Monday, 19 August 2024

লিঙ্গচেতনা?

 আমার জন্ম ব্যারাকপুরে। মায়ের চাকরির কারণে অশোকনগর, মধ্যমগ্রাম ইত্যাদি জায়গায় হোঁচট খেয়ে থিতু হই খড়দহে এসে - তখন আমার বয়েস ৫-৬ মতো। লক্ষ্যণীয়, সবকটি জায়গাই একদম মফস্বল। 


নব্বইয়ের দশকের শেষ-একবিংশ শতকের শুরু। বিশ্বায়নের ঢেউ তখনো সেভাবে আছড়ে পড়েনি এই জায়গাগুলোয়। ফলে, এই জায়গাগুলোর গায়ে তখনো শহুরে গন্ধ লাগেনি। কম্পিউটার আসেনি সব বাড়িতে, ভোডাফোন তখনো কম্যান্ড - সবে হাচ হবে হবে করছে; ল্যান্ডলাইন সাধারণ জিনিস। একটাই রেস্তোরাঁ থাকতো এসব জায়গায় - মাসে একবার সেখানে গিয়ে ওই একই ফ্রায়েড রাইস-চিলি চিকেন, বা পোলাও-রোগন জোশ খাওয়া ছিলো মফস্বলি মধ্যবিত্ত জীবনের আনন্দ। 


এই সময়ে আমার বড়ো হয়ে ওঠা, বেড়ে ওঠা। আমার স্কুলও ছিলো সরকারি বাংলা৷ মাধ্যম ছেলেদের স্কুল। বছরে ১৮০ টাকা মাইনে, ফলে সমাজের সব স্তরের মানুষই আসতো। তখনো প্রকল্পের জ্বালায় শিক্ষার ঝালাপালা হয়ে যায়নি, নিয়োগও নিয়মিত হতো - ফলে, সরকারি বাংলা মাধ্যম স্কুলে মফস্বলি উচ্চবিত্ত ব্যবসায়ীপুত্র থেকে নিম্নবিত্ত দিন আনা-দিনখাওয়া মানুষের ছেলেও পড়তো। সমগ্র সমাজতন্তুর একটা দারুণ প্রতিফলন দেখা যেতো এই ধরনের স্কুলে। 


ফলতঃ, স্বভাবতই যেটা হয়, একটা সম্পূর্ণ পিতৃতান্ত্রিক নির্মাণের মধ্যে আমার বেড়ে ওঠা, বড়ো হয়ে ওঠা। আমার সমস্ত সচেতনতা, শিক্ষার মধ্যে পরতে পরতে সরীসৃপের মতো, হিলহিলে ঠাণ্ডা শরীর নিয়ে মিশে ছিলো পিতৃতন্ত্রের ঘৃণ্য, বিমূর্ত উপস্থিতি৷ নারীবাদের অ-আ-ক-খ, লিঙ্গরাজনীতির পাঠ, সমাজতাত্ত্বিক নানা ধারণা ইত্যাদি সম্বন্ধে ন্যূনতম ধারণাটুকুও ছিলো না। কীভাবে হবে? তার পরিবেশ কোথায়? 


সেইসবের বদলে যেগুলো ভ’রে ভ’রে পেয়েছিলাম, দেখেছিলাম, শিখেছিলাম, আত্তীকরণ হয়েছিলো, সেগুলো হলো পুরুষতান্ত্রিক লিঙ্গবৈষম্যের সাধারণীকরণ - যাকে Casual Sexism বলা হয় আরকী। “মেয়েরা বাজে গাড়ি চালায়”, “মেয়েদের বুদ্ধি হাঁটুতে থাকে”, “ভালো বাড়ির মেয়েরা রাতে বেরোয় না” এবং নানাবিধ। উদাহরণ দিতে গেলে একটা আলাদা গ্লসারি বানাতে হবে, তাই সেসবের দায় এড়াচ্ছি। যাঁদের বোঝার, তাঁরা অন্তত বুঝে গেছেন, কী ধরনের মন্তব্যকে টার্গেট করে এটা বলা। 


অপভাষা প্রয়োগেও সহজেই একে অন্যের মা-বোন-দিদিকে নামিয়ে আনতাম। অলঙ্কৃত ধর্ষণ (Rape rhetoric) খুবই স্বাভাবিক ছিলো। আমরা তো তাদের ‘সত্যি সত্যি’ রেপ করছি না, তাহলে সমস্যা কোথায়? বুঝিনি, ভাবিওনি। কীভাবে ভাববো? কীভাবে বুঝবো? 


মজার ব্যাপার হলো, যে মহিলা বন্ধুরা ছিলো, তারাও এই ব্যাপারগুলোতেই অভ্যস্ত ছিলো। রাস্তায় দাঁড়িয়ে তার প্রেমিক তাকে ঠাটিয়ে থাপ্পড় মারলে (কারণ - সে অন্য কোনো ছেলের মেসেজের রিপ্লাই দিয়েছিলো) সে মাথা নিচু করে চড় খেতো। তাকে বেশ্যা বলে গালাগাল করলে সে সেটাই চুপ করে সহ্য করতো, বা প্রতিবাদ করলেও ‘'আমাকে গালাগাল দেবেনা” অবধিই সীমিত থাকতো। 


মেয়েদের বস্তুবৎ বিচার করা (Objectification) রোজকার ব্যাপার। “ভাই, মালটা কী ডবকা দেখেছিস? শাঁসালো পুরো। পেলে না…” বা “কোমরটা দেখ, পুরো গিটার। দেখলেই বাজাতে ইচ্ছে করে” - এই মন্তব্যগুলো একটু কান পাতলেই শোনা যেতো। অনেকেরই আবার লক্ষ্য থাকতো, পুজোর সময়ে ভিড়ের মধ্যে কটা মেয়ের গায়ে পড়ে যেতে পারে, বা একটু গায়ে হাত দিতে পারে। 


অনেকেরই এগুলো বেশ অপরিচিত লাগছে, না? স্বাভাবিক। জ্ঞানদীপ্তির ঢেউ মফস্বলের তটে এসে লাগেনি তখনো। ওক-সমাজ নাক সিঁটকোতেই পারেন, কিন্তু এটাই রূঢ় বাস্তব। আপনাদের নিজেদের তৈরি করা কুয়োর বাইরেও একটা সমাজ আছে, যেখানে আপনাদের ডিনায়ালের পেরিস্কোপ পৌঁছোয় না হয়তো। 


