Thursday, 24 October 2024

নীলাচলের নীল আঁচলে - পর্ব ১

সবক্ষেত্র একবার, শ্রীক্ষেত্র বার বার - এমনটা কেউ একজন বলেছিলেন। কে বলেছিলেন ঠিক মনে নেই - শ্রীচৈতন্য বা শ্রীদেবী, কেউ একটা হবে। 


সেই শ্রীবাক্য আপ্ত এবং apt-ও মেনে আমার জন্মদাতা ও জন্মদাত্রী ঠিক করলেন, এবারের পুজোর ছুটিতে পুরী যাওয়া হবে। সেই ব্যাপারে ওদের পুরোপুরি সমর্থন থাকলেও, আমার একেবারেই ছিলো না - কারণ, আমার পুরী ভাল্লাগে আহারে, আর বেড়াতে ভাল্লাগে পাহাড়ে। সমুদ্র আমার বরাবরের না-পসন্দ। সমুদ্রকে নিয়ে ভালো কথা লিখেছেই বা কজন? যেমন মেঘনাদের লেখা ‘মাইকেলবধ’ বলে উপন্যাসটায় রাবণভাই ‘কী হেব্বি চোকারমার্কা মালা পরেচিস বে পোচেতো, পুরা চলতা ফিরতা কোকেইন হ্যায়, কোকেইন’ ইত্যাদি ডায়লগ ঝেড়ে ব্যজস্তুতি-সার্কাজম ভরে ভরে দিয়েছিল; বা কোলরিজের ‘রাইম অফ দ্য এনশিয়েন্ট মেরিনার’ - এ কমরেড মাঝিভাইরা তেষ্টার চোটে সমুদ্দুরের জল খেয়ে ‘হ্যাক থুঃ, কী নুন রে ভাই ছ্যাঃ, মানুষে খায় এসব’ বলে মুখ সিঁটকে নিজেদের বিতৃষ্ণা, বি-তৃষ্ণা প্রকাশ করছিল - এইসবই মাথায় আসে শুধু। এইসব ভেবে গাঁইগুঁই করে বাড়িতে বোঝানোর চেষ্টা করছিলাম - যে সমুদ্রের কী দরকার, বাড়ির সামনেই তো পাড়ার পুকুর রয়েছে, ওখানে বসেই তো লোকজন গরম গরম কাটাপোনা ভাজা আর বাংলা খায়.. তবে শ্রেণিসংগ্রামের লড়াইতে কবেই বা আমার মতো সর্বহারারা জিততে পেরেছে। যাইহোক। ফলে টিকিট কাটা, হোটেল বুক করা - ইত্যাদি সমস্ত একে একে হয়ে গেল। আমি মুখ চুন (বা সমুদ্রে যাব বলে নুন) করে বসে রইলাম। 


এরপর ব্যাগ গোছানোর পালা। ব্যাগ গোছানোর ব্যাপারে আমার মায়ের প্রবল FOMO আছে। ফলে, আমাদের বেড়াতে যাওয়ার লাগেজ আমার ইমোশনাল ব্যাগেজের থেকেও ভারি হয়। সেইসব সময়ে আমি সামনে থাকি না - আমার ভারি আতঙ্ক হয়। 


প্যাকিং ইত্যাদি সারার পরে ঘরে ঢুকেই দেখি কেলেঙ্কারি! মেঝেতে পড়ে আছে ছটা ট্রলি, তিনটে সাইডব্যাগ, চারটে পিঠের ব্যাগ, খান পাঁচেক এদিকসেদিক আরো ব্যাগ.. সে এক বিরাট বাগাড়ম্বর, বা ব্যাগাড়ম্বরও বলা চলে। সমস্যা কী? সমস্যা হল, আমার উপরে ভুবনের ভার না থাকলেও, এই ব্যাগেজের ভার রয়েছে - এই ব্যাগেজ আমাকে আর বাবাকেই বইতে হয়। মা একটা স্টাইলিশ লেদারের সাইডব্যাগ আর একটা জলের বোতল নিয়ে অ্যাটলাসের পৃথিবী কাঁধে নেওয়ার মতো দাঁতমুখ খিঁচিয়ে চলতে থাকে। আর বাবাকে কুলি নিতে বললে বাবা কুলির সঙ্গে মারাত্মক দরাদরি করে, আর কুলি রেগে একেবারে হটি হয়ে যায়। স্বাভাবিক - একটা লোক ৩০০ টাকা চাইলে তাকে যদি কেউ ৩০ টাকা নেওয়ার জন্য ঝুলোঝুলি করতে থাকে, তবে তার মাথায় খুন চাপবে না? 


ব্যাগ দেখে আমার মাথায় হাত। মা গর্বিতা হয়ে বসে বসে যুগপৎ নিজের সুকীর্তি (লাগেজ) এবং কুকীর্তি (আমি) দেখছে। 


— এসব কী নিয়েছ মা?

— কেন, লাগেজ! ওখানে গিয়ে লাগবে না? 

— হ্যাঁ, লাগে বলেই তো এদের নাম লাগেজ। কিন্তু এত কিছু কোন কাজে লাগবে? তুমি কি দেশত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নিচ্ছো নাকি?

— আহা, কী সব অলুক্ষুণে কথা! দরকারের জিনিসই নিয়েছি শুধু! এইটুকু ছাড়া যাওয়া যায়?


ততক্ষণে আমি ব্যাগ হাঁটকে একের পর এক বোমা বের করছি। শুরুতেই একটা ৫ লিটার প্রেশার কুকার বেরোলো। 


— এটা কোন কাজে লাগবে?


মা গদগদ হেসে বলল, 


—আহা, কোনোদিন যদি পাঁঠার মাংস খেতে ইচ্ছে হয় আমাদের?

— মা, আমরা হোটেলে উঠছি, হলিডে হোমে না! সেখানে এসব হোম-যজ্ঞ চলে, হোটেল এসবের যোগ্য না! 


ব্যাগ থেকে আরো বেরোলো একটা ছোটো স্টোভ, একটা পুঁচকে গ্যাস সিলিন্ডার, একটা বড়ো কড়াই, একটা মাঝারি নন-স্টিক প্যান।


— এসব কেন? পিকনিক করবে নাকি? 

— না না। ধর ওখানে গিয়ে ভালো খাবার পেলাম না। তখন তো আমাকেই ধরবি তোরা। সবার জন্য ভাবি বলেই আজ আমার এই দশা। কেন যে মরতে এই সংসারে এসে পড়েছিলাম.. (ক্রন্দন)


এইসব শুনতে শুনতে অন্যান্য ব্যাগগুলোও দেখছি। একটা ব্যাগ থেকে বেরোলো একটা ভাঁজ করা ক্যাম্প খাট, একটা গার্ডেন ছাতা। অন্য আরেকটা ব্যাগ থেকে আমাদের ওয়াইফাই-এর রাউটার। 


— রাউটার নিচ্ছো কেন? এ কী! 

— (ফোঁপাতে ফোঁপাতে) যদি ওখানে নেট না পাই, তখন? কে তোদের জন্য রান্নার ভিডিও দেখে রান্না করবে, কে জোরে জোরে ভূতের গল্প লাইভ শুনে তোদের উত্ত্যক্ত করবে? (আরো জোরে ক্রন্দন)


মহা ঝামেলা তো! তারমধ্যে অন্য ব্যাগগুলো খুলতেও আর সাহস পাচ্ছি না। কে জানে, কোনো ব্যাগ খুললে হয়তো অক্সিজেন সিলিন্ডার বেরোবে - যদি আমরা সমুদ্রের তলায় গুপ্তধন খুঁজতে যাই! 


