আমার জন্ম ব্যারাকপুরে। মায়ের চাকরির কারণে অশোকনগর, মধ্যমগ্রাম ইত্যাদি জায়গায় হোঁচট খেয়ে থিতু হই খড়দহে এসে - তখন আমার বয়েস ৫-৬ মতো। লক্ষ্যণীয়, সবকটি জায়গাই একদম মফস্বল।
নব্বইয়ের দশকের শেষ-একবিংশ শতকের শুরু। বিশ্বায়নের ঢেউ তখনো সেভাবে আছড়ে পড়েনি এই জায়গাগুলোয়। ফলে, এই জায়গাগুলোর গায়ে তখনো শহুরে গন্ধ লাগেনি। কম্পিউটার আসেনি সব বাড়িতে, ভোডাফোন তখনো কম্যান্ড - সবে হাচ হবে হবে করছে; ল্যান্ডলাইন সাধারণ জিনিস। একটাই রেস্তোরাঁ থাকতো এসব জায়গায় - মাসে একবার সেখানে গিয়ে ওই একই ফ্রায়েড রাইস-চিলি চিকেন, বা পোলাও-রোগন জোশ খাওয়া ছিলো মফস্বলি মধ্যবিত্ত জীবনের আনন্দ।
এই সময়ে আমার বড়ো হয়ে ওঠা, বেড়ে ওঠা। আমার স্কুলও ছিলো সরকারি বাংলা৷ মাধ্যম ছেলেদের স্কুল। বছরে ১৮০ টাকা মাইনে, ফলে সমাজের সব স্তরের মানুষই আসতো। তখনো প্রকল্পের জ্বালায় শিক্ষার ঝালাপালা হয়ে যায়নি, নিয়োগও নিয়মিত হতো - ফলে, সরকারি বাংলা মাধ্যম স্কুলে মফস্বলি উচ্চবিত্ত ব্যবসায়ীপুত্র থেকে নিম্নবিত্ত দিন আনা-দিনখাওয়া মানুষের ছেলেও পড়তো। সমগ্র সমাজতন্তুর একটা দারুণ প্রতিফলন দেখা যেতো এই ধরনের স্কুলে।
ফলতঃ, স্বভাবতই যেটা হয়, একটা সম্পূর্ণ পিতৃতান্ত্রিক নির্মাণের মধ্যে আমার বেড়ে ওঠা, বড়ো হয়ে ওঠা। আমার সমস্ত সচেতনতা, শিক্ষার মধ্যে পরতে পরতে সরীসৃপের মতো, হিলহিলে ঠাণ্ডা শরীর নিয়ে মিশে ছিলো পিতৃতন্ত্রের ঘৃণ্য, বিমূর্ত উপস্থিতি৷ নারীবাদের অ-আ-ক-খ, লিঙ্গরাজনীতির পাঠ, সমাজতাত্ত্বিক নানা ধারণা ইত্যাদি সম্বন্ধে ন্যূনতম ধারণাটুকুও ছিলো না। কীভাবে হবে? তার পরিবেশ কোথায়?
সেইসবের বদলে যেগুলো ভ’রে ভ’রে পেয়েছিলাম, দেখেছিলাম, শিখেছিলাম, আত্তীকরণ হয়েছিলো, সেগুলো হলো পুরুষতান্ত্রিক লিঙ্গবৈষম্যের সাধারণীকরণ - যাকে Casual Sexism বলা হয় আরকী। “মেয়েরা বাজে গাড়ি চালায়”, “মেয়েদের বুদ্ধি হাঁটুতে থাকে”, “ভালো বাড়ির মেয়েরা রাতে বেরোয় না” এবং নানাবিধ। উদাহরণ দিতে গেলে একটা আলাদা গ্লসারি বানাতে হবে, তাই সেসবের দায় এড়াচ্ছি। যাঁদের বোঝার, তাঁরা অন্তত বুঝে গেছেন, কী ধরনের মন্তব্যকে টার্গেট করে এটা বলা।
অপভাষা প্রয়োগেও সহজেই একে অন্যের মা-বোন-দিদিকে নামিয়ে আনতাম। অলঙ্কৃত ধর্ষণ (Rape rhetoric) খুবই স্বাভাবিক ছিলো। আমরা তো তাদের ‘সত্যি সত্যি’ রেপ করছি না, তাহলে সমস্যা কোথায়? বুঝিনি, ভাবিওনি। কীভাবে ভাববো? কীভাবে বুঝবো?