যাইহোক। সেসব খোঁচা মারা আমার উদ্দেশ্য না।


এসবের ফলে আমার পুরো আপব্রিঙ্গিংটাই একটা অত্যন্ত পিতৃতান্ত্রিক স্ফিয়ারে হয়েছিলো। আমি সমাজবিচ্যুত নই, সমাজ নিয়ে ডিনায়ালেও থাকি না - কিন্তু, ভালো-মন্দ, ঠিক-ভুলের মধ্যেকার ফারাকটা তখনই করা যায়, যখন কারোর সামনে দুটোরই অভিজ্ঞতা করবার সুযোগ থাকে। আমি একটা দিক সম্বন্ধেই অবগত ছিলাম কেবল, ফলতঃ এই পিতৃতন্ত্রই স্বাভাবিক ছিলো আমার কাছে। সোশ্যাল মিডিয়া নামক জিনিসের সমুদ্রে পা ডোবালেও, আমার চেনাপরিচিতির বৃত্তটা হরেদরে একই ধাঁচের ছিলো। তাই, আমার দ্বাদশ শ্রেণিতে পড়াকালীন তৎকালীন প্রেমিকা যখন আমাকে জানায়, যে সে বিয়ের পর সিঁদুর পরবে না, শাঁখাপলা পরবে না, আমার পদবী নেবে না, এবং আমাদের সন্তানাদি আমাদের দুজনের পদবীই নেবে - আমার কাছে সেটা হাস্যকর, বোকা বোকা, অতিবিপ্লবী এবং বেঁড়েপাকামো লেগেছিলো। যা হয় - তাকে ‘নারীবাদী’ বলে দাগাতে আমার একমুহূর্ত দেরি হয়নি আমার, যেটা তখন আমাদের মধ্যে একটা বিচ্ছিরি গালাগালের সমান ছিলো। সম্পর্কটা, বলাই বাহুল্য, টেকেনি (সম্পর্কের দুদিনের মাথায় কেন বিয়ে-বাচ্চা নিয়ে আলোচনা করছিলাম, সেটাও একটা প্রশ্ন যদিও বা)।


এই মানসিকতায় বেড়ে ওঠা আমি গিয়ে গুটিগুটি পায়ে স্কুলশেষে গিয়ে ঢুকলাম প্রেসিডেন্সিতে (মাঝে মাস দেড়েক সেন্ট জেভিয়ার্সে ছিলাম, কিন্তু সেখানে মাত্রাতিরিক্ত ডিসিপ্লিন ইত্যাদির চক্করে শ্বাসটাস নেওয়ার স্পেস ছিলো না - তাই তার কোনো প্রভাবই আমার উপর পড়েনি)। প্রেসিডেন্সিতে ঢোকার পরে আমার সঙ্গে পরিচিতি হয় কলকাতার বিভিন্ন woke মানুষজনের সঙ্গে - যাদের কথাবার্তার ধরন, ভাব, বিষয় আমার সঙ্গে বহুক্ষেত্রেই মিলতো না - বিশেষত লিঙ্গরাজনৈতিক দিক থেকে। আমি বুঝতাম না, কেন একজন মহিলার সম্পর্কে বাজে মন্তব্য করা অনুচিত, কেন ট্রান্স-কুইয়ার-সমকামী ইত্যাদিদের নিয়ে মাতামাতি করা হয়, কেন কোনো মহিলা প্রবল খোলামেলা পোশাক পরলেও সেটা নিয়ে বিরূপ মন্তব্য করা যাবে না ইত্যাদি ইত্যাদি৷ সামনাসামনি সেভাবে বলতে পারিনি কোনোদিন - স্বভাবলাজুক বলেই। কিন্তু, আমার মধ্যে এই woke সমাজ নিয়ে একটা বিচ্ছিরি বিরূপতার সৃষ্টি হয় - যদিও, আমার বহুদিনের পুরোনো পিতৃতান্ত্রিক ধ্যানধারণায় আস্তে আস্তে নাড়া পড়তে থাকে, আমার অচেতনেই অবশ্য। 


যদিও, প্রেসিডেন্সির তথাকথিত ‘woke’ বৃত্তটা আমাদের সময়ে অন্তত ভয়ানক ছিলো। যারা সত্যিকারের woke, সেন্সিটাইজড, তারা এইসবে থাকতো না - আর, যারা রাজনৈতিক সংগঠন-মঞ্চ করতো, তাদের মতো ভণ্ড কোটিকে গুটিক মেলে। সামনে খুবই সচেতন, আর পিছনে গেলেই বিভিন্ন মেয়েদের অবজেক্টিফিকেশন, কার কীরকম ‘সাইজ’ নিয়ে আলোচনা, কে কাকে ‘তুলে’ এনে রাজনীতিতে ঢুকিয়েছে, কার বিছানা কতো গরম ইত্যাদি সুচিন্তিত আলোচনা হতো। পরে যখন সব বড়ো মাথাগুলো কলআউট খায়, তখন দেখা যায় বিজবিজ করে সব অ্যাবিউজার-মলেস্টার-এনাবলার বেরোচ্ছে। এইসব রথী-মহারথীরা নেশাভাঙ করে যা যা বলতো, শুনলে সুস্থ মাথা ব্যোমকে যাবে, এমনই এঁদের সেন্সিটাইজেশন। ফলে, আমি আরো ভাবি, যে এগুলোই আসলে নরমাল। এখানে নরমাল, আমার লোকালিটিতে নরমাল - শুধু কিছু আজব লোকজন বাড়াবাড়ি করে। ওরকম মৌলবাদী থাকবেই, ইগনোর করতে হয়।


কলেজে পড়াকালীনই ফেসবুকে একটি বিতর্কিত, বেফাঁস মন্তব্য আমি করে বসি এই সংক্রান্ত। ফলত, উড়িয়ে কলআউট। কলআউট কালচারের ইতিহাসে আমার নাম বোধহয় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। মুশকিল একটাই - কেন কলআউট, সেই ব্যাপারটা আমার বুঝতে লেগেছিলো বহু বহু দিন। তখন আমার তিক্ততা আরো বেড়ে গেছিলো, যা হয়। আর সেই সুযোগে সবাই সবার ব্যক্তিগত এজেন্ডা নিয়ে রাজনীতি করে গিয়েছিলো। যাইহোক, সেসব পুরোনো কাসুন্দি ঘেঁটে লাভ নেই। 


অনেক, অনেক জলকাদা ঘেঁটে অবশেষে বুঝতে শুরু করি, সমস্যাটা ঠিক কোথায়। আমার প্রাক্তন প্রেমিকার সঙ্গে কথা বলে, নানা মেয়ে বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলে, বিভিন্ন ব্যাপারে আমার মা-র সঙ্গে কথা বলে (যা আগে সেভাবে হয়নি, অদ্ভুতভাবেই) ব্যাপারগুলো খানিক বুঝতে পারি৷ পেট্রিয়ার্কি যেসব মহিলার ভিতরে ঘাঁটি গাড়তে পারেনি, তাদের সঙ্গে আলোচনা হয়৷ শিখি। শেখা শুরু করি। বোঝা শুরু করি, নিজেকে প্রশ্ন করা শুরু করি। সমস্ত হেজিমনির বিরুদ্ধে গিয়ে যখন আওয়াজ তুলছি, তখন লিঙ্গরাজনীতিতেই বা তার ব্যতিক্রম হবে কেন? এই যে হাজার-হাজার বছর ধরে গড়ে ওঠা পিতৃতন্ত্র, তন্ত্র, সিস্টেম একটা - সেটা তার বহুধাবিস্তৃত বটশিকড় ছড়িয়ে যে রয়েছে, সেটার বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলা প্রয়োজন, এটা না বুঝলে আমার সচেতনতা কোথায়? কীসের শিক্ষা?


