Wednesday, 9 November 2022

রাইটার্স ব্লক-টক...

 আজকাল আর কিছু লিখতে পারি না৷ অজস্র না-পারার মধ্যে যে সামান্য পারাটুকু পারানির কড়ি করে এগিয়ে চলার জোর পাচ্ছিলাম, সেটা ছিলো লেখালিখি। হারাধনের ন'টি ছেলেকে ফলো করে সেও যে কখন কেলো করে গুটিগুটি পায়ে বিদায় জানিয়ে 'জয় মা ভবানী' বলে ভাঁড়ে মা ভবানী হয়ে গেছে, সেটা বুঝতে পারিনি, বা হয়তো বুঝতে পারলেও মেনে ও পেনে নিতে পারিনি, ফলে লেখার চেষ্টা জোরকদমে হু-হু-হুঙ্কার দিয়ে চালিয়ে গেছি।


আজকাল যখন লিখতে বসি, ভেতরে সারাক্ষণ হাতড়ে চলি শব্দ। আগে লেখার জন্য বিন্দুমাত্র ভাবতে হতো না। খারাপ হোক, ভালো হোক, কিছু না কিছু লেখা বেরিয়ে আসতো। এখন লিখতে বসলে একটা কি দুটো শব্দের পর আর এগোতে পারিনা। মনে হয়, ধুর, এটা কী লিখছি? কেন লিখছি? কেন লিখব এইসব? প্রথম কথা, কেউ পড়বে না। এটা শুনে হয়তো মনে হতেই পারে, যে না পড়বে তো না পড়ুক! কী এসে যায়? এসে যায়, আমার অন্তত খুব এসে যায়। আমি কাফকাও না, জীবনানন্দও না। খুব সামান্য এক মানুষ, আশেপাশের কেউকেটাদের দেখলেও বুক (এবং আরো অনেককিছু) কাঁপতে থাকে। আমি ওরকম 'লিখতে হয় বলে লিখে যাচ্ছি, নাহলে তো, কবেই কিবোর্ড ভেঙে দিতাম' মার্কা ভাস্করোচিত ধ্যাষ্টামির সারেগামা বাজাতে পারি না। আমি লিখবো, লোকে পড়বে, লোকে মতামত দেবে। নিন্দেই করুক, কিন্তু করুক। আমার ভ্যালিডেশন দরকার হয়, প্রতিমুহূর্তে দরকার হয়। টিনেজার হৃদয়ের থেকেও বেশি ভঙ্গুর আত্মবিশ্বাস নিয়ে চলতে হয় যেহেতু, তাই দরকার হয়।


