সভ্যতা, মানে যাকে আক্ষরিক অর্থে সভ্যতা বলা যায় আরকী – জ্ঞানচর্চায় এবং শিল্পচর্চার চচ্চড়িতে যার বিকাশ, সেই সভ্যতার আদিলগ্ন থেকে একটা ষাঁড়াষাঁড়ি বানের মতো মারামারি চলে আসছে এই ফান্ডামেন্টাল প্রশ্নটা নিয়ে, যে শিল্প আর শিল্পী, এরা এক এবং অদ্বিতীয়, নাকি এরা আলাদা আলাদা। সুদূর গ্রিস-রোম থেকে অধুনা গুগল ক্রোম, সব জায়গায় লোকে এই একটা প্রশ্নের সন্ধান করে এসেছে। সেই প্রশ্নটারই উত্তর নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রবল জলঘোলা হয়, বিশেষ করে যখন কোনো শিল্পী কোনো বিতর্কিত মন্তব্য করেন/কাজ করেন/আচরণ করেন৷ এই সমাজের এক সুধী নাগরিক হিসেবে যখন পৃথিবীর প্রতিটা বিষয়ে নিজের মতামত রেখে যাওয়ার গুরুভার নিজেই নিজের কাঁধে টেনে নিয়েছি, তখন এইটেই বা বাদ যায় কেন?
কিছু লোকের, বা আমার দেখা অধিকাংশেরই বক্তব্য, শিল্পী ভুল করতেই পারেন না। শিল্পী যদি ভুল করেন, তবে তিনি শিল্পী নন – তিনি কুলপি বা ঝুলপি, বা নিদেনপক্ষে তল্পি। কিন্তু শিল্পী কোনোমতেই নন৷ যিনি নারীবাদের উপন্যাস লিখছেন, তিনি মেয়েদের রাতে বেরোনো নিয়ে মন্তব্য করছেন; যিনি সাম্যবাদের গান লিখছেন, তিনিই রিকশাওয়ালাকে মস্তি করে খিস্তি দিচ্ছেন – এগুলো কী করে হতে পারে কাকা? নারীবাদ নিয়ে লিখছো মানে তুমি নারী বাদে অন্য কিছু ভাবতেই পারবে না। আরে পাগল, শিল্প আসলে কী? শিল্প হচ্ছে আবেগের উজালাজলে ভেজানো স্যান্ডো গেঞ্জি, যেটা নিংড়োলেই ফোঁটা ফোঁটা শিল্প ঝরে পড়ে। প্রতিদিনের রোজনামচাই শিল্প। আমরা প্রস্রাব করলে শিল্প, মলত্যাগ করলে শিল্প, মলে গেলে শিল্প, হাঁটলে শিল্প, হাঁচলেকাশলেনাচলে শিল্প। শিল্প জীবনের প্রতিটা পরতে টক্সিক এক্সের ন্যায় জড়িয়ে না থাকলে সেটার প্রতিফলন শিল্পে কীভাবে দেখা যায়? তারমানে শালা শিওর ভণ্ড৷ অতএব, ব্যাঅ্যাঅ্যাঅ্যান কর শালাকে, মুখে জুতো মার, তার গানবাজনাছবিলেখাসিনেমানাটক সব বয়কট কর। এরকম ভণ্ডকে মেনে নিই কীভাবে?
