড়ে।'

Saturday, 9 July 2022

কালান্তক অটোভ্রমণ

 আপনারা অটো চড়েন? আমি চড়ি না। চড়া ছেড়ে দিয়েছি। কেন জানতে চান? আমার বিগত কিছু বছরের যাতায়াতের অভিজ্ঞতায় সবথেকে দুর্ধর্ষ, দুর্মদ, দুর্দমনীয়, দুর্বিষহ ও দুরন্ত যাতায়াতের মাধ্যম নিঃসন্দেহেই অটো। ভগবান অটোকে তিনটে চাকা, ফিজিক্সের সকল সূত্রকে হার মানিয়ে দেওয়া গ্যাসীয় ডাইমেনশন এবং কিছু অকুতোভয় অটোড্রাইভার দিয়ে এই ধরাধামে অবতীর্ণ করেছিলেন। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, এরা বিশ্বযুদ্ধে জাপানি কামিকাজে পাইলটদের ভূমিকায় অবতীর্ণ ছিল, অটোতীর্ণ না হলেও। এরকমই এক অটোয় চড়ার অভিজ্ঞতা সবার সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার উদ্দেশ্যে এই লেখার অবতারণা। 


কাজের জন্য রথতলায় গেছি। সন্ধে সাতটার সময়ে অটো ধরব। কামারহাটি পৌরসভার সামনেই যে অটোস্ট্যান্ডটি রয়েছে, সেটির দিকে গুটিগুটি পায়ে এগোলাম। 

'খড়দা, সোদপুর, ব্যারাকপুর, কামারহাটি, টিটাগড়' ইত্যাদি বলে গলায় ফেনা তুলে একজন চেঁচাচ্ছিল। পাছে সে প্রায় গোটা কল্যাণী হাইওয়েটাই পার হয়ে যায়, তাই তাড়াতাড়ি গিয়ে বললাম, 'দাদা, আমি খড়দহ যাব।'

প্রেমিকাকে গিফট এবং বাবা-মা-দাদুকে ভালো রেজাল্ট দেওয়ার পরে ছাড়া অত আনন্দিত মুখ জীবনে আর দেখিনি। দরবিগলিত কণ্ঠে হাতটাত কচলে সে বললে, 

'নিশ্চয়ই, নিশ্চয়ই৷ আপনাদের জন্যই তো অটো রয়েছে। এই..এইটায় উঠে পড়ুন।' 

আমাকে একটা অটো দেখিয়ে দিলো। উঠলাম। ফাঁকা অটো। বুঝলাম, গেল সব কচ্ছপ হয়ে। কখন ভর্তি হবে, কখন ছাড়বে, খোদায় মালুম।


প্রায় আধঘণ্টা কাটার পরেও ভর্তি হল না অটো। সবাই পালকির ভিতর উঁকি দিয়ে নতুন বউ দেখার মতো আমাকে দেখে চলে যাচ্ছে। জানি দর্শনীয় নই, তবুও সহযাত্রী হতে না চাওয়ার মতো স্পর্শনীয় অব্দি নই, এটা ভেবে মেজাজটা খিঁচড়ে যাচ্ছিল। 

প্রচুর প্রার্থনার পর অবশেষে অটো ভর্তি হল। বুঝলাম, মন দিয়ে ডাকলে ঈশ্বরের ম্যাসেঞ্জার না আসুক, অটোর প্যাসেঞ্জার অন্তত আসে। সেইসঙ্গে গুটখা চিবোতে চিবোতে এলেন তিনি। মহামহিম অটোচালক। এক খোট্টা যুবক; মাথায় লাল রঙের ঝুঁটি, গালে ত্রিশূলের উল্কি করা - সম্ভবত ঈশ্বরের কাছে ডাইরেক্ট পৌঁছে দেওয়ার সিম্বল, গায়ে নিয়ন সবুজ জামা আর কালো ট্র‍্যাকসুট, তাতে সিলভার রঙের লাইনিং ঝলমল করছে। 


দেখে আমি থ। একে দেখেই তো চোখ ধাঁধিয়ে যাচ্ছে, এ আবার অটো চালাবে কী? 