অনেকেই দেখি, ‘নট অল মেন’ বলে দাবি দেন। ঠিকই, ঘরে ঘরে পুরুষরা রেপ করেন না। কিন্তু, তাঁরা কেউ না কেউ অন্যান্য ভাবে পিতৃতন্ত্রকে এগিয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করেন। কেউ বৌ পেটান, বা নিদেনপক্ষে কথা বলতে দেন না, অসম্মান করেন; কেউ এনাবলারের ভূমিকা পালন করেন ‘যাগ্গে বাবা, আমার কী! মেয়েমানুষ যখন, এসব করার কী দরকার’ ইত্যাদি লাইনে বলে; কেউ কনুই মেরে, বা কেউ স্রেফ বিদ্ধকারী পুরুষ দৃষ্টি (male gaze) দিয়ে অস্বস্তিতে ফেলে, কেউ বন্ধুবান্ধবের সামনে বাজে আলোচনা করে, কেউ গ্রুপচ্যাটে বিকৃত মানসিকতা নিয়ে মহিলাশরীর নিয়ে আলোচনা করে। এখানে আমি ট্রান্সফোবিয়া-হোমোফোবিয়া ইত্যাদি বিষয়কে আনবোই না - যেখানে মেয়েদেরকে আমরা এখনো ‘দ্বিতীয় লিঙ্গ’ বলেই ধরি, যেখানে এখনো ক্যাজুয়াল সেক্সিজম সাধারণ ঘটনা, রেপ তখনই শিরোনামে আসে যখন তা ভয়ঙ্কর মৃত্যুর সঙ্গে জুড়ে যায় - সেখানে আমাদের সমাজ হেটেরোনর্মেটিভ চশমা খুলে কোনোকিছু দেখবে, এমনটা ভাবা বাতুলতা। যাইহোক, ব্যাপারটা অবশ্যই সমস্ত পুরুষেরই। ‘পুরুষ’ ব্যাপারটাই একটা লিঙ্গরাজনৈতিক, পরিচিতি রাজনীতির একটা অংশ - পুরুষ পরিচিতিকে যাঁরাই স্বীকার করে নেন, তাঁরা ঐতিহাসিকভাবে চলে আসা একটা সংঘাতের শাসক শ্রেণির পক্ষে দাঁড়িয়ে পড়েন। এখানে ব্যাপারটা ব্যক্তি বা ইন্ডিভিজুয়ালের নয় - একটা কালেক্টিভ ধারণা মিশে থাকে। যেমন, আমরা যখন বলি, যে ‘সাপ ছোবল মারে’, তার মানে কি এই, যে প্রত্যেকটা সাপ ছোবল মারে? বা, রাষ্ট্র মাত্রেই শাসনযন্ত্র - এখানে রাষ্ট্র মাত্রেই সব সমানভাবে নিপীড়ন করবে, বা করবেই? সব বাঘই মানুষ খায়? আশা করি, বোঝা যাচ্ছে ব্যাপার‍টা। যতদিন না আমরা ‘পুরুষ’ আর ‘মানুষ'-এর পার্থক্যটা বুঝবো, ততদিন পর্যন্ত খুব একটা আশা আছে বলে তো মনে হয় না! যতদিন পর্যন্ত না আমাদের, লিঙ্গগতভাবে পুরুষদের নিপীড়কের অপরাধবোধ (Opressors’ guilt) গিলে না খায়, পুড়িয়ে না দেয়, ততদিন পর্যন্ত শিক্ষার আগুন ভিতরে জ্বলবে না। সমাজের পরিবর্তন, সিস্টেম পালটে ফেলা একদিনে যায় না, কিন্তু একদিন ঠিকই যায়। যে দীর্ঘ দীর্ঘ সময় ধরে সিস্টেমটা গড়ে উঠেছে, সেটা একলহমায় যাবে না।


আমি কি পুরো পালটে গেছি? সচেতনতার ধ্বজাধারী? না। সম্ভব নয়। আমি এই সমাজের জীব, এই সমাজেরই উপাদান। সমাজবিচ্যুত অ্যাপোস্টেট নই। বহু বছর ধরে আমার ভিতরেও সযত্নে বয়ে নিয়ে চলেছি পিতৃতন্ত্রকে। কিন্তু, যেটা শিখেছি, সেটা হলো চুপ করতে। শুনতে। বলতে দিতে। নিজেকে প্রশ্ন করতে, সমানে প্রশ্নে প্রশ্নে জর্জরিত করে দিতে। নিজের ভিতরে ক্রমাগত, ক্রমাগত দ্বন্দ্ব তৈরি করতে শিখেছি, যার থিসিস-অ্যান্টিথিসিসের সংঘাত আমার চালিকাশক্তি। পাল্টাইনি আমি পুরো, জানিনা পাল্টাবো কিনা। কিন্তু, নিজের ভিতরে একটা দ্বন্দ্ব আনতে পেরেছি। এর একটা বিরাট কৃতিত্ব প্রেসিডেন্সির। প্রেসিডেন্সি আমাকে শিখিয়েছে, প্রশ্ন করতে। আমাকে একটা সচেতন স্পেস দিয়েছে, আমাকে ভাবতে শিখিয়েছে, আবার পরমুহূর্তেই নিজের ভাবনাকে ফের প্রশ্ন করতে শিখিয়েছে। নিজেকে সমানে ভাঙা-গড়ার মধ্যে রাখতে শিখিয়েছে, বদ্ধ হতে দেয়নি। একটা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যদি এই সামান্য শিক্ষাটুকু দিতে না পারে, তবে তা কীসের শিক্ষা? কী সার্থকতা সেই প্রতিষ্ঠানের নিগড়ের?


সমাজ পাল্টাতে গেলে তাই প্রশ্ন করতে হয়, ভিতরে দ্বন্দ্ব আনতে হয়। বয়ে চলা নদীতে পাথরও আটকায় না। নিজেকে ভাঙতে হয়, গড়তে হয়, দিয়ে আবার ভাঙতে হয়। শুরু করতে হয়, মাথা নত করতে হয়। গভীর, গভীরে যেতে হয়। 


ভাবুন, ভাবুন। প্র‍্যাক্টিস না হোক, ভাবাটা শুরু অন্তত করুন। আমার মতো মানুষ, আমার মতো ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে এসে যদি নিজেকে সমানে পাল্টানোর লড়াইতে শামিল হতে পারে, নিজের প্রচলিত ধ্যানধারণার মূলে কুঠারাঘাত করতে পারে, তাহলে আপনারাও পারবেন। পারবেনই, আমার দৃঢ় বিশ্বাস।


পুরুষতন্ত্র নিপাত যাক। মানবতা জিতুক, হেরে যাক নিপীড়ক-নিপীড়িতদের বাইনারি। হাতে হাত ধরা থাক, মিলুক কাঁধে কাঁধ।


পুনশ্চ - প্রতিবাদ-প্রতিরোধে নামাটাই একমাত্র সেন্সিটাইজেশন নয়, সেটা যেন আমরা ভুলে না যাই। প্রতিবাদ করতে হবে তো বটেই। কিন্তু প্রতিবাদ যখন আসবে সামান্য ক্যাজুয়াল সেক্সিজমের বিরুদ্ধেও, অবজেক্টিফিকেশনের বিরুদ্ধে, নারীদেহকে কমোডিটি ভাবার বিরুদ্ধে - তখনই সেন্সিটাইজেশন শুরু হয়েছে বলে ধরতে হবে। যখন সমাজের প্রতিটা স্তরের নারী, বা প্রান্তিক লিঙ্গের মানুষের অবমাননাকে সমান গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে পারবো আমরা, তখনই হবে। তবে, তার জন্য, শুরু করতে হবে। হাল্কা নাড়া না দিলে কোনোদিনই সেটা jolt হয়ে দেখা দেবে না।

Monday, 5 August 2024

স্বপ্নাদ্য...

