Thursday, 23 December 2021

খড়দহ বইমেলা ২০২১ - ঘটনার ঘনঘটা, বর্ণনার হেবি ছটা

 


মদীয় স্বনামধন্য খড়দহ বইমেলা এইবার বাইশে পা দিলো। তাই নিয়ে 'বাহ' বা 'ইশ' কিছুই বলার নেই আমার, বলার জন্য যে বিদ্যে লাগে, পেটে তাও নেই। কিন্তু কে না জানে, আদা ও জাহাজের খবরলাভের মধ্যের সাঁকোতে দাঁড়িয়ে থাকেন যাঁরা, তাঁরাই শ্রেষ্ঠ আঁতেল। আঁতেল হতে চাই না, এমন সৎ দাবি জানানোর সততা আমার নেই। এছাড়াও শুনেছি, বইমেলা এবং নন্দন আঁতেলতীর্থের শ্রেষ্ঠ তীর্থ, এমনটা কোনো এক গুণী বলেছিলেন। কে বলেছিলেন জানি না, কিন্তু তিনি যে ঠিকই বলেছিলেন, তাতে আমার কোনো দ্বিমত নেই। সেই গুরবাণীকে মাথায় রেখে, ফাঁকেতালে আঁতেল হতে পারার লোভ সম্বরণ করতে না পেরে(এবং মা'র স্কুল থেকে পাওয়া স্টুডেন্ট পাসের সদ্ব্যবহার করতে) আজ খড়দহ বইমেলা প্রাঙ্গণের উদ্দেশে রওনা হয়েছিলাম।


খড়দহ বইমেলা বিশ্বের এক অন্যতম বইমেলা, যেখানে ঢুকতে গেলে টিকিট লাগে। তা হ্যাঁরে মূর্খ, বিনিপয়সায় আঁতেল হবি, এদিকে কুলোপানা চক্করও মারতে হবে, তা কি হয়? শিক্ষিত হওয়ার দাম অন্ততপক্ষে পাঁচ টাকা, তবে খড়দহের কোনো বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী হলে স্টুডেন্ট পাস পাওয়া যাবে(এছাড়া খড়দহের গণ্যমান্য কালচারড রাজনীতিজ্ঞ পরিবারের লোক হলেও পাস পাবেন – কিন্তু আমার সঙ্গে কি তাদের তুলনা চলে? আমি হচ্ছি কেসি নাগের বইয়ের সেই বাঁদর, যে প্রাণপণে জাতরূপ তৈলাক্ত বাঁশ বেয়ে ওঠবার চেষ্টা করে, কিন্তু সমানে হড়কে হড়কে নেমে আসে)। মা খড়দহের বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা হওয়ার সুবাদে খানকয়েক পাস এমনিই পেয়েছিল, তদুপরি অনাদরে-অবহেলায় পড়ে থাকা আরো কিছু বেওয়ারিশ পাস নিয়ে বিজয়ীর হাসি হেসে ঘরে ফেরে। সেই পাসবগলে আমরা মায়েপোয়ে বইমেলার গেটে যাই। নিজেকে কল্যাণনগর বিদ্যাপীঠের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র বলে পরিচয় দিই (যদিও আমার স্কুল ব্যারাকপুর গভর্নমেন্ট হাই, এবং স্কুলের পাঠ ও পাট বহুযুগ আগে চুকিয়ে দিয়েছি, তবুও এই ছদ্মবেশ ধারণ করতে হল, নইলে পিঠে পড়ার প্রবল সম্ভাবনা – আর এ পিঠে শীতকালে পড়লেও তা মিষ্টি লাগে না; তা পিষ্টক তো নয়ই, বরং ইষ্টকখণ্ডের সমান - আশা করি, অভিজ্ঞ ব্যক্তিমাত্রেই জানবেন)। স্বয়ং পাণ্ডবরা বিপাকে পড়ে ছদ্মবেশ নিয়েছিলেন, আমি তো কোন ছার। মনে মনে 'সবার আমি ছাত্র' জপতে জপতে টিকিট দেখাই। প্রথমেই মুশকিল বাধল মাকে নিয়ে। 


“ভদ্রে! তিষ্ঠ! বিনামূল্যে প্রবেশাধিকারনিমিত্ত শুভ্র এই পত্রখণ্ডিকা কেবলই ছাত্রদিগের নিমিত্ত সংরক্ষিত – আপনি বানপ্রস্থের পথপ্রত্যাশী, পঞ্চশতিবয়স্ক - এ পথ আপনার নয় দেবি!"

