Thursday, 23 December 2021

খড়দহ বইমেলা ২০২১ - ঘটনার ঘনঘটা, বর্ণনার হেবি ছটা

 


মদীয় স্বনামধন্য খড়দহ বইমেলা এইবার বাইশে পা দিলো। তাই নিয়ে 'বাহ' বা 'ইশ' কিছুই বলার নেই আমার, বলার জন্য যে বিদ্যে লাগে, পেটে তাও নেই। কিন্তু কে না জানে, আদা ও জাহাজের খবরলাভের মধ্যের সাঁকোতে দাঁড়িয়ে থাকেন যাঁরা, তাঁরাই শ্রেষ্ঠ আঁতেল। আঁতেল হতে চাই না, এমন সৎ দাবি জানানোর সততা আমার নেই। এছাড়াও শুনেছি, বইমেলা এবং নন্দন আঁতেলতীর্থের শ্রেষ্ঠ তীর্থ, এমনটা কোনো এক গুণী বলেছিলেন। কে বলেছিলেন জানি না, কিন্তু তিনি যে ঠিকই বলেছিলেন, তাতে আমার কোনো দ্বিমত নেই। সেই গুরবাণীকে মাথায় রেখে, ফাঁকেতালে আঁতেল হতে পারার লোভ সম্বরণ করতে না পেরে(এবং মা'র স্কুল থেকে পাওয়া স্টুডেন্ট পাসের সদ্ব্যবহার করতে) আজ খড়দহ বইমেলা প্রাঙ্গণের উদ্দেশে রওনা হয়েছিলাম।


খড়দহ বইমেলা বিশ্বের এক অন্যতম বইমেলা, যেখানে ঢুকতে গেলে টিকিট লাগে। তা হ্যাঁরে মূর্খ, বিনিপয়সায় আঁতেল হবি, এদিকে কুলোপানা চক্করও মারতে হবে, তা কি হয়? শিক্ষিত হওয়ার দাম অন্ততপক্ষে পাঁচ টাকা, তবে খড়দহের কোনো বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী হলে স্টুডেন্ট পাস পাওয়া যাবে(এছাড়া খড়দহের গণ্যমান্য কালচারড রাজনীতিজ্ঞ পরিবারের লোক হলেও পাস পাবেন – কিন্তু আমার সঙ্গে কি তাদের তুলনা চলে? আমি হচ্ছি কেসি নাগের বইয়ের সেই বাঁদর, যে প্রাণপণে জাতরূপ তৈলাক্ত বাঁশ বেয়ে ওঠবার চেষ্টা করে, কিন্তু সমানে হড়কে হড়কে নেমে আসে)। মা খড়দহের বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা হওয়ার সুবাদে খানকয়েক পাস এমনিই পেয়েছিল, তদুপরি অনাদরে-অবহেলায় পড়ে থাকা আরো কিছু বেওয়ারিশ পাস নিয়ে বিজয়ীর হাসি হেসে ঘরে ফেরে। সেই পাসবগলে আমরা মায়েপোয়ে বইমেলার গেটে যাই। নিজেকে কল্যাণনগর বিদ্যাপীঠের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র বলে পরিচয় দিই (যদিও আমার স্কুল ব্যারাকপুর গভর্নমেন্ট হাই, এবং স্কুলের পাঠ ও পাট বহুযুগ আগে চুকিয়ে দিয়েছি, তবুও এই ছদ্মবেশ ধারণ করতে হল, নইলে পিঠে পড়ার প্রবল সম্ভাবনা – আর এ পিঠে শীতকালে পড়লেও তা মিষ্টি লাগে না; তা পিষ্টক তো নয়ই, বরং ইষ্টকখণ্ডের সমান - আশা করি, অভিজ্ঞ ব্যক্তিমাত্রেই জানবেন)। স্বয়ং পাণ্ডবরা বিপাকে পড়ে ছদ্মবেশ নিয়েছিলেন, আমি তো কোন ছার। মনে মনে 'সবার আমি ছাত্র' জপতে জপতে টিকিট দেখাই। প্রথমেই মুশকিল বাধল মাকে নিয়ে। 


“ভদ্রে! তিষ্ঠ! বিনামূল্যে প্রবেশাধিকারনিমিত্ত শুভ্র এই পত্রখণ্ডিকা কেবলই ছাত্রদিগের নিমিত্ত সংরক্ষিত – আপনি বানপ্রস্থের পথপ্রত্যাশী, পঞ্চশতিবয়স্ক - এ পথ আপনার নয় দেবি!"

মা'কে 'তিষ্ঠ' বলে আটকানোয় মা যারপরনাই ক্ষিপ্ত হয়ে যায় – কোন অলপ্পেয়ে ড্যাকরা বলেছে পঞ্চাশে স্কুলে যাওয়া যায় না? মিনসের মুখে নুড়ো জ্বেলে দিই – ইত্যাদি বলবার আগেই আমি আগ বাড়িয়ে কাঁচুমাচু মুখ করে জানাই, ইস্কুল থেকে জানিয়েছে যে এই পাসে গার্ডিয়ানরাও একলাফে পাশ করে যেতে পারবেন।  এইসব গাঁইগুঁইয়ের মাঝেই আবিষ্কার হল, মা সানন্দে ২০১৯-এর বেওয়ারিশ পাস নিয়ে বাড়ি এসেছে। আমি হাত কচলে 'মানে, ইয়ে' করে ম্যানেজ দেওয়ার চেষ্টা করে চলেছি এই বলে, যে ইস্কুল থেকেই ওসব আমি বাগিয়েছি (বা bag-ইয়েছি, ব্যাগ নিয়েই স্কুলে যেতে হয় কিনা), আর ২০১৯এর দোষ কী, তাতে কোভিড ছিল না, মাস্ক ছিলনা - ২০২১-এর থেকে তা অনেক ভালো ইত্যাদি। এইসব টিকটিকের মধ্যেই মা খুঁজেপেতে ২০২১ এর টিকিট বের করে ফেলেছে - তা দেখিয়ে আমরা সগর্বে, সদর্পে মেলাপ্রাঙ্গণে পা রাখলাম।