অবশেষে বেরোনোর দিন এলো। 


কোথাও বেরোনোর হলে আমাদের সবার সঙ্গে সবার চূড়ান্ত ঝামেলা বেধে যায়। মা আমাকে দোষ দেয়, আমি বাবাকে, বাবা নিজের কপালকে…. এইসব করে মোটমাট বেরোনো হল৷ 


বাবা রাস্তায় বেরিয়েই ‘ওরে বাবারে, ওলা কতো টাকা! ওরে বাবারে, উবের কতো টাকা! ওরে বাবারে, লোকাল ট্রেনের টিকিট কতো টাকা…’ মর্মে শুরু করেছে। 


প্রসঙ্গত -  বাবা একেবারেই কিপটে না - বরং বরাবরই উল্টোটা। কিন্তু, এটা বাবার স্বভাব। বাজারে আগুন, সবাই জানে - তাও বাজার এনেই রোজ ‘জানো, কী দাম সবকিছুর! কিছুই খাওয়া যাবে না আর’ মর্মে শুরু করে, অথচ আনে সব ভালো ভালো জিনিসই। 


যাইহোক। এসমস্ত সেরে, গাড়িটাড়ি ডেকে আমাদের ওলাওঠা, থুড়ি উবেরওঠা হল৷ লাগেজ তোলা নিয়ে সে আরেক ঝকমারি। শেষমেশ লাগেজগুলো সিটে বসল, আমরা কোনোমতে লাগেজের উপর গুটিসুটি মেরে। সামনে বসা ট্রলির গায়ে আদর করে সিটবেল্টও বেঁধে দিলাম। 


বাবা গাড়িতে উঠেই ড্রাইভারের সঙ্গে গল্প জুড়ে দেয়। বাবার ধারণা, বাড়ির বাইরে পা দিলেই সবাই হিন্দি আর ইংরিজিতে কথা বলে।


— রাম রাম ড্রাইভার ভৈয়া, গাড়ি তো বহুত হি আচ্ছা হ্যায় আপকা!


সম্পূর্ণ বাজে কথা। গাড়ির ভিতর থেকে ডিজেলের গন্ধ ছাড়ছে, গাড়ির কন্ডিশন অনেকটা আমার মানসিক স্থিতির মতো - ব্রেকডাউন হতে বিশেষ বাকি নেই। গাড়ি চললেই ‘ঘ্যাঁ ঘ্যাঁ ঘঁচাৎ’ করে আওয়াজ হচ্ছে। সেই গাড়ির মধ্যে বাবা যে কী ‘আচ্ছা’ দেখল, তা বুঝে ওঠা দুষ্কর। 


— হ্যাঁ, দেখতে হবে না! গাড়ি রোজ নিজের হাতে মেইনটেইন করি আমি। নিজের হাতে ধুয়ে মুছে সাফ করি রোজ! 


এদিকে পষ্ট দেখছি, উইন্ডস্ক্রিনের সামনে, বনেটের উপর ভূতুড়ে বাড়ির মতো ধুলোর পুরু আস্তরণ। যেমন ড্রাইভার, তেমন বাবা। পুরো সেয়ানে সেয়ানে কোলাকুলি হচ্ছে। 


— হাঁ ড্রাইভার ভৈয়া, হামলোগ হাওড়া স্টেশন যায়েঙ্গে। হাওড়া জানতা হায় না? উ যো ব্রিজ হ্যায় গঙ্গা মাইজী কে উপর? 


— আরে দাদা, জানব না কেন! লোকাল ছেলে, হাওড়া স্টেশন চিনব না?


— হাঁ, তো ওহিপর জায়েঙ্গে। রেলওয়ে স্টেশন সে ট্রেন পাকড়েঙ্গে।


— হ্যাঁ, আমরাও ট্রেন ধরতে হাওড়া স্টেশনেই যাই (উৎফুল্ল কণ্ঠে)।


আমি চুপ করে শুনছি শুধু। ভাষা হারিয়ে ফেলেছি। গান শুনব ভাবছিলাম একটু, সেই শক্তিও নেই আর। অত্যন্ত উচ্চস্তরের আলোচনা হচ্ছে। 


এইসব সিরিয়াস আলোচনার শেষে আমরা শেষমেশ হাওড়া পৌঁছালাম। কুলি ছাড়া কীভাবে যে ওই প্রচুর পরিমাণ লাগেজ নিয়ে ওয়েটিং রুম এবং সেখান থেকে ট্রেনে তুললাম, সে আরেক গল্প। সে থাক এখন। 


পুরী সুপারফাস্ট এক্সপ্রেসের ফার্স্ট ক্লাস কামরা। লাগেজ-টাগেজ দিয়ে ক্যুপটাকে মোটামুটি ভরিয়ে ফেলে হাঁপ ছাড়ছি যখন, তখন ক্যুপের চার নং ব্যক্তি এলেন। ভদ্রলোক সম্পর্কে একটা কিছু বলতে গেলেই মোটামুটি লোকজন বডিশেমিং-এর তকমা এঁটে দেবে আমার গায়ে। অতএব, বেশি কিছু বলা যাবে না। তবে, ভদ্রলোকের হাইট মোটামুটি ৫ ফুট, ওজন আন্দাজ ৮০ কেজি। বিধাতাপুরুষ একটি ডিভাইন কম্পাস বসিয়ে ৩৬০ ডিগ্রির মাপে ভদ্রলোককে এঁকেছেন। 


ভদ্রলোক এসে বসলেন। আমি মন দিয়ে বোধহয় কোনো সুন্দরী মেয়ের ফেসবুক প্রোফাইল দেখছি। হঠাৎই শুনি, চড়ুইয়ের ডাক। মন ভালো হয়ে গেল। চারপাশের দূষণের চক্করে চড়াইরা যে কোথায় চলে গেল.. দেখতেও পাইনা। চড়াইয়ের ডাক শুনে নস্ট্যালজিক লাগছিল খুব। চোখটোখ ভিজে এসেছিল আবেগে। 


হঠাৎ খেয়াল হল, রাত্তিরবেলা চড়ুই, তাও বন্ধ ট্রেনের ক্যুপে? অ্যাঁ? 


তাকিয়ে দেখি, চড়াই না - উৎরাই। মানে ভদ্রলোকের নিঃশ্বাস বেরোচ্ছে। কিন্তু এ জ্বালা উতরোই কীভাবে? প্রমাদ গুনতে শুরু করলাম। বাড়িতে ইতিমধ্যেই এক স্লিপ অ্যাপনিয়ার রুগি রয়েছে, মানে আমার বাবা।


 নেকের জ্ঞাতার্থে জানানো, স্লিপ অ্যাপনিয়া হল সেই রোগ, যাতে নাসাগহ্বর চর্বি দিয়ে ঠাসা থাকে। সেই চর্বিত চর্বণের ফলে নাক সারারাত ডাকাডাকি করতে থাকে। এই রোগেই বাপ্পী লাহিড়ি মরণকে জাদুর ঝাপ্পি দিয়ে আমাদের ফাঁকি দিয়ে অকালে কেটে পড়েছিলেন। 


বাবা আর এই দাদা - দুজনে মিলে কী কীর্তি যে বাধাবে রাতে, ভেবেই আতঙ্ক হচ্ছিল৷ ভয়ের চোটে দুটো ক্লোনাজেপাম(অ্যান্টি-অ্যাংজাইটি ওষুধ) মুখে দিয়ে চুষতে শুরু করলাম। 


অবশেষে সেই কালরাত এলো। 


আলোটালো নেভানো হল। লোয়ার বার্থদুটো আমি আর মা কব্জা করেছি। উপরে বাবা আর ওই অচেনা দাদা। 


দাদার আলাপ শুরু হলো প্রথমে।


ভাই রে ভাই, সে কী ভয়াবহ নাক ডাকা! নাক, মুখ, গলা দিয়ে রীতিমতো কথা বলছেন উনি! সমানে ‘ঘঁক ঘঁক ঘোঁড়ৎ’, ‘খোঁস ভোঁস ভঁচাৎ’ করে বিজাতীয় ভাষায় কথা বলেই চলেছেন। 


আমি কানে বালিশ চাপা দিয়ে পড়ে রয়েছি। ইয়ারফোন কানে গুঁজে রবীন্দ্রসঙ্গীত চালালাম - কিন্তু রবীন্দ্রসঙ্গীতের কী সাধ্য, ওই অতীন্দ্রিয়সঙ্গীতকে আটকায়! ফলে বাধ্য হয়ে আইটেম গান চালাতে হল। আইটেম গান ভেদ করেও যখন দেখছি দাদার নাসিকাধ্বনি আসছে, তখন বাধ্য হয়ে কঠিন বাস্তব - মানে দাদার বাঙ্ককে ফেস করলাম ইয়ারফোন খুলে। দেখা যাক, কে বেশি শক্তিশালী। 


দেখা গেল, দাদার নাকই বেশি শক্তিশালী। সবসময়ে তাই চ্যালেঞ্জ নিতে নেই।


অন্যদিকে বাবা তবলা সঙ্গত ধরে ফেলেছে।


সে কী অপূর্ব হারমোনি, থুড়ি ক্যাকোফনি! অনুপম থাকলে নির্ঘাত লিখতেন, ‘নাসিকের এই ক্যাকোফনি আমাদের স্বপ্ন চুষে খায়!’ 


