সবক্ষেত্র একবার, শ্রীক্ষেত্র বার বার - এমনটা কেউ একজন বলেছিলেন। কে বলেছিলেন ঠিক মনে নেই - শ্রীচৈতন্য বা শ্রীদেবী, কেউ একটা হবে।
সেই শ্রীবাক্য আপ্ত এবং apt-ও মেনে আমার জন্মদাতা ও জন্মদাত্রী ঠিক করলেন, এবারের পুজোর ছুটিতে পুরী যাওয়া হবে। সেই ব্যাপারে ওদের পুরোপুরি সমর্থন থাকলেও, আমার একেবারেই ছিলো না - কারণ, আমার পুরী ভাল্লাগে আহারে, আর বেড়াতে ভাল্লাগে পাহাড়ে। সমুদ্র আমার বরাবরের না-পসন্দ। সমুদ্রকে নিয়ে ভালো কথা লিখেছেই বা কজন? যেমন মেঘনাদের লেখা ‘মাইকেলবধ’ বলে উপন্যাসটায় রাবণভাই ‘কী হেব্বি চোকারমার্কা মালা পরেচিস বে পোচেতো, পুরা চলতা ফিরতা কোকেইন হ্যায়, কোকেইন’ ইত্যাদি ডায়লগ ঝেড়ে ব্যজস্তুতি-সার্কাজম ভরে ভরে দিয়েছিল; বা কোলরিজের ‘রাইম অফ দ্য এনশিয়েন্ট মেরিনার’ - এ কমরেড মাঝিভাইরা তেষ্টার চোটে সমুদ্দুরের জল খেয়ে ‘হ্যাক থুঃ, কী নুন রে ভাই ছ্যাঃ, মানুষে খায় এসব’ বলে মুখ সিঁটকে নিজেদের বিতৃষ্ণা, বি-তৃষ্ণা প্রকাশ করছিল - এইসবই মাথায় আসে শুধু। এইসব ভেবে গাঁইগুঁই করে বাড়িতে বোঝানোর চেষ্টা করছিলাম - যে সমুদ্রের কী দরকার, বাড়ির সামনেই তো পাড়ার পুকুর রয়েছে, ওখানে বসেই তো লোকজন গরম গরম কাটাপোনা ভাজা আর বাংলা খায়.. তবে শ্রেণিসংগ্রামের লড়াইতে কবেই বা আমার মতো সর্বহারারা জিততে পেরেছে। যাইহোক। ফলে টিকিট কাটা, হোটেল বুক করা - ইত্যাদি সমস্ত একে একে হয়ে গেল। আমি মুখ চুন (বা সমুদ্রে যাব বলে নুন) করে বসে রইলাম।
এরপর ব্যাগ গোছানোর পালা। ব্যাগ গোছানোর ব্যাপারে আমার মায়ের প্রবল FOMO আছে। ফলে, আমাদের বেড়াতে যাওয়ার লাগেজ আমার ইমোশনাল ব্যাগেজের থেকেও ভারি হয়। সেইসব সময়ে আমি সামনে থাকি না - আমার ভারি আতঙ্ক হয়।
প্যাকিং ইত্যাদি সারার পরে ঘরে ঢুকেই দেখি কেলেঙ্কারি! মেঝেতে পড়ে আছে ছটা ট্রলি, তিনটে সাইডব্যাগ, চারটে পিঠের ব্যাগ, খান পাঁচেক এদিকসেদিক আরো ব্যাগ.. সে এক বিরাট বাগাড়ম্বর, বা ব্যাগাড়ম্বরও বলা চলে। সমস্যা কী? সমস্যা হল, আমার উপরে ভুবনের ভার না থাকলেও, এই ব্যাগেজের ভার রয়েছে - এই ব্যাগেজ আমাকে আর বাবাকেই বইতে হয়। মা একটা স্টাইলিশ লেদারের সাইডব্যাগ আর একটা জলের বোতল নিয়ে অ্যাটলাসের পৃথিবী কাঁধে নেওয়ার মতো দাঁতমুখ খিঁচিয়ে চলতে থাকে। আর বাবাকে কুলি নিতে বললে বাবা কুলির সঙ্গে মারাত্মক দরাদরি করে, আর কুলি রেগে একেবারে হটি হয়ে যায়। স্বাভাবিক - একটা লোক ৩০০ টাকা চাইলে তাকে যদি কেউ ৩০ টাকা নেওয়ার জন্য ঝুলোঝুলি করতে থাকে, তবে তার মাথায় খুন চাপবে না?