মজার ব্যাপার হলো, যে মহিলা বন্ধুরা ছিলো, তারাও এই ব্যাপারগুলোতেই অভ্যস্ত ছিলো। রাস্তায় দাঁড়িয়ে তার প্রেমিক তাকে ঠাটিয়ে থাপ্পড় মারলে (কারণ - সে অন্য কোনো ছেলের মেসেজের রিপ্লাই দিয়েছিলো) সে মাথা নিচু করে চড় খেতো। তাকে বেশ্যা বলে গালাগাল করলে সে সেটাই চুপ করে সহ্য করতো, বা প্রতিবাদ করলেও ‘'আমাকে গালাগাল দেবেনা” অবধিই সীমিত থাকতো।
মেয়েদের বস্তুবৎ বিচার করা (Objectification) রোজকার ব্যাপার। “ভাই, মালটা কী ডবকা দেখেছিস? শাঁসালো পুরো। পেলে না…” বা “কোমরটা দেখ, পুরো গিটার। দেখলেই বাজাতে ইচ্ছে করে” - এই মন্তব্যগুলো একটু কান পাতলেই শোনা যেতো। অনেকেরই আবার লক্ষ্য থাকতো, পুজোর সময়ে ভিড়ের মধ্যে কটা মেয়ের গায়ে পড়ে যেতে পারে, বা একটু গায়ে হাত দিতে পারে।
অনেকেরই এগুলো বেশ অপরিচিত লাগছে, না? স্বাভাবিক। জ্ঞানদীপ্তির ঢেউ মফস্বলের তটে এসে লাগেনি তখনো। ওক-সমাজ নাক সিঁটকোতেই পারেন, কিন্তু এটাই রূঢ় বাস্তব। আপনাদের নিজেদের তৈরি করা কুয়োর বাইরেও একটা সমাজ আছে, যেখানে আপনাদের ডিনায়ালের পেরিস্কোপ পৌঁছোয় না হয়তো।
যাইহোক। সেসব খোঁচা মারা আমার উদ্দেশ্য না।
এসবের ফলে আমার পুরো আপব্রিঙ্গিংটাই একটা অত্যন্ত পিতৃতান্ত্রিক স্ফিয়ারে হয়েছিলো। আমি সমাজবিচ্যুত নই, সমাজ নিয়ে ডিনায়ালেও থাকি না - কিন্তু, ভালো-মন্দ, ঠিক-ভুলের মধ্যেকার ফারাকটা তখনই করা যায়, যখন কারোর সামনে দুটোরই অভিজ্ঞতা করবার সুযোগ থাকে। আমি একটা দিক সম্বন্ধেই অবগত ছিলাম কেবল, ফলতঃ এই পিতৃতন্ত্রই স্বাভাবিক ছিলো আমার কাছে। সোশ্যাল মিডিয়া নামক জিনিসের সমুদ্রে পা ডোবালেও, আমার চেনাপরিচিতির বৃত্তটা হরেদরে একই ধাঁচের ছিলো। তাই, আমার দ্বাদশ শ্রেণিতে পড়াকালীন তৎকালীন প্রেমিকা যখন আমাকে জানায়, যে সে বিয়ের পর সিঁদুর পরবে না, শাঁখাপলা পরবে না, আমার পদবী নেবে না, এবং আমাদের সন্তানাদি আমাদের দুজনের পদবীই নেবে - আমার কাছে সেটা হাস্যকর, বোকা বোকা, অতিবিপ্লবী এবং বেঁড়েপাকামো লেগেছিলো। যা হয় - তাকে ‘নারীবাদী’ বলে দাগাতে আমার একমুহূর্ত দেরি হয়নি আমার, যেটা তখন আমাদের মধ্যে একটা বিচ্ছিরি গালাগালের সমান ছিলো। সম্পর্কটা, বলাই বাহুল্য, টেকেনি (সম্পর্কের দুদিনের মাথায় কেন বিয়ে-বাচ্চা নিয়ে আলোচনা করছিলাম, সেটাও একটা প্রশ্ন যদিও বা)।
এই মানসিকতায় বেড়ে ওঠা আমি গিয়ে গুটিগুটি পায়ে স্কুলশেষে গিয়ে ঢুকলাম প্রেসিডেন্সিতে (মাঝে মাস দেড়েক সেন্ট জেভিয়ার্সে ছিলাম, কিন্তু সেখানে মাত্রাতিরিক্ত ডিসিপ্লিন ইত্যাদির চক্করে শ্বাসটাস নেওয়ার স্পেস ছিলো না - তাই তার কোনো প্রভাবই আমার উপর পড়েনি)। প্রেসিডেন্সিতে ঢোকার পরে আমার সঙ্গে পরিচিতি হয় কলকাতার বিভিন্ন woke মানুষজনের সঙ্গে - যাদের কথাবার্তার ধরন, ভাব, বিষয় আমার সঙ্গে বহুক্ষেত্রেই মিলতো না - বিশেষত লিঙ্গরাজনৈতিক দিক থেকে। আমি বুঝতাম না, কেন