তা তিনি এলেন। এসে বললেন, 'দাদা(গুটখা গিলে), একটু sসামনে এsসে বsসুন। লেডিজলোক আছে তো..' 

আমার প্রেসিচেতনা, বেশিচেতনা চাগাড় দিয়ে উঠল এই ঘৃণ্য সেক্সিস্ট মিসোজিনিস্ট মন্তব্য শুনে, সমাজকে নিচু চোখে দেখার এই প্রবণতা দেখে। যে সমাজ মেয়েদের অটোর সামনে বসার স্বাধীনতা খর্ব করে নেয়, সেই সমাজের প্রতি রইল একরাশ ঘৃণা। কিন্তু সমস্যা হল, আমি আবার ফেসবুক করিনা। আর ফেসবুকের বাইরে এসব বলতে গেলে অটো ড্রাইভার আমাকে পিটিয়ে ফটো করে দিতে একমুহূর্তও ভাববে না।

কিঞ্চিৎ গাঁইগুঁই করে 'ইয়ে, আমার বাতের ব্যথা চাগাড় দিচ্ছে, আমার হাঁটুতে টেনিস এলবো হয়েছে, আমার কোমরে স্ট্রোক হয়েছে' গোছের দাবি জানালাম। খোট্টাভাই থুক করে রঙিন থুতু ফেলে রাস্তাকে সদ্য প্রেমে-পড়া-যুগলের মনের মতো রাঙিয়ে দিয়ে বললেন, 'দ্দাদ্দা, কেনো বুঝছেন না, বেকার লাফড়া না কোরে সামনে আসুন।'

লাফড়া না করে সামনে গেলাম। অটোওয়ালার পাশে দুর্গে দুর্গে দুর্গতিনাশিনী বলতে বলতে অটো বসলাম। কিন্তু, 'অথ নিমন্ত্রণ ভোজন'-এর মতোই, দুর্গা বোধহয় সেটাকে 'দুর্গতিদায়িনী' শুনেছিলেন — এবং তিনি পরমানন্দে দুর্গতি করা শুরু করে দিলেন।


'ঘ্যাঁকোৎ ঘঁড়াৎ ঘ্যাঁ ঘ্যাঁ ঘোঁ' শব্দ করে অটো স্টার্ট নিলো। বোঁ করে অটো এগিয়ে গেল। চোখের সামনে কেমন হঠাৎ সব মিলিয়ে গেল - শুধু দেখতে পেলাম কিছু লাল লাল আলো। চোখ কচলে বুঝলাম, অটো সুপারসনিক জেটকে 'গরুর গাড়ির মতো পিছনে ফেলে' এগিয়ে যাওয়ার স্পিডে ভরসন্ধের বিটিরোডের রাস্তা দিয়ে হাঁকাচ্ছে।


একটু এগোতেই ঠাওর করলাম, সামনে অটোভাইয়ের এক জাতভাই অটো নিয়ে যাচ্ছে। 'সসালাকে দেখাতে হবে' বলে দাঁতে দাঁত পিষে সে দেখি স্পিড বাড়িয়ে দিলো। অটো তখন আর অটো নেই - মুক্তিবেগকে চুক্কি দিয়ে তখন সে হয় শ্রীহরিকোটার রকেট হওয়ার তাল করছে, নয় স্বয়ং শ্রীহরির পাদপদ্মে পৌঁছোবার সস্তা পারমার্থিক পথ খুঁজছে। আমি চোখ বুজে ইষ্টনাম জপ করতে থাকলাম। হঠাৎ 'গেল গেল' রব শুনে দেখি অটো ৭৫° বেঁকে অন্য অটোকে কাটিয়ে আবার সোজা হল - দুচাকা থেকে তিনচাকায় ফিরল। 


'হঁ, কাইসা লাগা বাবুয়া!' পরিতৃপ্তির হাসি হাসল সে। আমি তখন আর নিজের মধ্যে নেই। ইঁদুরের হার্টবিটকে তখন টেক্কা দিচ্ছে আমার হৃদযন্ত্র।


'হাঁ ভাই, কা ভৈল বা? রঘুয়া তো নাহি আয়া বে?' 