তারপরে দুজনের নাকে নাকে সারারাত গল্প হল। 


— ঘোঁ ঘঁড়াৎ?

— ফঁড়াৎ।

— ঘঁড়াৎ ফঁড়াৎ?

— ঘুঁ ঘুঁড়ুৎ। 

— সুঁড়ুৎ!

— ভোঁ ভোঁ ভুঁড়ুৎ! (অর্থাৎ কিনা, আমাদের বাদে বাকিদের ঘুম আজকের মতো ভোঁ ভোঁ!)


এর বেশি বাকিটা কিছু বুঝলাম না। অনুলিখন দেওয়া রইলো; কোনো ভাষাবিদ এর পাঠোদ্ধার করতে পারলে জানাবেন দয়া করে। 


সারারাত এইমতো চলার পরে, নামের মর্যাদা রক্ষা করে সুপারফাস্ট এক্সপ্রেস আমাদের ভোরবেলা শিডিউল্ড টাইমের আধঘণ্টা আগে পুরী স্টেশনে নামিয়ে দিল। 


 (চলবে)

Saturday, 12 October 2024

নোবেল শান্তি পুরস্কার ২০২৪ নিয়ে দু-চার কথা


গতকাল নোবেল শান্তি পুরস্কার ঘোষণা করা হল। জাপানের পারমাণবিক অস্ত্রবিরোধী সংস্থা নিহন হিদানকিওকে এবার বেছে নেওয়া হয়েছে। নোবেল কমিটির সুপারিশ জানাচ্ছে, এই নোবেল দেওয়ার কারণ - ‘পারমাণবিক অস্ত্রবিহীন এক বিশ্ব গড়ে তোলার প্রচেষ্টা এবং সাক্ষ্যপ্রমাণের মাধ্যমে দেখিয়ে দেওয়া যে, পারমাণবিক অস্ত্র আর কখনোই যাতে ব্যবহার না করা হয়।’


নোবেল শান্তি পুরস্কার নিয়ে আমরা খুব একটা মাথা কোনোদিনই ঘামাই না। তার একটা কারণ, সাহিত্যের নোবেল, বা ভারতীয়/বাঙালিরা জিতলে অর্থনীতির নোবেল নিয়ে জ্ঞানের ব্যাপ্তি দেখাতে পারলে বুদ্ধিজীবী সমাজে কদর বাড়ে। আর সবথেকে বড়ো কারণ? নোবেল শান্তি পুরস্কার একটা অত্যন্ত রাজনৈতিক পুরস্কার। আমরা যেহেতু ‘অরাজনৈতিক’ বলে এক ‘নহি ছাতা, নহি জুতা, নহি আমি কিচ্ছু’ মার্কা ‘রাজনৈতিক’ নিহিলিস্টিক কিম্ভূতকিমাকার প্রাণী, যাদের ব্যক্তিগত আলোচনার পরিসরে বলাই থাকে ‘এই এই পলিটিকাল আলোচনার জায়গা এটা না কিন্তু’, তারা স্বভাবতই এগুলো এড়িয়ে যাবে। 


কিন্তু, কিছুক্ষেত্রে করা দরকার। এবারের পুরস্কারটা নিয়ে বিশেষ করে করা দরকার। কেন?


বিগত বেশ কিছু বছরে, বিশেষ করে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে, আন্তর্জাতিক এজেন্সিগুলো কীভাবে বৃহৎ স্কেলে পুত্তলিকাবৎ হয়ে গিয়েছে। 


JCPOA-থেকে ২০১৮তে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বেরিয়ে যাওয়া এবং ইরান ও তার অ্যালাইদের উপর স্যাংশন চাপানো, আফগানিস্তান থেকে আচমকাই সৈন্য অপসারণ কোনো ডেফিনিটিভ সলিউশনের ব্যবস্থা না করে (ফলস্বরূপ দ্বিতীয় তালিবানি রেজিম) আটকাতে রাষ্ট্রপুঞ্জের অক্ষমতা; মার্কিন-চিন 'ট্রেড ওয়ার' এবং পারস্পরিক শুল্কের হার বাড়ানো (বাইডেনের প্রেসিডেন্সিতে চিন থেকে আমদানিকৃত ইলেক্ট্রিক ভেহিকলের উপর ১০০ শতাংশ শুল্ক চাপানো হয়!) রোধ করতে ডাব্লুটিও-র দৃষ্টান্তমূলক ব্যর্থতা; ২০২০ সালে কোভিড মহামারীকে আটকানো, একটা কম্প্রিহেন্সিভ প্ল্যান অফ অ্যাকশন - এই ব্যাপারে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কী ভূমিকা ছিল, সেটাও দেখা গিয়েছে। সেই ফাঁকে আবার ট্রাম্প হু-এর সদস্যপদ ত্যাগ করেন; ২০১৫-তে ইউনএফসিসিসি-র সিওপি ২১-এ হওয়া প্যারিস চুক্তির বর্তমান অবস্থা, বা ২০২০তে ট্রাম্পের প্যারিস চুক্তি ত্যাগ করা (যদিও বাইডেন তাঁর নির্বাচনী ইস্তেহারে বলেছিলেন যে প্যারিস চুক্তিতে যোগ দেবেন, সেই কথা রাখেনও তিনি) - গ্লোবাল ওয়ার্মিং বা ক্লাইমেট চেঞ্জ আটকাতে এজেন্সির অবস্থা বিশেষভাবে চোখে পড়ে। মজার ব্যাপার, বড়ো বড়ো ‘এমিটার’ দেশগুলোর সেই আর্থিক ক্ষমতা রয়েছে, যা দিয়ে তারা বিপুল পরিমাণ কার্বন ক্রেডিট কিনে নিচ্ছে তুলনামূলকভাবে অনেক কম কার্বন ফুটপ্রিন্ট রাখা দেশের কাছ থেকে, বা তাদের দেশে নানা ‘গ্রিন’ প্রজেক্টে কোটি কোটি ডলার ঢেলে দিচ্ছে। নিজেদের এনডিসি (ন্যাশনালি ডিটারমাইন্ড কনট্রিবিউশন) নিয়ে কেউই ভাবিত নয়। 


এভাবে বলতে গেলে লিস্ট ফুরোবে না। টেরর ফাইনান্সিং আটকাতে এফএটিএফ, আর্থিক কোটার পুনর্বিন্যাস করতে আইএমএফ, তেলের কার্টেলাইজেশন নিয়ন্ত্রণ করতে ওপেক, দক্ষিণ এশিয়া ও ভারতীয় উপমহাদেশে সম্প্রীতির পরিস্থিতি তৈরি করতে সার্ক - সবাই কমবেশি ব্যর্থ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর গ্লোবাল অর্ডারে এজেন্সির যে ভূমিকা ছিল, বা যে ভূমিকা এনভিসাজ করা হয়েছিল, তা বহুক্ষেত্রেই ধূলিসাৎ হয়েছে।