ব্যাগ দেখে আমার মাথায় হাত। মা গর্বিতা হয়ে বসে বসে যুগপৎ নিজের সুকীর্তি (লাগেজ) এবং কুকীর্তি (আমি) দেখছে।
— এসব কী নিয়েছ মা?
— কেন, লাগেজ! ওখানে গিয়ে লাগবে না?
— হ্যাঁ, লাগে বলেই তো এদের নাম লাগেজ। কিন্তু এত কিছু কোন কাজে লাগবে? তুমি কি দেশত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নিচ্ছো নাকি?
— আহা, কী সব অলুক্ষুণে কথা! দরকারের জিনিসই নিয়েছি শুধু! এইটুকু ছাড়া যাওয়া যায়?
ততক্ষণে আমি ব্যাগ হাঁটকে একের পর এক বোমা বের করছি। শুরুতেই একটা ৫ লিটার প্রেশার কুকার বেরোলো।
— এটা কোন কাজে লাগবে?
মা গদগদ হেসে বলল,
—আহা, কোনোদিন যদি পাঁঠার মাংস খেতে ইচ্ছে হয় আমাদের?
— মা, আমরা হোটেলে উঠছি, হলিডে হোমে না! সেখানে এসব হোম-যজ্ঞ চলে, হোটেল এসবের যোগ্য না!
ব্যাগ থেকে আরো বেরোলো একটা ছোটো স্টোভ, একটা পুঁচকে গ্যাস সিলিন্ডার, একটা বড়ো কড়াই, একটা মাঝারি নন-স্টিক প্যান।
— এসব কেন? পিকনিক করবে নাকি?
— না না। ধর ওখানে গিয়ে ভালো খাবার পেলাম না। তখন তো আমাকেই ধরবি তোরা। সবার জন্য ভাবি বলেই আজ আমার এই দশা। কেন যে মরতে এই সংসারে এসে পড়েছিলাম.. (ক্রন্দন)
এইসব শুনতে শুনতে অন্যান্য ব্যাগগুলোও দেখছি। একটা ব্যাগ থেকে বেরোলো একটা ভাঁজ করা ক্যাম্প খাট, একটা গার্ডেন ছাতা। অন্য আরেকটা ব্যাগ থেকে আমাদের ওয়াইফাই-এর রাউটার।
— রাউটার নিচ্ছো কেন? এ কী!
— (ফোঁপাতে ফোঁপাতে) যদি ওখানে নেট না পাই, তখন? কে তোদের জন্য রান্নার ভিডিও দেখে রান্না করবে, কে জোরে জোরে ভূতের গল্প লাইভ শুনে তোদের উত্ত্যক্ত করবে? (আরো জোরে ক্রন্দন)
মহা ঝামেলা তো! তারমধ্যে অন্য ব্যাগগুলো খুলতেও আর সাহস পাচ্ছি না। কে জানে, কোনো ব্যাগ খুললে হয়তো অক্সিজেন সিলিন্ডার বেরোবে - যদি আমরা সমুদ্রের তলায় গুপ্তধন খুঁজতে যাই!
অবশেষে বেরোনোর দিন এলো।
কোথাও বেরোনোর হলে আমাদের সবার সঙ্গে সবার চূড়ান্ত ঝামেলা বেধে যায়। মা আমাকে দোষ দেয়, আমি বাবাকে, বাবা নিজের কপালকে…. এইসব করে মোটমাট বেরোনো হল৷
বাবা রাস্তায় বেরিয়েই ‘ওরে বাবারে, ওলা কতো টাকা! ওরে বাবারে, উবের কতো টাকা! ওরে বাবারে, লোকাল ট্রেনের টিকিট কতো টাকা…’ মর্মে শুরু করেছে।
প্রসঙ্গত - বাবা একেবারেই কিপটে না - বরং বরাবরই উল্টোটা। কিন্তু, এটা বাবার স্বভাব। বাজারে আগুন, সবাই জানে - তাও বাজার এনেই রোজ ‘জানো, কী দাম সবকিছুর! কিছুই খাওয়া যাবে না আর’ মর্মে শুরু করে, অথচ আনে সব ভালো ভালো জিনিসই।
যাইহোক। এসমস্ত সেরে, গাড়িটাড়ি ডেকে আমাদের ওলাওঠা, থুড়ি উবেরওঠা হল৷ লাগেজ তোলা নিয়ে সে আরেক ঝকমারি। শেষমেশ লাগেজগুলো সিটে বসল, আমরা কোনোমতে লাগেজের উপর গুটিসুটি মেরে। সামনে বসা ট্রলির গায়ে আদর করে সিটবেল্টও বেঁধে দিলাম।
বাবা গাড়িতে উঠেই ড্রাইভারের সঙ্গে গল্প জুড়ে দেয়। বাবার ধারণা, বাড়ির বাইরে পা দিলেই সবাই হিন্দি আর ইংরিজিতে কথা বলে।
— রাম রাম ড্রাইভার ভৈয়া, গাড়ি তো বহুত হি আচ্ছা হ্যায় আপকা!