পাশে তাকিয়ে দেখি, অটোভাই কানে ফোন ধরে নিয়েছে একটা। দেখে আমার শরীর কীরকম ঠাণ্ডা হয়ে এলো। অস্ফুটে বিড়বিড় করে কাতর অনুরোধ করতে গেলাম - কিন্তু গলা থেকে গোঁ-গোঁ ছাড়া আর কিছু বেরোলো না। 


সিগনালে দাঁড়াল অটো। প্রায় তেঁতুলতলার কাছাকাছি এসে গেছি। এদিকে অটোভাই পাশে কথা বলেই চলেছেন ফোনে। 'হাঁ ভাই, তু কুছু টিনসন না লে। তেরা ভাই হ্যায় না?' 

এই আশ্বাসবাণীটা আমাকে দিলে বরং কাজে দিতো। লাভ কতোটা হতো জানি না, তবুও…


সিগনাল খুলতেই অটো ছেড়ে দিলো আবার। দুটো বাইকের মাঝখান দিয়ে শাঁ করে বেরিয়ে গেল অটো। আমি প্রাণের আশা মোটামুটি ছেড়ে দিয়ে এলিয়ে পড়ে আছি সিটে৷ কানে হরিবোল হরিবোল বাজছে। জীবনে কত কী করা হল না — একটা অটোয় উঠে নিজের জীবন অপরকে দান করে এলাম। অটোচালকভাই তখনো ফোনে গল্প করে চলেছেন প্রাণের মনের। কবে লক্ষ্মী হলে কোন সিনেমা দেখেছিল, তার গল্প চলছে। 


"উ জো লড়কি থি না, গজব থি।.. নাহি ভাই, তু বোল। হাম বিলকুল বিজি নাহি হ্যায়।" 


শুনে আমার টাকে উঠে গেলো, মানে হার্ট। কী বলে কী হতচ্ছাড়া! বিজি নয়? কীরকম ইজি ভাবে বলে দিল মাইরি!


'শোঁ-ওঁ-ওঁ' শব্দে একটা টাটা সুমো বেরিয়ে গেল। এক ইঞ্চির জন্য লাগল না। কিন্তু এদিকে চিত্তির হয়েছে - অটোভাই পাশ কাটাতে গিয়ে একটা সাইকেলে গুঁতো মেরেছে — আর নিউটনের তৃতীয় সূত্র মেনে সেই ভদ্রলোক 'গিচি গিচি' বলে আর্তনাদ করে 'ঘ্যাঁচাৎ' শব্দে সোজা পাশের একটা চায়ের দোকানে সাইকেল ল্যান্ড করিয়ে দিলেন।


"সালা মারকে ভাগায়ে দিতে হয় সব। হামার রাস্তাতেই আসে এরা।.. না ভাই, তু বোল। এক সালেকো ঘুসা দিয়া চা পটরী মে।"


আমার তখন হাত-পা হিম হয়ে এসেছে। এ তো দিনেদুপুরে মানুষ খুন করতে পারে! 


অটো থেকে নামার আশা প্রায় তখন ছেড়ে দিয়েছি। চোখ বুজে বার্ড ফ্লু হওয়া মুরগির মতো ঝিমোচ্ছিলাম। হঠাৎ চোখ খুলতে যা দেখলাম, তাতে হার্টটা কীরকম পিংপং বলের মতো লাফিয়ে মুখ দিয়ে বেরিয়ে আবার রিফ্লেক্সে ঢুকে গেলো। বাঁদিক থেকে একটা লরি ঘোরাচ্ছিল। মাঝরাস্তায় পারপেন্ডিকুলার হয়ে দাঁড়িয়ে গেছিল। আমার অটোভাই 'ক্র‍্যাঁঅ্যাঁঅ্যাঁচ' শব্দে ব্রেক মেরে ডানদিকে প্রায় পুরো হেলে আবার সোজা হল। দিয়ে থামল। দেখলাম জানলা দিয়ে লরি ড্রাইভার বিস্মিত হয়ে তাকিয়ে আছে। 

"ই কা হ্যায়?" বিস্মিত লরি ড্রাইভারের প্রশ্ন।

"ই ইস্পেসশিপ হ্যায় তুমহারা মাম্মিকা!" মুহূর্তে অটো ড্রাইভারের সদুত্তর। লরি থেকে কিছু ব-চ-ম খিস্তি ভেসে এলো। সেটাকে মাথা ঝুঁকিয়ে বাও করার ভঙ্গিতে লুফে নিয়ে আবার অটো ভাগাল অটোভাই।


অবশেষে স্টেশন রোড। আমার স্টপেজ। অটো থামল।


"আরে, ইসকো কা হুয়া! ইনি ওগ্যান হোয়ে পোড়ে গেলেন কেনো?"


