Thursday, 4 September 2025

শিক্ষক দিবস...

 হে আমার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষকবৃন্দ,


আজ আপনাদের দিবস, এবং আজ আপনারাই the boss। এই দিবসের আহাউহু দেখে সকাল থেকে মন ভ’রে যাচ্ছে। শিক্ষকরা যে জাতির শিরদাঁড়া, দেশের গর্ব, সমাজের অহঙ্কার... আপনারা বাবা-মা, আপনারা গুরু, আপনারা সমাজ গড়ে তুলেছেন, আপনারা চলতে শিখিয়েছেন, জ্বলতে শিখিয়েছেন...আপনারা যে আসলে কী, তাই সকাল থেকে বুঝে উঠতে পারলাম না। আপনাদের দেখেই কি সুকুমার রায় লিখেছিলেন, “নই জুতা, নই ছাতা, তবে আমি কেউ নই!” ?


মাইরি বলছি, জানেন, আপনাদের প্রতি এতো প্রেম আমার আসে না। আমার জীবনে যেসব শিক্ষকদের আমি পেয়েছি, তারা শিখদের মতো কৃপাণ উঁচিয়ে আমাকে মারতে এসেছে, নয় খক করে কেশে চলে গেছে। শিখ ও খক, এই দুয়ের মিলন আমার জীবনে অন্তত ঘটেনি।


মুশকিলটা হলো, কিছু লোক আমার আগে জন্মে গেছে, আমার আগে একটা পরীক্ষায় বসেছে বা ইন্টারভিউ দিয়েছে এবং শিক্ষক হয়ে গেছে, হয়ে গিয়ে বেত এবং যা যা উঁচোনো যায়, সেইসব উঁচিয়ে হারেরেরে করে প্রবল শিক্ষকত্ব দেখিয়েছে। শিক্ষক এবং ছাত্র – এই দুইয়ের মধ্যে অদ্ভুত একটা ভেদরেখা টেনে চলেছে তারা। আমার কাছে শিক্ষক মানেই হলো প্রবল অহমিকা, ঠুনকো অহঙ্কার, কিচ্ছুটি বোঝাতে না পারার ক্ষমতা, অহেতুক সহজ জিনিসকে জটিল করা এবং বহুক্ষেত্রেই, প্রবল অশিক্ষা। অশিক্ষা না বলে যদিও কুশিক্ষা বলাই ভালো, কারণ তাদের যেটা আছে, সেটা শিক্ষার অভাব নয়; সেটা ভুল, খারাপ শিক্ষা।


হে মহামহিমমহামহোপাধ্যায় শিক্ষকগণ, আসুন, আমরা আজ আত্মসমালোচনায় বসি। শিক্ষক আসলে কী? জাতির গর্বটর্ব ওসব ঢপের কেত্তন রেখে, সোজা পয়েন্টে আসুন। আচ্ছা, আপনারা এটা কোনোদিন শিখতে পারেন না, শিক্ষকও আসলে একজন ছাত্র? শিক্ষকের আদিতে রয়েছে ‘শিখ্‌’ ধাতু, যার অর্থ শিক্ষা। শিখ শব্দের অপর অর্থ শিষ্য। আপনারা শিক্ষক হয়েই ভেবে নিয়েছেন, ব্যাস, আজ থেকে শেখা শেষ, আজ থেকে শেখানো শুরু। আরে আরে, দাঁড়ান মশাই! জানেন, ভালোর কোনো শেষ হয় না? আপনার থেকে অধিক শিক্ষিত(অ্যাকাডেমিকালি অন্তত)কারোর সামনে যদি আপনাদের দাঁড় করাই, তাহলেই তো জারিজুরি ফটাসডুম হয়ে যাবে। যে শিক্ষার বলে বলীয়ান আপনারা, সেই বল প্লাস্টিকের হালকা বলসম ভেসে উড়ে যাবে, যদি সেরকম জায়গায় পড়েন। কী ভাগ্যি, পড়তে হয় না আপনাদের!