পৃথিবীর সকল আঁতেল কমরেড-বেশিলালরা জীবনের কোনো না কোনো এক সময়ে যে ব্যক্তিবিশেষকে পুজো (এথেইস্ট হলে অস্বীকার, অ্যাগনস্টিক হলে সন্দেহ) করে এসেছেন, তিনি হচ্ছে আমাদের সবার প্রিয়, ইডিপাস যাপন ও ইলেক্ট্রা-বাপনের প্রবক্তা, ট্যাবু-টোটেম ও লিবিডো-গেমের ফেমওয়ালা ফ্রয়েডকাকু। স্বপ্নের ব্যাখ্যা নিয়ে কাকুর একটা ঝকাস্টিক বই আছে, যেটার শুরু থেকে শেষ প্রায় একই রকমের দুর্বোধ্য, অক্সফোর্ড ইংলিশ ডিকশনারির থারুরোচিত মিক্সটেপ গোছের - সেখানে কাকু অসম্ভব ঝিঙ্কুঝিঙ্কু স্বপ্নব্যাখ্যা, স্বপ্নথিওরি ইত্যাদি দিয়ে গেছেন। সেসব বই পড়তে গেলে দাঁত ভেঙে যায়, আর মাংসের হাড় চিবোনো যায় না - ফলে, পড়িনি। কিন্তু, আমার এক অদ্ভুত স্বপ্নদর্শনের কোনো ব্যাখ্যা তাতে আছে কি? বিদ্বজনে সাহায্য করলে সুবিধে হয়। 


নিচে সেই স্বপ্নটা সিন বাই সিন লিখলাম। 


দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়। আমি নিখিলেশ বা সন্দীপ না হলেও প্যারিসে। ট্রিপল এজেন্টের কাজ করছি। আমার কাছে তখন জার্মানদের তথ্যও আছে। প্যারিসে কোথায় কোথায় বোম্পুঁতবে। ব্রিটিশদেরও। ফরাসিদেরও। সবার তথ্য নিয়ে আমি বসে বসে একদিন পারির বিখ্যাত কাফে দে জেনিতে চা আর নারকেল কোরা দিয়ে মশলা মুড়ি খাচ্ছি। 


হঠাৎই একটা লোক ঢুকলো ক্যাফেতে। শ্বেতাঙ্গ, দীর্ঘদেহী; প্রায় সাড়ে ছ'ফুট হাইট; স্যুটেডবুটেড। মাথায় সোনালি চুল। ঢুকেই আমার দিকে তাকিয়ে একটা ভাও দেওয়া বাও করলো, দিয়ে সজোরে হাঁচলো। টিসু দেবো না ব্লেসিং, বুঝতে পারলাম না - যদিও, অনতিবিলম্বেই বুঝলাম, সে আসলে হাঁচেনি - বললো

-- বঁজু মঁসিয়!

 আসলে ফরাসি ভাষা কিঞ্চিৎ সানুনাসিক কিনা, কথা বললেই মনে হয় সর্দি লেগেছে।


ভাঙা ভাঙা ফরাসিতে তাকে জিজ্ঞেস করলাম, 

-- মঁসিয়, কী হয়সিঁও?


মঁসিয় হাঁচিভাই আমাকে হেঁচেকেশেগলাখাঁকারি দিয়ে ফরাসিতে যা বললো, তার মোটামুটি দাবি হচ্ছে এই, যে মাও জে দং লং মার্চ করে হাতে জিনহাওয়ের চিনে কলম আর মেড ইন চায়না ছাপ মারা প্লাস্টিকের খেলনা বন্দুক উঁচিয়ে প্যারিসে আসছে জার্মানদের মারবে। তার সানাইবাদনের গৎ বোঝার চেষ্টা করছি, আর বুকপকেটে রাখা চ্যাপ্টা সিগারেট কেসের পিছনের টেপরেকর্ডারে সব রেকর্ড করছি। 


এমন সময়ে হঠাৎই এক ভারতীয়, গায়ে গেরুয়া ব্লেজার এবং মুখে একটা গোল ফ্রেমের চশমা পরা, গম্ভীর মুখের লোক দরজা ঠেলে ঢুকলেন। তাঁকে দেখে হাঁচিভাই ঝুঁকে পড়ে 'মঁসিয় ঁতাজি (ন সাইলেন্ট)' বলে প্রণাম করতে যেতেই তাঁর এক থাপ্পড়। 


-- চোপ শালা ইনফ্লুয়েঞ্জার পেশেন্ট, আমি গুমনামী বাবা জানিস না? 


সেই শুনে ক্যাফের কাউন্টার থেকে বাংলা সিনেমার ফার্স্টবয় আর কনস্পিরেসি তত্ত্ববিদের কী হুল্লাট সিটি!


তারপর সে এক হুল্লাট ক্যালাকেলি হাঁচিভাই আর গেরুয়া ব্লেজারের মধ্যে। এসবের মধ্যে হাঁচিভাই ফরাসিতে ‘কুকুর’ বলে গালাগাল দিলো গু৷ সঙ্গে সঙ্গে দরজা খুলে সন্তুর প্রবেশ।


— কী, কে ডাকলো আমাকে? কাকাবাবু


— আরে ভাই না, জোজোর কুকুর বলিনি। তোজোর কুকুর। 


এইসব ক্যালাকেলিতে বিরক্ত হয়ে বেরিয়ে এলাম

বেরিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ইংলিশ চ্যানেল পেরিয়ে এলাম। পেরোতেই দেখি জাঙিয়া পরে মিহির দাঁড়িয়ে। আমাকে দেখতেই সাষ্টাঙ্গে প্রণাম।


— আরে মিহির যে! থাক থাক। কী খবর?


মিহির হাতজোড় করে বললো,


— খবর ভালো না বদ্দা। এভাবে পায়ে হেঁটে ইংলিশ চ্যানেল পার? বদ্দা, প্লিজ, এইটা কেউ যেন না জানে, আমার ভাতকাপড় মার যাবে!


খানিকটা অপ্রস্তুতই হলাম। শর্টকাট নেওয়ার জন্য এতোটা না করলেই হতো। ইংল্যান্ড তো গাড়ি ধরলেই যাওয়া যায়। আমতা আমতা করে বললাম,


— ইয়ে, না না৷ আসলে বুঝিনি তুমিও যে আছো এখানে। ভুল হয়েছে ভাই। 


— সে ঠিক আছে, কিন্তু স্রেফ হেঁটে কীভাবে পার হলে বদ্দা? একটু শেখাবে? আসলে পরের বার কাস্পিয়ানটা টার্গেট করছি…

— এটা তো সিক্রেট মিহির। 


মিহির কাঁচুমাচু করে বললো, 

— শেখাবে না দাদা?


খারাপ লাগলো। যতই হোক, ছোটোবেলায় পিঠে জেরিক্যান(লোকে যাকে জারিকেন বলে) বেঁধে সাঁতার কাটা আমিই শিখিয়েছিলাম৷ 


— ঠিক আছে, বলছি। তবে এসব গুহ্য কথা, বাইরে বেশি বলো না। জলে নামার আগে পায়ের পাতায় ভালো করে সর্ষের তেল আর কেও কার্পিন ফ্রেঞ্চ অলিভ অয়েল মিশিয়ে মেখে নিলেই জলে হাঁটা যায়।


মিহির জাঙিয়ার পকেট থেকে একটা নোটবই বের করে টুকে নিলো। 


— ধন্যবাদ, বদ্দা। দেখা হবে!


