প্রিয়তমা,
অনেকদিন পরে আবার লিখতে বসলাম তোমায়। অনেকদিন বলতে, সময়ের হিসেবে মাস দেড়েক। অনেকদিন এইজন্যই, কারণ একটা সময়ে প্রত্যেকটা দিনই প্রায় কিছু না কিছু লিখতাম। এখন লিখতে পারি না একদমই। লেখা আসে না, লেখা পায় না। আমার মধ্যেকার চিন্তাগুলো মাথার ভিতরের এঁদোপুকুরের ডোবাজলে ঘুরতে থাকে, আমার কলম (বা, নোটপ্যাড) প্রসব করতে পারে না তাদের। এই অক্ষম মাতৃত্বের বেদনা এক ব্যাখ্যাতীত শূন্যতায় ভরিয়ে তোলে আমাকে।
অনেকদিন পরে আবার লিখতে বসলাম তোমায়। অনেকদিন বলতে, সময়ের হিসেবে মাস দেড়েক। অনেকদিন এইজন্যই, কারণ একটা সময়ে প্রত্যেকটা দিনই প্রায় কিছু না কিছু লিখতাম। এখন লিখতে পারি না একদমই। লেখা আসে না, লেখা পায় না। আমার মধ্যেকার চিন্তাগুলো মাথার ভিতরের এঁদোপুকুরের ডোবাজলে ঘুরতে থাকে, আমার কলম (বা, নোটপ্যাড) প্রসব করতে পারে না তাদের। এই অক্ষম মাতৃত্বের বেদনা এক ব্যাখ্যাতীত শূন্যতায় ভরিয়ে তোলে আমাকে।
যাকগে। অনেকদিন পরে আবার মনে হল, কিছু লিখি। অগোছালো কিছু চিন্তাকে একজায়গায় আনি। গোছাতে আমি পারি না কিছুই ; সে চিন্তাই হোক, কি পরীক্ষার উত্তর, কি ঘর, কি সম্পর্ক। গোছাতে গেলে হয়তো দরকারি জিনিসটা পেয়ে যাব ; কিন্তু, অগোছালো থাকলে অনেক আপাত অদরকারি জিনিস হঠাৎ হঠাৎ চোখে পড়ে যায়, যেগুলোকে এতদিন ভুলে ছিলাম। ভুলে থাকি। অথচ, থাকতে চাই না। সেই অহেতুক স্মৃতিচারণের একান্ত আপন, একান্ত ব্যক্তিগত মুহূর্তটা, বা অনুভূতিটার জন্যই হয়তো গুছিয়ে তুলতে পারলাম না কিছুই।
তোমার মনে পড়ে, কীভাবে আমাদের আলাপ হয়েছিল? তোমার লেখার প্রুফরিডার এবং এডিটর ছিলাম আমি। অগোছালো হলেও আমি কয়েকটা ব্যাপারে ভীষণ খুঁতখুঁতে ; তারমধ্যে এটা একটা। লেখালিখিতে ভুল আমার একদম সহ্য হয়না। তুমি আমাকে লেখা পাঠাতে, আমি এডিট করে দিতাম। তোমার সঙ্গে খুনসুটি হত টুকটাক। সবজড়িয়ে, দিনগুলো 'সোনার খাঁচাতে' না থাকলেও, মন্দ ছিল না। ভালোই চলছিল। সেখান থেকে তোমার সাথে কথাবার্তা এগোয় অনেক পরে, আস্তে আস্তে ঘনিষ্ঠতা বাড়ে, আবিষ্কার করি একে অপরকে।
সেসব দিনগুলো বড্ড ভালো ছিল। ঘুম থেকে উঠলে জানতাম, দোয়েলের নরম ডানার মত (জীবনানন্দ মশাই, আপনি আশা করি কিছু মনে করবেন না) আদর মাখা সুপ্রভাতী শুভেচ্ছা পাব। জানতাম, অনুচ্চারে হাত বাড়ালেও তোমার নরম হাতদুটো ঠিক খুঁজে নেবে আমার আঙুলগুলোকে। আঙুলে আঙুলে নীরবতার ভাষ্য রচনা করব আমরা। জানতাম, এসবকিছুই জানতাম।
হঠাৎ করে সবকিছু কেমন বদলে গেল। অবশ্য, বদলই একমাত্র স্থায়ী। আমি বদলাই, তুমি বদলাও, তোমার-আমার পারিপার্শ্বিক বদলায়, বদলায় আমাদের শহর, আমাদের সম্পর্কের সমীকরণ, আমাদের ভালোবাসার আঙ্গিক। সব বদলে যায়। জানতাম, জানো। যে মিথ্যে স্তোকের তাসের ঘর বানাচ্ছিলাম আমরা, একদিন ভাঙবেই, জানতাম। জেনেও পিছপা হতে পারিনি। জাটিঙ্গা পাখি কবেই বা আগুনে ঝাঁপ দিতে গিয়ে আত্মসংবরণ করে? পুড়বে জেনেই সে আত্মনিবেদন করে, আর প্রকৃতির কোণে কোণে মন্দ্রিত হয় উৎসর্গের সেই পবিত্র মন্ত্র, সেই পবিত্র নারীর নামে ; 'স্বাহা'।
