অন্ধকার, অন্ধকার, অতল। তলিয়ে যেতে থাকার এক গহ্বর। তলিয়ে যেতে যেতে আত্মবিস্মৃতির গভীরে ডুবে যাওয়া। বাইরে-ভিতরে অজস্র লড়াই লড়তে লড়তে নিজের অস্তিত্বকে পতঙ্গ-সম সংকীর্ণ করে দেখতে থাকা, এবং নিজের অস্তিত্বকেই শেষমেশ হারিয়ে ফেলা।
জীবন সততই সুখের, অবশ্যই৷ নিরন্তর আনন্দধারা বয়েও চলে সর্বদাই। কিন্তু সবার জীবন-অভিজ্ঞতা সমান হয় না, ফলে অনুভূতির আঙ্গিকও পালটে পালটে যায় ব্যক্তিবিশেষে।
ধরুন, আপনি এমন একজন মানুষ, যাকে আজন্ম বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে যে সে অবাঞ্ছিত। আশেপাশের প্রবল ব্যক্তিত্বের চিরহরিৎ বৃক্ষের সামনে লতা-সম আপনার অস্তিত্ব প্রস্ফুটিত হতেই পারেনি। আপনি সমানে আত্মবিশ্বাসের অভাবে ভুগতে থাকেন। তলিয়ে যেতে থাকেন অবসাদে। আত্ম-ঘৃণা আপনাকে কুরে কুরে খেতে থাকে ঘুণপোকার মতো। আপনি ক্রমাগত কুঁকড়ে যেতে থাকেন। মনে হতে থাকে, আপনার অস্তিত্ব গুবরে পোকার মতোই ঘৃণ্য, যার মৃত্যুতে সবাই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলবে; বা, বাবাকে খুশি করতে গিয়ে নিজেকে শেষ করে দেওয়াই শ্রেয়। আপনি ভাবছেন, আপনাকে সবাই বিচার করে চলেছে ক্রমাগত, দোষারোপ করে চলেছে, কাঠগড়ায় দাঁড় করাচ্ছে -- অথচ তার কারণ আপনার জানা নেই। আপনি নিজের প্রেমাস্পদকে মনের কথা জানাতে পারেন না। নিজের সমস্ত বেদনাকে হৃদয় নিংড়ে, সমস্ত রক্তকে কালির আখরে ঢেলে যে আখরছাঁদ সাজাচ্ছেন, সেই সব কাজকে পুড়িয়ে দিতে চান আপনি - যেন আপনার ঘৃণীত অস্তিত্বের সঙ্গেই তা একেবারে শেষ হয়ে যায়, যেন বিশ্বমাঝে আপনার অস্তিত্বের কোনো প্রমাণ না থাকে।
এই চূড়ান্ত অবসাদ, অস্তিত্বসংকট এবং অস্তিত্বের বিচ্ছিন্নতা, যার উদযাপন হয় না বা কাম্যও নয়, সেই অস্তিত্ব-অনস্তিত্বের দ্বন্দ্বের জন্মদিন আজ। আজ ফ্রানৎস কাফকার জন্মদিন। সেই কাফকা, যাঁকে আমরা নিজেদের আপাত-দুঃখের ট্রমাবন্ডিং-এর স্বার্থে সমাজমাধ্যমের পাতায় 'বাজারি' করে তুলেছি৷ কাফকাকে, কাফকার বেদনাকে বুঝতে গেলে তাঁকে একাকী খুঁজতে হবে, তাঁর সঙ্গে বসতে হবে, তাঁর মাথায় সমব্যথার হাত বুলিয়ে দিতে হবে - যা তিনি জীবদ্দশায় পাননি। তাঁর রক্তাক্ত হৃদয়ের সোচ্চার উদযাপন তিনি কখনো চাননি। কাফকাকে খুঁজতে গেলে তাই উদযাপনের রাজসড়ক থেকে নেমে এসে একলা গলিপথে ঢুকতে হবে, যেখান দিয়ে মেঘলা দুপুরে বিষণ্ণ একজোড়া চোখ, বিদীর্ণ হৃদয় এবং প্রবল আত্ম-অবিশ্বাস নিয়ে উদাসীন, একা হেঁটে চলেছেন ফ্রানৎস কাফকা।

No comments:
Post a Comment