চোখ খুলে দেখি রাস্তার ধারের এক চায়ের দোকানের বেঞ্চে শুয়ে আছি। লোকজন মুখেচোখে জলটল দিচ্ছে। কীসব 'দুর্বল হার্ট' ইত্যাদি ভেসে এলো কানে। প্রতিজ্ঞা করলাম, আর কোনোদিন অটোয় উঠব না এই জীবন থাকতে। আমার এ জীবন বোরিং-এর; অটোয় চড়ার সাময়িক উত্তেজনায় তা যে জীবন ফড়িং-এর করার কোনো বাসনা আমার নেই।

Monday, 21 February 2022

ভাষাদিবস এবং...

 আজকে ভাষা দিবস। মনে থাক ছাই না থাক, সকাল থেকে রাত বারোটা অবধি গান চালিয়ে কানের মাথা খেয়ে আমাদেরকেই প্রায় রফিক-বরকতদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জোগাড়। ওনারা এসব কেলোর কীর্তি হবে জানলে প্রাণ কেন, কানও দিতেন না বাংলা ভাষার জন্য। আর বাঙালি যে নিজের ভাষাকে এত ভালোবাসে, জানা ছিল না। সকাল থেকে বাংলা আমার মাতৃভাষা, ইংরেজি বাজে ভাষা, হিন্দি রাষ্ট্রভাষা নয় মর্মে যাচ্ছেতাই হ্যাজ চলছে। যারা দুটো বানান গুছিয়ে লিখতে পারে না, যাদের ভাষাজ্ঞান ভাসা ভাসা, তাদের ভাষার প্রতি পিরিত দেখলে হাসি কান্না সবই পায়। 


দ্যাখো ভাই, কিছু লোক নিজের ভাষাকে ভালোবেসে, নিজেদের ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য প্রাণ দিয়েছিলেন, খুবই প্রশংসনীয় ব্যাপার, গর্বিত হওয়ার মতো, মনে রাখার মতো। কিন্তু অধিকাংশ হুজুগেই সেটা নিয়ে যা করে চলেছে, মাইরি! ভাষাসাহিত্যের ছাত্র হয়েও এতকিছু জানতে পারিনি, আজ যা জেনে গেলাম। যাইহোক, সেসব বাদ দিই। একটু নিজের জ্ঞান/ভাবনা কপচাই।