দ্বিতীয়ত, লিখতে বসলেই মনে হয়, এটা যে লিখছি, এটা কী করছে? আমার চারপাশের অতিশিক্ষিত, অতিবুদ্ধিজীবী, ছবি আঁকলে মকবুলও ফিদা হয়ে যাওয়া এবং লিখলে জয়েসের ভয়েস বেরোনো, হাঁচলে দেরিদা ও কাশলে নেরুদা বেরোনো লোকজন আমার মতো সাবঅল্টার্ন টেনিদার লেখালিখির স্ট্যান্ডার্ড সম্পর্কে সংশয় এনে দিয়েছে। লিখতে গেলেই মনে হয়, আচ্ছা, এই লেখা না কালজয়ী, না দেশকালজাতির সমস্যা নিয়ে কথা বলে, না সরকারকে গালিগালাজ করে, না চারপাশের সমাজকে তুলে ধরে, অতএব এই কায়দার কীইবা ফায়দা? সমাজকে নিয়ে লিখতে যে ইচ্ছে করে না, তা নয়। কিন্তু লোকজন যে ভয়াবহ লেভেলে সেন্সিটিভ, তাতে কিছু বললেই 'ঘ্যাঁ ঘ্যাঁ ঘ্যাঁচাৎ' বলে তেড়ে এসে কামড়ে দেয়। আগেরদিন একজনকে মজার ছলে বললাম কথাপ্রসঙ্গে, যে বাংলাদেশও কিন্তু এককালে পাকিস্তান ছিলো। সে আমাকে দেড় পাতার একটা হ্যাজ টাইপ করে পাঠালো, কেন বাংলাদেশ পাকিস্তান নয়, বাংলাদেশ কেন পাকিস্তান হতে চায়নি বা না হওয়ার চেষ্টা করেছে, কেন বাংলাদেশ সার্বভৌম, কেন বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ করেছিলো, বাংলা ভাষার জন্য কেন প্রাণ দিয়েছিলো…. বাংলাদেশ নিয়ে পড়াশুনো করতে কেউ আগ্রহী হলে বলবেন, সেই ওয়ার অ্যান্ড পিস-এর ছোটোভাই মার্কা মেসেজটি কপিপেস্ট করে পাঠিয়ে দেবো, অনেক জানতে ও বুঝতে পারবেন। যাইহোক, তারপরে এও শুনলাম, রিচার্ড নিক্সন এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে আমার কোনো তফাৎ নেই, কারণ আমরা তিনজনেই এশিয়াবিদ্বেষী। আমি লাফ মেরে দু'হাত পিছনে গিয়ে ভার্চুয়াল নাকখত দিয়ে রেহাই পেলাম। থাক বাবা, আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি। সেখানে যদি সমাজের অসঙ্গতি নিয়ে লিখি, লোকে চন্দ্রিল ছুঁড়ে পেটাবে(চন্দ্রিলবাবু, আমার নামে মানহানির মামলা করবেন না মাইরি, আমাকে আরবদেশে বেচলেও মামলা লড়ার টাকা জোগাড় হবে না)। অতএব, লেখার বিষয় পাই না। মাঝে কবিতা লেখার চেষ্টা করলাম, সেই কবিতা দেখে আমার এক বন্ধু খুব উদ্বিগ্নভাবে জিজ্ঞেস করছিলো, আমার জন্য কাঁকের তৎকাল টিকিট কেটে দেবে কিনা, আমি তাকে কয়েকমাস পরে ফিরে এসে টাকাটা ফেরত দিলেও সে রাগ করবে না। তারপরে আর কবিতা লেখার রিস্ক নিইনি। একটা গল্প লিখলাম মাঝখানে, সেটা পড়ে মা খুব সন্দেহের দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকালো, দিয়ে এসে মুখ হাঁ করিয়ে গন্ধ শুঁকলো। খুব সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো, 'ছিঃ, শেষে ড্রাগস ধরলি? তোর থেকে এটা আশা করিনি।' দিয়ে বাবাকে ডেকে কাঁদতে কাঁদতে বললো, 'ওগো, তোমার ছেলে ড্রাগ ধরেছে শেষমেশ! আমার কপাল পুড়লো গো…' বলে ডুকরে ডুকরে সাহিত্যের মা-কেও কমপ্লেক্স দিয়ে কাঁদতে লাগলো। বাবা গম্ভীরভাবে কাকে একটা ফোন করে ফেললো, বললো, 'হ্যাঁ রে, তোর চেনা ওই নেশামুক্তি কেন্দ্রটার নাম্বারটা আমাকে দিস তো। হ্যাঁ। আর বলিস না, আমার ছেলেটা শেষমেশ বাড়িতে বেকার বসে থেকে থেকে হতাশায় ড্রাগ ধরে ফেলেছে।' অনেককষ্টে বাড়িতে বুঝিয়েসুঝিয়ে বললাম৷ তারপর থেকে আর গল্প লিখিনা, গল্প দেখলেই আঁতকে উঠে দৌড় মারি। একটা প্রবন্ধ অবধি লিখে ফেলার রিস্ক নিয়েছিলাম, তাও রবীন্দ্রনাথের উপর। সেই প্রবন্ধ আমার বন্ধু অমিতায়ু আবার তার বইতে ছাপিয়েও ফেলেছিলো — কিন্তু তারপরে হয়েছে কি, ওর বই লোকে আর কিনছে না - যারা বা কিনছে, তারা সেটা পড়ে ওকে রেগেমেগে ফোন করে বলছে, 'হ্যাঁ, ওটা কী ছেপেছো? ওটা প্রবন্ধ না কবন্ধ? আমার তিন বছরের মেয়ে এর থেকে ভালো রবীন্দ্রনাথের উপর রচনা লেখে।' এসবের চোটে আমাদের প্রায় বন্ধুবিচ্ছেদ হওয়ার জোগাড়। এদের সবার কাছে আমি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ, যে আমি আর কবিতা-গল্প-প্রবন্ধ লিখবো না। আগে প্রেমপত্র লিখতাম, কিন্তু এখন প্রেমপত্র লিখলে প্রেমিকা কটমট করে তাকিয়ে 'ড্যাকরা, মিনসে, মুখে নুড়ো জ্বেলে দিতে হয়' এসব বলে চলে যায়, নয়তো বলে, 'কোন মেয়ের পাল্লায় আবার পড়েছিস শুনি? তার মুখে খ্যাংরা মেরে বিষ যদি না ঝেড়েছি, আর তোকে নাকখত যদি না দিইয়েছি, তবে আমিও বারুইপুরের বিষ মাল নই!'

এসব থ্রেট পাওয়ার পরে মাইরি, আর কি লিখতে ইচ্ছে করে?



তাই আজকাল আর কিছুই লিখি না। ভাবলাম, এই বেদনা সবার সঙ্গে একটু ভাগ করে নিই। এ তো ট্রিট বিস্কুট নয়, যে ভাগ করা যায় না। যদিও, এ ব্যথা কী যে ব্যথা, তা আনজনে ছাই বুঝবে, তবুও, কোনো সজনী যদি রজনীকালের এই ব্যথা বোঝার চেষ্টাটুকু করে, তাতেই সুখমস্তি, অর্থাৎ সুখ ও মস্তি। অলমিতি! (ফ্যাঁচ!)

Luxury v/s Comfort - A ‘Food’ for Thought

In the 2022 culinary-thriller The Menu, the climactic scene was knitted with sheer artistic brilliance, and was extremely symbolic. The male...