মিহিরকে টাটা করে হাঁটতে হাঁটতে উঠলাম গিয়ে ডাউনিং স্ট্রিটের সামনে। ১০ ডাউনিং স্ট্রিট। বেল বাজাতেই উপর থেকে ভারি গলা, 


— অর্চিদা, দরজা খোলা আছে, উপরে চলে আসো।


তিনতলা খাড়া সিঁড়ি ভেঙে উঠলাম উপরে। একনম্বরের হাড়চিপ্পুস মালটা৷ একটা লিফটও বসায়নি।


তিনতলায় উঠে বাঁদিকের মেহগনি কাঠের দরজা ঠেলে দেখি, চার্চু প্রায় নগ্নাবস্থায় বসে এক ধামা চালভাজা চিবোচ্ছে। আমাকে দেখে ধামা বাড়িয়ে দিলো।


— নাও, খাবে? ফার্স্টক্লাস চালভাজা, শুকনো খোলায় ভাজা। 


ঘৃণাভ'রে প্রত্যাখ্যান করলাম। 


— না হে চার্চু। এ তো আমাদের দেশ থেকেই ঝাড়া চাল খাচ্ছো। এ খাই কী করে বলো? দেশে, মানে আমার প্রভিন্সে লোক মরছে, সিপিআই ফুটেজ কুড়োচ্ছে, কংগ্রেস বিশ্বযুদ্ধে যাবে না স্বাধীনতা ভিক্ষা করবে বুঝতে পারছে না, আমি এই চালভাজা কেমন করে খাই? লোকে মরছে চার্চু!


চার্চু হাতের গালটা শেষ করে বললো, 


— আরে তুমিও যেমন! ওই তোমাদের নেকেড ফকিরও তোমাদের বোঝায়, তোমরাও নাচো। আর কমিউনিস্টদের কথা তো ছেড়েই দিলাম। ভেবেছিলাম মীরাটে সাল্টে দিয়েছি, শালারা যে কুকুরের ল্যাজ, কেমন করে বুঝবো? এই যে জিওটি…


— জর্জ আর আর মার্টিনের, না এইচবিও?


— আরে ধুত, সে জিওটি, মানে গেম অফ থ্রোন্স না। জিওটি বাসু। তবে ফ্যান্টাসিই, কিন্তু উচ্চগ্রামের। 


— অ। তা সে কী করলে?


চার্চিল আরেক গাল চালভাজা মুখে পুরে তারিয়ে তারিয়ে চিবোতে লাগলো। ভরা মুখেই বললো,


— আরে, এখানে আমাকে দেখলেই একদল ডার্টি নিগার এসে 'চালচোর চালচোর' বলে ডাকে। সব শালা জিওটির চক্রান্ত। দেখবে, একদিন ও কালেদিনে তোমাদের দেশের কড়িবরগা কাঁপিয়ে দেবে।


ধামাটা নিচে নামিয়ে রাখলো চার্চিল। একটা চুরোট ধরালো, আমার দিকে একটা বাড়িয়ে দিলো। নিলাম। উৎকৃষ্ট হাভানা সিগার৷ আমার চুরোটে আগুন ধরিয়ে দিতে দিতে বললো, 


— আর শোনো হে, তোমরা যে বলছো লোকে মরছে, কেন মরছে সেই খবর রাখো? চাল আমি নিয়েছি শুধু? ওই শালা বেঁড়ে blurred জাপানির জাত, বর্মাতে এসে করিতকর্মা হয়ে গেলো। ওখান থেকে চাল আর আসছে না। আমরা কী খাবো, ঘেঁচু? আর আমরা না বাঁচলে, তোমরা বাঁচবে? এই যে তোমরা অ্যাসেম্বলি অ্যাসেম্বলি করে ক্ষেপে উঠেছো, এখন যদি ওই পেরজাপতি গোঁফের আর্টস্কুল ড্রপাউটের বাচ্চা হাল্কাকরে একটা হাইড্রোজেন নামায়, কে বাঁচাবে? আমরাই তো? কিপলিং পড়োনি?


—হ্যাঁ, জাঙ্গল বুক, মোগলি..


— ধুর, ও শালা আগলি। চিতাবাঘের ছাল দিয়ে জাঙিয়া পরে নিজেকে টারজান ভাবে। ওসব ফালতু লেখা নয়। হোয়াইট ম্যান'স বার্ডেন পড়োনি? ওই যে, আমরা তোমাদের নিগারদের ফিগারবোঝা মাথায় নিয়ে বৈতরণি পার করছি৷ তোমরা চাল বা চুলো, নিয়ে করবেই বা কী? তারমধ্যে আদ্ধেক চাল তো নানা রোগেই শেষ হয়ে গেছে। ইফ দ্য নিগার্স কান্ট হ্যাভ ডালভাত, লেট দেম হ্যাভ বিরিয়ানি।


আমি ব্যোমকে গেলাম। চুরোটের ধোঁয়া ছেড়ে বললাম, 


— যাহ শালা, এতো মারি আঁতোয়েত আর বুম্বাদার ককটেল। বাবা চার্চু, সানডাউনের আগেই আবার স্কচ মেরেছো? এসব পেঁয়াজি মারো তুমি, দেখবে এটলি তোমার কেটলি তুলে বাইরে ফেলে দিয়েছে একদিন। 


চার্চু চুপ করে গেলো। গম্ভীর হয়ে চুরোট টানতে লাগলো। বেশিই আঘাত দিয়েছি হয়তো। খানিকক্ষণ গম্ভীর থেকে জিজ্ঞেস করলো,


— বলো, কী দরকার। 


— দরকার কিছুই না। ফ্র‍্যাঙ্কির সঙ্গে কথাবার্তা চলছে? 


— তা চলছে। কিন্তু কিছুই বুঝছি না। তোমার কাছে লেটেস্ট খবর আছে কিছু?


— খবর তো আছেই। জার্মান নাৎসিদের গাইগার কাউন্টার নিয়ে অ্যাঙ্গোলার ওদিকে ঘুরতে দেখা গেছে, জানো? 


— তো? 


— তুমি একটা গবেট৷ তোমার থেকে বার্কেনহেডের মাথায় বেশি বুদ্ধি ছিলো। 


— আরে ধ্যাত, গালাগাল না করে বলো তো৷ নাৎসিরা অ্যাঙ্গোলা কলোনাইজ করছে নাকি? ওখানে তো পোর্তুগিজরা গিজগিজ করছে। আমরা কী করবো?


— ওহে ইডিয়ট, ওদিকটায় কী লেভেলের পিচব্লেন্ড ডিপোজিট রয়েছে, সেই আইডিয়া পেলে হয়েই যেতো। পিচব্লেন্ড থেকে কী পাওয়া যায়, আর তা যে কী কাজে লাগে, সেটাও কি জানো না মূর্খ? 


চার্চিলের মুখ শুকিয়ে গেলো। একরাশ ধোঁয়া গিলে বিষম খেতে লাগলো। মুখেচোখে জল দিয়ে ধাতস্থ করলাম ওকে। হাঁপ টানতে টানতে বললো, 


— তবে, ওরাও কি অ্যাটম…


— যাক, অতটাও মর্কট হওনি। আজ্ঞে, হ্যাঁ। ফ্র‍্যাঙ্কিকে একটু তাড়াতাড়ি এগোতে বলো ম্যানহাটনের কাজটা৷ ওপির খবর কী?