মা'কে 'তিষ্ঠ' বলে আটকানোয় মা যারপরনাই ক্ষিপ্ত হয়ে যায় – কোন অলপ্পেয়ে ড্যাকরা বলেছে পঞ্চাশে স্কুলে যাওয়া যায় না? মিনসের মুখে নুড়ো জ্বেলে দিই – ইত্যাদি বলবার আগেই আমি আগ বাড়িয়ে কাঁচুমাচু মুখ করে জানাই, ইস্কুল থেকে জানিয়েছে যে এই পাসে গার্ডিয়ানরাও একলাফে পাশ করে যেতে পারবেন।  এইসব গাঁইগুঁইয়ের মাঝেই আবিষ্কার হল, মা সানন্দে ২০১৯-এর বেওয়ারিশ পাস নিয়ে বাড়ি এসেছে। আমি হাত কচলে 'মানে, ইয়ে' করে ম্যানেজ দেওয়ার চেষ্টা করে চলেছি এই বলে, যে ইস্কুল থেকেই ওসব আমি বাগিয়েছি (বা bag-ইয়েছি, ব্যাগ নিয়েই স্কুলে যেতে হয় কিনা), আর ২০১৯এর দোষ কী, তাতে কোভিড ছিল না, মাস্ক ছিলনা - ২০২১-এর থেকে তা অনেক ভালো ইত্যাদি। এইসব টিকটিকের মধ্যেই মা খুঁজেপেতে ২০২১ এর টিকিট বের করে ফেলেছে - তা দেখিয়ে আমরা সগর্বে, সদর্পে মেলাপ্রাঙ্গণে পা রাখলাম।


আহা, কী দেখিলাম! জন্ম-জন্মান্তরে ভোলার প্রশ্নই ওঠে না! একখানি ছোটো মেলা, আমি একেলা। যদিও একেলা বলা যায় না - চারিদিকে প্রচুর লোক। এরাও মনে হয় আমার মতো আঁতেল হতে এসেছে। মা'রও চোখটোখ কেমন ঝলমল করছিল - আমাকে অস্ফুটে সেকেন্দার-সেলুকাস-প্রচণ্ড সূর্যোদয়-বিচিত্রদেশটেশ কীসব বলার চেষ্টাও যেন করল, কিন্তু আবেগে মা'র 'কণ্ঠ আমার রুদ্ধ আজিকে' হয়ে গেল। সেই সঙ্গীতহারা বাঁশি ফাটা কাঁসির মতো হয়ে বেরোল, বেরিয়ে 'দে'জ্'এ যাওয়ার আদেশ দিল। 


নামে যখন 'দে', তখন দেখলেই দিতে বলবে, অতএব ওদিকে যাওয়া উচিত কি- এই মর্মে মিনমিন করে ওজরআপত্তি তুলতে মা বরাভয় দিল - গেলে নাকি তারা 'দে' বলে পয়সাকড়িও চায় না, আবার 'নে' বলে বইপত্তরও দিতে চায় না। শুনে ভারি কৌতুহল হল। এ কেমন স্ববিরোধ? 