আহা, কী দেখিলাম! জন্ম-জন্মান্তরে ভোলার প্রশ্নই ওঠে না! একখানি ছোটো মেলা, আমি একেলা। যদিও একেলা বলা যায় না - চারিদিকে প্রচুর লোক। এরাও মনে হয় আমার মতো আঁতেল হতে এসেছে। মা'রও চোখটোখ কেমন ঝলমল করছিল - আমাকে অস্ফুটে সেকেন্দার-সেলুকাস-প্রচণ্ড সূর্যোদয়-বিচিত্রদেশটেশ কীসব বলার চেষ্টাও যেন করল, কিন্তু আবেগে মা'র 'কণ্ঠ আমার রুদ্ধ আজিকে' হয়ে গেল। সেই সঙ্গীতহারা বাঁশি ফাটা কাঁসির মতো হয়ে বেরোল, বেরিয়ে 'দে'জ্'এ যাওয়ার আদেশ দিল। 


নামে যখন 'দে', তখন দেখলেই দিতে বলবে, অতএব ওদিকে যাওয়া উচিত কি- এই মর্মে মিনমিন করে ওজরআপত্তি তুলতে মা বরাভয় দিল - গেলে নাকি তারা 'দে' বলে পয়সাকড়িও চায় না, আবার 'নে' বলে বইপত্তরও দিতে চায় না। শুনে ভারি কৌতুহল হল। এ কেমন স্ববিরোধ? 


তা যাই হোক, গেলাম। গিয়ে আমি তো অবাক! চারদিকে কতো লোক বই পড়ছে - প্রাণপণে পড়ছে, পারলে অন্যের হাত থেকে কেড়ে নিয়ে পড়ছে। একজন হাতের কাছে কিছু না পেয়ে ক্যাশমেমো নিয়েই পড়ছে। পরে বুঝলাম, তিনি ক্যাশিয়ার - ক্যাশই তাঁর ইয়ার কিনা। চন্দ্রিলবাবুর একটি বই বেরিয়েছে দেখলাম - বাংলায় স্বরচিত ক্লেরিহিউয়ের বই। ওটা হাতে নিতেই ক্যাশিয়ার ভদ্রলোক বিগলিত কণ্ঠে জানালেন, ওটা নতুন 'কবিতার' বই, চন্দ্রিলবাবু খুব বিখ্যাত কবি, ইত্যাদি। ভদ্রলোকের প্রজ্ঞায় আমি মুগ্ধ হয়ে গেলাম। যে ব্যক্তি একই সঙ্গে ক্যাশ সামলাচ্ছেন, নানা বইয়ের চলমান রিভিউ দিয়ে চলেছেন এবং চন্দ্রিলকে কবি বানিয়ে দিচ্ছেন - তিনি আঁতেল না হয়ে যেতেই পারেন না। মুগ্ধতার রেশ চোখে মেখে কোনো বই না নিয়েই পথে নামলাম। গন্তব্য - 'আনন্দ'। 'আনন্দ'-এ গিয়ে রীতিমতো নিরানন্দ হতে হল।  ফেলুদা-ব্যোমকেশ-স্মরণজিৎ-সুচিত্রার সবরকম পারম্যুটেশন-কম্বিনেশন, গুটিকয়েক টিনটিন-অ্যাসটেরিক্স এবং 'হেঁ হেঁ' হাতকচলানো দুই ক্যাশিয়ার বাদে আর কিছুই দেখতে পেলাম না। মা রেগেমেগে আমাকে নিয়ে বেরিয়ে এল। সেখান থেকে গেলাম 'দেব সাহিত্য কুটির'এ। সেখানে দেখলাম, তারাপদ রায়ের 'মাতাল সমগ্র'। তারাপদ রায় বলেছেন, মদ পাঁচ আঙুলের নেশা। তাঁকে স্মরণ করে বইটি ভক্তিভ'রে পাঁচ আঙুলস্থ করলাম। ক্যাশিয়ারকে বইটি দিয়ে 'গীতাঞ্জলি' ও 'Song Offerings'-এর সম্মিলিতি ম্যানাস্ক্রিপ্টটি নিয়ে পাতা ওল্টাচ্ছিলাম। হঠাৎ ক্যাশিয়ার বলল, 

'দাদা, এটা নিন। এটা কিন্তু অরিজিনাল!'

আমার মুখ বিস্ময়ে ও শ্রদ্ধায় হাঁ হয়ে গেল। স্বয়ং কবিগুরু নিজে হাতে এই লেদারেট-মলাটের বইতে লিখেছিলেন? আর তাতে হাত দিচ্ছি স্বয়ং আমি???? 

কম্পিতকণ্ঠে বললাম, "কি-কিন্তু ও-ওখানে তো আ-আরো আছে! ক-কবিগু-গুরু এ-এত গু-গুলো নি-নিজে হা-হাতে লিখেছিলেন??"

ক্যাশিয়ার একটু থমকালেন। দিয়ে বললেন, 

"না না, মানে, এটা জেরক্স।"

আমি তখন নেপচুন থেকে পড়েছি। বলে কী? একবার বলে অরিজিনাল, একবার বলে জেরক্স? মানছি আঁতেল নই, বইয়ের সঙ্গে সম্পর্ক ওই চপ-পকোড়ার ঠোঙার মধ্যে দিয়ে, তা'বলে মুখ্যুসুখ্যু পেয়ে যা নয় তাই বোঝাবে? চটেমটে বললাম,

"কী বলছেন ঠিক করে বলুন। একবার বলছেন অরিজিনাল, একবার বলছেন জেরক্স? ঠিক করে বলুন, এটা কী? অরিজিনাল না জেরক্স?"

-"ইয়ে, মানে জেরক্স।"

-"তবে রে ব্যাটা ইস্টুপিট! বললি যে অরিজিনাল?"

-"না, মানে.."

-"কী না মানে? আঁতেলকে ফিল্মফেস্ট চেনাচ্ছেন? "

-"আরে দাদা, এটা অরিজিনালের জেরক্স। এই দেখুন, উনি লেখাগুলো কাটাকাটি করেছেন।"


এতক্ষণে বোঝা গেল। কবিগুরু নিজের হাতে লিখে কাউকে দিয়ে জের‍ক্স করিয়ে বেচতে দিয়েছেন। এরকম দু'নম্বরি মাল কিনতে মন চাইল না। ধুর ধুর! দুনিয়াটাই ভ'রে গেছে দু'নম্বরি জিনিসে। ভারাক্রান্ত মন নিয়ে বেরিয়ে এলাম। 


ইতিউতি ঘুরে আমরা বেরিয়ে এলাম। বইমেলায় লোকে খাবার কিনতে আসে, তা বিস্মৃত না হয়েই আমরা লাইন দিলাম পকোড়ার দোকানে। সামনে বিরাট প্ল্যাকার্ড, 'মাত্র ২০/- (কুড়ি) টাকায় তিন পিস!'