দরজা নক করে টুপি পরা সিলিয়ান মার্ফির প্রবেশ।


— তুমি ডাক দিয়েছো কোন সকালে, কেউ তা জানে না, আমার মন যে কাঁদে আপন মনে, কেউ তা মানে না… নমস্তে! আই হ্যাভ বিকাম ডেথ… 


একটা সেন্সরড মার্কিন গালাগাল ঝেড়ে ওকে বললাম,


— এই শালা টমাস শেলবি, তোর অওকাত টুপির ভাঁজে ব্লেড রাখা, আর সিগারেট ফুঁকতে ফুঁকতে বাতেলা ঝাড়া অবধি। তোকে কে ডেকেছে বে? আই হ্যাভ বিকাম ডেথ? সোজা আইসিবিএমের মাথায় বসিয়ে বিকিনি অ্যাটল থেকে ছাড়বো, লেংটি পটলে গিয়ে পড়বি। ভাগ!


গালাগাল খেয়ে মার্ফি দুদ্দাড় দৌড় দিলো। চার্চিল কৌতূহলী স্তরে জিজ্ঞেস করলো,


— কে ও?

— ও আছে। ওটিটি দেখো না, না?

— সে তো তুমি আমার ওটিটি। তোমাদের এনশিয়েন্ট স্ক্রিপচারসেই তো আছে, ওটিটি ডেবো ভবো। 


মাথা চেপে ধরে উঠে দাঁড়ালাম। এর সঙ্গে খানিকক্ষণ থাকলে আমিই পাগল হয়ে যাবো। রোষকষায়িত দৃষ্টি হেনে বললাম,


— এসব ছ্যাবলামি না মেরে, শিগ্গির ফ্র‍্যাঙ্কির সঙ্গে কথা বলো। আইজুকেও জানাও। ওদের বলো, ব্যবস্থা করতে। আমি উঠছি এখন। জর্জদাকে বলো, পরেরবার দেখা করে যাবো।


— ডেবোব্রোটো স্যার এখানে নাকি? কোথায়? কোথায়?


চার্চিলের মুখ ঝলমল করতে লাগলো। দেওয়ালজোড়া বড়ো কাঁচের শারশির ফাঁক দিয়ে রাস্তায় ইতিউতি খুঁজতে লাগলো।


একটা অস্ফুট গালাগাল দিয়ে সিঁড়ি ভেঙে নামলাম। গন্তব্য হিথরো। জেট দাঁড়িয়ে ওখানে।


জেটে উঠলাম। সোজা ন্যুরেমবুর্গে নামবো। ওখান থেকে গাড়ি ধরে বাভারিয়া, বের্খতেশগাবেন। হিটুর হেডকোয়ার্টার, বের্গহফ। ভারি সুন্দর জায়গা। হিটুর সত্যিই শিল্পী হওয়া উচিত ছিলো। কপালের ফেরে.. যাগ্গে। 


হিটুর বাড়ি পৌঁছোতে পৌঁছোতে দুপুর। আমাকে দেখেই ইভা অ্যাপ্রনে হাত মুছতে মুছতে বিগলিত হাসি হেসে বেরিয়ে এলো। 


— অর্চিদা, মাইন ব্রুডার, এসো এসো। 


পায়ে হাত দিয়ে গলঅ্যাপ্রন হয়ে পেন্নাম ঠুকলো একটা। 


— থাক থাক মা। স্বামী নিয়ে সুখে বাঙ্কার করো। হিটু কই? বাজারে?


ইভা মুখ কুঁচকে বললো, 


— আর বলবেন না। এই আপনার ভাইকে নিয়ে পেরেই উঠি না। বার বার বলেছিলাম, আপনি আসবেন, যেন সক্কাল সক্কাল বাজার থেকে একটু ভালো দেখে ড্যানিউবের ইলিশ নিয়ে আসে, চাড্ডি কুমড়ো আর ঝিঙেও যেন আনে। ইলিশের গরমাগরম ভাপা করবো, আর কুমড়ো-ঝিঙের ঝোল, আর ভাজা। কয়লাও শেষ - গবাকে পাঠালাম একটু রুর ছাপ কয়লা আনতে। এখানে রুর ছাপ কয়লার যা দাম, ১৫০০০ মার্ক নিচ্ছে বড়ো এক বস্তা, ভাবা যায়! তা আপনার ভাই সকাল থেকে গবা, গোঙু আর হিমুর সঙ্গে তাস পিটিয়েই কাটালো। শেষে চেঁচামেচি করতে একটু আগে বেরিয়েছে। আপনি আসুন দাদা ভেতরে।


ইভা গজগজ করতে করতে ঢুকলো, পেছন পেছন আমি। ভারি সুন্দর করে গোছানো সব। হিটুটার জন্য ভালোও লাগে। প্রথম জীবনে জেল খেটে, কেরিয়ারে ব্রেক না পেয়ে, পছন্দের মানুষকে জীবনে না পেয়েও হাল ছাড়েনি। এখন নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছে শুধু না, বাকিদের মাড়িয়ে দাঁড়িয়েছে। ইভাও সুযোগ্যা পত্নী। ধন্য বীর হিটলার, যে হিটের পাশে/প্রেমপাশে বাঁধা সদা হেন সৌদামিনী। একা হাতে সংসার থেকে ক্যাম্প, সব কনসেনট্রেশান দিয়ে সামলাচ্ছে দশভুজার মতো, নিজেকে উজাড় করে। 


সদ্য বসে গরমাগরম বাভারিয়ান চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছি, বাইরে থেকে ভ্যাঁপ ভ্যাঁপ করে ডেমলার-ক্রাইসলারের আওয়াজ। অতিপরিচিত হর্ন। ছাইরঙা জামাপরে হিটু ঢুকলো। হাতে বাজারের থলে। 

আমাকে দেখেই একগাল হাসি। 


— আরে, কমরেড, কী ব্যাপার? 

— এই চলছে কমরেড। হাইল ফ্যুয়েরার বলতে হবে আমাকেও? নাকি না বললে গ্যাসচেম্বারে ফেলবে?


জিভটিভ কেটে হিটু বললো,


— এবাবা, তুমি কি সিলভিয়া প্লাথ নাকি হতচ্ছাড়া জু? বালাই ষাট। তুমি আমার দাদা হও। এসব পেছনে লেগো না তাবলে! 


হাতের ব্যাগটা নামিয়ে হিটু চিক্কুড় পাড়লো, 


— গিন্নি, মাইনে লিয়েবে, এই দেখো বাজার এনেছি। ড্যানিউবের ইলিশের পাশাপাশি রাইনের কইমাছও পেয়েছি। একটু জমিয়ে তেলকই করো তো! কতদিন বাদে অর্চিদা এলো!


ইভা এসে ব্যাগ ঘেঁটে দেখে হিটুর দিকে কটমট করে তাকালো। 


— হ্যাঁগা, তোমার কি কোনোকালেই কাণ্ডজ্ঞান হবে না? এতো করে বললাম সর্ষে পাউডার আনতে, ভাপা করবো কি আমার মুণ্ডু দিয়ে, নাকি আউষউইৎজের ছাই দিয়ে?