সবথেকে বেশি যে দুটো ঘটনা প্রভাব ফেলেছে, তা হল পৃথক পৃথক ফ্রন্টে চলতে থাকা যুদ্ধ। ডনেতস্ক অঞ্চলে রাশিয়া-ইউক্রেনের যুদ্ধ, গাজা স্ট্রিপ বা লেবাননে চলতে থাকা ইজরায়েলি হানা - এই ন্যক্কারজনক ঘটনাগুলো সবাই মোটামুটি জানেন, তাই বলা নিষ্প্রয়োজন। এই দুটো ঘটনাতে আন্তর্জাতিক এজেন্সিগুলোর ব্যর্থতা রীতিমতো চোখে পড়ার মতো। এই যুদ্ধগুলো, নির্বিচারে চলা গণহত্যা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে, ১৯৪৫-পরবর্তী অবস্থা কিচ্ছুটি পাল্টায়নি। বরং, আগ্রাসী শক্তিগুলো নিজেদের নখদাঁতকে লুকোনোর নিতুই নব কৌশল শিখে নিয়েছে, শিখেছে মিডিয়া ম্যানিপুলেশনের নিত্যনতুন পদ্ধতি। আক্রমণের নয়া নয়া অপরিকল্পিত পদ্ধতি দেখছি আমরা। আমরা দেখছি, কীভাবে নিরীহ পেজার যন্ত্রে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে গোটা লেবানন জুড়ে(দাবি, শুধুই নাকি ‘হেজবোল্লা’-দের লক্ষ্য করা হয়েছিল) প্যানিক সৃষ্টি করা যাচ্ছে - কোল্যাটারাল হিসেবে বেশ কিছু প্রাণও যাচ্ছে যদিও বা। আন্তর্জাতিক সাপ্লাই-চেন ম্যানেজমেন্টে কী স্তরের অন্তর্ঘাত ঘটাতে পারলে এমনটা করা সম্ভব, বোঝা যাচ্ছে কী? 


যুদ্ধ-বিধ্বস্ত একটা বিশ্বের অ্যাবসার্ডিটি, যার পরতে পরতে মিশে আছে মহামারী-উত্তর কালেক্টিভ ট্রমা, আর্থিক সংকট, বেকারত্ব, অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের দৃপ্ত হুঙ্কার - সেই ঘোরতর সার্বিক অবসাদ আমাদের পাথর করে দিচ্ছে, সূক্ষ্মতর অনুভূতিগুলো বোঁদা হয়ে যাচ্ছে। বাস্তবের পাথর-ঠেলা দুনিয়াকে ছাপিয়ে আমরা খোঁজ করছি এক ডিলিউশনাল দুনিয়ার। ‘ডেলুলুতেই সলুলু’ গোছের জেন-জি ইয়ার্কির গভীরে নিহিত আছে মূলত এই এসকেপিজমই। কনফ্রন্ট করতে করতে আমরা ক্লান্ত, নিজেদের ঘাড়ে বোঝা টানতে টানতে আমরা হতাশ। তাইজন্যই আমরা ঢুকতে চাইছি মেটাভার্সের ভার্চুয়াল রিয়ালিটির জগতে। অল্টারনেটিভ রিয়ালিটি চাই আমাদের। আমাদের চাই রিল-এর ৩০ সেকেন্ডের ডোপামিন বুস্টার। 


এই ক্লান্তি, হতাশার মাঝখানে নিহন হিদানকিও-র নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়া হৃত বিশ্বাসকে অন্তত আংশিক না হোক, ভগ্নাংশটুকু হলেও ফিরিয়ে দেওয়ার জায়গায় নিয়ে যেতে পারে। সাধারণত, যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়া হয় না। প্রথম বিশ্বযুদ্ধেও দেওয়া হয়নি, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধেও না। শুধু ১৯১৭-তে রেড ক্রস পেয়েছিল, যুদ্ধে আহত বা যুদ্ধবন্দীদের সেবার জন্য। ১৯৪৪-এও ফের ওরাই পায়, যুদ্ধচলাকালীন মানবিকতা প্রদর্শনের কারণে। সেই রীতি মেনেই এবারেও অনেকেই ভেবেছিলেন, হয়তো নোবেল শান্তি পুরস্কার এবারে স্থগিত রাখা হবে। অথচ, সবাইকে অবাক করেই এই পুরস্কার দেওয়া হয় এমন এক সংস্থাকে, যারা এক কথায় বলতে গেলে ফিনিক্স পাখি।


১৯৫৬ সালে এই সংস্থা তৈরি হয়। তৈরি করেন কারা? মার্কিন পরমাণু বোমার ফলআউট থেকে যাঁরা সারভাইভ করেছেন। হিরোশিমা-নাগাসাকি তো আছেই, তার সঙ্গে রয়েছে ১৯৫৪ সালের ১লা মার্চ বিকিনি অ্যাটলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ১৫ মেগাটনের পরীক্ষামূলক হাইড্রোজেন-লিথিয়াম পারমাণবিক বিস্ফোরণ - যাকে ‘আদর’ করে নাম দেওয়া হয় ‘কাসল ব্রাভো’। এই সারভাইভরদের জাপানি ভাষায় বলা হয় ‘হিবাকুশা’। সেই ১৯৫৬ সাল থেকে শুরু করে তাঁরা পারমাণবিক অস্ত্রের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছেন। জাপান সরকার, রাষ্ট্রপুঞ্জ, অন্যান্য নানা দেশের সরকারের কাছে আবেদন চালিয়ে গিয়েছেন তাঁরা, যাতে বিশ্বের কোথাও আর ‘হিবাকুশা’ তৈরি না হয়। 


এমন এক যুদ্ধ পরিস্থিতি, যেখানে প্রতিটি বেলিগারেন্ট দেশই পারমাণবিক অস্ত্রে বলীয়ান, একটা বোতাম টিপতে যাদের মুহূর্তমাত্র দেরি হবে না - সেখানে দাঁড়িয়ে এহেন এক আন্তর্জাতিক পুরস্কার কি কিছুটা হলেও আস্থা ফিরিয়ে আনে না, যেখানে গোলার বদলে গোলাপ ফুটবে একদিন? 


আরো একটা পরোক্ষ কারণের কথা এখানে বলা যায়। 


আগেই বলা, নোবেল শান্তি পুরস্কার অত্যন্ত রাজনৈতিক একটি পুরস্কার। এমন এমন রাষ্ট্রনায়কদের এই পুরস্কার দেওয়া হয়েছে, যাঁদের পুরস্কার পাওয়া আদৌ উচিত কিনা, সেটা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। তারমধ্যে যে দুজনের নাম খুবই আসে, তাঁরা দুজনেই মার্কিন - একজন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার, অপরজন মার্কিন রাষ্ট্রপতি বারাক ওবামা। 


ব্রিটিশ-মার্কিন লেখক-সাংবাদিক ক্রিস্টোফার হিচেনস তাঁর ‘দ্য ট্রায়াল অফ হেনরি কিসিঙ্গার’ বইতে লিখছেন, কিসিঙ্গারের বিরুদ্ধে তাঁর অভিযোগ কী কী - 


“1. The deliberate mass killing of civilian populations in Indochina.

2. Deliberate collusion in mass murder, and later in assassination, in Bangladesh.

3. The personal suborning and planning of murder, of a senior constitutional officer in a democratic nation Chile - with which the United States was not at war.

4. Personal involvement in a plan to murder the head of state in the democratic nation of Cyprus.

5. The incitement and enabling of genocide in East Timor.

6. Personal involvement in a plan to kidnap and murder a journalist living in Washington, DC.

The above allegations are not exhaustive. And some of them can only be constructed prima facie, since Mr. Kissinger - in what may also amount to a deliberate and premeditated obstruction of justice - has caused large tranches of evidence to be withheld or destroyed.”