আমরা গিয়ে ছ'পিস চাইলাম। দোকানদার দাম জানাল। আমরা ভদ্রভাবে বললাম, বইমেলায় এলেও আমরা আঁতেল নই, এ যেমন সত্যি, আবার এটাও সত্যি যে কিঞ্চিৎ অক্ষরজ্ঞান আমাদেরও হয়েছিল বটি, আর আমরা গান্ধারী'র ন্যায় আন্ধাধুন খেলাও খেলছি না। এসব বুঝিয়ে আবার ছয় পিস চাইতে দোকানদার আবার জানাল, দাম দাঁড়াচ্ছে চল্লিশটাকা। মা'র লুপ্ত ক্ষাত্রতেজ তখন ফুটে বেরিয়ে এল। মা'দের এককালে উপাস্য দেবী ছিলেন মা যশোরেশ্বরী(খাঁড়াহস্তে) - প্রতাপ রায়দের বংশের উপাস্য দেবী যিনি। সে প্রতাপ না থাকলেও মা'র প্রতাপ বিলকুল রয়েছে, তা মা খাঁড়া না তুলেই বুঝিয়ে দিল। 


"কী পেয়েছেন কী আপনি? আমরা কি (ছাপার অযোগ্য) নাকি? তখন থেকে (ফাংশনের গানবাজনায় শোনা গেল না) -এর মতো কথা বলে চলেছেন? একটা (ছাপার অযোগ্য) (শোনা গেল না) কোথাকার!" 


দোকানদারের স্যাঙাত বিপদ বুঝে মা'কে ঠেকাল।

"না দিদি, হেঁ হেঁ, ও না, হেঁ হেঁ, বোঝেনি, হেঁ হেঁ। আপনি কিছু, হেঁ হেঁ, মনে করবেন না, হেঁ হেঁ।" 


মা তখন চটেমটে বলল,

"চপ দিন, তবে চুপ করব।"

দোকানদার তখন নিজের সকল (অর্থাৎ বাটি) শূন্য করে পকোড়া ঢেলে দিল। 

চিবোতে চিবোতে আরেকপ্রস্থ খাওয়ার প্রস্তাব ফেলল মা - আর আমি তাতে ভোট দিয়ে পাশ করিয়ে দিলাম। মা তখন অঙ্গুলিনির্দেশ করে দোকানদারকে বলল, 

"দাদা, ওই বড়ো বড়ো পকোড়াগুলো দেবেন।"

দোকানদার দাদা চটে ছিলেন - তাঁকে দাম বলতে না দিয়েই আমরা টাকা দিয়ে দিয়েছি (এবং ওনার সাক্ষরতা অভিযানকে ব্যর্থ করে আমরা প্ল্যাকার্ড পড়ে নিয়েছি) বলে। এখন উনি ঝাঁপিয়ে পড়ে পকোড়াদের বুকে টেনে নিয়ে বললেন,

"না না, ওদের 'টাচ' করবেন না!"


মা গেল ক্ষেপে। পকোড়া এবং সুচিত্রা সেন যে এক নয় - সুচিত্রা সেন বারণ করার পরেও উত্তম তাঁকে 'টাচ' করলেও পকোড়াদের যে 'টাচ' করা একেবারেই উত্তম নয়, এই মর্মে একটা নাতিদীর্ঘ, পুতিবৃহৎ বক্তিমে ছাড়ল। আবার মুস্কিল আসান হল পেছনের 'হেঁ হেঁ' বাবু। সে আবার সামাল দিল,

"হেঁ হেঁ, দিদি, বুঝছেনই তো, হেঁ হেঁ.."


বোঝা ততক্ষণে হয়ে গেছে। আমরা পা বাড়ালুম রিকশার দিকে। সে আরেক চিত্তির। রিকশাওয়ালা মাতাল। হাতে 'মাতাল সমগ্র' নিয়ে সামনেই যে এহেন মূর্ত উদাহরণ দেখতে পাব, তা ভাবিনি। কথা এভাবে এগোল -


মা - "স্টেশন যাবেন?"

রিকশাওয়ালা - "যা-আ(হিক)ব।"

মা - "কত নেবেন?"

রি - "পনেরো(হিক)।"

মা - "বারো দেবো। যাবেন?"

রি - "না।"

মা - (জনান্তিকে)"বাবু, এ মাতাল। চল হেঁটে ফিরি।"

(গমনোদ্যোগ)

রি - "দিদি, বারো (হিক) দিন।"

মা - (হন্টন)

রি - "(হিক)দিদি দশ দিন?"

মা - (দ্রুতবেগে হন্টন)

রি - "আচ্ছা আট?"

মা - (প্রায় ছুন্টন)



রিকশাওয়ালা যেভাবে দর কষছিল, তার একটুমাত্র প্রতিফলনও যদি ভার্সেইতে দেখা যেত, তাহলে হয়তো জার্মানিও স্বাজাত্যবোধের পরাকাষ্ঠা হয়ে জাত্যাভিমানের খাঁড়া উঁচিয়ে ইহুদী ঠ্যাঙাতে বেরোত না, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-হিটলার-হলোকস্ট-বার্লিন-নাৎসি-কটাকট ইত্যাদি কল্পনাই থেকে যেতো। আর দাঁড়াতে সাহস হয়নি। সোজা বাড়ি। 