হিটু মাথা চুলকোতে চুলকোতে বললো, 


— এস টুট মিয়া লাইড লিয়েবলিং (দুঃখিত প্রাণেশ্বরী), জানোই তো, এই বাজারহাটের ব্যাপারটা আমার দ্বারা হয় না। আমি শুধু কার্পেট বম্বিং করে বাজার ওড়াতেই পারি। আর মাস্টার্ড চাইলে আন্ডারগ্রাউন্ডে একবার দেখতে পারো, ফার্স্ট ওয়ারের কিছু ক্যান থেকে গেছে মনে হয়।


— থাক! আর ম্যানেজ দিতে হবে না। হ্যাঁগা, মাস্টার্ড গ্যাস আর মাস্টার্ড পাউডার এক হলো? জার্মান জু আর আলিপুর জু এক? মাস্টার্ড গ্যাস দিয়ে রান্না করলে ইলিশ ভাপার বদলে দাদাকে মাটি চাপা দিতে হবে, জানো?


আমি গলাখাঁকারি দিয়ে বললাম 

— আমি হিন্দু, পোড়ালে ভালো।


ইভা জিভ কেটে বললো, 


— ছি ছি দাদা, এসব কী কথা! গেরস্তের অকল্যেণ হবে তো। ষাট ষাট। মাতা মেরির কৃপায় আমার দাদা শতায়ু হোক। আমি যাই, আপাতত ভাজা আর ঝোলই করি। এই লোকটাকে নিয়ে আর পেরে উঠি না। মিনসে মরলে হাড় জুড়োয় আমার!


হিটু চটে গেলো। বড্ড রগচটা এমনিতেও।


— হ্যাঁ, আমি মরলেই তো তোমার সুবিধে, না! কোনদিন নিজের ওয়ালথার পি-৩৮টা দিয়ে নিজের রগে ঠুকে মরে থাকবো, তার আগে তোমাকে পটাশিয়াম সায়ানাইড খাইয়ে দিয়ে যাবো। 


বিচ্ছিরি গৃহযুদ্ধ বেধে গেলো। মহা বিপদ। এইজন্য ঘরোয়া কোঁদলের মধ্যে আসতে চাই না।


খাবার টেবিলে সবাই গম্ভীর। আমি আপনমনে কই মাছের মুড়ো চিবোচ্ছি। ইভা অনেককিছু রেঁধেছে। পালংচচ্চড়ি, ড্যানিউবের ইলিশ ভাজা আর কুমড়ো-বেগুন-ঝিঙে দিয়ে ঝোল, রাইনের তেলকই, আর জার্মান ছানার কেক বিয়েনেনস্টিখ্‌। তবে ইভা একা রান্না করেনি, কানুও সঙ্গে ছিলো (কান্নেনবার্গ, হিটুর ভারি পেয়ারের শেফ)। হিটু এমনিতে মাছমাংস খায়ই না, কিন্তু আমার অনারে কাঁটা বেছে ইলিশ পর্যন্ত খেয়ে নিলো। 


খেয়ে উঠে দুজনে দুটো জার্মান মিঠাপাতার পান চিবুতে চিবুতে বাইরের ঘরে এসে বসলাম। পকেট থেকে চার্চুর চুরোটটা বার করলাম। হিটু সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকালো। 


— চার্চিলের সিগার না?


— হ্যাঁ। কেন বলো তো? অসুবিধে আছে? আমি কার সঙ্গে মিশবো, কার চুরুট টানবো, সেই কৈফিয়ত তোমাকে দেবো? ম্যানহাটানের খবর, হাইজেনবার্গ যে তোমাদের ঘোরাচ্ছে সেই খবর, বিহে নদীর ধারে পিচব্লেন্ডের খবর, পারীতে কোথায় কখন সেনা মোতায়েন থাকবে সেই খবর তোমাকে কে এনে দেয় শুনি? 


হিটু চুপ করে গেলো। 


— তবুও, তুমি চাইলে তোমাকে উৎকৃষ্ট প্রাশান চুরুট খাওয়াতাম। 


— থাক। ওসব নোকুতো পরে হবে। এখন কাজের কথায় আসি। ওদিকে ম্যানহাটান কিন্তু ফাটান-ফাটান করছে, সে খেয়াল রাখো? এইজন্য বলেছিলাম, বেশি আর্য-আর্য করো না। তোমাদের বাপ বিসমার্ক কী ডেঞ্জারাস ডিপ্লোম্যাটিক ছিলেন, আর তুমি একটা গোঁয়ার। নেশাভাং করে যাও, আর গোয়াঁর্তুমি করো। প্রথমত তোমার এই হলোকস্ট শোনা থেকেই আমার হলো কষ্ট - কিন্তু কী আর বলবো। তুমি ফ্যুয়েরার, আমি আর কে। তবে ইহুদীদের না পেঁদিয়ে, ওদের সঙ্গে চুক্তি করলে অনেক কাজে দিতো। তোমার এই জেদই তোমার পতন ডেকে আনবে। কথা শুনলে ভালো, না শুনলে আরো ভালো। আমার বোনটিকেই সারাজীবন সাদা থান, থুড়ি কালো গাউন পরে ঘুরতে হবে, শাঁখা-সিঁদুর, থুড়ি ওয়েডিং রিং খুইয়ে।


এতোটা বলে হাঁপিয়ে উঠলাম।


হিটু চুপ করে শুনছিলো। 


— কী বলো তো দাদা, আমরাই সহী আর্য। অখণ্ড যে জার্মানি, তাতে শুধু খাঁটি প্রাশানদেরই অধিকার। 


— দেখো ভাই হিটু, তোমার মাইন কাম্ফের প্রোপাগান্ডা, তোমার লেবেনশরাউমের হ্যাজ অন্যত্র দাও। তোমার সঙ্গে কাজের কথা বলতে এসেছি, বলে চলে যাবো। 


— বলো। 


— সেই যে সুভাষবাবুর সঙ্গে কথাবার্তা হলো…


— হ্যাঁ হ্যাঁ, হের বোস তো সেই এলেন। উবান করে তোজোভাইয়ের কাছে পাঠিয়েও দিলাম উজান বইয়ে। পৌঁছোননি উনি? 


— না না, সে পৌঁছেছেন। কিন্তু তুমি ভাই একটু দেখো। চার্চিল হতচ্ছাড়াটার পেঁয়াজি আর পোষায় না। আমাদের ওখানে আবার ক্রিপসকে পাঠিয়েছিলো নেগোশিয়েট করতে। ডোমিনিয়নই দিতে চাইছে না আমাদের, দিলেও গাদাগুচ্ছের কন্ডিশন। ওদিকে লিগ আর কংগ্রেস চুলোচুলি করছে, সিপিআই দুজনের কারোর পক্ষে না থেকে সুবিধাবাদী পক্ষে যাচ্ছে, সিএসপি মাথা চুলকোচ্ছে… স্বাধীনতা হীনতায় কে বাঁচতে চায় হিটু, কে বাঁচতে চায়? তুমি কি বোঝো না পরধীনতার এই কষ্ট? তোমার মাতৃ.. সরি, পিতৃভূমি, ডাইন ফাটারলান্ড, যাহারা তোমার বিষাইছে বায়ু… মনে পড়ে না হিটু, সেই ঘৃণ্য ভার্সেই, সেই ভার বয়ে চলেছো তুমি.. দুর্বল ভাইমার, যারা ভাই বোন সবাইকেই মার মার কাট কাট করার জায়গায় রেখেছে… তুমি বুঝবে না হিটু?