তা যাই হোক, গেলাম। গিয়ে আমি তো অবাক! চারদিকে কতো লোক বই পড়ছে - প্রাণপণে পড়ছে, পারলে অন্যের হাত থেকে কেড়ে নিয়ে পড়ছে। একজন হাতের কাছে কিছু না পেয়ে ক্যাশমেমো নিয়েই পড়ছে। পরে বুঝলাম, তিনি ক্যাশিয়ার - ক্যাশই তাঁর ইয়ার কিনা। চন্দ্রিলবাবুর একটি বই বেরিয়েছে দেখলাম - বাংলায় স্বরচিত ক্লেরিহিউয়ের বই। ওটা হাতে নিতেই ক্যাশিয়ার ভদ্রলোক বিগলিত কণ্ঠে জানালেন, ওটা নতুন 'কবিতার' বই, চন্দ্রিলবাবু খুব বিখ্যাত কবি, ইত্যাদি। ভদ্রলোকের প্রজ্ঞায় আমি মুগ্ধ হয়ে গেলাম। যে ব্যক্তি একই সঙ্গে ক্যাশ সামলাচ্ছেন, নানা বইয়ের চলমান রিভিউ দিয়ে চলেছেন এবং চন্দ্রিলকে কবি বানিয়ে দিচ্ছেন - তিনি আঁতেল না হয়ে যেতেই পারেন না। মুগ্ধতার রেশ চোখে মেখে কোনো বই না নিয়েই পথে নামলাম। গন্তব্য - 'আনন্দ'। 'আনন্দ'-এ গিয়ে রীতিমতো নিরানন্দ হতে হল।  ফেলুদা-ব্যোমকেশ-স্মরণজিৎ-সুচিত্রার সবরকম পারম্যুটেশন-কম্বিনেশন, গুটিকয়েক টিনটিন-অ্যাসটেরিক্স এবং 'হেঁ হেঁ' হাতকচলানো দুই ক্যাশিয়ার বাদে আর কিছুই দেখতে পেলাম না। মা রেগেমেগে আমাকে নিয়ে বেরিয়ে এল। সেখান থেকে গেলাম 'দেব সাহিত্য কুটির'এ। সেখানে দেখলাম, তারাপদ রায়ের 'মাতাল সমগ্র'। তারাপদ রায় বলেছেন, মদ পাঁচ আঙুলের নেশা। তাঁকে স্মরণ করে বইটি ভক্তিভ'রে পাঁচ আঙুলস্থ করলাম। ক্যাশিয়ারকে বইটি দিয়ে 'গীতাঞ্জলি' ও 'Song Offerings'-এর সম্মিলিতি ম্যানাস্ক্রিপ্টটি নিয়ে পাতা ওল্টাচ্ছিলাম। হঠাৎ ক্যাশিয়ার বলল, 

'দাদা, এটা নিন। এটা কিন্তু অরিজিনাল!'

আমার মুখ বিস্ময়ে ও শ্রদ্ধায় হাঁ হয়ে গেল। স্বয়ং কবিগুরু নিজে হাতে এই লেদারেট-মলাটের বইতে লিখেছিলেন? আর তাতে হাত দিচ্ছি স্বয়ং আমি???? 

কম্পিতকণ্ঠে বললাম, "কি-কিন্তু ও-ওখানে তো আ-আরো আছে! ক-কবিগু-গুরু এ-এত গু-গুলো নি-নিজে হা-হাতে লিখেছিলেন??"

ক্যাশিয়ার একটু থমকালেন। দিয়ে বললেন, 

"না না, মানে, এটা জেরক্স।"

আমি তখন নেপচুন থেকে পড়েছি। বলে কী? একবার বলে অরিজিনাল, একবার বলে জেরক্স? মানছি আঁতেল নই, বইয়ের সঙ্গে সম্পর্ক ওই চপ-পকোড়ার ঠোঙার মধ্যে দিয়ে, তা'বলে মুখ্যুসুখ্যু পেয়ে যা নয় তাই বোঝাবে? চটেমটে বললাম,

"কী বলছেন ঠিক করে বলুন। একবার বলছেন অরিজিনাল, একবার বলছেন জেরক্স? ঠিক করে বলুন, এটা কী? অরিজিনাল না জেরক্স?"

-"ইয়ে, মানে জেরক্স।"

-"তবে রে ব্যাটা ইস্টুপিট! বললি যে অরিজিনাল?"

-"না, মানে.."