একজন মহিলার সম্পর্কে বাজে মন্তব্য করা অনুচিত, কেন ট্রান্স-কুইয়ার-সমকামী ইত্যাদিদের নিয়ে মাতামাতি করা হয়, কেন কোনো মহিলা প্রবল খোলামেলা পোশাক পরলেও সেটা নিয়ে বিরূপ মন্তব্য করা যাবে না ইত্যাদি ইত্যাদি৷ সামনাসামনি সেভাবে বলতে পারিনি কোনোদিন - স্বভাবলাজুক বলেই। কিন্তু, আমার মধ্যে এই woke সমাজ নিয়ে একটা বিচ্ছিরি বিরূপতার সৃষ্টি হয় - যদিও, আমার বহুদিনের পুরোনো পিতৃতান্ত্রিক ধ্যানধারণায় আস্তে আস্তে নাড়া পড়তে থাকে, আমার অচেতনেই অবশ্য।
যদিও, প্রেসিডেন্সির তথাকথিত ‘woke’ বৃত্তটা আমাদের সময়ে অন্তত ভয়ানক ছিলো। যারা সত্যিকারের woke, সেন্সিটাইজড, তারা এইসবে থাকতো না - আর, যারা রাজনৈতিক সংগঠন-মঞ্চ করতো, তাদের মতো ভণ্ড কোটিকে গুটিক মেলে। সামনে খুবই সচেতন, আর পিছনে গেলেই বিভিন্ন মেয়েদের অবজেক্টিফিকেশন, কার কীরকম ‘সাইজ’ নিয়ে আলোচনা, কে কাকে ‘তুলে’ এনে রাজনীতিতে ঢুকিয়েছে, কার বিছানা কতো গরম ইত্যাদি সুচিন্তিত আলোচনা হতো। পরে যখন সব বড়ো মাথাগুলো কলআউট খায়, তখন দেখা যায় বিজবিজ করে সব অ্যাবিউজার-মলেস্টার-এনাবলার বেরোচ্ছে। এইসব রথী-মহারথীরা নেশাভাঙ করে যা যা বলতো, শুনলে সুস্থ মাথা ব্যোমকে যাবে, এমনই এঁদের সেন্সিটাইজেশন। ফলে, আমি আরো ভাবি, যে এগুলোই আসলে নরমাল। এখানে নরমাল, আমার লোকালিটিতে নরমাল - শুধু কিছু আজব লোকজন বাড়াবাড়ি করে। ওরকম মৌলবাদী থাকবেই, ইগনোর করতে হয়।
কলেজে পড়াকালীনই ফেসবুকে একটি বিতর্কিত, বেফাঁস মন্তব্য আমি করে বসি এই সংক্রান্ত। ফলত, উড়িয়ে কলআউট। কলআউট কালচারের ইতিহাসে আমার নাম বোধহয় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। মুশকিল একটাই - কেন কলআউট, সেই ব্যাপারটা আমার বুঝতে লেগেছিলো বহু বহু দিন। তখন আমার তিক্ততা আরো বেড়ে গেছিলো, যা হয়। আর সেই সুযোগে সবাই সবার ব্যক্তিগত এজেন্ডা নিয়ে রাজনীতি করে গিয়েছিলো। যাইহোক, সেসব পুরোনো কাসুন্দি ঘেঁটে লাভ নেই।
অনেক, অনেক জলকাদা ঘেঁটে অবশেষে বুঝতে শুরু করি, সমস্যাটা ঠিক কোথায়। আমার প্রাক্তন প্রেমিকার সঙ্গে কথা বলে, নানা মেয়ে বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলে, বিভিন্ন ব্যাপারে আমার মা-র সঙ্গে কথা বলে (যা আগে সেভাবে হয়নি, অদ্ভুতভাবেই) ব্যাপারগুলো খানিক বুঝতে পারি৷ পেট্রিয়ার্কি যেসব মহিলার ভিতরে ঘাঁটি গাড়তে পারেনি, তাদের সঙ্গে আলোচনা হয়৷ শিখি। শেখা শুরু করি। বোঝা শুরু করি, নিজেকে প্রশ্ন করা শুরু করি। সমস্ত হেজিমনির বিরুদ্ধে গিয়ে যখন আওয়াজ তুলছি, তখন লিঙ্গরাজনীতিতেই বা তার ব্যতিক্রম হবে কেন? এই যে হাজার-হাজার বছর ধরে গড়ে ওঠা পিতৃতন্ত্র, তন্ত্র, সিস্টেম একটা - সেটা তার বহুধাবিস্তৃত বটশিকড় ছড়িয়ে যে রয়েছে, সেটার বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলা প্রয়োজন, এটা না বুঝলে আমার সচেতনতা কোথায়? কীসের শিক্ষা?