গত বছর কিসিঙ্গার মারা যাওয়ার পরে মার্কিন সাংবাদিক স্পেন্সার অ্যাকারম্যান ‘রোলিং স্টোনস’-এ একটি আর্টিকলে লেখেন, 


‘Kissinger maintained his standing in part by savaging the Eastern Establishment from which he emerged. It was not entirely cynical. Kissinger shared with Nixon a contempt for the “defeatism” and “pessimism” of those who flinched at the unsavory Vietnam War they once supported. He rationalized his purges of the National Security Council bureaucracy and his marginalization of the State Department — measures that made him indispensable to foreign policy, and to Nixon — as protecting American power from those who lacked the confidence to wield it. It is revealing that among those who make U.S. foreign policy, Kissinger’s perspective is not considered ideological.’


মন্তব্য নিষ্প্রয়োজন। 


এই কিসিঙ্গারকে ১৯৭৩ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়া হয়, যেটা নিয়ে বিস্তর জলঘোলা হয়। বিশেষ করে এমন এক সময়ে, যখন ভিয়েতনাম যুদ্ধ একেবারে ফুল সুইং-এ চলছে। এই পুরস্কারকে কি আমরা ‘রাজনৈতিক’ বলতে পারিনা?


আবার, কিসিঙ্গারের এক ‘তথাকথিত সমর্থক’, প্রথম মার্কিন কৃষ্ণাঙ্গ প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাও নোবেল পান। নিপাট ভদ্রলোক এক ইমেজ। তবে, কেন এই কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি? 


ঠাণ্ডা যুদ্ধ পরবর্তীতে তথাকথিত ‘বোমারু’ রাষ্ট্রপতি হিসেবে আমরা বুশকেই ধরে থাকি। ৯/১১ এর পরে বুশের ঘোষিত ‘গ্লোবাল ওয়ার অন টেরোরিজম’, ইরাক যুদ্ধ, সাদ্দাম হুসেনের বাথিস্ট সরকারের পতন, ‘অপারেশন রেড ডন’ চালিয়ে সাদ্দাম হুসেনকে বাঙ্কার থেকে বের করে আনা ও এক্সিকিউট করা - এসবই আমাদের জানা। কিন্তু, আমরা কিছু স্ট্যাটিসটিক্স ভুলে যাই। কীরকম?


ওবামা তাঁর দুটো প্রেসিডেন্সি মিলিয়ে মোট ৫৬৩টা ড্রোন স্ট্রাইক ঘটান মিডল-ইস্ট, পাকিস্তান মিলিয়ে। বুশ মাত্র ৫৭টা। ওবামার প্রেসিডেন্সির প্রথম বছরে তিনি শুধু পাকিস্তানেই ৫৪টি ড্রোন স্ট্রাইক করান। বহু, বহু সিভিলিয়ান হতাহত হয়। শুধু দুটো বছরে পাকিস্তানেই ১৩০-এর উপর সিভিলিয়ান মারা যায় তাঁর বোমাবাজিতে। ২০১০-১১ সালে ইয়েমেনেও যথেচ্ছ বোমাবর্ষণ করেন তিনি। আফগানিস্তানেও। ডবল-ট্যাপ ড্রোন স্ট্রাইক - যেখানে প্রথম স্ট্রাইকের বেশ কিছুক্ষণ পরে আবার দ্বিতীয় স্ট্রাইক করা হয়, যাতে সিভিলিয়ান, স্বাস্থ্যকর্মী, উদ্ধারকর্মীরাও আহত হন - তাতে ওবামা বিশেষ পারদর্শী ছিলেন। 

ওবামা ২০০৯ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার পান। কিসিঙ্গারের মতো আউটরেজ না হলেও, ওবামার ক্ষেত্রেও নোবেল শান্তি পুরস্কারের ব্যাপারটা খুবই প্রশ্নসাপেক্ষ হয়ে দাঁড়ায়। আবারও, অত্যন্ত রাজনৈতিক একটি সিদ্ধান্ত, বোঝাই যাচ্ছে। 

সমরাপরাধের রক্ত যাঁদের হাতে রয়েছে, তাঁদের নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়ার মধ্যে যে ভাগ্যের ও সমকালের পরিহাস লুকিয়ে রয়েছে, তারই বিপ্রতীপে দাঁড়িয়ে রয়েছে নিহন হিদানকিও-র নোবেল পাওয়া। একদিকে প্রথম পরমাণু বোমার আঘাত হেনে লক্ষ লক্ষ লোককে হত্যা করা একটা দেশের এমন দুই রাষ্ট্রনায়ক, যাঁদের কীর্তিকলাপ লিখতে বসলে ফুরোবে না - আরেকদিকে এমন এক দেশ, যারা সেই প্রথম পরমাণু বোমার আঘাতে জরাজীর্ণ হয়ে আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়িয়েছে। চেষ্টা করেছে, যাতে আর বিশ্বজুড়ে হিবাকুশা কোথাও না থাকে। 

এই বিপ্রতীপ সিদ্ধান্তের মধ্যে নিহিত রয়েছে যে ন্যাচারাল জাস্টিসের সম্ভাবনা, সেটা কি খুবই কষ্টকল্পিত? বিশেষ করে সবাই যখন ‘জাস্টিস’-এর দাবিতে রাস্তায় নামছি?

প্রসঙ্গত, নিহন হিদানকিও, যারা ফিনিক্স পাখির মতো পারমাণবিক ফলআউটের ছাইয়ের থেকে ফের ডানা ঝাপটে ওড়বার শক্তি সঞ্চয় করেছে, তাদের লোগো হচ্ছে একটা ওরিগামির পাখি। :)

Thursday, 10 October 2024

হান কাং, নোবেল ও বাংলা সাহিত্য নিয়ে দু-চার কথা


সাহিত্যে নোবেল পেলেন দক্ষিণ কোরিয়ার সাহিত্যিক হান কাং। আমি যেহেতু ফেসবুকের নেমড্রপিং আঁতেল বা তুলনামূলক সাহিত্যের পড়ুয়া (নিন্দুকেরা বলে দুইই সমান, কান দেবেন না ওসবে) নই, ফলে তাঁর লেখা পড়িনি। সত্যি বলতে, তাঁর নামটা পর্যন্ত এর আগে শোনা ছিল না। দুদিন আগে দ্য গার্ডিয়ানের একটা প্রেডিকশন পোল পড়ছিলাম, যেটা অনুযায়ী জেতার দৌড়ে সবথেকে এগিয়ে ছিলেন চিনের ক্যান শুয়ে, আর্জেন্তিনার সিজার আইরা, অস্ট্রেলিয়ার গেরাল্ড মার্নেন, মার্কিন টমাস পিঞ্চন, আর অতিপরিচিত দুজন - মার্গারেট অটউড এবং প্রিটেনশাসদের গডফাদার হারুকি মুরাকামি। হান কাং তালিকাতেই ছিলেন না। কিন্তু, বিগত সমস্ত প্রেডিকশনেই আমরা এক্সিট পোলকে ফেল মেরে যেতে দেখেছি, এক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। 


হানের জেতার খবর পেয়ে একটা কেজো আর্টিকল লিখতে বসে ঘাঁটাঘাঁটি ইত্যাদি করছিলাম। দুর্ভাগ্যই বলা চলে, ভদ্রমহিলা যে ২০১৫ সালে ম্যান বুকার পেয়েছিলেন, সেই খবরটাও জানা ছিলো না। তবে নির্ঘাত জানি, যে উপন্যাসের জন্য তিনি ম্যান বুকার পেয়েছিলেন, 'চেসিকজুইজা' বা 'দ্য ভেজিটেরিয়ান' - সেটা এখন ফেসবুকজুড়ে অনেকেরই প্রিয়তম উপন্যাসের তালিকায় থাকবে। ঠিক দুদিন আগেই তারা পড়ছিল উপন্যাসটা, বা কেউ কলেজে থাকতেই পড়েছিল, পড়ে মুগ্ধ হয়েছিল এবং ভেবেছিল যে এরকম লেখা কেন নোবেল পায় না - পুরস্কার নামক পুঁজিবাদী প্রতিষ্ঠানকে ধিক-ধিক-ধিক্কার ইত্যাদি।