যা বুঝলাম, একদিনে অনেক আঁতেল হয়েছি। মন ভ'রে গেছে। তবে, এ'বছর হয়তো আর নয় - ভালো জিনিস অল্প হলেই ভালো। আবার পরের বছর। বেশি আঁতেল হয়ে গেলে খুব মুশকিল কিনা - তখন আবার পালা করে নন্দন, ফিল্ম-ফেস্টিভ্যাল যেতে হবে, কলকাতা বইমেলায় নিজের লেখা বই বেচতে হবে, জটিল বইয়ের নাম বলতে হবে, দুর্বোধ্য কথা বলতে হবে। ল্যাটিনে বলে, রেডুকশিও অ্যাড অ্যাবসুর্ডুম - অর্থাৎ কিনা, বেশি টানাহ্যাঁচড়া করলে কোনোকিছু অ্যাবসার্ডিটি অর্থাৎ অবান্তরের স্তরে পৌঁছে যায়। অতএব, 'আস্তে আস্তে ভাঙো।'


অলমিতি।


Tuesday, 7 December 2021

আয়না

 একটা হিমঘর থেকে আরেকটা হিমঘরের দূরত্ব অনেক। বা হয়তো দূরত্ব নেই; সবটাই আপেক্ষিক। এই আপেক্ষিকতাবাদের টানাপোড়েনে পড়ে অকালশৈত্যের হতাশায় শান্তি খুঁজতে যান আপনি। চাদর টেনে টেনে পরিচিত মুখ খুঁজতে খুঁজতে আনমনে কখন যে নিজেকেই খুঁজতে আরম্ভ করে দেন, বুঝতে পারেন না৷ 


কাগজকলম ছুঁড়ে ফেলে পেছন ফিরতেই আয়না দেখতে পান। আয়নাতে নিজেকে দেখতে আপনার কেমন একটা লাগে। দেখাতে চান না আপনি, মুখ লোকান। মুখ দেখালেই সত্যিটা বেরিয়ে পড়বে। আপনি সত্যি খুঁজতে চাননা, ধর্মাবতার সাক্ষী। সত্যি থেকে পালিয়ে আসতে চান, কিন্তু সত্যি পালাতেও দেয় না। 


চিৎকার করে ফেটে পড়ার ঠিক আগের মুহূর্তে আপনার অনুভূতিগুলো থম মেরে যায়। আপনি এলোমেলো হাতড়ে খুঁজতে থাকেন ইতস্তত বিক্ষিপ্ত শব্দগুলো; যেগুলো, আপনি জানেন, দেশলাই ঠেকালে প্রবল বিস্ফোরণে এক লহমায় নিশ্চিহ্ন করে দিতে পারে চরাচর। কিন্তু, আপনি পারেন না। এক অব্যক্ত বেদনায় আপনার সমগ্র অস্তিত্ব নীলচে হয়ে আসে। অবসাদের তলানিতে পৌঁছে আপনি যখন দিকভ্রষ্ট ডুবুরির মতো ত্রস্ত হাতে বিপদসঙ্কেত দিতে থাকেন, ততক্ষণে উপরিতল থেকে আলো আসা বন্ধ হয়ে গেছে। স্বর্গসিঁড়ি বেয়ে যে দেবশিশুর নেমে আসার কথা ছিল, সে আজও আসেনি। হয়তো সে আড্ডা দিচ্ছে পাড়ার চায়ের দোকানে। স্বপ্নে দেখা নবজাতকের মুখ আপনাকে প্রিয়জনবিয়োগের বেদনা মনে করিয়ে দেয়। আপনি জানেন, এই দ্রোহকাল পেরিয়ে গেলেই ফুল ফুটবে, পাখি ডাকবে, আরো যত ফিরোজানীল ধারণাগুচ্ছ আপনি সযত্নে সংগ্রহ করে রেখেছেন আপনার আলমারিতে, তারা সবাই নিজ নিজ রূপধারণ করবে। 


প্রেমিকার গা থেকে ভেসে আসে আপনার ছোটোবেলায় হারিয়ে যাওয়া লজেন্সগন্ধী ইরেজারের গন্ধ। আপনার বারান্দার সামনে ঝুলতে থাকা ওভারহেড তারে বসে পায়রারা যে গুপ্ত আলোচনায় মত্ত, আপনি জানেন, তাতে একদিন ওরা আপনাকেও শামিল ক'রে নেবে। আপনাকে শুধু হালকা হতে হবে। হালকা, হালকা, হালকা...


পথ ছেড়ে বেপথে আসা আপনার বরাবরের অভ্যেস। কিন্তু ফ্রস্ট কসম, তাতে আপনার কোনো ডিফারেন্স হয়নি। হবেও না। ঝরাপাতার পথ আপনার নয়, পাকা রাস্তা আপনার নয়। কোনোকিছুর উপরেই আপনি শেষমেশ অধিকার কায়েম করে উঠতে পারলেন না। যে দুঃখগুলো আপনি একটা ঝুলির মধ্যে পুরে আটকে রেখেছিলেন, একদিন তারাও প্রজাপতির মতো পরপর ডানা মেলে উড়ে গেছে। প্রাক্তন প্রেমিকাদের ভালো থাকতে দেখলে আপনি প্রবল হিংসায় জ্বলেপুড়ে খাক হতে চান, কিন্তু শেষমেশ তাদের ভালো চেয়ে বসেন। আপনি একদিন সব ছেড়ে চলে যেতে চান। সবকিছু ছেড়ে, সবার থেকে দূরে৷ এক দূরাগত অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দুঃস্বপ্নকে দূরে রেখে আপনি চলে যেতে চান। আপনি পারেন না। এই খুচরো না পারাগুলো নিয়েই আপনি 'আপনি' হয়ে ওঠেন। আপনি পারতে চান, পারেন না। প্রবল ব্যর্থতায় ফেটে পড়তে চান, ঘুষি মেরে ভেঙে ফেলতে চান কাঁচের অদৃশ্য দেওয়াল। আর দেওয়ালঘড়ির টিকটিক প্রতিমুহূর্তে আপনার অস্তিত্বকে নিয়ে পরিহাস ক'রে চলে।