আমরা আসলে ভুলে যাই, বা ডিনায়ালে থাকি, আমরা মানুষরা সবাই কমবেশি হিপোক্রিট। এই যে সভ্যতার কথা শুরুতেই বললাম, সেই সভ্যতা, হাজারহাজার বছরের সভ্যতা আমাদের উপর একটা প্রলেপ তৈরি করেছে, যেটা আমাদের না-মানুষদের থেকে আলাদা করেছে। বিবর্তনের পথে আমরা মানুষ হয়ে এগিয়েছি ঠিকই, কিন্তু নিজেদের না-মানুষি প্রবৃত্তিকে তো রাস্তায় ফেলে রেখে আসিনি? সেইটার উপরেই একটা ভদ্রতার প্রলেপ, সামাজিক রীতিনীতির একটা মোটা প্রলেপ পড়েছে এতো হাজার হাজার বছর ধরে৷ সেই তৈরি করা একটা সামাজিক আমির সঙ্গে ভিতরের লুকিয়ে থাকা আমিটার সারাক্ষণ দ্বন্দ্ব চলতে থাকে – সেটা আপনি স্বীকার করুন, আর নাই করুন। এই দ্বন্দ্বের ফলস্বরূপই নানা আউটবার্স্ট ঘটে যায়, জিতে যায় আপনার পাশবিক প্রবৃত্তি – যা এই সমাজের, এই সভ্যতার মেকি পোশাকি নিয়মকানুন মানে না। আপনি সত্যি করে বলুন তো, আপনি বিশ্বাস করেন যে সেট অফ আইডিয়ালসে, সেগুলোর একটাও কখনো লঙ্ঘন করেননি? করেছেন৷ আপনি নিজেও জানেন, করেছেন। সেটা কি ঠিক? অবশ্যই নয়। এটা প্রাকৃতিক আর স্বাভাবিক। আর মজা হচ্ছে, আমরা যে হিপোক্রিট, এটা আমরা সবাই জানি – আর এই জানা থেকেই আমরা ভুগতে থাকি এক অপরাধবোধে, এক গিল্টে। তাকে গিলতে বা উগরোতে না পেরে আমরা শুরু করি ন্যায়বিচার – যার দায় বা দায়িত্ব কোনোটাই আমাদের কেউ দেয়নি। আমরা ঠিক করে নিই, এর কর্তব্য এই, তার কর্তব্য সেই। শিল্পী শুধু শিল্প বানাবে, সেই শিল্প পবিত্র, অপাপবিদ্ধ, নিষ্কলুষ – এবং শিল্পীও পুরো টাইড দিয়ে কাচা ঝাক্কাস মাল – মুখহাত ইত্যাদি যাই খুলবে, শুধু পবিত্র শিল্প বেরোবে, যা তার নিজের জীবনেরই প্রতিফলন।
ঠিক এই কারণেই, আমরা সহজেই বলে দিতে পারি – কোন গায়কের ‘ফাক ইউ’ বলা ‘মানায় না’ ; কোন গীতিকারের নোংরা গালাগাল দেওয়া অনুচিত; কোন অভিনেত্রীর ‘আজকাল সবাই ল্যাম্পপোস্টের নিচে দাঁড়ানো মেয়েদের মতো শাড়ি পরে’ বলা একদম বেঠিক (যদিও তারপরের লাইনেই সেই অভিনেত্রী জানিয়েছেন, তিনি সেই ল্যাম্পপোস্টের নিচে দাঁড়ানোর পেশাকেও সম্মান করেন, কিন্তু সবার সেই একই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত শাড়ি পরার ধরনকে তিনি পছন্দ করেন না) – অতএব এঁদের শিগ্গির বয়কট কর, ব্যান কর। এঁদের গান আজ থেকে শুনবো না, এঁদের লেখা পড়বো না, এঁদের সিনেমা দেখবো না। এঁদের শিল্পকীর্তি ভালো? হোক। যে মানুষ খারাপ, তার শিল্প আমি দেখি না – কারণ রাজহাঁসের পালক ছিঁড়ে ফেলে আমার জন্ম, গোয়ালাদের সঙ্গে বাজি ধরে দুধমেশানো জল থেকে চোঁ চোঁ করে দুধটা মেরে দিতে শিখেছি আমি।
