Wednesday, 13 July 2022

চেতনাপ্রবাহের আঁকিবুঁকি

 একেকটা রাত অন্যগুলোর থেকে আলাদা হয়। এরকম কিছু কিছু রাত আসে, যখন এক অজানা কষ্টে কণ্ঠ দ্রব হয়ে আসে। আপনি চুপ করে শুয়ে শুয়ে কনট্যাক্ট লিস্ট হাতড়ান, আর দেখেন সবাই যে যার মত ব্যস্ত। এদিকে হয়তো আপনি দুটো কথা বলবেন বলে কাউকে খুঁজছেন, কিন্তু পাচ্ছেন না। কথা বলতে গেলেও যে বলতে পারবেন, এমনটা নয় ; তবুও, খুঁজছেন। আপনি কথা বলার লোক খুঁজতে থাকেন, আর আপনার অনুচ্চারিত কথাগুলো ঢেকে যায় প্যাসিভ-অ্যাগ্রেসিভ ইমোজিতে।  


আপনার যে আমিটা অনেকদিন আগে হারিয়ে গেছে ফিরবে না বলে, সেই আমিটাকে খুঁজতে গিয়ে আপনি একটা গর্ত খুঁড়ে ফেলেন। খুঁড়তেই থাকেন, খুঁড়তেই থাকেন। চারিদিকে চাপ-চাপ রক্তমাংস ছিটকে পড়ে, তবু আপনি ক্লান্ত হন না। শেষমেশ গিয়ে যখন একটা 'ঠং' করে শব্দ হয়, তখন উৎসাহিত হয়ে আরেকটু খুঁড়ে দেখেন, একটা কঙ্কাল অবহেলায় পড়ে আছে, যেন কোনোদিন কেউ আসবে বলে কথা দিয়ে যায়নি তাকে। 


প্রবল হতাশ হয়ে যখন আপনি ঘরের দিকে মুখ বাড়ান, তখন আর ঘরটা দেখতে পান না। তন্নতন্ন করে আপনি ঘরটা খুঁজতে থাকেন। মুখোমুখি দাঁড়িয়ে একটা বাড়ি মিচকি মিচকি হাসতে থাকে। এই গা-জ্বালানো হাসিকে অগ্রাহ্য করে আপনি বাড়ির দরজা খুলে ভেতরে ঢোকেন, কিন্তু অদ্ভুতভাবেই, ভেতরে ঘরটা নেই। আবার আরেকটা বাড়ি, দরজা, আর তারা মিচকি মিচকি হাসছে। আপনি আক্রোশে দরজার পর দরজা খুলতে খুলতে শেষমেশ দেখেন, এক অদ্ভুত শূন্যতা। ব্যর্থ আস্ফালনে আপনি মাটিতে ঘুষির পর ঘুষি মেরে রক্তাক্ত করে তোলেন হাতটাকে, আর বাড়ির পর বাড়ি, বাড়িগুলো, মিচকি মিচকি হেসে চলে। ভারী কৌতুক!


যে মেয়েটাকে ভালোবাসবেন বলে রাস্তা পেরোতে যাচ্ছিলেন, হঠাৎ করেই দেখতে পান, সেই মেয়েটা উল্টোদিকের ফূটপাথ দিয়ে তার প্রেমিকের হাত জড়িয়ে আইসক্রিম খেতে খেতে নিরুদ্দেশের দিকে মিলিয়ে যেতে থাকে। আপনি মাঝরাস্তায় অবাক হয়ে তাদের হারিয়ে যাওয়ার দিকে নিষ্পলকে তাকিয়ে থাকেন। হঠাৎ করে একটা লরি হুড়মুড় করে এসে আপনার ঘাড়ে পড়ে। আপনি দুটো টোকা মেরে গায়ের ধুলোরক্ত ঝেড়ে আবার তাকিয়ে থাকেন সেইদিকে, যেখান দিয়ে মেয়েটা একটু আগেই আইসক্রিম খেতে খেতে তার প্রেমিকের হাত জড়িয়ে চলে গেল। আপনি মেয়েটার মুখটা খুঁজতে থাকেন, ফোনের গ্যালারি আঁতিপাঁতি করে খুঁজতে থাকেন, দেখেন মেয়েটার মুখ নেই। মুখের জায়গাটা সাদাটে, ফ্যাকাশে - চোখনাককানভুরুঠোঁট কিস্যু নেই। আপনার ভয় করতে থাকে, আপনি ফোনটা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে অন্যদিকে হাঁটতে থাকেন। 