-"কী না মানে? আঁতেলকে ফিল্মফেস্ট চেনাচ্ছেন? "

-"আরে দাদা, এটা অরিজিনালের জেরক্স। এই দেখুন, উনি লেখাগুলো কাটাকাটি করেছেন।"


এতক্ষণে বোঝা গেল। কবিগুরু নিজের হাতে লিখে কাউকে দিয়ে জের‍ক্স করিয়ে বেচতে দিয়েছেন। এরকম দু'নম্বরি মাল কিনতে মন চাইল না। ধুর ধুর! দুনিয়াটাই ভ'রে গেছে দু'নম্বরি জিনিসে। ভারাক্রান্ত মন নিয়ে বেরিয়ে এলাম। 


ইতিউতি ঘুরে আমরা বেরিয়ে এলাম। বইমেলায় লোকে খাবার কিনতে আসে, তা বিস্মৃত না হয়েই আমরা লাইন দিলাম পকোড়ার দোকানে। সামনে বিরাট প্ল্যাকার্ড, 'মাত্র ২০/- (কুড়ি) টাকায় তিন পিস!'


আমরা গিয়ে ছ'পিস চাইলাম। দোকানদার দাম জানাল। আমরা ভদ্রভাবে বললাম, বইমেলায় এলেও আমরা আঁতেল নই, এ যেমন সত্যি, আবার এটাও সত্যি যে কিঞ্চিৎ অক্ষরজ্ঞান আমাদেরও হয়েছিল বটি, আর আমরা গান্ধারী'র ন্যায় আন্ধাধুন খেলাও খেলছি না। এসব বুঝিয়ে আবার ছয় পিস চাইতে দোকানদার আবার জানাল, দাম দাঁড়াচ্ছে চল্লিশটাকা। মা'র লুপ্ত ক্ষাত্রতেজ তখন ফুটে বেরিয়ে এল। মা'দের এককালে উপাস্য দেবী ছিলেন মা যশোরেশ্বরী(খাঁড়াহস্তে) - প্রতাপ রায়দের বংশের উপাস্য দেবী যিনি। সে প্রতাপ না থাকলেও মা'র প্রতাপ বিলকুল রয়েছে, তা মা খাঁড়া না তুলেই বুঝিয়ে দিল। 


"কী পেয়েছেন কী আপনি? আমরা কি (ছাপার অযোগ্য) নাকি? তখন থেকে (ফাংশনের গানবাজনায় শোনা গেল না) -এর মতো কথা বলে চলেছেন? একটা (ছাপার অযোগ্য) (শোনা গেল না) কোথাকার!" 


দোকানদারের স্যাঙাত বিপদ বুঝে মা'কে ঠেকাল।

"না দিদি, হেঁ হেঁ, ও না, হেঁ হেঁ, বোঝেনি, হেঁ হেঁ। আপনি কিছু, হেঁ হেঁ, মনে করবেন না, হেঁ হেঁ।" 


মা তখন চটেমটে বলল,

"চপ দিন, তবে চুপ করব।"

দোকানদার তখন নিজের সকল (অর্থাৎ বাটি) শূন্য করে পকোড়া ঢেলে দিল। 

চিবোতে চিবোতে আরেকপ্রস্থ খাওয়ার প্রস্তাব ফেলল মা - আর আমি তাতে ভোট দিয়ে পাশ করিয়ে দিলাম। মা তখন অঙ্গুলিনির্দেশ করে দোকানদারকে বলল, 

"দাদা, ওই বড়ো বড়ো পকোড়াগুলো দেবেন।"

দোকানদার দাদা চটে ছিলেন - তাঁকে দাম বলতে না দিয়েই আমরা টাকা দিয়ে দিয়েছি (এবং ওনার সাক্ষরতা অভিযানকে ব্যর্থ করে আমরা প্ল্যাকার্ড পড়ে নিয়েছি) বলে। এখন উনি ঝাঁপিয়ে পড়ে পকোড়াদের বুকে টেনে নিয়ে বললেন,

"না না, ওদের 'টাচ' করবেন না!"


মা গেল ক্ষেপে। পকোড়া এবং সুচিত্রা সেন যে এক নয় - সুচিত্রা সেন বারণ করার পরেও উত্তম তাঁকে 'টাচ' করলেও পকোড়াদের যে 'টাচ' করা একেবারেই উত্তম নয়, এই মর্মে একটা নাতিদীর্ঘ, পুতিবৃহৎ বক্তিমে ছাড়ল। আবার মুস্কিল আসান হল পেছনের 'হেঁ হেঁ' বাবু। সে আবার সামাল দিল,

"হেঁ হেঁ, দিদি, বুঝছেনই তো, হেঁ হেঁ.."