হিটুর চোখ ছলছল করতে লাগলো। যাক, ঠিক জায়গায় খোঁচাটা দিয়েছি। জিঙ্গোইস্টিক হ্যাজ নামালেই ব্যাটা সেন্টিমেন্টাল হয়ে পড়ে একেবারে। 


— আমি দেখছি অর্চিদা। আমি সত্যিই দেখছি। বোমাটা বানাক আমার হতচ্ছাড়া ফাউল ভিজেনশাফটলাররা, একটা তাক করে ফেলবো তোমাদের বাবা ইংল্যান্ডে, একদম ওয়েস্টমিনস্টারের মাথা বরাবর, আরেকটা তোমাদের দিল্লিতে। ওয়াভেলটা বড্ড পোঁয়াপাকা। যাইহোক, জানিয়ে দেবো। তুমি ব্যবস্থা নিয়ে ইভ্যাকুয়েট করিয়ে দিও একটু। 


— কবে রাম লঙ্কায়.. থুড়ি, কবে জিগফ্রিড ওয়ার্মসে আসবে, কবে ক্রিয়েমহিল্ডের সঙ্গে তার বিয়ে হবে! 


— অ্যাঁ? এর মধ্যে নিবেলুঙ্গেনলিড এলো কেন?


— তোমার বোম তোমার ইয়েতে গোঁজো। ওসব না করে কিছু প্যাঞ্জার পাঠাও। সুভাষবাবু নেফার দিক দিয়ে ঢুকবেন ভারতে। একটু প্যাঞ্জার হলে ভালো। 


হিটু মাথা চুলকোতে চুলকোতে বললো,


— এখন তো মোটে একটাই প্যাঞ্জার এখানে, সেটা নিয়ে তোমার বোন মার্কেটিং-এ যায়। ওটা দিলে..


— আহা, এক্ষুণি কে চেয়েছে? তুমি সময়সুযোগ করে পাঠিও। আমি মাঝে এসে তাগাদা দিয়ে যাবো। উঠি আজ। ইভা বোধহয় ঘুমোচ্ছে, ওকে আর ডাকতে হবে না। অনেক খাটনি গেছে বোনটার।


বেরোনোর সময়ে হিটুর পেটে একটা খোঁচা মেরে বললাম,


— এই যে, বৌয়ের মুখঝামটায় অতো মুষড়ে পড়ো না। ঝগড়া হলে প্রেম গাঢ় হয়। একটু গীতগোবিন্দ পড়ো। ম্যাক্সদা অনুবাদ করে গেছে তো। রাতের বেলা বৌকে একটু চুপিচুপি গিয়ে ‘রতিসুখসারে গতমাভিসারে’ ইত্যাদি শুনিয়ে এসো। চললুম হে ভায়া। বেশি ইহুদী মেরো না। লেবেন উন্ড লেবেন লাসেন (নিজেও বাঁচো, অন্যদেরও বাঁচতে দাও)। 


বেরিয়ে এসে জেটে উঠলাম। হিটুর জন্য কষ্ট হয়। রোগে রোগে জর্জরিত ছেলেটা। ওর কাজকর্মকে সমর্থন করতে পারি না কোনোদিনই, কিন্তু ওরকম গুণী ছেলে খুব কমই হয়। ইভাটাও ভারি মিষ্টি মেয়ে। মাইন গৎ, ওদের যেন ভালো হয়, দেখো… 


জেট এসে পৌঁছোলো ভারতে। একটু তিহার ঘুরে আসতে হবে। জওহরটা রয়েছে ওখানে। অনেকদিন দেখা হয় না। 


তিহারে পৌঁছে জওহরের সেলের দিকে গেলাম। রোগা হয়ে গেছে ছেলেটা। গারদের দিকে পিঠ করে বসে কী যেন লিখছে।


— কী, জওহর, সব ঠিকঠাক?


কোটরে ঢোকা চোখগুলো আমাকে দেখে উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। 


— আরে অর্চিদা, তুমি? কখন এলে?


এগিয়ে এলো আমার দিকে। 


— এই চলছে। তুমি কেমন? 


— এই, দিনগত পাপক্ষয়। লেখাপড়া করে মনটাকে শান্ত রাখার চেষ্টা করি। 


— বুঝি। দেখা করে গেলাম। চার্চু আর হিটুর ওখান থেকে ঘুরে এলাম। দুজনকেই দুদিক থেকে উস্কে রেখেছি। স্বাধীনতা দূরাগত নয়।


জওহর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো।


— আর স্বাধীনতা। মানুষ মরছে অর্চিদা। কতো, কতো মানুষ মরছে, আর আমি জেলের মধ্যে প্রিভিলেজড হয়ে বসে আছি। ওদিকে জিন্না মনে হয় না নতুন নেশন না পেলে মানবে। রহমত বেটা ধুয়ো তুলেই রেখেছে, আর হতচ্ছাড়া ব্রিটিশগুলো তালে তাল দিচ্ছে। ক্রিপসকে ঠেকিয়েছি ঠিকই, কিন্তু কতোবার ঠেকাবো? রক্তগঙ্গা বইয়ে দিচ্ছে চারিদিকে সবাই। এই দাঙ্গাই কি আমরা চেয়েছিলাম, অর্চিদা? 


— কী বলবো বলো। মতিদা যদি ওই সময়ে অতোটা ইগো না রেখে চলতো.. তুমিও তো বোঝো। সবার নিজের জেদ বড্ড। 


— জানি। বাবা বড্ড একগুঁয়ে, কারো কথা বোঝে না। জানো, ছোটোবেলায় বাবার দুটো ভালো কলম ছিলো, সোয়ানের। একটা আমি নিয়েছিলুম - বাবার দুটো কলম, একটা নিলে ক্ষতি কী? বাবা জানতে পেরে কী মার মেরেছিলো! সেই থেকে আমার বাবার উপর অসন্তোষ। নিজের ছাড়া কিচ্ছু বোঝে না। কিন্তু এখন সেসব অরণ্যে রোদন করে তো লাভ নেই!


— ঠিকই। যাইহোক। সাবধানে থাকো। আসবো আবার আমি। আজ চলি। ক্লান্ত লাগছে। সেই পারি থেকে লণ্ডন, সেখান থেকে বাভারিয়া, সেখান থেকে এই বিহার…


— নানা। আসো আজ। সাবধানে থেকো। বন্দেমাতরম। 


— বন্দেমাতরম!


বেরিয়ে এলাম। ঘরে ফেরা এবার। কাল সকালে একবার ওয়াশিংটন ডিসি যেতে হবে। ওদের যে ভাইস-প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যান বলে ছোঁড়াটা, ও ডেকেছে। ক্লোজড ডোর মিটিং আছে একটা কী। ফ্র‍্যাঙ্কিও থাকবে, আইজেনহাওয়ারও। সেখান থেকে পালাৎজো ব্রাসসিতে যেতে হবে একবার, বেনু ডেকেছে। কবে যে এই ঘোরাঘুরি শেষ হবে… ক্লান্ত লাগে। 


হঠাৎ অ্যালার্মের আওয়াজে ঘুম ভেঙে গেলো। তাকিয়ে দেখি, ভোর তখন ৫টা।

Luxury v/s Comfort - A ‘Food’ for Thought

In the 2022 culinary-thriller The Menu, the climactic scene was knitted with sheer artistic brilliance, and was extremely symbolic. The male...