সম্পূর্ণ বাজে কথা। গাড়ির ভিতর থেকে ডিজেলের গন্ধ ছাড়ছে, গাড়ির কন্ডিশন অনেকটা আমার মানসিক স্থিতির মতো - ব্রেকডাউন হতে বিশেষ বাকি নেই। গাড়ি চললেই ‘ঘ্যাঁ ঘ্যাঁ ঘঁচাৎ’ করে আওয়াজ হচ্ছে। সেই গাড়ির মধ্যে বাবা যে কী ‘আচ্ছা’ দেখল, তা বুঝে ওঠা দুষ্কর।
— হ্যাঁ, দেখতে হবে না! গাড়ি রোজ নিজের হাতে মেইনটেইন করি আমি। নিজের হাতে ধুয়ে মুছে সাফ করি রোজ!
এদিকে পষ্ট দেখছি, উইন্ডস্ক্রিনের সামনে, বনেটের উপর ভূতুড়ে বাড়ির মতো ধুলোর পুরু আস্তরণ। যেমন ড্রাইভার, তেমন বাবা। পুরো সেয়ানে সেয়ানে কোলাকুলি হচ্ছে।
— হাঁ ড্রাইভার ভৈয়া, হামলোগ হাওড়া স্টেশন যায়েঙ্গে। হাওড়া জানতা হায় না? উ যো ব্রিজ হ্যায় গঙ্গা মাইজী কে উপর?
— আরে দাদা, জানব না কেন! লোকাল ছেলে, হাওড়া স্টেশন চিনব না?
— হাঁ, তো ওহিপর জায়েঙ্গে। রেলওয়ে স্টেশন সে ট্রেন পাকড়েঙ্গে।
— হ্যাঁ, আমরাও ট্রেন ধরতে হাওড়া স্টেশনেই যাই (উৎফুল্ল কণ্ঠে)।
আমি চুপ করে শুনছি শুধু। ভাষা হারিয়ে ফেলেছি। গান শুনব ভাবছিলাম একটু, সেই শক্তিও নেই আর। অত্যন্ত উচ্চস্তরের আলোচনা হচ্ছে।
এইসব সিরিয়াস আলোচনার শেষে আমরা শেষমেশ হাওড়া পৌঁছালাম। কুলি ছাড়া কীভাবে যে ওই প্রচুর পরিমাণ লাগেজ নিয়ে ওয়েটিং রুম এবং সেখান থেকে ট্রেনে তুললাম, সে আরেক গল্প। সে থাক এখন।
পুরী সুপারফাস্ট এক্সপ্রেসের ফার্স্ট ক্লাস কামরা। লাগেজ-টাগেজ দিয়ে ক্যুপটাকে মোটামুটি ভরিয়ে ফেলে হাঁপ ছাড়ছি যখন, তখন ক্যুপের চার নং ব্যক্তি এলেন। ভদ্রলোক সম্পর্কে একটা কিছু বলতে গেলেই মোটামুটি লোকজন বডিশেমিং-এর তকমা এঁটে দেবে আমার গায়ে। অতএব, বেশি কিছু বলা যাবে না। তবে, ভদ্রলোকের হাইট মোটামুটি ৫ ফুট, ওজন আন্দাজ ৮০ কেজি। বিধাতাপুরুষ একটি ডিভাইন কম্পাস বসিয়ে ৩৬০ ডিগ্রির মাপে ভদ্রলোককে এঁকেছেন।
ভদ্রলোক এসে বসলেন। আমি মন দিয়ে বোধহয় কোনো সুন্দরী মেয়ের ফেসবুক প্রোফাইল দেখছি। হঠাৎই শুনি, চড়ুইয়ের ডাক। মন ভালো হয়ে গেল। চারপাশের দূষণের চক্করে চড়াইরা যে কোথায় চলে গেল.. দেখতেও পাইনা। চড়াইয়ের ডাক শুনে নস্ট্যালজিক লাগছিল খুব। চোখটোখ ভিজে এসেছিল আবেগে।
হঠাৎ খেয়াল হল, রাত্তিরবেলা চড়ুই, তাও বন্ধ ট্রেনের ক্যুপে? অ্যাঁ?