অনেকেই দেখি, ‘নট অল মেন’ বলে দাবি দেন। ঠিকই, ঘরে ঘরে পুরুষরা রেপ করেন না। কিন্তু, তাঁরা কেউ না কেউ অন্যান্য ভাবে পিতৃতন্ত্রকে এগিয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করেন। কেউ বৌ পেটান, বা নিদেনপক্ষে কথা বলতে দেন না, অসম্মান করেন; কেউ এনাবলারের ভূমিকা পালন করেন ‘যাগ্গে বাবা, আমার কী! মেয়েমানুষ যখন, এসব করার কী দরকার’ ইত্যাদি লাইনে বলে; কেউ কনুই মেরে, বা কেউ স্রেফ বিদ্ধকারী পুরুষ দৃষ্টি (male gaze) দিয়ে অস্বস্তিতে ফেলে, কেউ বন্ধুবান্ধবের সামনে বাজে আলোচনা করে, কেউ গ্রুপচ্যাটে বিকৃত মানসিকতা নিয়ে মহিলাশরীর নিয়ে আলোচনা করে। এখানে আমি ট্রান্সফোবিয়া-হোমোফোবিয়া ইত্যাদি বিষয়কে আনবোই না - যেখানে মেয়েদেরকে আমরা এখনো ‘দ্বিতীয় লিঙ্গ’ বলেই ধরি, যেখানে এখনো ক্যাজুয়াল সেক্সিজম সাধারণ ঘটনা, রেপ তখনই শিরোনামে আসে যখন তা ভয়ঙ্কর মৃত্যুর সঙ্গে জুড়ে যায় - সেখানে আমাদের সমাজ হেটেরোনর্মেটিভ চশমা খুলে কোনোকিছু দেখবে, এমনটা ভাবা বাতুলতা। যাইহোক, ব্যাপারটা অবশ্যই সমস্ত পুরুষেরই। ‘পুরুষ’ ব্যাপারটাই একটা লিঙ্গরাজনৈতিক, পরিচিতি রাজনীতির একটা অংশ - পুরুষ পরিচিতিকে যাঁরাই স্বীকার করে নেন, তাঁরা ঐতিহাসিকভাবে চলে আসা একটা সংঘাতের শাসক শ্রেণির পক্ষে দাঁড়িয়ে পড়েন। এখানে ব্যাপারটা ব্যক্তি বা ইন্ডিভিজুয়ালের নয় - একটা কালেক্টিভ ধারণা মিশে থাকে। যেমন, আমরা যখন বলি, যে ‘সাপ ছোবল মারে’, তার মানে কি এই, যে প্রত্যেকটা সাপ ছোবল মারে? বা, রাষ্ট্র মাত্রেই শাসনযন্ত্র - এখানে রাষ্ট্র মাত্রেই সব সমানভাবে নিপীড়ন করবে, বা করবেই? সব বাঘই মানুষ খায়? আশা করি, বোঝা যাচ্ছে ব্যাপারটা। যতদিন না আমরা ‘পুরুষ’ আর ‘মানুষ'-এর পার্থক্যটা বুঝবো, ততদিন পর্যন্ত খুব একটা আশা আছে বলে তো মনে হয় না! যতদিন পর্যন্ত না আমাদের, লিঙ্গগতভাবে পুরুষদের নিপীড়কের অপরাধবোধ (Opressors’ guilt) গিলে না খায়, পুড়িয়ে না দেয়, ততদিন পর্যন্ত শিক্ষার আগুন ভিতরে জ্বলবে না। সমাজের পরিবর্তন, সিস্টেম পালটে ফেলা একদিনে যায় না, কিন্তু একদিন ঠিকই যায়। যে দীর্ঘ দীর্ঘ সময় ধরে সিস্টেমটা গড়ে উঠেছে, সেটা একলহমায় যাবে না।