বোঝা ততক্ষণে হয়ে গেছে। আমরা পা বাড়ালুম রিকশার দিকে। সে আরেক চিত্তির। রিকশাওয়ালা মাতাল। হাতে 'মাতাল সমগ্র' নিয়ে সামনেই যে এহেন মূর্ত উদাহরণ দেখতে পাব, তা ভাবিনি। কথা এভাবে এগোল -


মা - "স্টেশন যাবেন?"

রিকশাওয়ালা - "যা-আ(হিক)ব।"

মা - "কত নেবেন?"

রি - "পনেরো(হিক)।"

মা - "বারো দেবো। যাবেন?"

রি - "না।"

মা - (জনান্তিকে)"বাবু, এ মাতাল। চল হেঁটে ফিরি।"

(গমনোদ্যোগ)

রি - "দিদি, বারো (হিক) দিন।"

মা - (হন্টন)

রি - "(হিক)দিদি দশ দিন?"

মা - (দ্রুতবেগে হন্টন)

রি - "আচ্ছা আট?"

মা - (প্রায় ছুন্টন)



রিকশাওয়ালা যেভাবে দর কষছিল, তার একটুমাত্র প্রতিফলনও যদি ভার্সেইতে দেখা যেত, তাহলে হয়তো জার্মানিও স্বাজাত্যবোধের পরাকাষ্ঠা হয়ে জাত্যাভিমানের খাঁড়া উঁচিয়ে ইহুদী ঠ্যাঙাতে বেরোত না, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-হিটলার-হলোকস্ট-বার্লিন-নাৎসি-কটাকট ইত্যাদি কল্পনাই থেকে যেতো। আর দাঁড়াতে সাহস হয়নি। সোজা বাড়ি। 


যা বুঝলাম, একদিনে অনেক আঁতেল হয়েছি। মন ভ'রে গেছে। তবে, এ'বছর হয়তো আর নয় - ভালো জিনিস অল্প হলেই ভালো। আবার পরের বছর। বেশি আঁতেল হয়ে গেলে খুব মুশকিল কিনা - তখন আবার পালা করে নন্দন, ফিল্ম-ফেস্টিভ্যাল যেতে হবে, কলকাতা বইমেলায় নিজের লেখা বই বেচতে হবে, জটিল বইয়ের নাম বলতে হবে, দুর্বোধ্য কথা বলতে হবে। ল্যাটিনে বলে, রেডুকশিও অ্যাড অ্যাবসুর্ডুম - অর্থাৎ কিনা, বেশি টানাহ্যাঁচড়া করলে কোনোকিছু অ্যাবসার্ডিটি অর্থাৎ অবান্তরের স্তরে পৌঁছে যায়। অতএব, 'আস্তে আস্তে ভাঙো।'


অলমিতি।


Tuesday, 7 December 2021

আয়না

 একটা হিমঘর থেকে আরেকটা হিমঘরের দূরত্ব অনেক। বা হয়তো দূরত্ব নেই; সবটাই আপেক্ষিক। এই আপেক্ষিকতাবাদের টানাপোড়েনে পড়ে অকালশৈত্যের হতাশায় শান্তি খুঁজতে যান আপনি। চাদর টেনে টেনে পরিচিত মুখ খুঁজতে খুঁজতে আনমনে কখন যে নিজেকেই খুঁজতে আরম্ভ করে দেন, বুঝতে পারেন না৷ 


কাগজকলম ছুঁড়ে ফেলে পেছন ফিরতেই আয়না দেখতে পান। আয়নাতে নিজেকে দেখতে আপনার কেমন একটা লাগে। দেখাতে চান না আপনি, মুখ লোকান। মুখ দেখালেই সত্যিটা বেরিয়ে পড়বে। আপনি সত্যি খুঁজতে চাননা, ধর্মাবতার সাক্ষী। সত্যি থেকে পালিয়ে আসতে চান, কিন্তু সত্যি পালাতেও দেয় না। 