Thursday, 19 August 2021

নব জন্মদিন

একেকটা জন্মদিন আসলে নিজের মৃত্যুদিনের কথা মনে করিয়ে দেয়, এমনটা শুনেছিলাম। হয়তো তাই। বহতা জীবন, বহতা এই নদী, তার শেষ আছে। সকলই ফুরায়, ফুচকার প্রায়, পড়ে থাকে শালপাতা। এবার প্রশ্ন হচ্ছে, আমার জীবনে এই শালপাতা কী? শুধুই কি আমার স্মৃতি? আমার আমিটা থাকবে না? আমি লেখক নই, মাইকেল বা শেকসপীয়রীয় দাবি জানিয়ে যেতে পারবোনা, যে আমার লেখা থাকবে, তা যুগে যুগে আমাকে বাঁচিয়ে রাখবে। কিন্তু, এই যে আমি, হাটেবাজারে চালালু কেনার গোষ্ঠিক পরিচয়ের বাইরেও যে একটা ব্যক্তিক পরিচয় আছে আমার, সেটা কী দিয়ে রেখে যাব? লেখাই কি শ্রেষ্ঠ নয়? আর যে আমি কিছুই পারি না! লেখাও যে পারি, এমনটাও নয়। তবু অসংখ্য না-পারার মধ্যেও যে কিছু পারাটুকু পড়ে থাকে, তারমধ্যে লেখাটুকুই একমাত্র আশ্রয় বলা যেতে পারে।


এবার প্রশ্ন হচ্ছে, লিখবো, তো লিখবো কী? কবিতা? সে লেখা তো সোজা, --


''আকাশেতে ছিলো পাখি

  উড়তো একা একা

  একদিন সে পড়লো কেটে

  পেলো না কেউ দেখা..'

নাহ্, মিলে যাচ্ছে। মিলে গেলে তা কবিতা নয়। খবিতা, গবিতা, ঘবিতা, নিদেনপক্ষে ঙবিতা বা চবিতাও হতে পারে, তবে কদাচ কবিতা নয়। তবে.. 


'আকাশের গায়ে লেগে থাকে পাখির ডানা

তার সোচ্চার ডাক যেন তালিবানের বন্দুকের গুলি

একদিন সে পেড়েছিলো ডিম

লোকে ভাবে উগ্রবাদী বোমা

বোমা দেখে লেগে যায় দাঙ্গা

মানুষের কান্না মরুভূমি হয়ে ওঠে...'



হ্যাঁ, এটা খানিকটা হয়েছে। পাখি আছে, তার সোচ্চার ডাক আছে, তালিবান সমস্যা রয়েছে, ডিম রয়েছে, লোকের বোমা ভাবাও রয়েছে, তাতে দাঙ্গা, মানুষের কান্না, মরুভূমিও রয়েছে। বিশ্বসমস্যার কথা লিখেছি। এবার শুধু লিটল ম্যাগাজিন ধরে ছাপানোর অপেক্ষা। কিন্তু, নাম কী দিই? 


'ঙর্ঘৎহৃয' - এই নামটা বেশ ভালো। বোধগম্য নাম হলে ভালো লাগে না।


ধুর, এতো সোজা জিনিস লিখতে ভাল্লাগে না। তবে কি.. গল্প লিখব? গল্প লেখাও সোজা। একটা দম্পতি থাকবে, তাদের কোভিড হবে, তারা মরে যাবে, কিন্তু মরার আগে তারা জানতে পারবে তাদের আরেকটা করে বিয়ে আছে, তারাও কোভিডে মারা গেছে। হুঁ হুঁ বাবা, দেশ ছাপলো বলে। তাড়াতাড়ি লুকিয়ে ফেলতে হবে, নইলে আমি তো খুব বড়ো লেখক, আমার লেখা 'চুরি' হলো বলে। আলুচুরিমুলোচুরি ছেড়ে লেখাচুরি এখন বড়ো ব্যাপার। সবার লেখা চুরি হচ্ছে। 



কিন্তু, লিখিটা ঠিক কী? প্রবন্ধ? 


'এতদ মুমূর্ষু কিয়ৎ প্রদ্যোত কিয়ৎ অভ্রংলিহ হর্ম্ম্যরাজি চার্বাক, অর্হৎ আর্ষপ্রয়োগ কিঞ্চিৎ কুজ্ঝটিকা অলত্র ভুসুকু? বৈরী অগ্নিমীলে রাজ্ঞী কুর্বক, দ্যুঃ ম্রিয়ত কপোতাক্ষ।'


এই প্রবন্ধটা একটু সোজা হচ্ছে। আরেকটু কঠিন দেখি।


'আসলে ফ্রয়েড যেটা বলেছিলেন, সেটা লিখতে হলে দেরিদার ডিকনস্ট্রাকশন থিওরি চাই। বাখতিন বিড়ি খেতেন না, এই মর্মে গ্রামসির যে পোস্টকলোনিয়াল ছড়াটা আছে, তার বিরুদ্ধে সোচ্চার প্রতিবাদ করেছিলেন চমস্কি(চমচম থেকে চমস্কি - চমৎকার প্রকাশনী, পৃষ্ঠা ৬৯)। ব্যাপারটা হলো, যখন গ্রীষ্মকালে ভীষ্মলোচন শর্মা তান ধরেছিলেন, তখন নীরদ সি চৌধুরী বলেছিলেন, বাঙালি পিৎজায় পাইন্যাপল খায়। পিৎজায় পাইন্যাপল আমরা দেখতে পাই ফেলিনির লা দোলচে ভিতায়, যেটা নিয়ে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, কীভাবে কমিউনিস্ট উপেনের ভিটা চলে গেছিল (লা দলচে থেকে উপেন - ভিটা থেকে ভিতার পোস্টমডার্ন, পোস্টকলোনিয়াল, পোস্টমর্টেম ও পোস্টঅফিস বিশ্লেষণ, অত্যাধুনিক প্রকাশনী, পৃষ্ঠা ১০৮)। 

আমাদের বুঝতে হবে, সার্ত্রে ঠিক কী কী কারণে লুঙ্গি পরতেন না, তার জন্য মিলের উপযোগিতাবাদ ঠিক কতটা দরকারি। আলড্যুস হাক্সলের হ্যাল খাওয়ার ফলে ১৯২৯ এর বিশ্বব্যাপী আর্থিক মন্দায় কীভাবে হাংরি জেনারেশন প্রভাব ফেলেছিল, তার প্রপঞ্চের ব্যাখ্যামূলক দ্বন্দ্ববাদ আমাদের শেখায়, কেন সোনম গুপ্ত বেওয়াফা। মধুশ্রী মুখার্জি চার্চিলের ব্যাপারে বলতে গিয়ে চার্চিলের সব চাল খেয়ে ফেলার যে দাবিটা জানিয়েছেন, সেই দাবিটা নিয়ে নীৎশে বলেছেন, ভগবান মৃত, আর রোঁলা বার্থ ইজ্ ডেড। জরাথ্রুষ্ট তাতে রুষ্ট হয়েছেন, তার পেছনে বিরোধীদের যে আর্থসামাজিক হাত রয়েছে, সেটা কিন্তু সুস্পষ্ট দেখা গেছে বার্গম্যানের সেভেন্থ সিলে। মৃত্যু এসে দাবা খেলছে, আর মানিকদা লাফাচ্ছেন 'শতরঞ্জ কি খিলাড়ি, শতরঞ্জ কি খিলাড়ি' বলে। বাকিটা স্বতঃসিদ্ধ, অনেকটা শ্রোডিঞ্জারের বেড়াল মজন্তালি সরকারের মতো।'



এইটাও বেশ সোজা হল। তাহলে....