আমি কি পুরো পালটে গেছি? সচেতনতার ধ্বজাধারী? না। সম্ভব নয়। আমি এই সমাজের জীব, এই সমাজেরই উপাদান। সমাজবিচ্যুত অ্যাপোস্টেট নই। বহু বছর ধরে আমার ভিতরেও সযত্নে বয়ে নিয়ে চলেছি পিতৃতন্ত্রকে। কিন্তু, যেটা শিখেছি, সেটা হলো চুপ করতে। শুনতে। বলতে দিতে। নিজেকে প্রশ্ন করতে, সমানে প্রশ্নে প্রশ্নে জর্জরিত করে দিতে। নিজের ভিতরে ক্রমাগত, ক্রমাগত দ্বন্দ্ব তৈরি করতে শিখেছি, যার থিসিস-অ্যান্টিথিসিসের সংঘাত আমার চালিকাশক্তি। পাল্টাইনি আমি পুরো, জানিনা পাল্টাবো কিনা। কিন্তু, নিজের ভিতরে একটা দ্বন্দ্ব আনতে পেরেছি। এর একটা বিরাট কৃতিত্ব প্রেসিডেন্সির। প্রেসিডেন্সি আমাকে শিখিয়েছে, প্রশ্ন করতে। আমাকে একটা সচেতন স্পেস দিয়েছে, আমাকে ভাবতে শিখিয়েছে, আবার পরমুহূর্তেই নিজের ভাবনাকে ফের প্রশ্ন করতে শিখিয়েছে। নিজেকে সমানে ভাঙা-গড়ার মধ্যে রাখতে শিখিয়েছে, বদ্ধ হতে দেয়নি। একটা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যদি এই সামান্য শিক্ষাটুকু দিতে না পারে, তবে তা কীসের শিক্ষা? কী সার্থকতা সেই প্রতিষ্ঠানের নিগড়ের?
সমাজ পাল্টাতে গেলে তাই প্রশ্ন করতে হয়, ভিতরে দ্বন্দ্ব আনতে হয়। বয়ে চলা নদীতে পাথরও আটকায় না। নিজেকে ভাঙতে হয়, গড়তে হয়, দিয়ে আবার ভাঙতে হয়। শুরু করতে হয়, মাথা নত করতে হয়। গভীর, গভীরে যেতে হয়।
ভাবুন, ভাবুন। প্র্যাক্টিস না হোক, ভাবাটা শুরু অন্তত করুন। আমার মতো মানুষ, আমার মতো ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে এসে যদি নিজেকে সমানে পাল্টানোর লড়াইতে শামিল হতে পারে, নিজের প্রচলিত ধ্যানধারণার মূলে কুঠারাঘাত করতে পারে, তাহলে আপনারাও পারবেন। পারবেনই, আমার দৃঢ় বিশ্বাস।
পুরুষতন্ত্র নিপাত যাক। মানবতা জিতুক, হেরে যাক নিপীড়ক-নিপীড়িতদের বাইনারি। হাতে হাত ধরা থাক, মিলুক কাঁধে কাঁধ।
পুনশ্চ - প্রতিবাদ-প্রতিরোধে নামাটাই একমাত্র সেন্সিটাইজেশন নয়, সেটা যেন আমরা ভুলে না যাই। প্রতিবাদ করতে হবে তো বটেই। কিন্তু প্রতিবাদ যখন আসবে সামান্য ক্যাজুয়াল সেক্সিজমের বিরুদ্ধেও, অবজেক্টিফিকেশনের বিরুদ্ধে, নারীদেহকে কমোডিটি ভাবার বিরুদ্ধে - তখনই সেন্সিটাইজেশন শুরু হয়েছে বলে ধরতে হবে। যখন সমাজের প্রতিটা স্তরের নারী, বা প্রান্তিক লিঙ্গের মানুষের অবমাননাকে সমান গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে পারবো আমরা, তখনই হবে। তবে, তার জন্য, শুরু করতে হবে। হাল্কা নাড়া না দিলে কোনোদিনই সেটা jolt হয়ে দেখা দেবে না।