সারিয়্যালিটি আপনাকে অবাক করে না আর। আপনি এখন অনায়াসে দালির ঘড়ি পরে, দ্যুশঁর ফাউন্টেনে পেচ্ছাপ করে, ম্যাগরিটের পাইপ ফুঁকতে ফুঁকতে জীবন কাটিয়ে দিতে পারেন। তবুও, এই খুঁজতে চাওয়া এবং খুঁজতে গিয়ে রক্তাক্ত হওয়া এবং শেষমেশ হারিয়ে যাওয়াটা আপনার অভ্যেস হয়নি এখনো। শিখে যাবেন হয়তো। শেখার মতো অবসাদগ্রস্ততা আপনার আছে, চিন্তা নেই।


এভাবেই, একেকটা রাতকে আলাদা করে ফেলেন আপনি আরেকটার থেকে, কষ্টেদুঃখেপ্যাসিভ-অ্যাগ্রেশনের কামড় খেতে খেতে। এভাবেই, এভাবেই আপনি, আপনার অস্তিত্ব, আপনার অনস্তিত্ব, আপনার অবসাদ, মনখারাপ, দুঃখকষ্ট সবকিছু লাখ-লাখ লোকের হাততালি কোড়ায়, আর কম্যুনারিজমের শিকার হন আপনি, আর এভাবেই, এভাবেই রাতগুলো একটার থেকে আরেকটা আলাদা হয়ে যায়।

Tuesday, 12 July 2022

ক্রান্তিকাল

 এক অদ্ভুত যন্ত্রণা, যার কোনো ব্যাখ্যা হয় না, এবং যার কোনো পরিচিত ওষুধও নেই - সেই যন্ত্রণার মত মারণরোগ বোধহয় আর নেই। 

রোগেভোগে মরে যাওয়া অনেক সহজ। ভেতরে ভেতরে মরে যাওয়ার মত দুঃখ আর কিছুতে নেই।

যখন নেরুদা ছুঁয়ে আমরা প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, কেউ কাউকে ছেড়ে যাব না - ভাবিনি, কেবল একপক্ষই সেই কথা রাখবে। দূরত্ব বাড়বে, যন্ত্রণা বাড়বে, প্রত্যেকটা রাত বেদনার্ত হতে হতে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেবে, আর দূর থেকে মুচকি হেসে সম্রাট নিরো তার বেহালাটা তুলে নেবে। 

তোমার জানা নেই হয়তো, বেহালাও কাঁদে। ছড়ের টানে নয়, দুঃখে। যন্ত্রণায়। বুকের ভেতরে যে অব্যক্ত ব্যথা কুরে কুরে খেতে থাকে, সেই যন্ত্রণার মূর্ছনায় বেহালাও আর্তনাদ করে ওঠে, আর আমরা ভাবি বাখ।


চলে যাওয়া বড়ই সহজ। থাকতে গেলে অনেক কষ্ট করতে হয়। আমরা সবসময়েই সহজ বিকল্পকে বেছে নিই। সময় বাঁচাতে।


প্রত্যেকটা রাত্রি মলম হয়ে উঠতে চায়। মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে চায়। পারে না। প্রত্যেকটা রাত্রি জানে, মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী। 


থেকে গেলে পারতে হয়তো। স্কেল দিয়ে যে দূরত্ব মাপা যায় না, সেই দূরত্বের একপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আবছা সিল্যুয়েটসম বিলীন হয়ে না গিয়ে, এই দীর্ঘ ছায়াপথটা হেঁটে আসতে পারতে। 


আবার হয়তো কোনোদিন একসাথে নেরুদা পড়ব আমরা। আবার হয়তো কোনো এক কালবোশেখী সন্ধ্যের হাল্কা শীতকে হার মানিয়ে দেবে দুজোড়া হাতের মধ্যবর্তী উষ্ণতা। ব্যর্থ আস্ফালনে বেহালা ছুঁড়ে ফেলে দেবেন নিরো, আর অলক্ষ্যে দাঁড়িয়ে মহাকাল মুচকি হাসবে। হয়তো তুমি চেষ্টা করবে, এই সুদীর্ঘ ছায়াপথটা হেঁটে পার হওয়ার। কিন্তু ততদিনে সব ঝাপসা হয়ে যাবে। কিছু অস্ফুট, অনুচ্চারিত কথা, কিছু অভিমান, কিছু দুঃখ, কিছু অব্যক্ত যন্ত্রণা ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামাবে।


'এমন বৃষ্টির দিন পথে পথে

আমার মৃত্যুর দিন মনে পড়ে।'