নাটক? 


'রাজা - নন্দিন, তোমাকে ভাবছি মনে, আর হচ্ছি রোগা দিন দিন।

নন্দিনী - উঁহ, মিনসের মুখে জুতো।

রা - দাও মম মুখে জুতো, তবুও যে পাবো তোমাকে চুমু খাওয়ার ছুতো!

বিশু পাগলা - এইও রাজা! কিছু কিছু দুঃখ আছে, যাকে ভোলার মতো দুঃখ আর নেই!

রা - কিন্তু আমি তো সেটা...

বি - চোপরাও! বলছি না, কিছু কিছু দুঃখ আছে, যাকে ভোলার মতো দুঃখ আর নেই?

রা - কিন্তু আমি..

বি - চোপ শালা ক্যাপিটালিস্ট জালের আড়ালে থাকা মাল, বুঝছিস না, কিছু কিছু দুঃখ আছে, যাকে ভোলার মতো দুঃখ আর নেই??

(ইউকুলেলে বাজিয়ে 'তোমায় গান শোনাব' গাইতে গাইতে প্রস্থান)

রা - শালা, এ ক্যামন পাঁচ অক্ষরের পাগল? দেখে যেন মনে হয় নন্দিনের বাঁধা ছাগল!

(হঠাৎ এক প্রৌঢ়ের আবির্ভাব)

ন - এ কী, রঞ্জন! তুমি বেঁচে? এরকম গোলগাল, টাকমাথা কীভাবে হলে? ওগো, তুমি তো যৌবনের দূত, আমার পান্তোভূত!


অধ্যাপক(পাশ থেকে হঠাৎ এসে) - ধুত্তোর, এ তোমার রঞ্জন না। ইনি বেস্টসেলার লেখক। যেখানে খুশি সেখানে যান স্বেচ্ছায়, এবার তোমাকে রাজাকে জড়াবেন কেচ্ছায়। 

ন - অ! দিতে হয় খ্যাংরা দিয়ে পিটিয়ে!

রা - তোমার হাতের খ্যাংরা, আহা, যেন বেগুন বড়ির ঝোলে ট্যাংরা!

ন - এই কে আছিস, এই দু'পয়সার অ্যান্টনি ফিরিঙ্গিকে থামা তো! 

রা - আজকে আমায় থামায় কে? আজকে বড়ো সুখের দিন, নাচব আমি আর নন্দিন!


ন - ইল্লি? আমি কি বাসন্তী নাকি, করছিস শুধু খিল্লি?

(মোড়ল আর গোঁসাইয়ের প্রবেশ)

মোড়ল - বাজা তোরা রাজা যায়!

গোঁসাই - আহা, কী শান্তি। মা নন্দিন, এদিকে আয় মা।

ন - তুমি কে বাবা? দেখে তো মনে হচ্ছে আশারাম বাপু!

গোঁ - না মা, আমি শুধু বাণী দিই।

ন - ও, সন্দীপ মাহেশ্বরী টাইপ। ইউটিউব চ্যানেল আছে? কটা টেড টক দিয়েছো?

গোঁ - আহারে, অবলা নারী। নারীর ভাষা কিছুই বোঝা যায় না। এইজন্যই নারীরা পদতলে থেকে গেলো।

ন - এসব আলফাল বকলে এমন পোস্ট ছাড়ব না ফেসবুকে, তোমার স্ক্রিনশট নিয়ে লোকে লাখ লাখ যুগ হিয়ে হিয়ে রেখে দেবে, তখন সব ইয়ে বেরিয়ে যাবে!

গোঁ - না ভাই, এ বড়ো কঠিন ঠাঁই। আসি রাজাদা। চলো মোড়ল ভাই। 

মো - চলুন গোঁসাই। বাজা তোরা, রাজা যায়।

রা - ধুত্তেরি, এদের চক্করে নেই প্রাইভেসি, শুধু চ্যাংড়ামি বেশি বেশি। নন্দিন, চলো আমরা ওইখানে যাই, যৌবনের গান গাই। 


(মালা যে তার ভরেছে তার পাকা ফসলে গাইতে গাইতে প্রস্থান রাজা ও নন্দিনের)।'



এটাও সোজাই হচ্ছে। আচ্ছা, লোকে যে তাহলে বলে লেখা নাকি কঠিন? আমার তো বেশ সোজাই লাগছে। শেষ একবার ফেবুকবিতা ট্রাই করে দেখি...


'তোমার আদরের দাগ আমার ডানায় লেখা আছে

যেমন লেগে থাকে পিরিয়ডের রক্তের দাগ।'


এটা বরং একটু কঠিন। পিরিয়ড না আনলে ফেবুকবিতা হয় না, আর পিরিয়ড তো মাস না ফুরোলে আসবেও না। বড্ড বেশিই কঠিন। যদি হই, ফেবুকবিই হবো, মনস্থির করলাম। ওগো কাব্যদেবী, 


ফুটি যেন ফেবুতলে, মানসে মা যথা ফলে, 

মধুময় ফেবুকবি, কী বসন্ত, কী শরদে।



আজ আমার নব জন্মদিন হলো, ফেবুকবি রূপে। শুভ জন্মদিন, কবি। 😊

Sunday, 9 May 2021

পোচিসে বোইসাখ...