আপনাদের ধারণা, ছাত্র মাত্রেই অশিক্ষিত। যে ছাত্র আপনার বলা সুরে গেয়ে যাবে, সেই আসল ছাত্র। চুপিচুপি বলি, তোতাকাহিনীর তোতা আসলে বিদ্যার ভারে নয়, আপনাদের দেখে হাসতে হাসতে দম ফেটে মজন্তালী সরকারের মতো পেট ফেটে মরেছিলো। হ্যাঁ, অবশ্যই কিছুক্ষেত্রে আপনারা বেশি জানেন, কারণ আর যাই হোক, কিছু বছরের অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান অন্তত আপনারা সঞ্চয় করেছেন। যদিও অনেকেই করেননি, তাদের প্রতি আমার করুণা রইলো। আচ্ছা, আপনার সামনে যে বসে রয়েছে, সে ঘাসপাতা চিবিয়ে বসে রয়েছে, শুধু আপনার তালে তালে ব্যা বা হ্যাঁ কিছু একটা করবে বলে, এমনটা ভেবে নেওয়ার দস্তুর কী? আপনাদের যখন যা ইচ্ছে মনে হয়, পড়িয়ে যান। আপনাদের ছাত্ররাও আপনাদের মতো, “তালে তাল দিয়ে যায় হ্যাঁ-হ্যাঁ বলা সঙ” – ফলে কেউ কিছুই প্রশ্ন করে না। আপনি Wastelandকে বলবেন পশ্চিমভূমি(Westland ভেবে), কারণ হিসেবে বলবেন, যে তা আসলে পশ্চিমের লোকজনদের নিয়ে তা লেখা; উইকিপিডিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ করে মুখস্থ পড়িয়ে যাবেন, ভাববেন কেউ ধরতে পারবে না; ডিরোজিওর ‘ইয়ং বেঙ্গল’এর সদস্য দক্ষিণারঞ্জন মুখোপাধ্যায়কে মিত্র মজুমদার বলে চালিয়ে দেবেন, তিনি ‘ঠাকুমার ঝুলি’র “লেখক” বলে। কতো বলবো? আমার জীবনে ৯০% প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষককে দেখলাম ভুল পড়াতে। তাও বেশ, ভুল পড়ানো মেনে নিলাম(যদিও ভুল পড়াবো কেন – এটাই বুঝলাম না, এইটুকু বেসিক রিসার্চ করে পড়াতে কী কষ্ট হয়), সেটা নিয়ে আপনারা আবার তর্ক করেন, যদি কেউ প্রতিবাদ করে, বা আপনাদের ভুলটুকু ধরিয়ে দেয়। এমনকী, যদি আপনাদের হাতে থাকে, আপনারা কারোর কেরিয়ারের ক্ষতি করতেও পিছপা হন না, এমনই আপনাদের ইগো। আপনারা হয়তো জানেন আপনারা ভুল (বা জানেন না, বইয়ের সঙ্গে সম্পর্ক বহুযুগ আগেই ঘুচিয়ে দিয়েছেন), তাও আপনারা স্বীকার করবেন না, যদি ছাত্র – যারা আপনাদের তুলনায় হীন, কীটসম যাদের অস্তিত্ব, তাদের কাছে যদি আপনারা ছোটো হয়ে যান! প্রসঙ্গত বলি, আমার এক শিক্ষককে একবার ফেসবুকে পোস্ট দিতে দেখেছিলাম, নিজেকে 'ছাত্র' মনে করা, মাথা ঝুঁকিয়ে ক্লাসে ঢোকা ইত্যাদি বড়ো বড়ো কথা বলে। সেই ভদ্দর(?)লোককেই আবার দেখেছি, তাঁর ক্লাসনোট ঝাড়া মুখস্থ লিখিনি বলে নাম্বার না দিতে, নাম্বার দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রবল পার্শিয়াল্টি দেখাতে, ছাত্রদের সঙ্গে মতবিরোধ হলে প্রবল ইগোসর্বস্ব হয়ে ঘুরে বেড়াতে, এবং লোকজনের ব্যক্তিগত ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করতে এবং নিজের ‘ক্ষমতা’ প্রদর্শন করতে। অন্তত আমি তার শিকার। বাকিরা হয়তো তাঁর নাম উচ্চারণ করলেই অজ্ঞান হয়ে ধপ্পাস করে পড়ে যাবে, তাঁর প্রশস্তিতে খান বিশেক বই লিখে ফেলতে পারে, আমাকে প্লেনে তুলে দেশান্তরে পাঠিয়ে দিতে পারে, বা নিদেনপক্ষে ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে শালিশালাজ তুলে গালিগালাজ করতে পারে। তাদের নিয়ে আমি বিন্দুমাত্র ভাবিত নই। সত্যের কাছে মাথা নত করার দায় আমার, আর কারোর কাছে নয়। নিরর্থক তোষণ আমার আসে না, ব্যক্তিপূজাও একদমই পারি না।  দুঃখিত, আপনারা শিক্ষক হওয়ার উপযুক্ত নন। একবার অন্তত মাথা ঝুঁকিয়ে বসুন, ‘আমি বেশি জানি’ – এই মোহ থেকে একবার বেরোন। নিজেকে ছোটো ভাবলে কেউ ছোটো হয় না, এটা একবার মাত্র বুঝুন। বেশি না, মাত্র একবার। সেটা শুধু মুখে বলা নয়, উপলব্ধি করা। মুখে ওরকম বলতে বা ফেসবুকে বাতেলা ঝাড়তে সবাই পারে।


 


অদ্ভুত ব্যাপার হলো, এই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষকদের বাদ দিলে, সবার কাছ থেকে আমি জীবনে নানা শিক্ষা পেয়েছি। না, আকাশ আমায় উদার হতে শিক্ষাটিক্ষা দেয়নি, বা বায়ুও আমাকে কর্মী হওয়ার মন্ত্র দেয়নি। বা, সবার আমি ছাত্র – এহেন দাবিও দিতে পারবো না। কিন্তু সবাই আমাকে কিছু না কিছু শিখিয়েছে, জীবনের শিক্ষা।


আপশোষ একটাই, জানেন। আমারও খুব ইচ্ছে করে আপনাদের জয়গান গাইতে, কিন্তু আপনারাই আপনাদের স্বভাবে ও শিক্ষকত্বের অভাবে অনেক দূরে চলে গেছেন। আমার বন্ধুরা জানে, ভালো শিক্ষকের ছাত্র হওয়ার আকুলতা আমার কতখানি, ভালো শিক্ষকের শিষ্যত্ব নিতে আমি কতখানি ব্যাকুল। সেই পিয়াসা মেটাতে পারলেন না আপনারা, এটাই দুঃখের।


যাকগে। আপনাদের গুরুপূজায় শামিল হতে পারলাম না, দুঃখিত।


 


ইতি,


আপনাদের এক দুর্বিনীত, অবাধ্য, অভব্য ছাত্র


অর্চিষ্মান



(অনেক বছর আগে লেখা। ফের পোস্টালাম।)

No comments:

Post a Comment

'ঠাকুরমার ঝুলি'

 আজকে আমার ঠাকুমার মৃত্যুবার্ষিকী। ২০২১ সালের এই দিনেই তিনি গত হয়েছিলেন। এইটুকু পড়েই অনেকে হয়তো, 'ওঁ শান্তি, আত্মার শান্তি কামনা করি, তি...