মাতৃভাষা, দেশের মতোই, খুব সংকীর্ণ একটা ধারণা, এবং ফ্লোটিং একটা ধারণা, অর্থাৎ যা দেশকালপাত্র হিসেবে বদলায়। আজকে তুমি এখানে না জন্মে মঙ্গলগ্রহে জন্মালে তুমি অ-এ অজগর না বলে তিন্তিড়ি তিন্তিড়ি বলতে, ওটাই তোমার মাতৃভাষা হত। এবার ব্যাপার হল, যারা জন্মসূত্রে দোভাষী/তেভাষী, তাদের? ধরা যাক, পুঁজিবাদী আম্রিগার এক দম্পতি, যার মধ্যে একজন ওখানকারই নেটিভ এবং ইস্পাহানি(স্প্যানিশ আরকী) বলে থাকেন, আরেকজন ধরা যাক জাতে চাইনিজ, তিনি অবশ্যই নাক কুঁচকে (ঘেন্না থেকে নয়) কথা বলে থাকেন। এবার, তাঁরা নিজেদের মধ্যে ইঞ্জিরি বলেন। তাঁদের সন্তানের মাতৃভাষা কোনটি? লিঙ্গুইস্টিক্সে এইজন্য মাতৃভাষা শব্দটা সেভাবে ব্যবহার হয়ই না, নেটিভ ল্যাঙ্গুয়েজ, এবং আরো স্পেসিফিকভাবে, ফার্স্ট ল্যাঙ্গুয়েজ বা L1 শব্দটি ব্যবহৃত হয় - অর্থাৎ, একটি শিশু প্রথম যে ভাষাটি শেখে। সেখানে দাঁড়িয়ে আমরা আজও মাতৃভাষা মাতৃদুগ্ধ নামক ম্যাক্সিম আউড়ে গেলে বেশ চাপ। তাও যদি বা ধরি মাতৃভাষা মাতৃদুগ্ধ, আমাকে একটু বলতে পারেন, অন্য ভাষায় অশিক্ষার অর্থ কীভাবে মাতৃভাষায় প্রেম হতে পারে? আজকে আমি হিন্দি শিখব সেটা রাষ্ট্রভাষা বলে নয়(সবাই জানে হিন্দি রাষ্ট্রভাষা নয়, অষ্টম তফশিলে বাইশটা ভাষা ইত্যাদি, যদিও সবাইকে বাকি একুশটা ভাষার নাম বা সংবিধান নিয়ে দুচারকথা বলতে বললে বেডপ্যান দিতে হবে), সেটা প্রেমচন্দের বা হরিশচন্দ্রের ভাষা বলে; উর্দু শিখব গালিবের জন্য, ইংরিজি শিখব কিটস পড়ব বলে। নিজের অশিক্ষা/অক্ষমতাকে মাতৃভাষার প্রতি প্রেম(তাও যদি সেটাও জানতাম, হায়রে!) দিয়ে ঢাকতে চাওয়া নিজের দেশের অক্ষমতাকে দেশপ্রেম দিয়ে ডিফেন্ড করারই আরেক পিঠ। আরে ভাই, গোটা দেশে না হোক, তার একটা বৃহত্তর অংশে হিন্দি (মানে ওই বিভিন্ন হিন্দির জগাখিচুড়ি আরকী) কমন ল্যাঙ্গুয়েজ, নিজের রাজ্যের বাইরে গেলে আমি কোন ভাষা বলব? এসপেরান্তো? ইংরেজি নিয়েও একই বক্তব্য। আজকের এই বিশ্বায়নের যুগে আমি ইংরেজি শিখব না, কেন? না, আমি সাচ্চা ভারতীয়, যে তথাকথিত 'কলোনিয়াল হ্যাংওভার'এ ভুগি না। এদিকে যে ইংরেজি পড়তে গিয়ে কাপড়েচোপড়ে করেছিলাম, সেটা বলতে ফাটে, মানে বুক। তাই চেপে যাই। ওহে অন্ধ বাঙালি, এমনকী তোমাদের রবিদাদু, যাঁকে নিয়ে তোমরা ঘর সাজাও(কারণ অত মোটা রচনাবলী কে পড়বে!), তিনিও ইঞ্জিরিতে লিখেই নোবেল পেয়েছিলেন। ইঞ্জিরি জানার মধ্যে দোষ নেই কোনো! একটা ভাষা জানা মানে বাকি ভাষাকে অপমান করা নয়!


বাঙালি যেমন এরকম উজবুকের মতো কাজ করে, বাঙালি ততোধিক বেশি উজবুকের কাজ করে নিজের রাজ্যে অন্য ভাষা বলে। তখন না পারা গুলো সব 'পারা' হয়ে যায়। তখন বাঙালি পারলে অ্যাংকেও 'মিলিপিপ্পিং খ্রুক?' বলে সম্বোধন জানায়। বাঙালি হিন্দিভাষীকে ভুল হিন্দি, বিদেশিকে ইয়েস নো গুডমর্নিং বলবেই। পারুক, না পারুক, বলতেই হবে। আমরা সুযোগ পেলেই হিন্দিমেশানো বাংলা, ইংরেজিমেশানো বাংলা বলবো, আবার অঞ্চলভিত্তিক লোকনিরুক্তি-মিশ্রিত ডায়ালেক্টের ডায়ালগ শুনলে ছোট্টুলালকে কমপ্লেক্স দিয়ে 'খ্যাঁ খ্যাঁ খৌয়া খৌয়া' হাসি হাসবো - কলকাতা এবং তৎসংলগ্ন অঞ্চলের মান্যভাষাকেই কেবল 'বাংলা' বলে ধরে নেবো - যে বাঙালি মাতৃভাষা নিয়ে এত সচেতন, একটু নিজের কেরামতি দেখানোর সুযোগ পেলে সেই মাতৃভাষা প্রেম কোথায় যায়, ভগবান জানে। নিজের রাজ্যে আমি আমার ভাষা ছেড়ে অন্য ভাষায় কেন কথা বলব? তাতে আমার মাতৃভাষার প্রতি ভারী সম্মান দেখানো হচ্ছে? নাকি ভুল ইংরিজি, হোঁচট খাওয়া হিন্দি বললে ভারি বিশ্বনাগরিকত্ব দেখানো হয়? 