প্রশ্ন উঠতেই পারে, এগুলো কি জাস্টিফায়েড? এঁদের কথা, কাজ, এগুলো? বহু শিল্পী তাঁদের ক্ষমতার ডায়নামিক্সের সুযোগ নিয়ে যাচ্ছেতাই নোংরামো চালিয়ে গেছেন – সেগুলোকে সাপোর্ট করবো? লাখো লাখো সত্যিকারের ‘মিটু’কে ‘আহা, শিল্পী ওরকম করতেই পারে’ বলে এন্যাবলিং করবো? যে প্রখ্যাত অভিনেতা পিডোফিলিয়ার অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়েছেন, সেটার মতো ঘৃণ্য কাজকে সাপোর্ট করবো? না। সেগুলো কেউ বলছে না। আপনি চাইলে করতেই পারেন সাপোর্ট, তাতে আপনার বিকৃত মানসিকতারই পরিচয় পাওয়া যাবে। কিন্তু, চশমা-আঁটা সমালোচক দাদাদিদিরা, আপনারা কখনো একটু নিজেদের দিকে তাকিয়ে দেখেছেন? ভেবে দেখেছেন, আঁতে ঘা পড়লে, অস্তিত্বসঙ্কট হলে আপনার মধ্যের পাশবিক প্রবৃত্তি কীভাবে হিংস্র হয়ে ওঠে সারভাইভালের জন্য? এই ব্যাপারটা প্রাকৃতিক – যেজন্য বিড়াল কোণঠাসা হলে উচ্চে পুচ্ছ তুলে ফ্যাঁস করে ওঠে, সাপ ফণা তোলে/ছোবল মারে, মৌমাছি হুল ফোটায় আর আপনি পলিটিকালি ইনকারেক্ট মন্তব্য করেন। ফাংশনিংটা একই, শুধু মেথডটা যার যার আলাদা। কিন্তু দাদাদিদিরা, চালুনি হয়ে সূঁচের ছ্যাঁদা দেখে যদি বলেন, সেলাই করতে সূঁচ ব্যবহার করবো না, কারণ তোর পিছনে ফুটো – ব্যাপারটা কীরকম হাস্যকর হবে বলুন দেখি?
একজন শিল্পীর শিল্পীসত্তা আর ব্যক্তিসত্তা, এইদুটো যে সম্পূর্ণ আলাদা আইডেন্টিটি, এটা আমরা বুঝতে চাই না, বুঝতে পারিও না। একটা মানুষের অনেকগুলো সত্তা থাকে – শিল্পীসত্তা তার মধ্যে একটা। কোনো মানুষই একমুখী নন, একসত্তাবিশিষ্ট নন – অজস্র টুকরোটাকরা কোলাজ জুড়ে তৈরি হন একজন মানুষ, যার মধ্যে প্রভাব রয়েছে তাঁর আর্থসামাজিক অবস্থানের, পারিপার্শ্বিকের, বংশগতির – এবং আরো নানা ফ্যাক্টরের৷ সেই মানুষের শিল্পীসত্তা হলো হিমশৈলের চূড়াবিশেষ – এমনকী যেটাকেও আমরা পুরো কোনোদিন দেখতে পাই না। প্রচুর ফিল্টারের মধ্যে ছেঁকে, প্রচুর কাটাছেঁড়াবাদদেয়াপরিবর্তন ইত্যাদির মধ্যে দিয়ে গিয়ে কতিপয় এন্ড প্রোডাক্ট আমরা পাই, আর ভাবি বিন্দুতে সিন্ধু দেখে ফেললাম। তারমধ্যে, সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে এখন ব্যক্তিগত বলে কিছুই নেই। আপনি বন্ধুদের সঙ্গে গালাগাল দিয়ে কথা বলবেন, সেটা চলবে – কিন্তু একজন শিল্পী তাঁর বন্ধুর ফোটোর তলায় একটা চারঅক্ষর লিখে কমেন্ট করবেন, এ ক্যামন নিরক্ষরতা? আপনি ভাবাবেগে কেঁদেককিয়ে একটা ভালোমন্দ কিছু করে ফেলেন প্রায়। একে তো শিল্পীর স্বাধীনতা একটা আস্ত ঘোড়াড্ডিম – সবাই কিছুতে না কিছুতে সারাক্ষণ অফেন্স নিচ্ছে। গালাগাল দিলে দোষ, ভালো কথা বললে দোষ, ছোটো জামা পরলে