Saturday, 9 July 2022

কালান্তক অটোভ্রমণ

 আপনারা অটো চড়েন? আমি চড়ি না। চড়া ছেড়ে দিয়েছি। কেন জানতে চান? আমার বিগত কিছু বছরের যাতায়াতের অভিজ্ঞতায় সবথেকে দুর্ধর্ষ, দুর্মদ, দুর্দমনীয়, দুর্বিষহ ও দুরন্ত যাতায়াতের মাধ্যম নিঃসন্দেহেই অটো। ভগবান অটোকে তিনটে চাকা, ফিজিক্সের সকল সূত্রকে হার মানিয়ে দেওয়া গ্যাসীয় ডাইমেনশন এবং কিছু অকুতোভয় অটোড্রাইভার দিয়ে এই ধরাধামে অবতীর্ণ করেছিলেন। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, এরা বিশ্বযুদ্ধে জাপানি কামিকাজে পাইলটদের ভূমিকায় অবতীর্ণ ছিল, অটোতীর্ণ না হলেও। এরকমই এক অটোয় চড়ার অভিজ্ঞতা সবার সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার উদ্দেশ্যে এই লেখার অবতারণা। 


কাজের জন্য রথতলায় গেছি। সন্ধে সাতটার সময়ে অটো ধরব। কামারহাটি পৌরসভার সামনেই যে অটোস্ট্যান্ডটি রয়েছে, সেটির দিকে গুটিগুটি পায়ে এগোলাম। 

'খড়দা, সোদপুর, ব্যারাকপুর, কামারহাটি, টিটাগড়' ইত্যাদি বলে গলায় ফেনা তুলে একজন চেঁচাচ্ছিল। পাছে সে প্রায় গোটা কল্যাণী হাইওয়েটাই পার হয়ে যায়, তাই তাড়াতাড়ি গিয়ে বললাম, 'দাদা, আমি খড়দহ যাব।'

প্রেমিকাকে গিফট এবং বাবা-মা-দাদুকে ভালো রেজাল্ট দেওয়ার পরে ছাড়া অত আনন্দিত মুখ জীবনে আর দেখিনি। দরবিগলিত কণ্ঠে হাতটাত কচলে সে বললে, 

'নিশ্চয়ই, নিশ্চয়ই৷ আপনাদের জন্যই তো অটো রয়েছে। এই..এইটায় উঠে পড়ুন।' 

আমাকে একটা অটো দেখিয়ে দিলো। উঠলাম। ফাঁকা অটো। বুঝলাম, গেল সব কচ্ছপ হয়ে। কখন ভর্তি হবে, কখন ছাড়বে, খোদায় মালুম।


প্রায় আধঘণ্টা কাটার পরেও ভর্তি হল না অটো। সবাই পালকির ভিতর উঁকি দিয়ে নতুন বউ দেখার মতো আমাকে দেখে চলে যাচ্ছে। জানি দর্শনীয় নই, তবুও সহযাত্রী হতে না চাওয়ার মতো স্পর্শনীয় অব্দি নই, এটা ভেবে মেজাজটা খিঁচড়ে যাচ্ছিল। 

প্রচুর প্রার্থনার পর অবশেষে অটো ভর্তি হল। বুঝলাম, মন দিয়ে ডাকলে ঈশ্বরের ম্যাসেঞ্জার না আসুক, অটোর প্যাসেঞ্জার অন্তত আসে। সেইসঙ্গে গুটখা চিবোতে চিবোতে এলেন তিনি। মহামহিম অটোচালক। এক খোট্টা যুবক; মাথায় লাল রঙের ঝুঁটি, গালে ত্রিশূলের উল্কি করা - সম্ভবত ঈশ্বরের কাছে ডাইরেক্ট পৌঁছে দেওয়ার সিম্বল, গায়ে নিয়ন সবুজ জামা আর কালো ট্র‍্যাকসুট, তাতে সিলভার রঙের লাইনিং ঝলমল করছে। 


দেখে আমি থ। একে দেখেই তো চোখ ধাঁধিয়ে যাচ্ছে, এ আবার অটো চালাবে কী? 

তা তিনি এলেন। এসে বললেন, 'দাদা(গুটখা গিলে), একটু sসামনে এsসে বsসুন। লেডিজলোক আছে তো..' 