একটাই বক্তব্য। ভাষা নিয়ে কোনো রিজিডিটি দেখানোটা বোকামো এবং অশিক্ষার পরিচায়ক। যে ভাষাই বলব/লিখব/জানব, সেটা ভালো করে জানব/লিখব/শিখব/বলব, সে ছাই মাতৃভাষা হোক আর ভ্রাতৃভাষা, একটা ভাষা হোক কি একান্নটা। এটুকু যেন মাথায় রাখি, তাহলেই রফিক-বরকতদের প্রতি, সমস্ত ভাষাশহীদদের প্রতি, ভাষার প্রতি সম্মান জানানো হবে। 😊

Saturday, 1 January 2022

পড়শিচরিত

 আমাদের একজন প্রতিবেশি আছে। না, সবারই প্রতিবেশি থাকে। আমি শশী কাপুর নই। এখানে দয়া করে 'সবারই তো ঘর রয়েছে..' ইত্যাদি গাইতে বসবেন না। এর ব্যাপার আলাদা। এ আমাদের প্রতিবেশি হলেও এর প্রতি আমাদের বেশি ভালোবাসা নেই(এবং উল্টোটা)।

প্রতিবেশী আদতে বিহারি খোট্টা। কে না জানে, কিছু উদাহরণ বাদে এই প্রজাতির বাকি প্রায় সব প্রোডাক্টই 'আ, মরণ!'(সতর্কীকরণ - 'খোট্টা' সম্প্রদায়ের থেকেও বেশি একটি মেন্টালিটি, একটি স্বভাব। সে আদতে বাংলা, বিহার, কর্ণাটক এমনকি মঙ্গলগ্রহের প্রাণীও হতে পারে। কেউ মনে করবেন না 'খোট্টা মাত্রেই বিহারি' গোছের সমীকরণ টানা হচ্ছে এবং বিহারিদের কোনোভাবে ছোটো করা হচ্ছে। ধন্যবাদ) এও এদের জাতভাইদের সুনাম অটুট রেখেছে, মানে টুটতে দেয় না, বরং পাশের বাড়ির(মানে আমাদের) শান্তি টুটিয়ে ও ছুটিয়ে দেয়। খোট্টাভাইয়ের দুই বৌ ও এক ছেলে... থুড়ি, দুই ছেলে ও এক বৌ আছে। তারা সবাই খোট্টা, এবং সেই শিবা মহাশয় কথিত আঙুরের মতোই, অতিশয় খাট্টা-ও। খাট্টা দেখলেই আমার আবার গাঁট্টা মারতে ইচ্ছে করে, কিন্তু নিজেকে সংবরণ করতে হয়, কারণ সেটা ঠাট্টার ব্যাপার নয়। খোট্টা লোকটি নিজের মাইনের পুরো টাকা ফ্রডকে দেয়(ফিশিং), এত ব্রড মন ওর। খোট্টার ছেলেরা পড়াশুনো করে না, শুধু দৌড়ে বেড়ায়। বাচ্চা না শুয়োরের বাচ্চা, খোদায় মালুম। খোট্টার বৌ ছেলে দেখলে গান গায়, আর সেই শুনে আমাদের কান যায়। এসব সত্ত্বেও আমরা খোট্টার অত্যাচার মেনে নিয়ে ছিলাম। কিন্তু তাতে খোট্টার মন মেনে নিল না।