ভদ্রমহিলা সঙ্গীত ও শিল্পের রীতিমতো কনোইজার যাকে বলে। অনুরাগিনী। তাঁর লেখাতে বিশেষভাবে প্রচুর রেফারেন্স উঠে আসে, এবং একটা অদ্ভুত শিল্পচেতনা দেখা যায়, এমনটা অনেকেরই মত। বিশেষত, তাঁর 'গেউদাইউই চাগাওন সোন' বা 'ইয়োর কোল্ড হ্যান্ডস'-এ এটা বিশেষ করে দেখা যায়। এক স্থপতির নেশা, ধ্যানজ্ঞান, মোহাবিষ্টতা - সবই হচ্ছে নারীদেহের প্লাস্টারকাস্ট বানানো। মানবদেহের অ্যানাটমি এবং আর্ট - এই দুইয়ের আলোচনাকে যে জায়গায় নিয়ে গিয়েছেন, সেটা প্রচণ্ডই রেনেসাঁ যুগের কথা মনে করিয়ে দেয় কিছুক্ষেত্রে। এক স্থপতির মনের দ্বন্দ্ব - মানবদেহের দৃশ্য ও অদৃশ্য নিয়ে - শরীর কী দেখায়, শরীর কী লুকোয় - এই নিয়ে এক অদ্ভুত আলো-আঁধারির সংঘাত। প্রসঙ্গত, রেমব্রান্টের অ্যানাটমি লেসন অফ নিকোলাস টুল্প ছবিটার কথা মনে পড়তে পারে অনেকের। যাইহোক, না পড়া উপন্যাস নিয়ে অকারণ জ্ঞান দেওয়া উচিত হবে না। তবে, রয়্যাল সুইডিশ অ্যাকাডেমি এই উপন্যাসের ইংরিজি অনুবাদের যে লাইনটা তুলে দিয়েছে তাদের বিবৃতিতে, সেটা উদ্ধৃত করার লোভ সামলাতে পারলাম না -  “Life is a sheet arching over an abyss, and we live above it like masked acrobats.”।


হানের লেখা সম্পর্কে যা পড়লাম, যেটুকু উলটেপালটে দেখার সুযোগ হল, তাতে এটাই বোঝার, যে হানের সাহিত্য মূলত অন্তর্জগতের। মনোজগতের। শরীর-মনের যে ক্লাসিক দেকার্তীয় দ্বৈততা, তা তুলে ধরা এবং তার পাশাপাশি দুয়ের মধ্যে এক অনবদ্য সাঁকো তৈরি করা, তার সঙ্গে এক অদ্ভুত কাব্যিক গদ্যশৈলী - এতে হান অদ্ভুতরকমের পারদর্শী। বিশেষত আমরা যখন মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে এতোটা সচেতনতা ছড়ানোর চেষ্টা করছি চারপাশে, সেখানে মানসিক স্বাস্থ্য সংক্রান্ত লেখার অভাব তুলনামূলকভাবে চোখে পড়ার মতো। ম্যাক্রো ঘটনার মাইক্রো প্রভাব নিয়ে অনেকেই মাথা ঘামান, লেখেন। কিন্তু তুচ্ছাতিতুচ্ছ ঘটনা কীভাবে মনোজগতের ধূসর জায়গাগুলোকে প্রভাবিত করে, সেগুলো নিয়ে আমরা লেখালিখিতে অতটা ভাবিত নই। দুঃস্বপ্ন দেখে মাংস খাওয়া বিষয়ক ট্রমা, মাংস ছেড়ে নিরামিষাশী হয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া, তার ফলে নানাবিধ কনসিকোয়েন্সেস - এই সামান্য ব্যাপার নিয়ে ভাবি আমরা কেউ? কীভাবে আপাত ছোটো ছোটো ঘটনা মানসিক বিকলন ঘটাতে পারে, পর্যুদস্ত করে দিতে পারে সবকিছু, ওলটপালট করে দিতে পারে আমাদের জীবনজগৎ সবকিছু - সাহিত্যে তার প্রতিফলন এখন কই? বিশেষ করে, বাংলা সাহিত্যে? 


এক্ষুণি হয়তো কোনো লিটল ম্যাগাজিনের সম্পাদক দাড়ি নেড়ে এবং কাফকা-কামু ঝেড়ে কিছু বাতেলা দেবে এসে, কেন নোবেল পুরস্কারের মাধ্যমেই উৎকর্ষতা হয় না, কেন তাদের ক্ষুদ্রতম, সংকীর্ণতম গণ্ডির ম্যাগাজিনেই একমাত্র বাংলা সাহিত্যের আসল অস্তিত্বসংকটের আসল ধারাটা লুকিয়ে রয়েছে, বা সমাজ পালটে দেওয়ার চাবিকাঠি। অনেকেই বলবেন, বাংলা সাহিত্য এখন কর্পোরেটাইজড। কিছু হাঙ্গররূপী বৃহদাকার প্রকাশনা সংস্থা পুরো বাজারটা চালাচ্ছে, বাকিরা পাত্তা পাচ্ছে না, আর চলছে চূড়ান্ত ফেভারিটিজম, লবির খেলা ইত্যাদি। ঠিকই, কিছু ক্ষেত্রে তা নিশ্চয়ই ঠিক। কিন্তু, তা সত্ত্বেও আমরা, বাঙালির মতো একটা চূড়ান্ত অধঃপতিত জাত, ভুলেও নিজেদের দিকে একবারও তাকাব না। ভাবব না, ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা প্রকাশনা সংস্থা এবং রক্তবীজকে কমপ্লেক্স দেওয়া নব্যলেখকগোষ্ঠী বইমেলা এলেই কিছু না কিছু ছাপতে থাকে। দুটো লাইন লিখতে পারে কি পারে না (বেশিরভাগই পারে না, সেটা আলাদা), গাঁটের কড়ি খরচা করে সেলফ-পাবলিশড বই বের করতে বেরিয়ে পড়ে সবাই। 


আর, বাংলা বাজার এখন রাজ করছে চেনা কিছু রিপিটিটিভ জনরা - হয় তন্ত্র, নয় অদ্ভুত সব প্রেমের গল্প, নয় জঘন্য কবিতা, নয় থ্রিলার, নয় ঐতিহাসিক, নয় পৌরাণিক - অথবা এদের মধ্যেকার পারমুটেশন নিয়ে লড়ে চলা। মানে, পৌরাণিক-তন্ত্র, প্রেম-ঐতিহাসিক, থ্রিলার-প্রেম, ঐতিহাসিক-তন্ত্র... আর কী লেখার ছিরি, কী তার বাহার! ঐতিহাসিক মাত্রেই তৎসম শব্দে এক অদ্ভুতুড়ে ন্যারেটিভ, সবাই সবাইকে 'আর্যে! ভদ্রে! রাজন! রাজ্ঞী' এসব বলে ডাকছে - তন্ত্রমাত্রেই একটা এমন চরিত্র থাকছে, যে হুটপাট বিভিন্ন তন্ত্রসার হ্যানত্যান বইয়ের থেকে র‍্যান্ডম পটল(অধ্যায়, তোলার বা ভাজার না) মুখস্থ বলে যাচ্ছে, এবং লাস্টে 'ভালোবাসাই তন্ত্র, বাকি সব যন্ত্র, আর পেটে থাকে অন্ত্র' মার্কা ক্যাচফ্রেজ দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে ইত্যাদি। সেখানেতে আঁভা-গার্দ ভাবব, ঠিকঠাক সাহিত্যের কথা ভাবব.. এসব কোথায়? তাও লোকে লেখার চেষ্টা করছে। দুয়েকজন এখনো ভালো লিখছেন, কিন্তু সেই লেখার সমকালীনতাকে ছাপিয়ে যাওয়ার প্রয়াস কই? সমকালীনতার বেড়াজালকে কাটাতে না পারলে কোনো শিল্পই উৎকর্ষের শিখরে পৌঁছোতে পারে না, সে নোবেল পাক আর কৎবেল।