 আজকে দাদুর জন্মদিন.. 🥳🥳 শুভ জন্মদিন দাদু.. তোমাকে ছাড়া বাঙালি হাগতেপাদতেকাঁদতে.. (এর সঙ্গে মিলিয়ে আরো একটা জিনিস হয়, লিখলাম না আর, বুঝ লোক জান যে সন্ধান😛) পারত না.. তোমার কবিতা শুনে সকালে উঠি, তোমার উপন্যাস পড়ে রাতে ঘুমোই(নিন্দুকেরা বলে এত বাজে উপন্যাস যে পড়লেই ঘুম পেয়ে যায়), তোমার গান গেয়ে কাজ শুরু করি। 


কী করোনি বলো তো দাদু! সেই ছোটো থেকে তুমি বাড়ির চাকরদের ইয়ে জ্বালাতে, যে জন্য তোমাকে শ্যাম চাকর আটকে রাখত খড়ির গণ্ডি এঁকে - এর বাইরে বেরোলেই উত্তাল ক্যালানি। তুমি চুপচাপ বসে জানলার বাইরে মেয়েদের স্নান দেখতে। লোকে যে বয়সে হাফপ্যান্ট ছেড়ে ফুলপ্যান্ট পরে, সেই বয়সে তুমি একটা কেচ্ছা করে দিলে! লাস্টে রঞ্জন বাঁড়ুজ্যে সেটা বেচে বেস্টসেলার করে নিল.. যাই হোক, সেসবে গিয়ে আর লাভ নেই...

জমিদারি সামলাতে গেলে, গিয়ে শুধু ফাটিয়ে কবিতা আর ছোটোগল্প লিখলে, আর ভাইঝিকে চিঠি লিখে গেলে। যদিও তুমি কাকা হেব্বি বুদ্ধিমান, এমন কিছু চিঠিতে লিখলেই না, যেটা প্রকাশ পেলে আবার স্ক্যান্ডাল। আগেকার দিনে তো স্ক্রিনশট ছিল না, তা সত্তেও তোমার এর'ম সাবধানতা.. তুমি সত্যিই সেরা। সারাজীবন নারীদাড়িগাড়ি নিয়ে থেকে গেলে.. আর কিছু লেখা লিখলে, বাপরে! এত লেখা একটা মানুষ তার জীবদ্দশায় পড়ে শেষ করতে পারে না, আর তুমি সেটা লিখে ফেললে??? কোন এক মারোয়াড়ি বলেছিল, সুধু কাগোজ আর কোলোমের বেওসা কোরে উনি লাখো কামায় নিলেন। আর তোমার প্রেম! আগে নাবিকদের বন্দরে বন্দরে বৌ থাকত, তোমার প্রেমিকা থাকত দেশে দেশে.. শেষমেশ আর্জেন্তিনাতেও!!! লোকে আর্জেন্তিনা চেনে মেসির জন্য, তুমি চেনালে ওকাম্পোর জন্য!! এইসব দেখেই গান্ধীজি তোমাকে 'গুরুদেব' বলে ডাকতেন। গান্ধীজি শুধু কুমারী মেয়েদের নিয়ে ব্রহ্মচর্য প্র‍্যাকটিস করতেন, তুমি সেসবেরও ঊর্ধ্বে - নইলে গুরুদেব হলে কীভাবে! সীমার মাঝে অসীম তুমি, বাজাও আপন সুর। তোমার থেকে শেখার, জীবনে এত ম্যাডাম ক্র‍্যাকারোলজির পরেও তোমার নামে কেউ #মিটু কীভাবে করেনি। কী তব চার্ম, কেউ করতে পারেনি তোমার ফেমের হার্ম? তোমার বিরোধী গোষ্ঠী তোমাকে 'আধুনিক নও' মর্মে খিস্তি মারছে বলে একটা অসাধারণ রকমের যাচ্ছেতাই উপন্যাস লিখে ফেললে, যেটার শুরু থেকে শেষ একই রকমের খাজা! যদিও তুমি গুরুদেব, তুমি বুঝেছিলে বহু বছর পরে ওটা পড়ে সমগ্র বাঙালি আঁতেলগোষ্ঠীর সম্মিলিত অর্গ্যাজম হবে। লহ প্রণাম গুরুদেব, লহ প্রণাম।


জোকস অ্যাপার্ট, বাঙালি নামক এই থার্ডক্লাস জাতের গর্ব হওয়া উচিত, রবীন্দ্রনাথ আমাদের। রবীন্দ্রনাথের দর্শন, রবীন্দ্রনাথের দর্শনের যাত্রা, রবীন্দ্রনাথের কবিতা, রবীন্দ্রনাথের আধুনিকতা, রবীন্দ্রনাথের জাতীয়তাবাদ, স্বদেশচেতনা.. কী ছেড়ে কী নিয়ে লিখি? যদি উনি শুধুই ছোটোগল্প, বা শুধুই গান, বা শুধুই কবিতা, বা শুধুই নাটক লিখতেন, আর কিচ্ছুটি না করে, তাহলেও রবীন্দ্রনাথ উৎকর্ষতার শিখরেই থাকতেন, তাঁর প্রভা কিছুমাত্র কমত না।

ছোটগল্প নিয়ে বলি একটু। রবীন্দ্রনাথের মতো ছোটোগল্পকার বিশ্বসাহিত্যে বিরল। ওরকম অসাধারণ ঠাসবুনোন, ক্লাইম্যাক্স রচনা, ক্যাটাস্ট্রফিতে এসে সজোরে ধাক্কা, অসামান্য মেটাফর এবং ইমেজারির প্রয়োগ - এবং, সর্বোপরি, জীবনের এক ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অধ্যায়ের উপর লাইমলাইট ফেলে একটা সার্বজনীনতা প্রদান - এর তুলনা থরে-বিথরে পাওয়া যায়, এমনটা আমার জানা নেই অন্তত। আবার, উনি ছোটোগল্পের টেক্সটবুক সংজ্ঞা ও উদাহরণ - এমনটা ভাবাও ভুল। যেকোনো শ্রেষ্ঠ শিল্পী মাত্রেই তাঁর শিল্পকর্ম নিয়ে প্রচুর এক্সপেরিমেন্ট করেন, রবীন্দ্রনাথও তার ব্যতিক্রম নন। তাঁর ছোটোগল্পের উৎকর্ষতার একটা ছোট্ট উদাহরণ দেওয়ার লোভ সামলাতে পারলাম না। 