দোষ, বড়ো জামা পরলে দোষ, ধর্ম নিয়ে কথা বললে দোষ; তাঁর লিঙ্গ থেকে lingo, সবেতেই দোষ। তাঁরমধ্যে যদি সেই শিল্পী কোনো অপরাধ করলে আমরা সবাই বিচারকের আসনে বসে পড়ে হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে পিটিয়ে লাখো লাখো অর্ডার দিয়ে শিল্পী ও শিল্পের চারপাশে একটা বর্ডার টেনে দিই, একঘরে করে দিই। আমাদের সঙ্গে আগেকার দিনের চণ্ডীমণ্ডপ কালচারের খুব একটা পার্থক্য নেই – স্বভাব যায় না ম’লে।একটাই কথা বলার। শিল্পী অপরাধ করুন, বা আপনার তরুণ হিয়ার অরুণ ভাবাবেগকে ভেঙে পদমথিত করে যান, শিল্পকে কাঠগড়ায় তুলবেন না প্লিজ। শিল্প একবার শিল্পীর কাছ থেকে বেরিয়ে গেলে তা সম্পূর্ণভাবেই আমাদের সবার জন্য, তার উপর অধিকার আমাদের সবার। শিল্প নিষ্কলুষ – তার উপরে আপনার অকারণ বেঁড়েমির কাদাজল ছেটাবেন না প্লিজ। ঠিক যেমন, কবীর সুমন যাই আজেবাজে বলুন না কেন (যা অবশ্যই ক্ষমার অযোগ্য), একটা ‘তোমাকে চাই’ বা ‘আমি চাই’ বা ‘আমাদের জন্য’-র মতো গান নিরর্থক হয়ে যায় না – সে যতোই শিল্পীর গানের কথা আর ব্যক্তিগত জীবন বিপ্রতীপ হোক; বা অগুন্তি যৌন নির্যাতনের দোষে দুষ্ট কেভিন স্পেসি বা মার্লন ব্র্যান্ডোর ক্ষমার অযোগ্য অপরাধসত্ত্বেও ‘ইউজুয়াল সাসপেক্ট’-এর কাইজার সোজে বা ‘গডফাদার’-এর ভিতো কোরলিওনি-র অতুল্য অভিনয় আবিল হয়ে যায় না। দয়া করে, কবি (মানে শিল্পী)কে তাঁর জীবনচরিতে খোঁজার বদভ্যেস ত্যাগ করুন। শিল্পকে খোলামনে নিতে শিখুন, শিল্পীকে দূরে ঠেলে রেখে। শিল্পীর কোনো দায় নেই, ব্যক্তিগত জীবনে আপনার গুডবুকে গুডবয় বা গুডগার্ল হয়ে থাকার।
আর যদি সেটা না পারেন, মানে মনে করেন যে শিল্পীর শিল্প নির্ভর করে শিল্পীর ব্যক্তিগত জীবনের প্রতিফলনের উপর, তবে তো উল্টোটাও সত্যি হওয়া উচিত? তাহলে একটা কাজ করুন – যিনি খুব ভালো মানুষ, ভালো কথা বলেন ও কাজ করেন, তাঁর হাতে একটা তুলি ধরিয়ে বলুন, একটা ‘ক্যাফে ইন আর্লে’ এঁকে দেখাতে; যিনি NGO চালান, গরিব-দুঃস্থ-পিছিয়ে পড়া মানুষজনের জন্য কাজ করেন, তাঁর হাতে হারমোনিয়াম ধরিয়ে বলুন, একটা ‘মন হারালো হারালো মন হারালো’র মতো গান লিখে ও সুর দিয়ে দেখাতে; অথবা, যিনি খুব পশুপ্রেমী, তাঁকে বলুন একটা ‘লা দলচে ভিতা’ বানাতে। সেকী, আপনার মা দারুণ কুমড়োর ছক্কা রাঁধেন এবং মিষ্টি করে গল্প করেন সবার সঙ্গে, অথচ একটাও গান লেখেননি/সিনেমা বানাননি/অভিনয় করেননি/গল্প-উপন্যাস-কবিতা লেখেননি/ছবি আঁকেননি, নিদেনপক্ষে একটা দারুণ সেলাইয়ের কাজও বানাননি? ধুত, এমন করলে খেলবো না বলে দিচ্ছি, আব্বুলিশ!
No comments:
Post a Comment