আমার প্রেসিচেতনা, বেশিচেতনা চাগাড় দিয়ে উঠল এই ঘৃণ্য সেক্সিস্ট মিসোজিনিস্ট মন্তব্য শুনে, সমাজকে নিচু চোখে দেখার এই প্রবণতা দেখে। যে সমাজ মেয়েদের অটোর সামনে বসার স্বাধীনতা খর্ব করে নেয়, সেই সমাজের প্রতি রইল একরাশ ঘৃণা। কিন্তু সমস্যা হল, আমি আবার ফেসবুক করিনা। আর ফেসবুকের বাইরে এসব বলতে গেলে অটো ড্রাইভার আমাকে পিটিয়ে ফটো করে দিতে একমুহূর্তও ভাববে না।

কিঞ্চিৎ গাঁইগুঁই করে 'ইয়ে, আমার বাতের ব্যথা চাগাড় দিচ্ছে, আমার হাঁটুতে টেনিস এলবো হয়েছে, আমার কোমরে স্ট্রোক হয়েছে' গোছের দাবি জানালাম। খোট্টাভাই থুক করে রঙিন থুতু ফেলে রাস্তাকে সদ্য প্রেমে-পড়া-যুগলের মনের মতো রাঙিয়ে দিয়ে বললেন, 'দ্দাদ্দা, কেনো বুঝছেন না, বেকার লাফড়া না কোরে সামনে আসুন।'

লাফড়া না করে সামনে গেলাম। অটোওয়ালার পাশে দুর্গে দুর্গে দুর্গতিনাশিনী বলতে বলতে অটো বসলাম। কিন্তু, 'অথ নিমন্ত্রণ ভোজন'-এর মতোই, দুর্গা বোধহয় সেটাকে 'দুর্গতিদায়িনী' শুনেছিলেন — এবং তিনি পরমানন্দে দুর্গতি করা শুরু করে দিলেন।


'ঘ্যাঁকোৎ ঘঁড়াৎ ঘ্যাঁ ঘ্যাঁ ঘোঁ' শব্দ করে অটো স্টার্ট নিলো। বোঁ করে অটো এগিয়ে গেল। চোখের সামনে কেমন হঠাৎ সব মিলিয়ে গেল - শুধু দেখতে পেলাম কিছু লাল লাল আলো। চোখ কচলে বুঝলাম, অটো সুপারসনিক জেটকে 'গরুর গাড়ির মতো পিছনে ফেলে' এগিয়ে যাওয়ার স্পিডে ভরসন্ধের বিটিরোডের রাস্তা দিয়ে হাঁকাচ্ছে।


একটু এগোতেই ঠাওর করলাম, সামনে অটোভাইয়ের এক জাতভাই অটো নিয়ে যাচ্ছে। 'সসালাকে দেখাতে হবে' বলে দাঁতে দাঁত পিষে সে দেখি স্পিড বাড়িয়ে দিলো। অটো তখন আর অটো নেই - মুক্তিবেগকে চুক্কি দিয়ে তখন সে হয় শ্রীহরিকোটার রকেট হওয়ার তাল করছে, নয় স্বয়ং শ্রীহরির পাদপদ্মে পৌঁছোবার সস্তা পারমার্থিক পথ খুঁজছে। আমি চোখ বুজে ইষ্টনাম জপ করতে থাকলাম। হঠাৎ 'গেল গেল' রব শুনে দেখি অটো ৭৫° বেঁকে অন্য অটোকে কাটিয়ে আবার সোজা হল - দুচাকা থেকে তিনচাকায় ফিরল। 


'হঁ, কাইসা লাগা বাবুয়া!' পরিতৃপ্তির হাসি হাসল সে। আমি তখন আর নিজের মধ্যে নেই। ইঁদুরের হার্টবিটকে তখন টেক্কা দিচ্ছে আমার হৃদযন্ত্র।


'হাঁ ভাই, কা ভৈল বা? রঘুয়া তো নাহি আয়া বে?' 


পাশে তাকিয়ে দেখি, অটোভাই কানে ফোন ধরে নিয়েছে একটা। দেখে আমার শরীর কীরকম ঠাণ্ডা হয়ে এলো। অস্ফুটে বিড়বিড় করে কাতর অনুরোধ করতে গেলাম - কিন্তু গলা থেকে গোঁ-গোঁ ছাড়া আর কিছু বেরোলো না। 


সিগনালে দাঁড়াল অটো। প্রায় তেঁতুলতলার কাছাকাছি এসে গেছি। এদিকে অটোভাই পাশে কথা বলেই চলেছেন ফোনে। 'হাঁ ভাই, তু কুছু টিনসন না লে। তেরা ভাই হ্যায় না?' 