আর, পুরস্কারের প্রতি বাঙালির চিরঘৃণা তো রয়েছেই। বাঙালি মাত্রেই এক অদ্ভুত শহিদ জাত, যাদের সবাই চেপে রেখেছে, আটকে রেখেছে, জিততে দেয়নি, ফেলে দিয়েছে, ঠেলে দিয়েছে, উঠতে দিচ্ছেনা। ক্রিকেটের ময়দান থেকে চাকরির পরীক্ষা, সবেতেই বাঙালি এগিয়ে, কিন্তু লবি বাঙালিকে উঠতে দেয়নি। বাঙালি পুরস্কারে বিশ্বাস করে না, তাকে ঘৃণাভ'রে প্রত্যাখ্যান করে। (অথচ পেলে পরে মাথায় নিয়ে পরের একশো বছরের হিসেব সেটল করে নেয়, সেটা আলাদা)।


একটাই কথা। পাশ্চাত্য একমুখীনতার যুগে বহুদিন হল প্রাচ্য মাথা উঁচু করে এগিয়ে চলেছে। সিনেমা, সাহিত্য, শিল্প, বিজ্ঞান, অর্থনীতি সবেতেই প্রাচ্যের জয়জয়কার হচ্ছে। এশীয় হিসেবে আমাদের গর্ব হওয়া উচিত, হান এক এশীয় দেশ থেকে সাহিত্যে প্রথম নোবেল জিতলেন, যেখানকার পপ গান নিয়ে বা ড্রামা নিয়ে আমরা পাগল হয়ে যাই। অথচ, আমাদের মনে হয় না, প্রচুর ভেবেচিন্তে ব্রেইনস্টর্মিং করে, অনুভব করে কিছু লেখার কথা। এমন লেখা, যা শুধু বাজারেই কাটবে না, বরং ভাবাবেও। দরকারে দুটো লোক কম পড়বে, কিন্তু যারা পড়বে, ভালোবেসে পড়বে। সাহিত্যের প্রতি, শিল্পের প্রতি একটা দায়বদ্ধতা থাকা উচিত। 'লোকে পড়বে' অজুহাতে গা ভাসিয়ে দিলেই সাহিত্যিক হওয়া যায় না। আপনারা তাই সেটা হতে পারবেনও না, সেই দূরদর্শিতাও আপনাদের নেই।


প্রসঙ্গত, এর আগে এশিয়া থেকে সাহিত্যে ৮ জন নোবেল জিতেছেন। হান ৯ নং। প্রথমজনের পরে আর কেউই বাংলা সাহিত্য নিয়ে এগোনোর প্রয়োজন বোধ করেননি। আসলে, লিটল ম্যাগাজিনেই আমাদের ভিত্তি, বইমেলাই আমাদের ভবিষ্যৎ কিনা!


Tuesday, 8 October 2024

A Raconteur's Ramblings

It’s well past the midnight. The smaller hand of the vintage grandfather clock, almost as vintage as your heart, is about to complete its 4th and a half revolution of the day. My city, sullen and in slumber, wishes not to be perturbed anymore. So does my weary mind, but it refuses to shut off. I dream while being half-asleep, and sink, sink, sink.. 

You are more vivid in my subconscious than in reality. Almost lively, as clear as a hallucination. The paintbrushes picked up by my layers are as bold as Monet's strokes, as colourful as Rothko, as pointed as Seurat, as detailed as Botticelli. You are painted, and alive. Maybe alive. Or painted. Difficult to distinguish at times. 

I touch your scars. The hidden scars, that you're afraid to showcase. You're afraid, timid as a homeless bird. You're stripped off of your garb of pretence that protects your tender, broken heart. I touch your scars, caress them. Your scars touch me too. You're not you anymore. You are a body full of scars, a mind full of trauma, a life full of pasts affecting the presence. Your cindery existence, a testament to the existence of fire, recounts the story of Icarus. Your wings have melted. You fall, and fall, and fall. You are drowning. You are looking for someone. That someone isn't me. It never was. Or maybe it was, I can't really tell. It's been epochs and eons since then. Almost an eternity. 

Your scars lighten up. My tears touch your scars. Your wounds, that are long unattended. Perhaps it never was attended in the first place. I kiss your wounds, as dearly as Adam kissed Eve when he saw her for the first time, ever. Kiss speaks of empathy, compassion. A language that binds our soul. We kiss, and kiss, and kiss - as if that's the end of the World. An apocalyptic kiss. A kiss, that Klimt painted in yellow. A kiss, that Scorsese crafted with fiery cinders. Cinders, that speak of your existence. A testament to the fire within. 

You heal. Your healing heals me. My healing heals you. Our sorrows and pains and woes touch each other. Our cosmic presence transcends into the realm of ethereal nothingness. The metamorphosis of macabre melancholia into nihilistic numbness. We are floating, and floating, and floating. You wish to stretch your hands out. My hands are closer as well, so close that you can touch mine if you want. But they never meet. We never meet. We go back to our own abysses again. Abyss, that we've turned into home. With a whimper, not with a bang - we explode. The sound of the explosion barely reaches anyone. Not even our own ears.

And our city, your city, my city, wishes not to be perturbed of its deep, dark, deadly slumber. And the vintage grandfather clock, almost as vintage as your heart, keeps ticking.

Wednesday, 2 October 2024

উৎসবে-ব্যসনে চৈব (ed.)