হঠাৎ করে দূরত্বটা যে বেড়ে গেল, জেনেও বিশেষ কিছু করতে পারিনি। জানতাম, এরকমটাই হবে। আঘাতে-আশঙ্কায়-নৈরাশ্যের কঠোর হস্তক্ষেপে জর্জরিত হয়ে মেনে নিয়েছি, ভালো কিছুর প্রত্যাশী হলে তা ঘটে না।
এই নৈরাশ্যের মধ্যেও, এই শূন্যতার মধ্যেও, এই তুমিহীনতার মধ্যেও যে আলোফুলগুলো ঝরে পড়ে, সেগুলোকে হাতে নিয়ে গন্ধ শুঁকি আমি। আর চোখের সামনে ভেসে ওঠে একটা ছাদ, একটা অন্ধকার রাত, এক আকাশ ভর্তি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র তারা, আর তার নীচে তস্যাধিক ক্ষুদ্র আমি, ও তুমি। বা, আমরা। একে অপরের মধ্যে মিশে যেতে যেতে, প্রবল ভালোলাগার শীৎকারের মধ্যে দিয়ে এক আকাশ ভর্তি তারার আলোকোজ্জ্বলতা মাখা আশীর্বাদকে খুঁজে নেবো আমরা। দূরে কোন বাড়ি থেকে ভেসে আসা একঝলক ডেনভার ছুঁয়ে যাবে আমাদের ;
"Come, let me love you,
let me give my life to you,
let me drown in your laughter, let me die in your arms..
let me lay down beside you,
let me always be with you,
come, let me love you,
come, love me again..."
কোনো একদিন আমরা বৃষ্টিতে ভিজব। তোমার নরম ঠোঁটদুটোর পেলবতার মধ্যে আমার নিকোটিনে ভেজা ঠোঁটগুলো বড্ড বেমানান লাগবে, কিন্তু আমরা মানিয়ে নেব। হাতের ছাতাটা বন্ধ করে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে প্রচণ্ড ভিজব আমরা ; দিয়ে দুজনেরই রাত্রে জ্বর হবে। দুজনেই না খেয়ে পাশাপাশি শুয়ে ঘুমিয়ে পড়ব। দুজনেই মাঝরাতে জেগে উঠে প্রবল জ্বরের ঘোরে প্রলাপ বকব ; আবার সামলেও নেবো নিজেদের। সকালে উঠে তোমাকে আদা চা করে দেব ; তুমি আমায় ওষুধের বাক্স ঘেঁটে খুঁজে দেবে প্যারাসিটামল।
প্রবল সংসারী হয়ে উঠব আমরা। বেছে বেছে ঠিক বুড়ো ঝিঙে, কানা বেগুন, পচা মাছটা আনবই, দেখে নিয়ো। তুমি গরমমশলা আনতে বললে খুঁজে খুঁজে ঠিক সর্ষে পাউডারই আনব। তুমিও নুনের বদলে চিনি দিয়ে প্রবল মিষ্টি একটা খাবার বানাবে, আর আমি মুখটা বিতিকিচ্ছিরি করে বলব, 'কী সুন্দর বানিয়েছো!'
এই খুচরো মিথ্যে - খুনসুটি - অপটুতা - কাঁচা বয়সের ছেলেমানুষি - উদ্দামতা - আদিমতা - শালীনতা ও অশালীনতা - বুকর্যাক - দেওয়াল জোড়া মার্ভেলের স্টিকার - কোহেনের পোস্টার ----- এসবকিছু নিয়েই আমরা। তুমি। আমি। আমরা। ঘর। সংসার।
এই স্বপ্নগুলো একদিন সত্যি হবেই। একদিন ঠিক নিজেকে গুছিয়ে তুলতে পারব, আমি জানি। বিশ্বাস করি। প্রবল শূন্যতার মধ্যেও এই খুচরো চার-আনা মূলধন নিয়ে পসার সাজিয়ে বসি আমি। আর বিষণ্ণ হাসি হেসে পাথরের টুকরোটায় লাথি মারতে মারতে এগিয়ে চলি।
শব্দের বা অক্সিটোসিন-ডোপামিন-অ্যাড্রিনালিনের ক্ষরণের মাত্রাসূচক যন্ত্রটা যেখানে গিয়ে হাল ছেড়ে দেয়, ততটা ভালোবাসা নিয়ো। ভালো থেকো। থাকার চেষ্টা করো।
ইতি,
তোমার একান্ত আপন।