'পোস্টমাস্টার' আশা করি সকলেরই পড়া। আমি নিশ্চিত, বিশ্বসাহিত্যের যেকোনো লেখক 'পোস্টমাস্টার'এর মত একটা ছোটোগল্প লিখতে পারার জন্য নিজের ডানহাতটুকু অবধি কেটে দিতে রাজি হবেন। পোস্টমাস্টার শহরের প্রতীক, রতন গ্রামের। পোস্টমাস্টার রতনকে পড়াতে পড়াতে 'অল্পদিনেই যুক্ত-অক্ষরে উত্তীর্ণ' হওয়ার একটা প্রসঙ্গ আছে। যুক্তাক্ষর নয়, যুক্ত-অক্ষর --- একটা হাইফেনের দূরত্ব, একটা ব্যবধান, যে ব্যবধান বুঝিয়ে দেয় পোস্টমাস্টার এবং রতন কখনোই এক হতে পারলেন না, পারেন না। শহর আর গ্রাম কাছে আসতে পারে, তারা মিলিত হতে পারে না -- এই ট্র‍্যাজেডিটাই আবার তুলে ধরেছেন তিনি শেষ প্যারাগ্রাফে, যেখানে রতন ওরফে গ্রাম নদীর ধারে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখে শহরের ফিরে যাওয়া - মাঝে একটা প্রতিশ্রুতি, একটা আশ্বাস, একটা কথা দিয়ে না রাখার ব্যবধান, যার ফলে যুক্তাক্ষর অনেকটা ব্যঞ্জনা নিয়ে যুক্ত-অক্ষর হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। 

এ'রকম লেখা যিনি লিখতে পারেন, তিনি মানুষ নন।

তাঁর কবিতা বা গান নিয়ে না'হয় নাই বা বললাম। সেই নিয়ে তো হুজুগ করার লোকের অভাব নেই। শুধু এটুকুই, যে জীবনের শুরুর দিকে তিনি বসে লিখছেন 'নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ', মাঝবয়েসে এসে লিখছেন 'সোনার তরী' শেষ মুহূর্তে এসে যিনি 'তোমার সৃষ্টির পথ রেখেছ আকীর্ণ করি' -- আত্ম থেকে ব্রহ্মের দিকে এই যাত্রা, এই অসীমের যাত্রা, এই উপলব্ধি, ক'জন পারে? তাঁকে যে ঋষি বলা হয়, তা কি অমূলক? সাহিত্যমূল্যে না'হয় বা নাই গেলাম।

আবার, নাটক? রক্তকরবী? রক্তকরবী কি শুধুই রাজার  বিরুদ্ধে রঞ্জনের জেহাদ? রক্তকরবী কি শুধুই সেই জানলার বাইরে দিয়ে তাঁর দেখতে পাওয়া, লোহালক্কড়ের মধ্যে দিয়ে ফুটে ওঠা রক্তকরবীর ফুল? রক্তকরবী কি এখনকার যুগে প্রযোজ্য নয়? 'ডাকঘর'? 'অচলায়তন'? নাট্যদ্বন্দ্ব ইত্যাদি লিটারারি ডিভাইস না'হয় তুলে রাখলাম আবারও। বেশ। কিন্তু তাঁর চিন্তন, তাঁর মনন, তাঁর ভাবনা? লিখতে তো সবাই পারে, কিন্তু প্রাসঙ্গিক, কালজয়ী হন ক'জন? বিশ শতকের শুরুর দিকে বসে একটা লোক কী ছাইপাঁশ লিখে গেল, আমরা একুশ শতকে পড়ে ভাবছি, এই ভাবনা কীভাবে সম্ভব? এখনও কীভাবে এগুলো এতটাই সত্যি? 'বিদূষক' পড়ে আমরা সকলেই আমোদ পাই, বাহ্ কী মজার গল্প! কিন্তু এটা বুঝি না, কীভাবে তিনি বুঝেছিলেন ও বোঝানোর চেষ্টা করেছিলেন, রাষ্ট্র কীভাবে ইতিহাস গড়ে তোলে, কীভাবে ইতিহাস রচনা করে। জাপানি আগ্রাসন সম্পর্কে ব্যথিত হয়ে বলতে পারেন 'ওরা শক্তির বাণ মারছে চীনকে, আর ভক্তির বাণ বুদ্ধকে' - তিনি অতিমানব। যিনি ঘরে-বাইরের মত উপন্যাসের মধ্যে দিয়ে একটা অসাধারণ মেটাফর নিয়ে আসতে পারেন, শেষের কবিতা'য় নিজের প্রাতিষ্ঠানিকতাকে নিজেই ব্যঙ্গ করছেন, তিনি কি সাধারণ? বলছেন, অতিমানব নন?

আর কত বলব? কাগজ ফুরিয়ে যাবে, ওনার লেখার ব্যাপারে বলা ফুরোবে না। রবীন্দ্রনাথ আসলে তাঁর লেখা ঘরে-বাইরের সেই রঙিন কাঁচ লাগানো বারান্দা, যার মধ্যে দিয়ে আলো এসে ঝিলমিল করে, আর তাঁর চরিত্রের বিভিন্ন শেডগুলো এসে ধরা দেয় তাঁর সৃষ্টির মধ্যে, আর আমরা ধন্য হই। আফশোস এটাই, রবীন্দ্রনাথ যেটা নিজে পছন্দ করতেন না, আমরা রবীন্দ্রনাথকে সেই স্যাক্রোস্যাংটই করে রেখে দিলাম, মূর্তিপুজোয় বিশ্বাসী হয়ে গেলাম, গোঁড়া হয়ে উঠলাম। মলয় স্যার, আমাদের অতি প্রিয় মলয় রক্ষিত স্যার একবার লিখেছিলেন(খেয়াল আসছে না সেটা অন্য কারোর কথা না ওনার নিজের), "কবিগুরুকে আমরা ড্রইংরুমে সাজিয়েই রাখলাম, নিতে পারলাম না।"

'ঠাকুরমার ঝুলি'

 আজকে আমার ঠাকুমার মৃত্যুবার্ষিকী। ২০২১ সালের এই দিনেই তিনি গত হয়েছিলেন। এইটুকু পড়েই অনেকে হয়তো, 'ওঁ শান্তি, আত্মার শান্তি কামনা করি, তি...