এই আশ্বাসবাণীটা আমাকে দিলে বরং কাজে দিতো। লাভ কতোটা হতো জানি না, তবুও…


সিগনাল খুলতেই অটো ছেড়ে দিলো আবার। দুটো বাইকের মাঝখান দিয়ে শাঁ করে বেরিয়ে গেল অটো। আমি প্রাণের আশা মোটামুটি ছেড়ে দিয়ে এলিয়ে পড়ে আছি সিটে৷ কানে হরিবোল হরিবোল বাজছে। জীবনে কত কী করা হল না — একটা অটোয় উঠে নিজের জীবন অপরকে দান করে এলাম। অটোচালকভাই তখনো ফোনে গল্প করে চলেছেন প্রাণের মনের। কবে লক্ষ্মী হলে কোন সিনেমা দেখেছিল, তার গল্প চলছে। 


"উ জো লড়কি থি না, গজব থি।.. নাহি ভাই, তু বোল। হাম বিলকুল বিজি নাহি হ্যায়।" 


শুনে আমার টাকে উঠে গেলো, মানে হার্ট। কী বলে কী হতচ্ছাড়া! বিজি নয়? কীরকম ইজি ভাবে বলে দিল মাইরি!


'শোঁ-ওঁ-ওঁ' শব্দে একটা টাটা সুমো বেরিয়ে গেল। এক ইঞ্চির জন্য লাগল না। কিন্তু এদিকে চিত্তির হয়েছে - অটোভাই পাশ কাটাতে গিয়ে একটা সাইকেলে গুঁতো মেরেছে — আর নিউটনের তৃতীয় সূত্র মেনে সেই ভদ্রলোক 'গিচি গিচি' বলে আর্তনাদ করে 'ঘ্যাঁচাৎ' শব্দে সোজা পাশের একটা চায়ের দোকানে সাইকেল ল্যান্ড করিয়ে দিলেন।


"সালা মারকে ভাগায়ে দিতে হয় সব। হামার রাস্তাতেই আসে এরা।.. না ভাই, তু বোল। এক সালেকো ঘুসা দিয়া চা পটরী মে।"


আমার তখন হাত-পা হিম হয়ে এসেছে। এ তো দিনেদুপুরে মানুষ খুন করতে পারে! 


অটো থেকে নামার আশা প্রায় তখন ছেড়ে দিয়েছি। চোখ বুজে বার্ড ফ্লু হওয়া মুরগির মতো ঝিমোচ্ছিলাম। হঠাৎ চোখ খুলতে যা দেখলাম, তাতে হার্টটা কীরকম পিংপং বলের মতো লাফিয়ে মুখ দিয়ে বেরিয়ে আবার রিফ্লেক্সে ঢুকে গেলো। বাঁদিক থেকে একটা লরি ঘোরাচ্ছিল। মাঝরাস্তায় পারপেন্ডিকুলার হয়ে দাঁড়িয়ে গেছিল। আমার অটোভাই 'ক্র‍্যাঁঅ্যাঁঅ্যাঁচ' শব্দে ব্রেক মেরে ডানদিকে প্রায় পুরো হেলে আবার সোজা হল। দিয়ে থামল। দেখলাম জানলা দিয়ে লরি ড্রাইভার বিস্মিত হয়ে তাকিয়ে আছে। 

"ই কা হ্যায়?" বিস্মিত লরি ড্রাইভারের প্রশ্ন।

"ই ইস্পেসশিপ হ্যায় তুমহারা মাম্মিকা!" মুহূর্তে অটো ড্রাইভারের সদুত্তর। লরি থেকে কিছু ব-চ-ম খিস্তি ভেসে এলো। সেটাকে মাথা ঝুঁকিয়ে বাও করার ভঙ্গিতে লুফে নিয়ে আবার অটো ভাগাল অটোভাই।


অবশেষে স্টেশন রোড। আমার স্টপেজ। অটো থামল।


"আরে, ইসকো কা হুয়া! ইনি ওগ্যান হোয়ে পোড়ে গেলেন কেনো?"


চোখ খুলে দেখি রাস্তার ধারের এক চায়ের দোকানের বেঞ্চে শুয়ে আছি। লোকজন মুখেচোখে জলটল দিচ্ছে। কীসব 'দুর্বল হার্ট' ইত্যাদি ভেসে এলো কানে। প্রতিজ্ঞা করলাম, আর কোনোদিন অটোয় উঠব না এই জীবন থাকতে। আমার এ জীবন বোরিং-এর; অটোয় চড়ার সাময়িক উত্তেজনায় তা যে জীবন ফড়িং-এর করার কোনো বাসনা আমার নেই।

'ঠাকুরমার ঝুলি'

 আজকে আমার ঠাকুমার মৃত্যুবার্ষিকী। ২০২১ সালের এই দিনেই তিনি গত হয়েছিলেন। এইটুকু পড়েই অনেকে হয়তো, 'ওঁ শান্তি, আত্মার শান্তি কামনা করি, তি...