চিৎকার করে ফেটে পড়ার ঠিক আগের মুহূর্তে আপনার অনুভূতিগুলো থম মেরে যায়। আপনি এলোমেলো হাতড়ে খুঁজতে থাকেন ইতস্তত বিক্ষিপ্ত শব্দগুলো; যেগুলো, আপনি জানেন, দেশলাই ঠেকালে প্রবল বিস্ফোরণে এক লহমায় নিশ্চিহ্ন করে দিতে পারে চরাচর। কিন্তু, আপনি পারেন না। এক অব্যক্ত বেদনায় আপনার সমগ্র অস্তিত্ব নীলচে হয়ে আসে। অবসাদের তলানিতে পৌঁছে আপনি যখন দিকভ্রষ্ট ডুবুরির মতো ত্রস্ত হাতে বিপদসঙ্কেত দিতে থাকেন, ততক্ষণে উপরিতল থেকে আলো আসা বন্ধ হয়ে গেছে। স্বর্গসিঁড়ি বেয়ে যে দেবশিশুর নেমে আসার কথা ছিল, সে আজও আসেনি। হয়তো সে আড্ডা দিচ্ছে পাড়ার চায়ের দোকানে। স্বপ্নে দেখা নবজাতকের মুখ আপনাকে প্রিয়জনবিয়োগের বেদনা মনে করিয়ে দেয়। আপনি জানেন, এই দ্রোহকাল পেরিয়ে গেলেই ফুল ফুটবে, পাখি ডাকবে, আরো যত ফিরোজানীল ধারণাগুচ্ছ আপনি সযত্নে সংগ্রহ করে রেখেছেন আপনার আলমারিতে, তারা সবাই নিজ নিজ রূপধারণ করবে। 


প্রেমিকার গা থেকে ভেসে আসে আপনার ছোটোবেলায় হারিয়ে যাওয়া লজেন্সগন্ধী ইরেজারের গন্ধ। আপনার বারান্দার সামনে ঝুলতে থাকা ওভারহেড তারে বসে পায়রারা যে গুপ্ত আলোচনায় মত্ত, আপনি জানেন, তাতে একদিন ওরা আপনাকেও শামিল ক'রে নেবে। আপনাকে শুধু হালকা হতে হবে। হালকা, হালকা, হালকা...


পথ ছেড়ে বেপথে আসা আপনার বরাবরের অভ্যেস। কিন্তু ফ্রস্ট কসম, তাতে আপনার কোনো ডিফারেন্স হয়নি। হবেও না। ঝরাপাতার পথ আপনার নয়, পাকা রাস্তা আপনার নয়। কোনোকিছুর উপরেই আপনি শেষমেশ অধিকার কায়েম করে উঠতে পারলেন না। যে দুঃখগুলো আপনি একটা ঝুলির মধ্যে পুরে আটকে রেখেছিলেন, একদিন তারাও প্রজাপতির মতো পরপর ডানা মেলে উড়ে গেছে। প্রাক্তন প্রেমিকাদের ভালো থাকতে দেখলে আপনি প্রবল হিংসায় জ্বলেপুড়ে খাক হতে চান, কিন্তু শেষমেশ তাদের ভালো চেয়ে বসেন। আপনি একদিন সব ছেড়ে চলে যেতে চান। সবকিছু ছেড়ে, সবার থেকে দূরে৷ এক দূরাগত অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দুঃস্বপ্নকে দূরে রেখে আপনি চলে যেতে চান। আপনি পারেন না। এই খুচরো না পারাগুলো নিয়েই আপনি 'আপনি' হয়ে ওঠেন। আপনি পারতে চান, পারেন না। প্রবল ব্যর্থতায় ফেটে পড়তে চান, ঘুষি মেরে ভেঙে ফেলতে চান কাঁচের অদৃশ্য দেওয়াল। আর দেওয়ালঘড়ির টিকটিক প্রতিমুহূর্তে আপনার অস্তিত্বকে নিয়ে পরিহাস ক'রে চলে।

Luxury v/s Comfort - A ‘Food’ for Thought

In the 2022 culinary-thriller The Menu, the climactic scene was knitted with sheer artistic brilliance, and was extremely symbolic. The male...