খোট্টারা দ্বিজের (মানে দুজনের, বামুনের কিছু নেই এতে)কে সহজেই নিজের করে নিয়েছে। মানে আমাদের যেটা কমন প্যাসেজ, তাতে তারা মন দিয়ে কাপড় মেলে। ক মণ কাপড় মন দিয়ে কমন প্যাসেজে মেলা যায়, তা জানিনে, কিন্তু ব্যাপারটা মোটেও কমনীয় নয়, রমণীয় তো নয়ই, বরং এই কোরোনাকালে বাইরে কাপড় মেলাটা কেমন শমনীয় মনে হয়, মানে যা শমনের কাছ থেকে শমন এনে দেবে। বমনীয়ও বলা চলে, কারণ সেই কাপড় থেকে প্রবল বাজে গন্ধ বেরোয় এবং তারা একটুও দমনীয় নয়। খোট্টা বাচ্চাদুটোর বয়স যথাক্রমে আট ও চার, কিন্তু তারা নাকি বিছানা শুকনো রাখতে নাচার। চার হয়েও নাচার এবং আট হয়েও ভেজায় খাট, এ জ্বালা শালা আনজনেও বোঝে না, দেখে চোখে আঞ্জনী হয়ে যায়। এবার তাদের খোট্টা বাবা ও খোট্টামা মোট্টা করে কাপড় মেলে সেই কোট্টায়(মানে কোটা আরকি)। এবার, সেই সুযোগে তারা শাড়ি লুঙ্গি সায়া বেহায়া হয়ে মেলে যায়। খোট্টা বাচ্চাদের এতকিছু পরিধান অভিধানবিরুদ্ধ বলেই মনে হয়। এর বিরুদ্ধে আমরা অনুরোধ করি কাপড় না মেলার। তারা সেই অনুরোধকে ভাবে খেলার, দিয়ে তোয়াক্কা না করে আরো মেলে যায়। আমরা চিঠি দিই কমিটিকে। কিন্তু কমিটি কবেই বা কী মিটিয়েছে? মিটিয়ে উঠতে পারে না বলেই একে কমিটি বলে। যাইহোক, এই সন্দেশ পেয়ে খোট্টা আমাদের দরজায় এসে(সন্দেশ না এনেই) পদাঘাত করে এবং আমাদের শাসিয়ে যায়। প্রতিবেশি হয়েও সে বলে আমাদের প্রতি বাঁশ দিয়ে দেবে। প্রতিবেশির অর্থ যে প্রতি বাঁশি, মানে সবার প্রতি বাঁশির মতোই বাজাই যে তার কাজ, সেটা শিব্রাম বাবু বলেছিলেন; নিজের দরজায় দড়াম পড়ার পর সেটা হাড়ে হাড়ে বুঝলাম। আমরা পুলিশটুলিশকে জানাই। সরকারি সিদ্ধান্ত নেওয়া শুরু হয়। কিন্তু সরকারি সিদ্ধান্ত দরকারি না হলে তা ছোটোগল্প হয়ে যায়, মানে শেষ থাকে না। ব্যাপারটা সেরকম জায়গাতেই আছে আরকী। আমাদেরও নাকি হবে, কে জানে বাবা কবে! আপাতত খোট্টারা প্রাণপণে কাপড় মেলে চলেছে। খোট্টার একবার কোরোনাও হয়ে গেছে, খোট্টাদের বাচ্চাগুলো মুখে মাস্ক না পরেই দৌড়ে বেড়ায় হারেরেরে করে। কোর্টের শমন না উপরের শমন, কে আগে আসবে, বুঝছি না। লালন বলেছিলেন, পড়শি যদি আমায় ছুঁত, আমার যমযাতনা যেত দূরে। এ পড়শি আমাকে ছুঁলে যম এসে আমার সব যাতনা ঘুচিয়ে দেবে। ভগমান, দেখে রেখো। এ খোট্টাফ্ল্যাট আমার ফ্ল্যাট নয়।

'ঠাকুরমার ঝুলি'

 আজকে আমার ঠাকুমার মৃত্যুবার্ষিকী। ২০২১ সালের এই দিনেই তিনি গত হয়েছিলেন। এইটুকু পড়েই অনেকে হয়তো, 'ওঁ শান্তি, আত্মার শান্তি কামনা করি, তি...