*উৎসবে-ব্যসনে চৈব*
আগেরদিন অনলাইনে একটা আর্টিকল পড়ছিলাম, যার মুখ্য বিষয় হলো কীভাবে উৎসবের হরষের গভীরে লুকিয়ে থাকে গোষ্ঠীক অবসাদ। অবসাদের মাত্রা যত গভীর হয়, ততই পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকে আড়ম্বর, ভিড়, ঠেলাঠেলি, ধাক্কাধাক্কি। বিশেষত, কোভিডের প্রকোপের ফলে যে প্রজন্মগত ট্রমা সামাজিকভাবে আমাদের পঙ্গু করে দিয়েছে, তারই বশে কোভিড-পরবর্তী পুজোগুলোর ধুমধাড়াক্কা আরো বেশি।
বিশ্বায়ন-পরবর্তী যুগে, মূলত এই নয়া পুঁজিবাদের যুগে মানুষ নিজের অজান্তেই হয়ে পড়েছে কেবলই একটি রাশিবিজ্ঞানের আইডেন্টিটি, একটি সংখ্যা। কেবলই একজন ভোক্তাবিশেষ - এর বাইরে তার পরিচয় নেই। সুকৌশলে সেটাকে মুখোশ পরিয়েই যে পরিচিতিটা তুলে ধরে এই নয়া-পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থা, তা হল ইন্ডিভিজুয়াল, ব্যক্তিবিশেষ হিসেবে একজনের পরিচয়। এইসবের টানাপোড়েনের ফলে আমরা ক্রমশ যে 'বিশেষ' হয়েছি, তাই শুধু নয় - আমরা হয়ে পড়েছি চূড়ান্ত, চূড়ান্তভাবে একা। বহির্বিশ্বের সঙ্গে একদিকে আমাদের সংযোগ বেড়েছে, অপরদিকে আমাদের নিজেদের মধ্যে মানসিক ব্যবধান যোজনবিস্তীর্ণ হয়ে গিয়েছে আস্তে আস্তে। আমরা এর আগে এক বদ্ধতার মধ্যে থাকলেও, বেঁধে বেঁধে থাকতাম। একটা কৌমপরিচিতি ছিল আমাদের। বিশ্বায়ন এসে সেই পরিচিতি-রাজনীতির মূলে আঘাত হেনেছে, ঘটিয়েছে এক অদ্ভুত প্যারাডাইম শিফট।
কোভিডের মতো বিশ্বব্যাপী সঙ্কট আসার ফলে আমরা বহির্বিশ্ব থেকে মুখ ফেরাতে বাধ্য হয়েছিলাম। আমাদের ফিরে আসতে হয়েছিল ঘরে, নিজের বাড়ির লোকেদের সঙ্গে চার দেয়ালের মধ্যে - যাদের মধ্যে দূরত্ব মাপতে বোধহয় হাবল স্পেস টেলিস্কোপ বা জেমস ওয়েব টেলিস্কোপও পারবে না। বাধ্য হয়েছিলাম সভ্যতার ফিরতি পথের ট্রানজিট রুট নিতে, যার অবশ্যম্ভাবী ফলস্বরূপ আমরা এক নয়া পরিচিতিসঙ্কটের শিকার হই - যাদের থেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছিলাম, তাদের সঙ্গে দিনগুজরান - ব্যক্তিক ও গোষ্ঠীক পরিচয়ের অদ্ভুত সংঘাত। ফলে, খুঁটিনাটি কারণেই ঝগড়া, বিরক্তি। বরফ গলা তো দূর, বরফ জমতে থাকে - বাড়তে থাকে একাকীত্ব। বাইরের জগতের কোভিড-সংক্রান্ত উদ্বেগ, অস্তিত্বের একরকম সঙ্কট, আর ভিতরের জগতের পরিচিতি সঙ্কট - এই দ্বিমুখী আক্রমণে টাল সামলাতে না পেরে এক অনন্ত কুয়োর মধ্যে তলিয়ে যাওয়া শুরু হয় আমাদের, আমাদের গিলে খেতে থাকে এক অদ্ভুত ট্রমা।
এই ট্রমা-পরবর্তী সময়েই আমরা দেখছি, যেকোনো উৎসবে, যেকোনো সামাজিক স্ফিয়ারে আমাদের যোগদানের উৎসাহটা তুলনামূলকভাবে বেশি - সেটা পুজোর প্যান্ডেলে হোক, ক্রিসমাসের পার্ক স্ট্রিটে হোক, বা তিলোত্তমার বিচারের দাবিতে পথে নামাতেই হোক। প্রসঙ্গত, ফেসবুকে একজন লিখেছেন, বোধন শব্দের মধ্যেই বোধ লুকিয়ে থাকে - এবং দেবীর বোধনের আগেই কলকাতায় লক্ষাধিক জনসমাগম সেই বোধের অভাবেরই পরিচায়ক। আমি নিজেও সেই মতাদর্শেই মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি, যে বাঙালি এবং ভারতীয় মাত্রেই হুজুগে বিশ্বাসী। কিন্তু, তবুও, কোথাও গিয়ে যেন একটু হলেও মনে হয় যে, এই উৎসবের হুজুগগুলো, বিশেষ করে এই পরিস্থিতিতে খুব একটা নিরর্থক নয়।
মানুষ আসলে একা থাকতে ভালোবাসে না। এই একাকিত্বটা শুধুমাত্র যে দশটা মানুষের সঙ্গে গলাজড়াজড়ি করে বসে থাকা, তা নয় - এই একাকিত্বটা belongingness-এরও। এই কারণেই দেখা যায়, কোনো পপুলার টিভি সিরিজ, কোনো সিনেমা, কোনো বই (যদিও বই নিয়ে মাতামাতিটা ডাইনোসরের সঙ্গেই উল্কার বাড়ি খেয়ে মহাশূন্যে বিলীন হয়ে গেছে) বা যেকোনো নতুন অভিজ্ঞতার একটা সামাজিক চাপ কাজ করে, যেটাকে peer pressure-ও বলা হয়। ফলে দেখা যায়, মার্ভেল দিয়ে গুলি করে না মার্ভেলাস মারামারি করে, এইটুকুও না জানা মানুষটা মার্ভেলের নতুন সিনেমা দেখতে চলে যায়, ফ্যান্টাসি বলতে পাশের বাড়ির বৌদির বেশি ভাবতে না পারা লোক গেম অফ থ্রোনস দেখে নিচ্ছে, ডিজনিল্যান্ডকে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের দেশ ভাবা লোকজন শ্রীভূমিতে ভূমিহীনের ন্যায় জড়ো হয়েছে। এমন না, যে এগুলো না দেখলে-না করলে লোকে জাতে উঠতে পারবে না। বরং, এগুলো না করলে সে বাকিদের থেকে আলাদা হয়ে পড়বে। এই আলাদা হয়ে পড়া, এই একাকিত্ব, এই একলা হয়ে যাওয়ার উদ্বেগ মানুষকে বোধশূন্য করে তোলে, তাকে হুজুগে মাতিয়ে তোলে।
অনেকেই মনে করেন, যাদের ব্যক্তিত্বের অভাব, যাদের নিজস্বতার অভাব, তারাই এই পিয়ার প্রেশারের চাপে মাথা ঝুঁকিয়ে ফেলে, হয়ে যায় ট্রেন্ডসর্বস্ব, ভেড়ার ন্যায় herd mentality-ময়। কিছুটা হয়তো তা সত্যিই। কিন্তু, 'আমি ট্রেন্ডের সামনে মাথা নিচু করবো না' এই মর্মে অনেকেই হয়ে গেছে চূড়ান্ত একা। বাকিদের থেকে আমি আলাদা, স্রোতের বিপরীতে আমাকে যেতেই হবে - এই জেদ করে স্রোত থেকেই চ্যুত হয়ে গেছে কতশত মানুষ। অথচ, একটু যদি 'আমিত্ব'কে দূরে সরিয়ে রেখে তার কালেক্টিভ সত্তাকে প্রশ্রয় দিতো, তাহলে হয়তো এতোটাও খারাপ সময় আসতো না। ক্ষুদ্র আমিগুলোকে কখনো কখনো বৃহৎ আমিগুলোর সঙ্গে, সামাজিক আমিগুলোর সঙ্গে, গোষ্ঠীক আমিগুলোর সঙ্গে মিলিয়ে দিতে হয় - নিজের স্বাতন্ত্র্যের স্বার্থেই - কেন না, মনে রাখতে হবে, মানুষ আসলে একা থাকতে পারে না, এবং চায়ও না, তা কাম্যও নয়। ব্যক্তিপরিচয়ের সঙ্গে মানুষের কৌমপরিচয়টাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এখন আবার উৎসবের মরশুম। অদ্ভুত কিছু মনখারাপ গ্রাস করে থাকে আমাদের যাপন। কেউ কেউ সেটা ভুলতে বেরিয়ে পড়ে ভিড়ের মধ্যে, যদি ধাক্কাধাক্কির চোটে সেসবকে দূর করে দেওয়া যায় - আর অল্প কিছু মানুষ থাকে, যারা নির্বান্ধব, নিঃসঙ্গ, একাকী - এই সমস্ত শহরের সবকটা ভিড় একসঙ্গে মিলেও তাদের মনখারাপের মলম হয়ে উঠতে পারে না৷ অদ্ভুত এক বোধ খেলা করে চলে তাদের মধ্যে। এই পুজো, উৎসব তাদের জন্য নয়। তারা শুধু এই আলোকোজ্জ্বল শহরের ছায়া-উপচ্ছায়ার কোণে বসে নিজেদের মনখারাপের বিনিসুতো গেঁথে চলে, আবার দিনদশেক পরের ধূসর বিষণ্ণতার শরিক হওয়ার জন্য। আসলে, উৎসব বড়ো নিষ্ঠুর। উৎসব মানুষকে যেমন কাছে আনে, তেমনই তাদের মধ্যেকার ফাঁকগুলোও বড্ড নির্মমভাবে হাইলাইট করে দেয় - বুকের মধ্যে শূন্যতা খাঁ খাঁ করে, যে অতলস্পর্শী হওয়ার মতো ডুবুরি হওয়া আর কারোর হয়ে ওঠে না।
(বছরকয়েক আগে পুজোয় লেখা। একটু এডিট করে পোস্টানো)

'ঠাকুরমার ঝুলি'

 আজকে আমার ঠাকুমার মৃত্যুবার্ষিকী। ২০২১ সালের এই দিনেই তিনি গত হয়েছিলেন। এইটুকু পড়েই অনেকে হয়তো, 'ওঁ শান্তি, আত্মার শান্তি কামনা করি, তি...