তাকিয়ে দেখি, চড়াই না - উৎরাই। মানে ভদ্রলোকের নিঃশ্বাস বেরোচ্ছে। কিন্তু এ জ্বালা উতরোই কীভাবে? প্রমাদ গুনতে শুরু করলাম। বাড়িতে ইতিমধ্যেই এক স্লিপ অ্যাপনিয়ার রুগি রয়েছে, মানে আমার বাবা।
নেকের জ্ঞাতার্থে জানানো, স্লিপ অ্যাপনিয়া হল সেই রোগ, যাতে নাসাগহ্বর চর্বি দিয়ে ঠাসা থাকে। সেই চর্বিত চর্বণের ফলে নাক সারারাত ডাকাডাকি করতে থাকে। এই রোগেই বাপ্পী লাহিড়ি মরণকে জাদুর ঝাপ্পি দিয়ে আমাদের ফাঁকি দিয়ে অকালে কেটে পড়েছিলেন।
বাবা আর এই দাদা - দুজনে মিলে কী কীর্তি যে বাধাবে রাতে, ভেবেই আতঙ্ক হচ্ছিল৷ ভয়ের চোটে দুটো ক্লোনাজেপাম(অ্যান্টি-অ্যাংজাইটি ওষুধ) মুখে দিয়ে চুষতে শুরু করলাম।
অবশেষে সেই কালরাত এলো।
আলোটালো নেভানো হল। লোয়ার বার্থদুটো আমি আর মা কব্জা করেছি। উপরে বাবা আর ওই অচেনা দাদা।
দাদার আলাপ শুরু হলো প্রথমে।
ভাই রে ভাই, সে কী ভয়াবহ নাক ডাকা! নাক, মুখ, গলা দিয়ে রীতিমতো কথা বলছেন উনি! সমানে ‘ঘঁক ঘঁক ঘোঁড়ৎ’, ‘খোঁস ভোঁস ভঁচাৎ’ করে বিজাতীয় ভাষায় কথা বলেই চলেছেন।
আমি কানে বালিশ চাপা দিয়ে পড়ে রয়েছি। ইয়ারফোন কানে গুঁজে রবীন্দ্রসঙ্গীত চালালাম - কিন্তু রবীন্দ্রসঙ্গীতের কী সাধ্য, ওই অতীন্দ্রিয়সঙ্গীতকে আটকায়! ফলে বাধ্য হয়ে আইটেম গান চালাতে হল। আইটেম গান ভেদ করেও যখন দেখছি দাদার নাসিকাধ্বনি আসছে, তখন বাধ্য হয়ে কঠিন বাস্তব - মানে দাদার বাঙ্ককে ফেস করলাম ইয়ারফোন খুলে। দেখা যাক, কে বেশি শক্তিশালী।
দেখা গেল, দাদার নাকই বেশি শক্তিশালী। সবসময়ে তাই চ্যালেঞ্জ নিতে নেই।
অন্যদিকে বাবা তবলা সঙ্গত ধরে ফেলেছে।
সে কী অপূর্ব হারমোনি, থুড়ি ক্যাকোফনি! অনুপম থাকলে নির্ঘাত লিখতেন, ‘নাসিকের এই ক্যাকোফনি আমাদের স্বপ্ন চুষে খায়!’
তারপরে দুজনের নাকে নাকে সারারাত গল্প হল।
— ঘোঁ ঘঁড়াৎ?
— ফঁড়াৎ।
— ঘঁড়াৎ ফঁড়াৎ?
— ঘুঁ ঘুঁড়ুৎ।
— সুঁড়ুৎ!
— ভোঁ ভোঁ ভুঁড়ুৎ! (অর্থাৎ কিনা, আমাদের বাদে বাকিদের ঘুম আজকের মতো ভোঁ ভোঁ!)
এর বেশি বাকিটা কিছু বুঝলাম না। অনুলিখন দেওয়া রইলো; কোনো ভাষাবিদ এর পাঠোদ্ধার করতে পারলে জানাবেন দয়া করে।
সারারাত এইমতো চলার পরে, নামের মর্যাদা রক্ষা করে সুপারফাস্ট এক্সপ্রেস আমাদের ভোরবেলা শিডিউল্ড টাইমের আধঘণ্টা আগে পুরী স্টেশনে নামিয়ে দিল।
(চলবে)



.jpg)